সূরা আন-নামলের এই আয়াত হৃদয়ের এক নির্মম অথচ করুণ সত্য সামনে এনে দাঁড় করায়: সত্য সামনে থাকা সত্ত্বেও সব চোখ একরকম দেখে না। আল্লাহর রাসূলকে সান্ত্বনা ও সতর্কতার ভাষায় জানানো হচ্ছে, আপনি অন্ধদের—অর্থাৎ এমন মানুষের, যারা জেদ, অহংকার, গাফলত ও সত্য-অস্বীকৃতির কারণে অন্তরের দৃষ্টি হারিয়েছে—তাদেরকে তাদের পথভ্রষ্টতা থেকে জোর করে ফিরিয়ে আনতে পারেন না। হেদায়েত কোনো বাহ্যিক চাপের নাম নয়; এটি আল্লাহর নূর, যা এমন হৃদয়ে প্রবেশ করে, যা সত্যের সামনে নরম হয়। তাই কুরআন এখানে চোখের অন্ধত্বের চেয়ে অন্তরের অন্ধত্বকে বেশি কাঁপিয়ে তোলে। কারণ চোখ বন্ধ থাকলে মানুষ জানে সে অন্ধ, কিন্তু অন্তর বন্ধ থাকলে মানুষ নিজেকেই খুব সত্যদর্শী মনে করে বসে।
এই আয়াতের পূর্বাপর প্রেক্ষাপটও বিস্ময়কর। সূরা আন-নামলে আল্লাহর নিদর্শনগুলোর এক দীর্ঘ সারি দেখা যায়—সুলাইমান আলাইহিস সালাম ও পিপীলিকার ঘটনাই হোক, কিংবা সাবার লোকদের কাছে পৌঁছানো তাওহীদের আহ্বানই হোক, সর্বত্রই একটিই বাণী স্পষ্ট হয়ে ওঠে: আল্লাহর নিদর্শন সামনে এলে মানুষ বা তো বিনয়ের সাথে ঈমান আনে, অথবা অহংকারে অন্ধ হয়ে যায়। যাদের হৃদয়ে সত্যের জন্য প্রস্তুতি আছে, তাদের জন্য সামান্য ইশারাও আলো হয়ে ওঠে; আর যাদের ভেতরে জেদ জমে গেছে, তাদের সামনে সমুদ্রের মতো নিদর্শন রাখলেও তারা কেবল ভাসমান পাথরের মতোই থাকবে। তাই এই আয়াত আমাদের শেখায়, কুরআনের আলো কানে পৌঁছালেই ঈমান জন্মায় না; বরং যে অন্তর আল্লাহর আয়াতকে গ্রহণ করে, তারই শ্রবণ সত্যিকার শ্রবণে পরিণত হয়।
এই আয়াতের ভেতরে এক অদ্ভুত নীরব কান্না আছে। আল্লাহর রাসূলকে বলা হচ্ছে, আপনি তাদেরকে হেদায়েত দিতে পারবেন না, যারা নিজেদের অন্ধত্বকে আঁকড়ে ধরে আছে। এ অন্ধত্ব চোখের নয় শুধু, অন্তরের; কারণ চোখের সামনে সত্য থাকলেও যে হৃদয় তা গ্রহণ করতে চায় না, সে-ই সবচেয়ে গভীর অন্ধ। কুরআন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, হেদায়েত কোনো জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া আলো নয়; এটি এমন এক নূর, যা সত্যের সামনে ভেঙে পড়া অহংকারের দেওয়ালে প্রবেশ করে। যে নিজেকে বড় মনে করে, তার ভেতর আয়াতের সুরও অনেক সময় শুধু শব্দ হয়ে থাকে; আর যে নিজের দরিদ্রতা, ত্রুটি, আর আল্লাহর মুখাপেক্ষিতা মেনে নেয়, তার কাছে সেই শব্দই হয়ে ওঠে জীবন।
সূরা আন-নামলের বিস্ময়কর ধারায়—পিপীলিকার ক্ষুদ্র জগৎ, সুলাইমান আলাইহিস সালামের রাজকীয় ক্ষমতা, সাবার মানুষের চোখধাঁধানো সভ্যতা—সবাই যেন একই প্রশ্নের সামনে এসে দাঁড়ায়: কে আল্লাহর নিদর্শন দেখে নত হয়, আর কে নিজের চোখের জৌলুসে সত্যকে অস্বীকার করে? এই আয়াত সেই প্রশ্নের অন্তরতম জবাব। কারণ আল্লাহর নিদর্শন কেবল আকাশ-জমিনে ছড়িয়ে নেই; তা মানুষের বিবেক, বিনয়, এবং ঈমানের দরজাতেও কড়া নাড়ে। যে হৃদয় এই ডাক শুনতে প্রস্তুত, সে-ই সত্য শোনে; আর যে হৃদয় জেদে পাথর হয়ে যায়, তার কাছে নবীও কেবল পৌঁছে দিতে পারেন, জাগিয়ে তুলতে পারেন না।
এই আয়াত যেন অন্তরের দরজায় ধীরে ধীরে কড়া নাড়ে। আল্লাহ তাআলা এখানে আমাদের শেখাচ্ছেন, সত্যের আলো সবখানে ছড়ানো থাকলেও গ্রহণের ক্ষমতা সবার এক নয়। কেউ আয়াত শোনে, তবু নড়ে না; কেউ নিদর্শন দেখে, তবু বদলায় না। চোখ থাকে, কিন্তু দৃষ্টি থাকে না; কানে শব্দ আসে, কিন্তু হৃদয় সাড়া দেয় না। এটাই সেই ভয়ংকর অন্ধত্ব, যা বাহ্যিক অন্ধতার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। কারণ বাহ্যিক অন্ধ মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা জানে, কিন্তু অন্তরের অন্ধ মানুষ নিজের অন্ধত্বকে প্রজ্ঞা ভেবে বসে। সূরা আন-নামলের তাওহীদময় ধারায় এ কথা আরও তীব্র হয়ে ওঠে—সুলাইমান আলাইহিস সালামের রাজত্ব, পিপীলিকার নরম সতর্কবাণী, সাবার লোকদের কাছে পৌঁছানো হিদায়াতের ডাক—সবকিছুই যেন ঘোষণা করে, আল্লাহর নিদর্শন সামনে এলে হৃদয়কে নত হতে হয়, অন্যথায় মানুষ নিজেরই অন্ধকারকে সত্য মনে করে বসে।
এই আয়াত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সান্ত্বনা দেয়, আবার আমাদের সকলকেও জাগিয়ে তোলে: হেদায়েত আপনি তৈরি করতে পারেন না, কেবল পৌঁছে দিতে পারেন; খুলে দিতে পারেন না হৃদয়ের তালা, তা আল্লাহই খুলে দেন। তাই দাওয়াতের কাজ কেবল ভাষার নয়, দায়বদ্ধতারও। একজন মানুষকে সত্য শোনানো যায়, কিন্তু সে যদি অহংকার, জেদ, গাফলত আর দুনিয়ার মোহে নিজেকে গুটিয়ে রাখে, তবে সে শোনা সত্যকেও বোঝা মনে করবে। এই ভয় আমাদের নিজেদের দিকে ফিরিয়ে নেয়—আমি কি সত্য শুনে নরম হই, নাকি সত্য শুনে আরও শক্ত হয়ে যাই? আমি কি আয়াতের সামনে আত্মসমর্পণ করি, নাকি নিজের যুক্তি দিয়ে আল্লাহর কথা ছেঁটে ফেলি?
এখানেই ঈমানের জীবন্ত পরীক্ষা। যে ব্যক্তি আল্লাহর আয়াতসমূহে বিশ্বাস করে, তার কান আসলে কেবল শব্দ শোনে না, তার হৃদয় নির্দেশ গ্রহণ করে; আর যে হৃদয় আনুগত্যে নত হয়, সে-ই সত্যের পথে হেঁটে যায়। তাই এই আয়াত আমাদের ভয়ের সঙ্গে আশা জাগায়—কারণ অন্ধ হৃদয়কে বাঁচানো যায় না যদি না আল্লাহ দয়া করেন, কিন্তু যে হৃদয় একটু-ও নরম হয়, তার জন্য হিদায়াতের দরজা এখনো খোলা। আমাদের সমাজও এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে আছে: কত কথা, কত যুক্তি, কত স্লোগান, অথচ অন্তরে যদি আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি সম্মান না থাকে, তবে সভ্যতার ভিড়ে মানুষ আরও একা, আরও শূন্য হয়ে যায়। তাই ফিরে আসা দরকার—নিজের রবের দিকে, নিজের ভুলের দিকে, নিজের অন্তরের দিকে। কারণ সত্যের আলো বাইরে নয়, আগে ভেতরে নামতে হয়; আর যে হৃদয় আল্লাহর সামনে সিজদায় নত হয়, সেই হৃদয়ই অন্ধকার থেকে মুক্তির প্রথম সকাল দেখতে পায়।
এই আয়াত যেন আমাদের হাতের আয়না। আমরা কি এমন এক হৃদয় নিয়ে বেঁচে আছি, যা প্রতিদিন কুরআন শুনেও নরম হয় না? চোখ থাকলেই দেখা যায় না; কান থাকলেই শোনা যায় না। আল্লাহর আয়াতের সামনে যাদের অন্তর বিনয়ী, তাদের জন্য সামান্য কথাও আলো হয়ে নামে। আর যাদের ভেতরে জেদ জমে গেছে, তাদের কাছে সত্য বারবার এলেও তা কেবল শব্দ হয়ে ফিরে যায়। এ এক ভয়ের বাস্তবতা—মানুষ কখনও কখনও এমনভাবে অন্ধ হয়ে যায় যে, নিজের অন্ধত্বকেও সে আলো ভেবে বসে।
তাই এ সূরা শেষে দাঁড়িয়ে মনে হয়, আমি কি সেই বান্দা, যে আয়াত শুনে মাথা নোয়ায়, না কি সেই মানুষ, যে নফসের অহংকারে নিজেকেই যথেষ্ট মনে করে? সুলাইমান আলাইহিস সালামের রাজত্ব, পিপীলিকার সূক্ষ্ম বোধ, সাবার সভ্যতার উত্থান-পতন—সবকিছুই শেষ পর্যন্ত একই দরজায় এসে দাঁড়ায়: আল্লাহর নিদর্শনের সামনে আত্মসমর্পণ। যিনি ঈমানকে বেছে নেন, তাঁর কান সত্যের জন্য খুলে যায়; আর যিনি সত্যের সামনে নিজেকে ছোট করেন, তিনিই আসলে বড় হন। হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরকে এমন দিও না, যা আয়াত শুনে শুধু বাহ্যিকভাবে নড়ে, কিন্তু ভেতরে বদলায় না; বরং এমন হৃদয় দাও, যা তোমার বাণীতে কাঁপে, নরম হয়, এবং অবশেষে আজ্ঞাবহ হয়ে যায়।