মানুষ যখন সত্যের ডাককে ঠাট্টা করে, তখন নবীর কণ্ঠ আরও শান্ত, আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। এই আয়াতে সেই কণ্ঠেরই এক অদ্ভুত, হৃদয়-কাঁপানো প্রতিধ্বনি আছে: তাদের হিসাব আমার রবেরই কাজ; যদি তোমরা বুঝতে! বাহ্যত এটি খুব ছোট্ট একটি বাক্য, কিন্তু এর ভেতরে আছে দাওয়াতের মর্যাদা, মানুষের সীমাবদ্ধতা, আর আল্লাহর সার্বভৌম বিচারের অখণ্ড ঘোষণা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের অন্তর খুলে দিতে এসেছেন; কারও গোপন হিসাব টানতে, কারও মুখোশ খুলে অপমান করতে, কারও ব্যক্তিগত পরিণতি মানুষকে দেখিয়ে দিতে নয়। সত্যের আহ্বান যখন কানে আসে, তখন কিছু মানুষ তার আলোয় নরম হয়ে যায়, আর কিছু মানুষ আরও কঠিন তাচ্ছিল্যে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এই আয়াতে সেই তাচ্ছিল্যের জবাব আছে, কিন্তু প্রতিশোধের ভাষায় নয়; আছে রবের কাছে সবকিছু সোপর্দ করার প্রশান্ত দৃঢ়তা।
সূরা আশ-শুআরার এই ধারাবাহিক অংশে নবীদের কাহিনি বারবার আমাদের শেখায়—দাওয়াত মানে শুধু কথা বলা নয়, বরং মানুষের অস্বীকার, বিদ্রূপ, সংকীর্ণতা, এবং নিজেদের বানানো মানদণ্ডের মুখোমুখি দাঁড়ানো। এখানে কোনো নির্দিষ্ট সহীহভাবে প্রতিষ্ঠিত বিশেষ ঘটনার নাম নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও, সূরাটির সামগ্রিক মক্কি প্রেক্ষাপট স্পষ্ট: নবীজি মক্কার সমাজে যখন তাওহীদের আহ্বান পৌঁছে দিচ্ছিলেন, তখন কুরাইশের একাংশের কাছে এই আহ্বান ছিল কবিতা, কল্পনা, জাদু বা সাধারণ বাগ্মিতার মতো আরেকটি ‘কথা’ মাত্র। অথচ আল্লাহর ওহি কোনো কবিতা নয়, কোনো মানবিক অভিনয় নয়; এটি এমন এক সত্য, যা মানুষের ঠাট্টাকে অতিক্রম করে সোজা আখিরাতের দিকে ইশারা করে। কাজেই এই আয়াতে ‘হিসাব’ বলতে কেবল দুনিয়ার কোনো সামাজিক মূল্যায়ন বোঝানো হয়নি; বোঝানো হয়েছে চূড়ান্ত বিচার, যেখানে মানুষের হাস্যরস, অবজ্ঞা, এবং অহংকারের আসল ওজন প্রকাশ পাবে।
আর ‘যদি তোমরা বুঝতে’—এই ছোট্ট বাক্যটি যেন আমাদের অন্তরকে ধাক্কা দেয়। কারণ অজ্ঞতা শুধু না-জানাই নয়; সত্য সামনে থেকেও না-বোঝার নামও অজ্ঞতা। মানুষ যখন মনে করে, সে-ই ঠিক করবে কে সৎ, কে ভ্রান্ত, কে ক্ষমা পাবে আর কে ধ্বংস হবে, তখন সে নিজের সীমা ভুলে যায়। এই আয়াত সেই ভুল-স্মরণ করিয়ে দেয়: বিচার মানুষের হাতে নয়, দাওয়াতের মালিকের হাতে, সৃষ্টির রবের হাতে, অন্তর জানেন যিনি সেই আল্লাহর হাতে। নবীর কাজ ছিল আহ্বান পৌঁছে দেওয়া, আর মানুষের পরিণতি আল্লাহর জ্ঞানে ও ইনসাফে নির্ধারিত হওয়া। তাই এই আয়াত কেবল বিরোধীর প্রতি সতর্কবাণী নয়; এটি মুমিন হৃদয়ের জন্যও সান্ত্বনা—সত্যকে যখন অবমূল্যায়ন করা হয়, তখন তুমি ভেঙে পড়ো না। তোমার কাজ সত্য বলা, আর তাদের হিসাব আল্লাহর রবুবিয়াতের হাতে ছেড়ে দেওয়া।
মানুষের তাচ্ছিল্য কখনো কখনো এতটাই মুখর হয় যে, মনে হয় সত্যকে বুঝি সে শব্দের ভিড়ে চাপা দিয়ে ফেলবে। কিন্তু নবীর কণ্ঠ সে ভিড়ে হারায় না; বরং আরও স্থির, আরও নির্মল হয়ে ওঠে। “তাদের হিসাব নেওয়া আমার রবেরই কাজ”—এই ছোট্ট বাক্যে যেন দাওয়াতের মর্যাদা রক্তমাংস পেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নবী মানুষকে অপমান করতে আসেননি, তাদের অন্তরকে জাগাতে এসেছেন; তাই কার কতটা অস্বীকার, কার কতটা উপহাস, কার ভেতরে কত অন্ধকার—এসবের পূর্ণ মীমাংসা মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি। সত্যের ডাক যখন শোনা হয়, তখন সেটা চরিত্রের পরীক্ষা হয়ে যায়; আর যে পরীক্ষা আল্লাহ নেন, মানুষের কটাক্ষ সেখানে শেষ কথা হতে পারে না।
আরও একবার এই আয়াত আমাদের থামিয়ে দেয়: যদি তোমরা বুঝতে! যেন বলা হচ্ছে, মানুষের অজ্ঞতা কত ভয়ংকর—সে শুধু সত্যকে অস্বীকার করে না, সে নিজের সীমাকেও ভুলে যায়। আমরা তো আল্লাহর ফয়সালার সামান্য ইশারাও পুরোপুরি জানি না; তাহলে কার হিসাব কে টানবে? সূরা আশ-শুআরার নবী-গাথাগুলোতে এই বোধই বারবার ফিরে আসে—সত্যের কণ্ঠ একা হয়ে গেলেও সে পরাজিত নয়, কারণ তার পেছনে আছেন সেই রব, যাঁর আদালতে কোনো কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় না। আজও এই আয়াত হৃদয়কে শেখায়: তাচ্ছিল্যের জবাব তাচ্ছিল্যে নয়, সন্দেহের জবাব অহংকারে নয়; জবাব হলো আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা, এবং সেই নিশ্চিত বিশ্বাস—শেষ বিচার মানুষের নয়, আমার রবের।
যখন সত্যের ডাককে মানুষ ঠাট্টা করে, যখন নবীর আহ্বানকে তুচ্ছ ভেবে নিজেদের অজ্ঞতাকেই বুদ্ধি মনে করে, তখন এই আয়াতটি এক অদ্ভুত শান্ত কিন্তু বজ্রসম ঘোষণা হয়ে নেমে আসে: তাদের হিসাব নেয়া আমার রবেরই কাজ; যদি তোমরা বুঝতে! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কারও অন্তরের গুপ্ত হিসাব খুলে অপমান করতে আসেননি, কারও ভবিষ্যৎ পরিণতি মানুষের সামনে টেনে এনে তামাশা করার জন্যও আসেননি। দাওয়াতের মর্যাদা এখানেই—তিনি মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকেন, আর মানুষের অন্তরের গোপন ফয়সালা আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেন। যে সমাজ সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে উপহাসে হাসে, সে সমাজ আসলে নিজেরই অন্ধত্বকে প্রকাশ করে; কারণ হেদায়েতের আলো যখন চোখে লাগে, তখন কিছু হৃদয় নরম হয়, আর কিছু হৃদয় আরও শক্ত হয়ে যায়।
এই আয়াতে ভয়ও আছে, আশা-ও আছে। ভয় এই জন্য যে, মানুষের ব্যঙ্গ, অস্বীকার, অহংকার—কোনোটাই চিরস্থায়ী নয়; একদিন সব হিসাব সেই রবের দরবারে পৌঁছাবে, যাঁর সামনে কোনো ছলনা টেকে না, কোনো মুখোশ স্থায়ী হয় না। আর আশা এই জন্য যে, সত্যের পথিককে মানুষের বিচার বহন করতে হয় না; তাকে কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা করে চলতে হয়, নিজের দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করতে হয়। এই বাণী আমাদেরও থামিয়ে দেয়: আমি কি অন্যকে বিচার করতে গিয়ে নিজের হিসাব ভুলে যাচ্ছি? আমি কি দাওয়াতের নামে মানুষের ওপর রায় দিচ্ছি, অথচ নিজের আত্মাকে জাগ্রত করছি না? সূরা আশ-শুআরার নবীদের কাহিনি যেন বারবার এ কথাই শেখায়—শেষ কথা মানুষের নয়, আল্লাহর; আর যার অন্তরে এই সত্য নেমে আসে, তার হৃদয় তাচ্ছিল্যের শব্দে আর কাঁপে না, বরং নিজের রবের সামনে নত হতে শেখে।
মানুষ অনেক সময় এমন ভাবে, যেন সে-ই বিচারক, সে-ই সাক্ষী, সে-ই শেষ কথা। কিন্তু নবীর কণ্ঠ এখানে সেই অহংকারের ভিতরেই নীরব এক বজ্রপাত নামিয়ে দেয়: তাদের হিসাব আমার রবেরই কাজ। দাওয়াতের ভাষা কখনো মানুষের আত্মসম্মান ভাঙতে আসে না; সে শুধু সত্যের আয়না ধরে। যারা সেই আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখে হাসে, উপহাস করে, মুখ ফিরিয়ে নেয়—তাদের অন্তরের অন্ধকারও, তাদের প্রত্যাখ্যানও, তাদের প্রত্যাবর্তনের পথও আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়। নবী মানুষের অন্তরের মালিক নন; তিনি রবের বার্তাবাহক। আর রব যখন হিসাব নেন, তখন কারও তামাশা, কারও গর্ব, কারও ভ্রান্ত নিরাপত্তা—সবই ধুলো হয়ে যায়।
এই আয়াত আমাদের শেখায়, সত্যের পথে দাঁড়িয়ে আমাদের কাজ প্রতিশোধ নেওয়া নয়, বরং আমানত আদায় করা। কাউকে হেয় করা, কাউকে তাড়িয়ে দেওয়া, কাউকে অপমানের ভাষায় জবাব দেওয়া—এসব নবীর পথ নয়। তিনি দয়া নিয়ে ডাকেন, আর বিচার আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেন। যদি আমরা সত্যিই বুঝতাম, তবে জানতাম—আজ যে ঠাট্টা করছে, কাল সে-ই নিজের আমলনামার সামনে থেমে যাবে; আজ যে মানুষকে ছোট করছে, কাল সে আল্লাহর সামনে কত বড় অসহায়। তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদেরও কণ্ঠ নিচু হয়, হৃদয় ভেঙে পড়ে: হে আল্লাহ, আমাদেরকে এমন বানিয়ে দিন না যারা সত্যকে দেখে অন্ধভাবে উপহাস করে; বরং এমন বানিয়ে দিন যারা তোমার হিসাবকে ভয় করে, তোমার দয়ার মুখাপেক্ষী হয়, এবং তোমার কাছে ফিরে আসতে জানে।