আল্লাহ তাআলা এখানে এক নির্মম, কিন্তু মুক্তিদায়ী সত্য উচ্চারণ করেছেন: আপনি মৃতদেরকে ডাক শুনাতে পারবেন না, আর বধিরদের কাছেও আহ্বান পৌঁছায় না, যখন তারা মুখ ফিরিয়ে চলে যায়। বাহ্যিক অর্থে এটি শোনা-না শোনার কথা; কিন্তু অন্তর্গত অর্থে এটি হৃদয়ের অবস্থার কথা। কারণ কানে শব্দ পৌঁছানো আর অন্তরে সত্য প্রবেশ করা এক জিনিস নয়। কেউ যদি সত্যের দিকে মুখ না ফেরায়, যদি তার সত্তা আগেই পেছন ফিরে থাকে, তবে তাকে ডাক দেওয়া হয়তো হয়; কিন্তু ডাকে সাড়া দেওয়ার জীবন্ত স্পন্দন তার মধ্যে জাগে না। এ আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—হেদায়েত কেবল তথ্যের বিষয় নয়, এটি জীবনের বিষয়। মৃত হৃদয়কে জাগাতে আল্লাহই পারেন, আর মানুষের দায়িত্ব হলো সেই আহ্বানের সামনে নিজেকে খোলা রাখা।
সূরা আন-নামলের এই পর্যায়ে সুলায়মান আলাইহিস সালামের কাহিনি, পিঁপড়ার সংবেদন, সাবার সংবাদ, এবং তাওহীদের দিকে ডেকে নেওয়া নিদর্শনসমূহ একে একে সামনে আসে। সৃষ্টিজগত জুড়ে আল্লাহর কুদরতের এত আলামত, এত বাণী, এত ইশারা ছড়িয়ে আছে—তবু যদি মানুষ অহংকারে, জেদের অন্ধকারে, বা দুনিয়ার মোহে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তাকে আর কে শোনাবে? এই আয়াত সেই ধারাবাহিকতার ভেতর এক তীক্ষ্ণ আঘাতের মতো দাঁড়িয়ে আছে: নবীর আহ্বান, কুরআনের বাণী, এবং আল্লাহর নিদর্শন—সবই উপস্থিত; কিন্তু যাদের অন্তর ইতিমধ্যে বধিরের মতো, তাদের ক্ষেত্রে বাহ্যিক ডাকা যথেষ্ট হয় না। এখানে কোনো নির্দিষ্ট শানে নুযুল সুপ্রতিষ্ঠিত নয়; তবে সামগ্রিক প্রেক্ষাপট স্পষ্ট—এটি সেইসব মানুষের অবস্থা, যারা সত্য স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তাকে গ্রহণ করে না।
এই আয়াত আমাদের নিজের ভেতরের দিকে তাকাতে বাধ্য করে। আমি কি এমন অবস্থায় আছি, যেখানে কুরআন শুনি কিন্তু ভেতরে নরম হই না? নাম শুনি, আয়াত পড়ি, নিদর্শন দেখি, তবু আমার অস্থিরতা, গাফলত আর আত্মঅভিমান আমাকে আল্লাহর দিকে ফিরতে দেয় না? মৃত হৃদয়ের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক এই যে, সে নিজেকে মৃত মনে করে না। আর বধির আত্মার সবচেয়ে করুণ অবস্থা এই যে, সে শোনে না—শুধু কারণ কানের সমস্যা নয়, বরং মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অভ্যাস তাকে কঠিন করে দিয়েছে। তাই এ আয়াত ভয়েরও, আবার রহমতেরও; কারণ আজও যদি আমরা ফিরে আসি, যদি নিজেদের অহংকার ভেঙে আল্লাহর সামনে নত হই, তবে সেই হিদায়াতের দরজা এখনও খোলা। সত্যের ডাক বাইরে নয় শুধু, আমাদের অন্তরের দরজায়ও কড়া নাড়ছে।
এই আয়াতের ভেতরে এক ভয়াবহ নীরবতা আছে। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সামনে এমন এক হৃদয়ের ছবি এঁকে দেন, যা শুনতে পায়, কিন্তু গ্রহণ করে না; সামনে আলো থাকে, কিন্তু চোখে তা আগুন হয়ে লাগে; ডাক আসে, কিন্তু অন্তর তার দিকে ফিরে তাকায় না। মৃত মানুষ যেমন নিজে থেকে সাড়া দিতে পারে না, বধির যেমন আহ্বানের গভীরতা ধরতে পারে না, তেমনি সত্যের প্রতি পিঠ ফিরিয়ে নেওয়া আত্মা ধীরে ধীরে জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে—হেদায়েতকে অনুভব করার ক্ষমতা। এ মৃত্যু কবরের আগেই শুরু হয়; এটি দেহের নয়, বিবেকের, আত্মার, আনুগত্যের মৃত্যু।
এখানে ভয় আছে, কিন্তু তার ভেতরেই মুক্তি। কারণ এই আয়াত আমাদের হুঁশ ফিরিয়ে দেয়, আমাদের ভেতরের মৃত্যুকে চিনতে শেখায়, যাতে আমরা দেরি হওয়ার আগে আল্লাহর দিকে ফিরে আসি। মানুষের জীবন তখনই জেগে ওঠে, যখন সে বুঝতে পারে—আমি কেবল কানে শোনা মানুষ নই, আমি অন্তরে সাড়া দেওয়া বান্দা হতে চাই। হে রব, আমাদেরকে তাদের দলে রেখো যাদের হৃদয় তোমার স্মরণে কেঁপে ওঠে, যাদের অন্তর তোমার আহ্বানে নরম হয়, যাদের চোখ তোমার নিদর্শনে অশ্রুতে ভরে, আর যারা মুখ ফিরিয়ে নয়, বরং বিনয়ের সঙ্গে তোমার দিকে ফিরে যায়।
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা আমাদের সামনে এমন এক আয়না ধরেন, যেখানে শুধু অন্যের অবস্থা নয়, নিজের অন্তরের চেহারাও দেখা যায়। মৃতদেরকে যেমন ডাক শোনানো যায় না, বধিরদের কাছেও আহ্বান পৌঁছে না, বিশেষত যখন তারা মুখ ফিরিয়ে চলে যায়—তেমনি অনেক হৃদয় আছে, যা সত্য শুনেও নড়ে না। শব্দ সেখানে পৌঁছায়, কিন্তু অর্থ পৌঁছায় না; নসিহত আসে, কিন্তু জাগরণ আসে না। কারণ সমস্যা কানে নয়, অন্তরের বেছে নেওয়া অন্ধকারে। মানুষ যখন অহংকার, গাফলত, স্বার্থ বা জেদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়, তখন আল্লাহর নিদর্শন তার চারপাশে থেকেও তার ভেতরে আলো জ্বালাতে পারে না। সূরা আন-নামলের এই ধারাবাহিকতায় সুলায়মানের শাসন, পিঁপড়ার বিনয়, সাবার রাজ্য, আর তাওহীদের স্পষ্ট ডাক—সবই যেন বলছে, সৃষ্টিজগত আল্লাহর সাক্ষ্য দিচ্ছে; কিন্তু যে অন্তর শুনতে চায় না, সে সাক্ষ্যকেও নীরবতা মনে করে।
এখানে ভয়ও আছে, আবার আশা-ও আছে। ভয় এই কারণে যে, বারবার সত্যকে প্রত্যাখ্যান করলে হৃদয় ধীরে ধীরে মৃতের মতো হয়ে যেতে পারে; তখন মানুষ বাঁচে, কিন্তু সত্যের জন্য বাঁচে না। আর আশা এই কারণে যে, এ আয়াত আমাদের আগেই সতর্ক করে দেয়, যাতে আমরা সেই পরিণতির দিকে না যাই। এখনো দরজা খোলা, এখনো কান আছে, এখনো চোখ আছে, এখনো কুরআনের আহ্বান আমাদের দিকে আসছে। তাই নিজের ভেতরে প্রশ্ন জাগুক—আমি কি সত্য শুনে থেমে যাচ্ছি, নাকি সত্যের কাছে সঁপে দিচ্ছি আমার ইচ্ছা, আমার অহংকার, আমার পথচলা? আল্লাহর ডাকা যদি হৃদয়কে না ছোঁয়, তবে দোষ ডাকে নয়; দোষ আমাদের সাড়া না দেওয়ার অভ্যাসে।
এই আয়াত সমাজকেও জাগিয়ে তোলে। যখন সত্যের কথা বলা হয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠার আহ্বান আসে, কুরআনের আলো সামনে রাখা হয়, তখন একটি সমাজ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়: একদল শুনে, নরম হয়, ফিরে আসে; আরেকদল মুখ ফিরিয়ে নেয়, যেন তারা আগে থেকেই কোনো অদৃশ্য নীরবতায় ঢেকে গেছে। কিন্তু মুমিনের কাজ হলো নিজের অন্তরকে জীবিত রাখা—তাওবায়, যিকিরে, কুরআনের সামনে বিনয়ে, আল্লাহর নিদর্শনের সামনে বিস্ময়ে। আমরা যেন সেই মুখ ফিরিয়ে নেওয়া লোকদের দলে না পড়ি, যারা ডাকের মধ্যে থেকেও ডাক পায় না। বরং এমন অন্তর চাই, যা সামান্য ইশারাতেই কেঁপে ওঠে, সামান্য আয়াতেই নত হয়, আর শেষ পর্যন্ত রবের দিকে ফিরে বলে: হে আল্লাহ, আমার হৃদয়কে জীবিত রাখুন, যেন আপনার আহ্বান আমার কাছে কখনোই মৃত না হয়ে যায়।
সুলায়মান আলাইহিস সালামের বিস্ময়কর দৃশ্য, পিঁপড়ার ক্ষুদ্র ভাষা, সাবার বিশাল সভ্যতার পরিণতি, এবং তাওহীদের দিকে আল্লাহর নিদর্শন—সবকিছু মিলিয়ে সূরা আন-নামল যেন বারবার বলছে, সৃষ্টির প্রতিটি প্রান্তে রবের ইশারা ছড়িয়ে আছে। কিন্তু ইশারা দেখার জন্য চাই বিনয়, আর আহ্বান শোনার জন্য চাই জীবন্ত হৃদয়। যে হৃদয় অহংকারে শক্ত হয়ে গেছে, যে আত্মা নিজ জেদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে, তার কাছে সত্যের ডাকও কেবল বাতাসে হারিয়ে যায়। আজ যদি আমরা নিজেদের ভেতরে এমন বধিরতা টের পাই, তবে সেটাই হতে পারে রহমতের প্রথম দরজা—কারণ নিজের অক্ষমতা বুঝতে পারাই কখনো কখনো হেদায়েতের শুরু।
হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরকে জীবিত করুন, আমাদের কানকে কেবল শব্দের জন্য নয়, সত্যের জন্য খুলে দিন, আমাদের চোখকে নিদর্শন দেখার তাওফিক দিন, আর আমাদের আত্মাকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অভিশাপ থেকে রক্ষা করুন। আমরা যেন এমন না হই—যাদের কাছে কুরআন এসেছে, কিন্তু হৃদয় নরম হয়নি; নিদর্শন এসেছে, কিন্তু বিশ্বাস গভীর হয়নি; আহ্বান এসেছে, কিন্তু সাড়া জাগেনি। আমাদের এমন এক অন্তর দান করুন, যা আপনার ডাক শোনামাত্র কেঁপে ওঠে, নরম হয়, এবং বিনম্রভাবে আপনার দিকে ফিরে আসে।