সূরা আশ-শুআরার এই আয়াতটি এক গভীর মর্যাদার ঘোষণা: “আমি মুমিনগণকে তাড়িয়ে দেওয়ার লোক নই।” বাহ্যত এটি একটি সংক্ষিপ্ত বাক্য, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে দাওয়াতের শুদ্ধতা, ঈমানের সম্মান, আর সত্যের পথে দাঁড়ানোর নৈতিক দৃঢ়তা। নবী নূহ আলাইহিস সালাম তাঁর কওমের সামনে যখন সত্যের আহ্বান পেশ করছেন, তখন তার বিরুদ্ধে এক ধরনের শ্রেণিগত অহংকার ও সামাজিক বাছ-বিচার ধ্বনিত হচ্ছিল। তারা চাইছিল, ঈমানের দরজায় যেন তাদের মানসিক শর্ত, সামাজিক মাপকাঠি, আর পছন্দ-অপছন্দের পাহারা বসে। কিন্তু নূহের জবাব জানিয়ে দেয়—আল্লাহর কাছে আগত মুমিনকে দূরে ঠেলে দেওয়ার অধিকার কারও নেই; দাওয়াত কোনো আভিজাত্যের মঞ্চ নয়, এটি হিদায়েতের বিস্তৃত দিগন্ত।
এই বক্তব্যের প্রেক্ষাপটকে সূরাটির সমগ্র ধারার ভেতর বুঝতে হয়। সূরা আশ-শুআরায় বারবার নবীদের কাহিনি এসেছে—একই সত্য, এক ভাষ্য, এক সংগ্রাম: নবীরা মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকেন, আর ক্ষমতার গরিমায় ডুবে থাকা সমাজ সত্যকে ঠেকাতে চায়। কোথাও তাদেরকে কবি বলা হয়, কোথাও মিথ্যাবাদী, কোথাও আবার সাধারণ মানুষদের ঈমানকে অবমাননা করা হয়। নূহ আলাইহিস সালামের এই উক্তি সেই অবমাননার প্রতিউত্তর। তিনি যেন ঘোষণা করছেন: ঈমানদাররা কোনো বোঝা নয়, কোনো অপদার্থ দল নয়, যাদের তাড়িয়ে দিয়ে দাওয়াতকে “পরিষ্কার” করা যাবে; বরং তারাই আল্লাহর রহমতের দিকে ফিরে আসা হৃদয়, যাদের সম্মান করা মানে সত্যকে সম্মান করা।
এই আয়াতে একটি চিরন্তন শিক্ষা আছে—দাওয়াতের পথে মুমিনকে অপমান করা, কমিয়ে দেখা, বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা সত্যের বিরোধিতারই আরেক রূপ। যারা আল্লাহর দিকে আসে, তাদের বাহ্যিক অবস্থান, পারিবারিক মর্যাদা, সম্পদ বা সামাজিক ক্ষমতা দিয়ে বিচার করা যায় না; মাপকাঠি একটাই—ঈমান। তাই এই আয়াত কেবল ইতিহাসের একটি বাক্য নয়, বরং প্রতিটি যুগের জন্য হৃদয়-ঝাঁকুনি দেওয়া নীতিবাক্য: আল্লাহর পথে যারা দাঁড়ায়, তাদেরকে তাড়ানো হয় না; তাদেরকে বুকে টেনে নেওয়া হয়, সম্মান করা হয়, আর সত্যের ছায়ায় স্থির রাখা হয়। কারণ দাওয়াতের সৌন্দর্য তখনই পূর্ণ হয়, যখন সেখানে অহংকারের দরজা বন্ধ থাকে এবং মুমিনের মর্যাদা উন্মুক্ত আকাশের মতো প্রশস্ত থাকে।
এখানে নবী নূহ আলাইহিস সালামের কণ্ঠে এমন এক সত্য উচ্চারিত হয়, যা দাওয়াতের হৃদয়কে নির্মল করে দেয়: ঈমানদারকে তাড়িয়ে দেওয়া সত্যের কাজ নয়। যে ডাকে আল্লাহর দিকে, সে মানুষের অন্তরকে ওজন করে না ধন, বংশ, মুখরোচকতা বা ক্ষমতার মানদণ্ডে; সে দেখে কে রবের ডাকে সাড়া দিয়েছে। এই আয়াত আমাদের শেখায়, হিদায়েতের পথে প্রথম শত্রু অনেক সময় বাইরের অস্বীকার নয়, ভেতরের অহংকার। মানুষ যখন নিজের দল, রুচি, সামাজিক মর্যাদা আর সুবিধাকে ঈমানের ওপরে বসাতে চায়, তখন দাওয়াতের পবিত্রতা ক্ষতবিক্ষত হয়। নূহ আলাইহিস সালাম সেই ক্ষতের বিরুদ্ধে সোজাসাপ্টা সত্য বলেন—আমি মুমিনদের তাড়িয়ে দেওয়ার লোক নই। অর্থাৎ, আল্লাহর পথে আসা হৃদয়কে অপমান করা নয়, বরং তাকে আশ্রয় দেওয়া, সম্মান করা, রক্ষা করা।
আজকের হৃদয়েও এই আয়াত প্রশ্ন তোলে: আমরা কি এমন ঈমান চাই, যা কেবল নিজের মতো, নিজের পছন্দমতো, নিজের মতো মানুষদের নিয়ে গড়া? নাকি এমন ঈমান চাই, যেখানে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা প্রতিটি আত্মা মর্যাদা পায়? এই প্রশ্নের জবাবেই দাওয়াতের শুদ্ধতা নির্ধারিত হয়। মুমিনদের তাড়িয়ে দেওয়া নয়—বরং তাদের সম্মান করা, তাদের ঈমানকে লালন করা, তাদের ভেতরকার আলোর উপর সন্তুষ্ট থাকা—এটাই সত্যের ভাষা। নূহ আলাইহিস সালামের এই উচ্চারণ আমাদের শেখায়, কারও ঈমানকে হালকা মনে করা নিজেই এক ভয়ংকর অন্ধকার। কারণ যে হৃদয় একবার আল্লাহকে চেনে, সে আল্লাহর কাছে প্রিয়। আর আল্লাহর প্রিয়কে অবজ্ঞা করা, শেষ পর্যন্ত নিজেরই অন্তরকে শূন্য করে দেয়।
এই বাক্যটি শুনলে মনে হয়, যেন একজন নবীর কণ্ঠে মানবতার সবচেয়ে কোমল, কিন্তু সবচেয়ে দৃঢ় ঘোষণা শোনা যাচ্ছে: আমি মুমিনদের তাড়িয়ে দিই না। এতে শুধু নূহ আলাইহিস সালামের অবস্থান নয়, বরং প্রতিটি যুগের সত্যিকারের দাওয়াতের মর্মধ্বনি লুকিয়ে আছে। ঈমানের পথে যাদের হৃদয় নরম হয়ে আসে, তাদের প্রতি অবজ্ঞা, সামাজিক বাছ-বিচার, বা প্রভাবশালী শ্রেণির খুশি রক্ষার জন্য দরজা বন্ধ করে দেওয়া—এটি আল্লাহর পথে চলার ভাষা নয়। যে আহ্বান আল্লাহর, সেখানে মানুষের মর্যাদা ধন-সম্পদে, বংশে, কিংবা বাহ্যিক অবস্থানে মাপা হয় না; সেখানে মাপা হয় অন্তরের সাড়ায়, তাওহীদের ডাকে সাড়া দেওয়ার সাহসে। তাই এই আয়াত আমাদের শিখিয়ে দেয়, সত্যের কাছে আসা মানুষকে ঠেলে ফেলে নয়, বরং সম্মান দিয়ে বুকে টেনে নেওয়াই ঈমানি ভদ্রতা।
কিন্তু এই আয়াত কেবল নবীর মর্যাদা বর্ণনা করে না; আমাদের নিজেদের হৃদয়ের ভেতরও প্রশ্নের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। আমি কি কখনো ঈমানদারদের প্রতি এমন আচরণ করি, যেন তাদের পরিশুদ্ধতা, তাদের দীনদার রুচি, তাদের সাধারণতা, কিংবা তাদের ভিন্নতা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে? আমি কি এমন সমাজের অংশ হয়ে উঠেছি, যেখানে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের পাশে দাঁড়ানোর বদলে তাদের সরিয়ে রাখা সহজ মনে হয়? এই আয়াত মানুষকে ভয় ও আশার মধ্যে দাঁড় করায়—ভয়, কারণ আল্লাহর পথে অহংকার প্রবেশ করলে দাওয়াতের প্রাণ শুকিয়ে যায়; আর আশা, কারণ যে হৃদয় তাওহীদের দিকে ফিরে আসে, তার জন্য দরজা খোলা থাকে, যতক্ষণ না আল্লাহর রহমত তাকে ঢেকে নেয়। সত্যের পথ কখনো ক্ষমতার দরবার নয়, এটি আত্মসমর্পণের মিহরাব। সেখানে মানুষ আসে ধুলো হয়ে, কিন্তু আল্লাহ তাদেরকে নূর দিয়ে উঠিয়ে দেন। তাই মুমিনকে তাড়িয়ে দেওয়া নয়, মুমিনকে সম্মান করা—এটাই সেই ঈমান, যা সমাজকে নরম করে, আত্মাকে জাগায়, এবং শেষ পর্যন্ত মানুষকে তার রবের দিকে ফিরিয়ে নেয়।
এই আয়াত আমাদের শেখায়, ঈমানের দুনিয়ায় সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজ হলো মানুষের হৃদয়কে আল্লাহর দরবার থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার মানসিকতা। হিদায়েত যখন আসে, তখন তার মুখে কোনো মানবিক শ্রেণিভেদ থাকে না; সেখানে ধনী-দরিদ্র, শক্তিশালী-দুর্বল, পরিচিত-অপরিচিত—সবাই একই আলোয় দাঁড়ায়। নবীর কণ্ঠে তাই কঠোরতা নয়, বরং এক পবিত্র ঘোষণা শোনা যায়: মুমিনকে তাড়ানো যায় না, কারণ সে আল্লাহর দিকে ফিরেছে। তাকে ছোট করা মানে সেই আলোর অবমাননা, যার সামনে একদিন আমাদেরও দাঁড়াতে হবে।
আজকের অন্তরহীন দুনিয়ায় এই কথা আরও বেশি কাঁপিয়ে দেয়। আমরা কত সহজে মানুষকে তার রূপ, ভাষা, অবস্থান, অতীত, কিংবা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ডে মাপি। অথচ কুরআন আমাদের সামনে এমন এক দাওয়াতের মাপকাঠি রাখে, যেখানে মর্যাদা আসে ঈমান থেকে, আর নিরাপত্তা আসে আল্লাহর রহমতে। যে হৃদয় সত্যকে গ্রহণ করেছে, তাকে রক্ষা করা দরকার, অপমান নয়; তাকে কাছে টানতে হয়, দূরে ঠেলে নয়। কারণ ঈমানদারকে কষ্ট দেওয়া শুধু একজন মানুষকে আঘাত করা নয়, বরং আল্লাহ যাকে সম্মান দিয়েছেন, তাকে অসম্মান করার দুঃসাহস।
এই একটি বাক্য আমাদের ভেতরের অহংকারকে জিজ্ঞাসা করে—তুমি কি সত্যের পক্ষ নিয়েছ, নাকি মানুষের গ্রহণযোগ্যতার? তুমি কি মুমিনকে সম্মান করছ, নাকি নিজের শ্রেষ্ঠত্বের দেয়াল তৈরি করছ? নূহ আলাইহিস সালামের এই দৃঢ়তা আমাদেরও শিখিয়ে যায়, দাওয়াতের পথে প্রথম প্রয়োজন বিনয়, আর শেষ প্রয়োজন আল্লাহভীতি। যে ব্যক্তি নিজের ভাইকে তাড়ায়, সে হয়তো কোনো সময় মানুষকে ঠেকাতে পারে; কিন্তু আল্লাহর রহমতকে ঠেকাতে পারে না। তাই আজ হৃদয় নরম হোক, জিহ্বা সংযত হোক, দৃষ্টি পবিত্র হোক। আমরা যেন মুমিনদের প্রতি হৃদয়ের দরজা খোলা রাখি, আর নিজেদের জন্য আল্লাহর দরবারে এমন এক ক্ষমা চাই, যা আমাদের অহংকারকে ভেঙে ঈমানের সজল মাটিতে ফিরিয়ে আনে।