“নূহের সম্প্রদায় পয়গম্বরগণকে মিথ্যারোপ করেছে”—এই সংক্ষিপ্ত আয়াতটি যেন ইতিহাসের দরজায় এক ভারী আঘাত। একটি জাতির নাম এসেছে, কিন্তু কথাটি কেবল তাদের নয়; এটি মানুষের অন্তরের সেই পুরোনো রোগের কথা, যেখানে সত্য সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও অহংকার তাকে চিনে না। কুরআনের ভাষা এখানে গভীর ও বিস্তৃত: নূহ আলাইহিস সালামের জাতি কেবল তাঁকেই অস্বীকার করেনি, বরং রাসূলদের প্রতি অবিশ্বাসের যে মানসিকতা, সেই একই ধারাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। কারণ আল্লাহর প্রেরিত সত্যের একটি অংশকে অস্বীকার করা মানে, সত্যের উৎসকেই অস্বীকার করা।
এই আয়াতে নূহের কাহিনি একদিকে ঐতিহাসিক, অন্যদিকে চিরকালীন। এটি সেই প্রথম বড় মানবসমাজগুলোর একটির কথা মনে করায়, যারা দীর্ঘদিন নূহ আলাইহিস সালামের দাওয়াতের মুখোমুখি হয়েছিল—তাওহীদের ডাক, শির্কের বিরুদ্ধে সতর্কতা, ন্যায় ও আত্মসমর্পণের আহ্বান। কুরআন এখানে কোনো কল্পকাহিনি শোনাচ্ছে না; বরং মানুষের সামাজিক বাস্তবতা, নেতৃত্বের জেদ, সংখ্যাগরিষ্ঠের অহংকার, আর সত্যের আহ্বানকে উপহাস করার ভয়াবহ পরিণতি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। যখন কোনো সমাজ বারবার হেদায়াত পায়, তবু বেছে নেয় অস্বীকার, তখন তাদের পতন হঠাৎ নেমে আসে না—তার আগে হৃদয়ের ভেতরে নেমে আসে অন্ধকার।
সূরা আশ-শুআরার এই অংশে ধারাবাহিকভাবে নবীদের কাহিনি এসেছে, যেন বোঝানো হয়: দাওয়াতের পথ নতুন কিছু নয়, আর প্রতিরোধও নতুন কিছু নয়। নবীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা, অপবাদ, এবং উপহাস—সব যুগেই এক ধরণের চেহারা নেয়। তাই এই আয়াত আমাদের কেবল নূহের জাতির দিকে তাকাতে বলে না; নিজের ভেতরের সেই নীরব জেদকেও দেখতে বলে, যা সত্যকে মেনে নিতে চায় না। আল্লাহর ক্ষমতার সামনে কোনো জাতির সংঘবদ্ধ অস্বীকার টিকে থাকতে পারে না—এই ঘোষণাই এখানে স্পন্দিত হয়।
নূহ আলাইহিস সালামের জাতির এই অস্বীকার শুধু একটি ঘটনার নাম নয়; এটি মানুষের ভিতরের সেই পুরোনো দুর্ভাগ্যের প্রতিচ্ছবি, যেখানে সত্যের কণ্ঠস্বর যত স্পষ্টই হোক, অহংকার তার দিকে কানে দেয় না। কুরআন যখন বলে, “নূহের সম্প্রদায় পয়গম্বরগণকে মিথ্যারোপ করেছে,” তখন বক্তব্যের ওজন কেবল নূহের জাতির ওপর সীমিত থাকে না; বরং একটি বড় নৈতিক সত্য উন্মোচিত হয়—আল্লাহর প্রেরিত সত্যকে অস্বীকার করা মানে সেই সত্যের উৎসকেই মিথ্যা বলা। তাই এক নবীর দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করা আসলে সব রাসূলের ডাকে পিঠ ফিরিয়ে নেওয়ারই নাম। মানুষের জেদ, বংশগৌরব, সংখ্যার ভিড়, পুরোনো অভ্যাস—এসব যখন হৃদয়ের ওপর পর্দা টেনে দেয়, তখন নাজাতের ডাকও শাস্তির পূর্বাভাস হয়ে ওঠে।
নূহের সম্প্রদায়ের এই অস্বীকার শুধু একটি বাক্য নয়; এটি মানুষের হৃদয়ে জমে থাকা এক চিরচেনা অন্ধকারের নাম। সত্য যখন নরম কণ্ঠে ডাকে, তখনও অহংকার তাকে শুনতে পায় না; আর যখন সত্য বারবার দাঁড়িয়ে যায়, তখনও ভেতরের জেদ তাকে মিথ্যা বলে অভিহিত করে। কুরআন এখানে আমাদের সামনে এমন এক সমাজকে তুলে ধরে, যেখানে দাওয়াতের কথা ছিল, সতর্কতার ভাষা ছিল, আল্লাহর দিকে ফেরার সুযোগ ছিল; কিন্তু মানুষের ভিড়ে একাকী হয়ে গেল সত্যের আহ্বান। এই আয়াতের ধাক্কা তাই কেবল অতীতের দিকে নয়, আমাদের নিজের বুকের দিকেও—আমি কি কোনোদিন সত্য শুনে তাকে অস্বীকার করেছি? আমি কি নিজের স্বার্থ, গোষ্ঠী, অভ্যাস, কিংবা অহংকারকে ঈমানের ওপর বসিয়ে দিয়েছি?
নূহ আলাইহিস সালামের কাহিনি আমাদের শেখায়, দাওয়াতের পথে বিপরীত স্রোত নতুন কিছু নয়; বরং এটি সেই পুরোনো ইতিহাস, যা বারবার ফিরে আসে সমাজের নানা মুখোশ পরে। কখনো উপহাসের ভাষায়, কখনো অবহেলার নীরবতায়, কখনো সংখ্যার জোরে সত্যকে চাপা দেওয়ার চেষ্টায় মানুষ আল্লাহর বাণীকে দূরে সরাতে চায়। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত সত্য মানুষের ভোটে সত্য হয় না, আর মানুষের জেদে মিথ্যা হয় না। এ আয়াত যেন বলে: অনেকের সমর্থনও যদি বাতিলের পক্ষে দাঁড়ায়, তবু একমাত্র সত্যের মানদণ্ড আল্লাহই। তাই সমাজের বাহ্যিক সমৃদ্ধি, কণ্ঠের জোর, কিংবা ভ্রান্ত ধারার প্রাচুর্য দেখে যেন হৃদয় বিভ্রান্ত না হয়; কারণ ইতিহাসে অনেক সম্প্রদায়ই সংখ্যায় বড় ছিল, কিন্তু আল্লাহর সামনে তারা ছিল দুর্বল ও অসহায়।
এই ঘোষণার মধ্যে একদিকে ভয় আছে, অন্যদিকে আশাও আছে। ভয় এই জন্য যে, সত্যকে অস্বীকার করা কোনো নিরীহ ভুল নয়; এটি হৃদয়কে কঠিন করে, সমাজকে অন্ধ করে, আর মানুষের ওপর আল্লাহর ন্যায়বিচারের দরজা খুলে দেয়। আর আশা এই জন্য যে, আল্লাহ এমন আয়াতের মাধ্যমে আমাদের এখনই জাগিয়ে দিচ্ছেন—যেন দেরি হয়ে যাওয়ার আগে অন্তর নরম হয়, চোখ ভিজে ওঠে, জবান ফিরে আসে তাওবার দিকে। নূহের সম্প্রদায়ের নাম উচ্চারিত হয়েছে যাতে আমরা নিজেদের সময়কে বাঁচাতে পারি, নিজেদের গর্বকে ভেঙে ফেলতে পারি, আর বলতে পারি: হে আল্লাহ, সত্য যদি আমাদের বিরুদ্ধেও যায়, তবু আমরা সত্যের সঙ্গেই থাকব। কারণ শেষ পর্যন্ত জেতা তাদেরই, যারা প্রভুর ডাকে সাড়া দেয়; আর হেরে যায় তারাই, যারা নবীদের কণ্ঠকে মিথ্যা বলে, অথচ নিজেদের আত্মাকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
নূহ আলাইহিস সালামের জাতি যখন পয়গম্বরগণকে মিথ্যাবাদী বলল, তখন আসলে তারা শুধু একজন মানুষের কথা ফেরায়নি; তারা ফেরাল আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা হেদায়েতের দরজা। এ এক ভয়ংকর আত্মপ্রবঞ্চনা—যেখানে হৃদয় সত্য শুনেও নিজেদেরই বানানো অন্ধকারকে আঁকড়ে ধরে। কুরআন আমাদের সামনে এই দৃশ্যকে রেখে যেন বলছে: সত্যের বিপরীতে মানুষের জেদ যতই বড় মনে হোক, তা এক মুহূর্তে ধূলিসাৎ হয়ে যায়; আর আল্লাহর আহ্বানকে ঠাট্টা করে উড়িয়ে দেওয়া কোনো জাতির জন্য সম্মান নয়, বরং পতনের অশনি সংকেত।
এই আয়াত আমাদেরও কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে: আমরা কি কখনো নিজের পছন্দ, নিজের অহংকার, নিজের অভ্যাসকে এত বড় করে তুলেছি যে হক কথা শুনলে মন সরে যায়? নূহের জাতির কাহিনি শুধু অতীতের ধ্বংসের গল্প নয়, এটি প্রতিটি অন্তরের ভিতরে চলা যুদ্ধের স্মরণিকা—সত্য নাকি জেদ, নূর নাকি নফস। যে হৃদয় বিনয়ী, সে অল্প কথায় নরম হয়; আর যে হৃদয় বেঁকে যায়, সে বহু নিদর্শন দেখেও অস্বীকার করে। আজও মুক্তি সেখানেই, যেখানে বান্দা নিজের দাবিকে নামিয়ে রাখে এবং রবের কথার সামনে মাথা নত করে।