আল্লাহর এই আয়াতে নূহ আলাইহিস সালামের কণ্ঠে এক আশ্চর্য মিশ্রণ শোনা যায়—স্নেহ, সতর্কতা, আর হৃদয় কাঁপানো জিজ্ঞাসা। তিনি বলেন, “তোমাদের কি ভয় নেই?” এটি কেবল প্রশ্ন নয়; এটি এক ঘুমন্ত বিবেককে নাড়া দেওয়ার ডাক। যাদের তিনি সম্বোধন করছেন, তারা তাঁর রক্তের সম্পর্কের লোক, নিজের জনগণ; তাই আয়াতে “তাদের ভ্রাতা” বলা হয়েছে। নবীদের দাওয়াত কখনো শূন্য আকাশে ভেসে আসা বক্তব্য নয়, তা মানুষের মাঝখান থেকে উঠে আসা হেদায়েতের আহ্বান—কাছের মানুষকে দূরত্ব থেকে নয়, মমতার গভীরতা থেকে ডাকা।

এই প্রশ্নের ভেতরে আছে আল্লাহভীতির মূল বীজ। তাখওয়া মানে শুধু ভয় নয়; তা হলো অন্তরের জাগরণ, সীমারেখা চিনে নেওয়া, সত্যের সামনে নত হওয়া। নূহ আলাইহিস সালাম তাঁর জাতিকে প্রথমে শাস্তির ভয় দেখিয়ে নয়, বরং আত্মাকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন—তোমরা কি অনুভব করো না যে, তোমাদের জীবন আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আছে? তোমাদের কাজ, তোমাদের জেদ, তোমাদের অহংকার—এসব কি শেষ বিচারের ভার বহন করতে পারবে? এই প্রশ্নের মধ্যে লুকিয়ে আছে নবুয়তের কোমল কঠোরতা: হৃদয়কে আঘাত না করে জাগানো, আর জাগিয়ে তুলে তওবার দিকে ফেরানো।

সূরা আশ-শুআরার এই অংশে ধারাবাহিকভাবে একাধিক নবীর কাহিনি এসে যায়, যেন কুরআন আমাদের শেখাতে চায়—দাওয়াতের ভাষা বদলাতে পারে, কিন্তু সত্যের প্রাণ এক। এখানে নূহ আলাইহিস সালামের বক্তব্যকে কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার সংকীর্ণ বিবরণ হিসেবে নয়, বরং মানব ইতিহাসের আদিম ও চিরন্তন সংকট হিসেবে বোঝা উচিত: মানুষ বারবার আল্লাহকে ভুলে যায়, নবীরা বারবার তাকে স্মরণ করিয়ে দেন। এই আয়াত সেই বিস্মৃত হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে, যেখানে আত্মসম্ভ্রম, গোমরাহী, সামাজিক জেদ আর ধর্মহীন নিরাপত্তাবোধ জমে পাথর হয়ে গেছে। আর নূহ (আ.)-এর প্রশ্ন, “তোমাদের কি ভয় নেই?”—এখনো প্রতিটি যুগের মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যেন বলছে, আল্লাহর সামনে ফিরে আসার সময় কি এখনো হয়নি?

নূহ আলাইহিস সালাম যখন বলেন, “তোমাদের কি ভয় নেই?”, তখন প্রশ্নটি কেবল মুখের শব্দ হয়ে থাকে না; তা হয়ে ওঠে অন্তরের দরজায় আল্লাহর পক্ষ থেকে টোকা। এ প্রশ্নে আছে এমন এক স্নেহ, যা দূরত্ব সৃষ্টি করে না; বরং মানুষকে নিজের অবস্থার সামনে এনে দাঁড় করায়। নবীদের ডাক এভাবেই আসে—নরম, অথচ অবিচল; মমতাময়, অথচ কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো সত্যে পূর্ণ। মানুষের কাছে মানুষের সবচেয়ে বড় উপহার কখনো প্রশংসা নয়, কখনো তিরস্কারও নয়; বরং সেই জাগরণ, যা তাকে ভুলে যাওয়া রবের দিকে ফিরিয়ে নেয়।

“অল-আরাф/অচেতনতা” মানুষের অন্তরে এমন পর্দা ফেলে, যাতে পাপ আর স্বাভাবিক মনে হতে থাকে, আর আল্লাহর হুকুম হয়ে যায় দূরের কথা। নূহের এই আহ্বান সেই পর্দা ছিঁড়ে ফেলে দেয়। তিনি যেন বলতে চান, তোমরা কি সত্যিই নিরাপদ, অথচ তোমাদের জীবন এক মুহূর্তের জন্যও তোমাদের হাতে নেই? তোমরা কি আল্লাহর সামনে জবাবদিহির কথা ভুলে গেলে? তাখওয়া এখানে ভয়ভীতির অন্ধকার নয়; বরং সত্যকে সম্মান করার আলো। এটি সেই জাগ্রত হৃদয়, যা জানে—নিজেকে হারিয়ে ফেললে সবকিছু হারিয়ে যায়, আর আল্লাহকে স্মরণ করলে পতনের মধ্যেও মুক্তির পথ খোলা থাকে।
এই আয়াত আমাদেরও সামনে দাঁড় করায়। আজও মানুষের ভিড়ে এমন কত আত্মা আছে, যারা নিজেদের ব্যস্ততা, অহংকার, অবহেলা, আর দুনিয়ার শব্দে নূহের সেই প্রশ্ন শুনতে পায় না। অথচ প্রশ্নটি আজও জীবিত: তোমাদের কি ভয় নেই? অর্থাৎ, তোমাদের হৃদয় কি নরম হলো না? তোমরা কি ফিরবে না? এই কাঁপানো ডাকই নবীদের দাওয়াতের সারকথা—মানুষকে অপমান করতে নয়, জাগাতে; ভেঙে দিতে নয়, সত্যের সামনে নত করতে। আর যে হৃদয় একবার এই প্রশ্নে কেঁপে ওঠে, সে জানে—আল্লাহর দিকে ফেরা কোনো পরাজয় নয়; সেটাই মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্ধার।

নূহ আলাইহিস সালামের এই প্রশ্নে আগে ধমক নেই, আছে ভ্রাতৃত্বের স্নেহ; আগে আতঙ্ক নেই, আছে জাগরণের স্পর্শ। তিনি তাদের অচেনা কেউ নন, তাদেরই ভেতরের মানুষ—তাদের সমাজের, তাদের ভাষার, তাদের জীবনের সাথী। তাই এই ডাক এত ভারী: “তোমাদের কি ভয় নেই?” অর্থাৎ, তোমাদের অন্তর কি সত্যিই জেগে আছে? তোমাদের বিবেক কি এতটাই মরে গেছে যে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর অনুভবও হারিয়ে ফেলেছ? নবীদের কণ্ঠ এভাবেই মানুষের ঘুম ভাঙায়—কখনো নরম হাতে, কখনো কাঁপানো প্রশ্নে, কিন্তু সবসময় হৃদয়কে সত্যের দরজার সামনে এনে দাঁড় করিয়ে।

এই আয়াতে তাখওয়ার মূল সুর ধরা পড়ে। তাখওয়া শুধু শাস্তির ভয় নয়; তা হলো নিজের সীমা জানা, রবের মহত্ত্ব বুঝে অবাধ্যতার পথে পা না বাড়ানো, অদৃশ্য আল্লাহর সামনে নিজের ভেতরের গোপন জবাবদিহি অনুভব করা। সমাজ যখন অভ্যাসে গাফিল হয়, অন্যায় যখন স্বাভাবিক হয়ে যায়, সত্য যখন অস্বস্তিকর মনে হয়, তখন নবীদের এই প্রশ্ন আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। নূহ আলাইহিস সালামের আহ্বান যেন আমাদেরও সামনে এসে দাঁড়ায়—আমরা কি এমন এক জীবনে ডুবে গেছি, যেখানে আল্লাহর ভয় নয়, মানুষের অভ্যাসই আমাদের মানদণ্ড?

এই প্রশ্নের ভিতরেই আছে প্রত্যাবর্তনের দরজা। কারণ নবীর সতর্কতা কখনো আশা কেড়ে নেয় না; বরং আশা জাগায়, যদি মানুষ নিজেকে আল্লাহর দিকে ফেরাতে চায়। আজও এই আয়াত আমাদের হৃদয়ে বলে, জীবনকে কেবল চলমান অভ্যাস ভেবে ফেলো না; এটি পরীক্ষা, এটি সাক্ষাৎ, এটি ফিরে যাওয়ার সফর। তাই নিজের অন্তরকে জিজ্ঞেস করা জরুরি: আমি কি আল্লাহকে স্মরণ করি, নাকি কেবল দুনিয়ার শব্দে বাঁচি? আমি কি সত্যের সামনে নত হই, নাকি জেদের পর্দা টানি? নূহ আলাইহিস সালামের সেই কাঁপানো ডাক আজও বাতাসে ভেসে আছে—যার অন্তরে একটু নরমত্ব আছে, সে শুনবে: তোমাদের কি ভয় নেই?

নূহ আলাইহিস সালামের এই একটিমাত্র প্রশ্নে মানুষের সমস্ত আত্মপ্রবঞ্চনা থমকে দাঁড়ায়। কারণ সত্যের কণ্ঠ কখনো চিৎকার করে না, কিন্তু হৃদয়ের দরজায় এমন নক করে যে, অনন্তকাল পর্যন্ত তার শব্দ থেকে পালানো যায় না। তিনি তাদের অপমান করেননি; বরং ভ্রাতৃত্বের স্নেহে জাগাতে চেয়েছেন। এই ভ্রাতৃত্বই নবীদের দাওয়াতের সৌন্দর্য—শত্রু বানিয়ে নয়, নিজের মানুষের জন্য কেঁদে কেঁদে পথ দেখানো; দূরত্ব তৈরি করে নয়, কাছে এসে আত্মাকে নাড়া দেওয়া।
আজও এই আয়াত আমাদের দিকে ফিরে আসে। আমরা কি সত্যিই আল্লাহকে ভয় করি, নাকি ভয়কে শুধু দুনিয়ার হিসাবের মধ্যে বন্দী করে রেখেছি? অপরাধের অভ্যাস, গুনাহের পরিচিতি, অহংকারের নীরব আসন—এসব কি আমাদের অন্তরকে এতটাই কঠিন করে দেয় যে, নূহের মতো এক নবীর কাঁপানো প্রশ্নও আমাদের ভেতরে কোনো সাড়া জাগায় না? আল্লাহভীতি মানে আতঙ্ক নয়; তা হলো অন্তরকে এমন নম্র করে তোলা, যেন সে আর নিজের ইচ্ছাকে উপাস্য বানাতে না পারে।
এই আয়াত শেষ পর্যন্ত আমাদের সামনে একটি দরজা খুলে দেয়—ফিরে আসার দরজা। নবীদের কাহিনি কেবল অতীতের কাহিনি নয়; তা আজকের হৃদয়ের জন্য আয়না। যে হৃদয় “তোমাদের কি ভয় নেই?” শোনে এবং কেঁপে ওঠে, সে-ই বেঁচে যায়। আর যে হৃদয় শোনে অথচ নিষ্প্রভ থাকে, তার ভেতরে হয়তো এখনো নিঃশব্দে নূহের জাতির সেই পুরোনো অন্ধকারই বাসা বেঁধে আছে। হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরে এমন এক তাখওয়া দান করুন, যা আমাদের জাগিয়ে তোলে, নরম করে, এবং আপনার দিকে ফিরিয়ে আনে।