আল্লাহ বলেন: “ভয় কর তাঁকে, যিনি তোমাদেরকে সেসব বস্তু দিয়েছেন, যা তোমরা জান।” এই এক আয়াতে তাওহিদের ডাকও আছে, কৃতজ্ঞতার শিক্ষা-ও আছে, আর জবাবদিহির কাঁপন-জাগানো বাণীও আছে। মানুষ যখন নিজের হাতে গড়া শক্তি, জমি, সম্পদ, কৌশল, সভ্যতা—সবকিছুকে নিজের অর্জন ভেবে বসে, তখন এই আয়াত এসে অন্তরকে নরম করে দেয়: যা তোমার জানা, পরিচিত, চোখের সামনে দৃশ্যমান—সবই তো তোমার রবের দান। যেটুকু দেখছ, যেটুকু ধরে রেখেছ, যেটুকুতে বেঁচে আছ—তার উৎস তোমার নয়; উৎস তিনি, যিনি দান করেন, তারপর স্মরণ করিয়ে দেন যে দানের মালিকানা একমাত্র তাঁরই।
সূরা আশ-শুআরার এই অংশে একটি জাতির কাছে নবীর সতর্কবার্তা এসেছে—জীবনকে অহংকারের উপরে দাঁড় করিও না, নিয়ামতকে বিদ্রোহের সিঁড়ি বানিও না। এখানে নির্দিষ্ট কোনো আলাদা শানে নুযূলের প্রসিদ্ধ, নির্ভরযোগ্য বর্ণনা আমাদের সামনে নেই; বরং কুরআনের ভেতরের প্রসঙ্গই এই আয়াতের দরজা খুলে দেয়। পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে নূহ, হূদ, সালিহ, লূত, শুয়াইব আলাইহিমুস সালাম-এর দাওয়াত একই সুরে ধ্বনিত হয়েছে—নবীরা আগে হৃদয় জাগান, তারপর যুক্তি দাঁড় করান, তারপর আল্লাহর নিদর্শন স্মরণ করান। এই আয়াত সেই দীর্ঘ নবী-দাওয়াতেরই একটি স্পষ্ট কণ্ঠ: তোমরা যে সব নিয়ামত জানো—শরীর, শক্তি, সম্পদ, নিরাপত্তা, জীবনযাপনের উপায়—এসবের সামনে গর্ব নয়, তাকওয়া চাই।
এখানে ভয় মানে আতঙ্কে সংকুচিত হওয়া নয়; বরং এমন এক অন্তর্জাগরণ, যা মানুষকে ভুলের স্বাদ থেকে ফিরিয়ে আনে। যে ব্যক্তি জানে আল্লাহই দান করেছেন, সে জানে দান অস্থায়ী, আর দাতার হক চিরস্থায়ী। তাই এ আয়াতের ভিতর দিয়ে কুরআন আমাদের শেখায়: জ্ঞান যত বাড়ে, দায়ও তত বাড়ে; নিয়ামত যত বিস্তৃত হয়, কৃতজ্ঞতার সীমাও তত গভীর হয়; আর উপকার যত স্পষ্ট হয়, অবাধ্যতার অন্ধকার তত লজ্জাজনক হয়ে ওঠে। এই সতর্কতা শুধু অতীতের কোনো জাতির জন্য নয়—এটি আজকের মানুষের জন্যও, যে প্রতিদিন আল্লাহর দেওয়া নিঃশ্বাস, রিজিক, বুদ্ধি আর সুযোগের ভেতরে দাঁড়িয়ে ভাবতে ভুলে যায়: আমি যা জানি, তারও আগে যিনি দিয়েছেন, তাঁকেই ভয় করা উচিত।
নবীদের এই ধারাবাহিক কাহিনির ভেতরে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু কঠিন সত্য বারবার ফিরে আসে: মানুষ যখন আল্লাহর দানকে নিজের কৃতিত্বের খোলসে ঢেকে ফেলে, তখন তার ভেতরের নরম জায়গাটি শুকিয়ে যায়। আয়াতটি যেন অন্তরকে জিজ্ঞেস করে—যে জ্ঞান তুমি বহন করছ, যে শক্তি তুমি ব্যবহার করছ, যে সম্পদে তুমি ভরসা করছ, যে সভ্যতা ও দক্ষতায় তুমি গর্ব করছ, সেগুলোর উৎস কোথায়? তোমার হাত কি আসমান খুলে দিয়েছে, নাকি তোমার প্রার্থনায় এমন ক্ষমতা আছে যে বৃষ্টির ফোঁটা, শস্যের দানা, শ্বাসের অবকাশ, চোখের আলো সবই তোমার কাছে বাধ্য হয়ে এসেছে? এই প্রশ্নের উত্তরে অহংকার নীরব হয়ে যায়, আর হৃদয় বুঝতে শেখে: দান যখন এত বিপুল, তখন দাতার সামনে দাঁড়ানোও ততই কাঁপনজাগানো।
এখানেই তাকওয়ার আসল সৌন্দর্য: আল্লাহকে ভয় মানে শুধু শাস্তির আতঙ্ক নয়, বরং নিয়ামতের ভারকে হৃদয়ে অনুভব করা। দানকে দম্ভে পরিণত না করা, ক্ষমতাকে জুলুমে না ঢেলে দেওয়া, জ্ঞানকে বিভ্রান্তির অস্ত্রে না বদলে ফেলা, এবং নিজের ভেতরের অন্ধকারকে আল্লাহর আলো দিয়ে ভাঙতে শেখা—এই তো নবীদের দাওয়াতের অন্তঃসার। মানুষ যত বেশি পায়, ততই যদি তার দায় বাড়ে; আর যত বেশি জানে, ততই যদি তার স্রষ্টার দিকে ফেরার কথা মনে পড়ে—তবে সেই জ্ঞান হয়ে ওঠে নুর, আর সেই নিয়ামত হয় নাজাতের সিঁড়ি। কিন্তু যদি প্রাপ্তি মানুষকে আরও কঠিন, আরও গর্বিত, আরও অবাধ্য করে তোলে, তবে সে আসলে নিজের হাতেই নিজের বিপদ রচনা করে। এই আয়াত তাই কোমল কণ্ঠে নয়, হৃদয় কাঁপানো নীরবতায় বলে: তোমার চারপাশের সব দানকে দেখো, আর দাতাকে ভুলে যেয়ো না।
এই আয়াতের ভেতর তাকওয়ার ডাক এমন নয় যে তা কেবল ভয় দেখায়; বরং এটি এমন এক জাগরণ, যেখানে মানুষ বুঝে ফেলে—যার হাতে সব নিয়ামত, তাঁর সামনে মাথা নত করাই বুদ্ধি, কৃতজ্ঞতা, আর নিরাপত্তা। তোমার জানা জিনিসগুলো, তোমার দেখা আর না-দেখা প্রয়োজনগুলো, তোমার জীবন চালানোর উপকরণ, তোমার শক্তি, স্বাস্থ্য়, রিজিক, বুদ্ধি, সম্পর্ক—সবই তো এক মহান দাতার অনুগ্রহ। তাই অবাধ্যতার অহংকারে যখন হৃদয় শক্ত হয়ে যায়, এই আয়াত তাকে থামিয়ে দেয়: তুমি যা ধারণ করছ, তা তোমার নিজের ক্ষমতায় টিকে নেই; তা টিকে আছে আল্লাহর ইচ্ছায়। বান্দা যখন দানের ভেতর দাতাকে ভুলে যায়, তখন নিয়ামতই তার জন্য পরীক্ষায় পরিণত হয়। আর যে হৃদয় দানকে স্মরণ করে, তার মধ্যে কৃতজ্ঞতা জন্ম নেয়; আর কৃতজ্ঞতার মাটিতেই তাকওয়ার বৃক্ষ শেকড় গাড়ে।
সূরা আশ-শুআরার এই ধারাবাহিকতায় নবীদের কাহিনি যেন বারবার একই সত্য শোনায়—মানুষের সমাজ বাইরে থেকে যতই জমকালো হোক, যদি তার ভিতরে আল্লাহভীতি না থাকে, তবে সেই সভ্যতা মিথ্যার উপর দাঁড়ানো এক নরম ভঙ্গুর প্রাসাদ। কখনো তারা ক্ষমতার নেশায় উদ্ধত হয়, কখনো অর্থের মোহে অন্ধ হয়, কখনো ভাষার সৌন্দর্য, বুদ্ধির চাতুর্য, আর প্রথার ভারে সত্যকে আড়াল করে। এই আয়াত তাদেরই সম্বোধন করে, যারা জানে কিন্তু মানে না, পায় কিন্তু শুকর করে না, উপভোগ করে কিন্তু জবাবদিহি মনে রাখে না। দাওয়াতের এই সুরে নবী-রিসালাত মানুষকে কেবল আখিরাতের ভয় দেখায় না; বরং দুনিয়ার ভেতরেও নৈতিক শুদ্ধতার পথে ফেরায়—যাতে মালিকানা মানুষকে ঔদ্ধত্য না শেখায়, বরং বিনয়ের শিক্ষা দেয়।
অতএব, এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অন্তরকে প্রশ্ন করতে হয়: আমার জীবনের যে আলো, যে সুযোগ, যে প্রাচুর্য, যে পথচলা—আমি কি তাকে আল্লাহর দান হিসেবে দেখছি, নাকি নিজের কৃতিত্বের মূর্তিতে রূপ দিচ্ছি? যে হৃদয় নিজের ওপর অতিরিক্ত আস্থা রাখে, সে একদিন হোঁচট খায়; আর যে হৃদয় আল্লাহকে ভয় করে, সে ভেঙে পড়লেও ফিরে আসার পথ পায়। তাকওয়া এখানে আতঙ্কের নাম নয়, বরং জবাবদিহির সৌন্দর্য—নিজের সীমা জানা, রবের মহত্ত্ব মানা, এবং তাঁর দেওয়া প্রতিটি নিয়ামতের সামনে কৃতজ্ঞ আত্মসমর্পণ করা। এই ভয়ের মধ্যে আশাও আছে; কারণ যিনি দেন, তিনিই রক্ষা করেন। যিনি স্মরণ করিয়ে দেন, তিনিই ফিরিয়ে নেন। তাই বান্দার মুক্তি এইখানে—যত কিছু জানি, যত কিছু পাই, যত কিছু আঁকড়ে ধরি, সবকিছুর ওপরে যেন আল্লাহই থাকেন; আর তাঁর সামনে হৃদয় যেন সবসময় জেগে থাকে।
আল্লাহর দান যত প্রকাশ্য হয়, মানুষের আত্মপ্রবঞ্চনাও তত সূক্ষ্ম হয়ে ওঠে। আমরা দুনিয়ার কারণগুলো দেখি, কিন্তু কারণগুলোর পেছনে থাকা করুণাময় হাতে চোখ যায় না। এই আয়াত অন্তরকে সেই ভুল থেকে ফেরায়। তিনি দিয়েছেন বলে আমরা বেঁচে আছি; তিনি রেখেছেন বলে আমরা নিরাপদ মনে করছি; তিনি ঢেকে রেখেছেন বলেই বহু গোপন গুনাহ এখনো প্রকাশ পায়নি। তবু মানুষ যদি নিয়ামত পেয়ে উদ্ধত হয়, তবে সেই নিয়ামতই তার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে।
সুতরাং আজ এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে শুধু তিলাওয়াত নয়, আত্মসমর্পণ চাই। হে রব, তুমি যা দিয়েছ তা ভুলে গিয়ে যদি আমরা নিজেকে বড় ভেবে থাকি, তবে আমাদের ক্ষমা করো। তুমি আমাদের জানাশোনা সব দানের মাঝেও এমন হৃদয় দাও, যা তোমাকে ভয় করে, তোমাকে ভালোবাসে, তোমার দিকে ফিরে আসে। কারণ অবশেষে মানুষ হারায় না সম্পদে, মানুষ হারায় গাফিলতায়; আর যে হৃদয় তাকওয়ার আলোয় জেগে ওঠে, সে অল্প পেয়েও বেঁচে যায়, অনেক পেয়েও ধ্বংসের পথে যায় না।