সূরা আন-নামলের এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা একটি শহরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিষাক্ত বাস্তবতাকে সামনে এনে দেন: সেখানে ছিল নয়জন লোক, যারা পৃথিবীতে ফাসাদ ছড়াত, আর কোনো সংস্কারের পথে হাঁটত না। শব্দটি শুধু সংখ্যা নয়, বরং এক ধরনের সংগঠিত নৈতিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত—কতকজন মানুষ যখন নিজেদের শক্তি, কৌশল বা প্রভাবকে কল্যাণের বদলে অনর্থের জন্য ব্যবহার করে, তখন একটি নগরের বাতাসও ভারী হয়ে ওঠে। কুরআন এখানে আমাদের চোখকে শুধু ঘটনার দিকে নয়, চরিত্রের দিকে ফেরায়: যারা সংশোধন করে না, তারা শুধু ভুলই করে না—তারা ভুলকে স্বাভাবিক বানিয়ে ফেলে, আর এভাবেই ফাসাদ ধীরে ধীরে সমাজের ভিতরে বাসা বাঁধে।
এই আয়াতের ভাষা আমাদেরকে নৈতিকভাবে সতর্ক করে, কারণ আল্লাহর দৃষ্টিতে সমাজের ক্ষতি কখনও কেবল প্রকাশ্য যুদ্ধ বা রক্তপাতেই সীমাবদ্ধ নয়; মিথ্যা, প্রতারণা, অহংকার, অন্যায় সিদ্ধান্ত, ক্ষমতার অপব্যবহার, এবং মানুষের কল্যাণের পথ রুদ্ধ করে দেওয়া—এসবও ফাসাদের অন্তর্ভুক্ত। আয়াতটি একা কোনো ব্যক্তিগত পাপের বিবরণ নয়, বরং এমন এক সামাজিক বাস্তবতার ছবি, যেখানে কয়েকজন প্রভাবশালী লোক গোটা পরিবেশকে কলুষিত করে। কুরআন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সংস্কারহীনতার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো এই যে, সে নিজের ভেতরের অন্ধকারকে স্থায়ী করতে চায়; সে তওবা, সংশোধন, ন্যায় আর সদুপদেশের দরজা বন্ধ করে দেয়।
এ সূরার বৃহত্তর প্রবাহে এটি এক গভীর সতর্কবার্তা। এর আগের আয়াতগুলোতে সুলাইমান আলাইহিস সালামের শক্তি, ন্যায় এবং আল্লাহর নিদর্শনের সামনে আত্মসমর্পণের যে দৃশ্য এসেছে, তার পাশে এই আয়াত যেন বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে দেখায়—শক্তি থাকলেই তা সৎ হবে এমন নয়; ক্ষমতা থাকলেই তা কল্যাণে ব্যয় হবে এমনও নয়। কুরআন এভাবে হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে: তুমি কি সোলাইমানের মতো নিয়ামতকে শোকর বানাবে, নাকি এই নয়জনের মতো অনর্থকে অভ্যাসে পরিণত করবে? নির্দিষ্ট কোনো সহীহভাবে প্রতিষ্ঠিত কারণ-ঘটনা এখানে স্পষ্টভাবে জানা না-ও থাকতে পারে, তবে বর্ণনার সামগ্রিক উদ্দেশ্য খুব পরিষ্কার—আল্লাহ মানুষের সমাজকে জানিয়ে দিচ্ছেন, ফাসাদ কখনও অদৃশ্য থাকে না, আর সংশোধনহীনতার জবাব একদিন অবশ্যই আসবে।
কুরআন যখন বলে, শহরে ছিল নয়জন লোক, যারা পৃথিবীতে ফাসাদ করত আর সংশোধনের পথে হাঁটত না—তখন বিষয়টি কেবল কয়েকজন মানুষের ব্যক্তিগত চরিত্রের কথা থাকে না; এ যেন এক গোটা সমাজের ভিতরে পচনের নীরব ছায়া। সংখ্যা অল্প, কিন্তু ক্ষতির গভীরতা বিশাল। কারণ অনর্থ সব সময় বহুজনের হাত ধরে আসে না; কখনো অল্প কিছু মানুষের পরিকল্পিত বিকৃতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অহংকার, জুলুম আর মিথ্যার জোটই একটি নগরের হৃদয়ে অন্ধকার নামিয়ে দেয়। কুরআন আমাদের শেখায়, ফাসাদ শুধু প্রকাশ্য সহিংসতা নয়—যেখানে কল্যাণ থেমে যায়, সত্য বিকৃত হয়, ন্যায়ের পথ রুদ্ধ হয়, আর মানুষকে ভালো দিকে ফেরানোর ইচ্ছাই মরে যায়, সেখানেও ফাসাদের শেকড় গেঁথে বসে।
সুতরাং এই আয়াতের ভেতর এক গভীর আসমানি সতর্কতা আছে: সমাজের বিচার কেবল বাহ্যিক চাকচিক্যে হয় না, আল্লাহ দেখেন কারা ভেতরে ভেতরে অনর্থ বাড়ায় আর কারা অন্তত সংস্কারের দায় বয়ে বেড়ায়। ইমানের চিহ্ন শুধু ইবাদতের শব্দে নয়, মানুষের উপকারে, ন্যায়ের প্রতি আনুগত্যে, অশান্তিকে শান্তিতে বদলে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষায়ও প্রকাশ পায়। যে হৃদয় সংশোধনের চিন্তা হারায়, সে হৃদয় ধীরে ধীরে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যায়; আর যে হৃদয় নিজের ভুল দেখে কাঁদে, অন্যায় থামাতে চায়, সমাজকে শুদ্ধ করতে চায়, তার ভেতরেই সংস্কারের আলো জ্বলে ওঠে। এই আয়াত আমাদের শেখায়, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ভারী অপরাধগুলোর একটি হলো এমন ফাসাদ, যা অনুশোচনা নয়, বরং অবিরাম বিস্তারে আনন্দ পায়।
কুরআন এখানে শুধু নয়জন মানুষের কথা বলে না; সে আমাদের সামনে এক নীরব অগ্নিকাণ্ড তুলে ধরে, যেখানে অনর্থের শিখা ব্যক্তি থেকে সমাজে, সমাজ থেকে ভবিষ্যতে ছড়িয়ে পড়ে। একটি শহর তখনই বিপন্ন হয়, যখন তার ভেতরে এমন কজন দাঁড়িয়ে যায়, যারা নিজেকে শক্তিশালী ভাবে, কিন্তু শক্তিকে কল্যাণে নয়; যারা কথা বলে, কিন্তু সত্যের জন্য নয়; যারা পরিকল্পনা করে, কিন্তু মানুষের মঙ্গলের জন্য নয়। এই আয়াতের কাঁপন এখানেই—আল্লাহর সামনে কোনো ফাসাদ ছোট নয়, কোনো বিকৃতি অদৃশ্য নয়। মানুষের চোখে তারা হয়তো কৌশলী, প্রভাবশালী, সফল; কিন্তু আসমানের মানদণ্ডে তারা সেইসব আত্মা, যারা পৃথিবীকে ভারী করে তোলে, অথচ সংশোধনের পথে একটি পা-ও বাড়ায় না।
তাই এ আয়াত আমাদেরকে বাইরে তাকাতে বলার আগে ভেতরে তাকাতে বাধ্য করে। আমি কি এমন কারও সঙ্গী, যে অনর্থকে স্বাভাবিক মনে করে? আমি কি এমন কোনো কথার অংশীদার, যা কারও হৃদয় ভেঙে দেয়, অথচ আমি তাকে প্রতিবাদ করি না? আমি কি নীরব থেকে অন্যায়ের পক্ষে জায়গা করে দিই? কুরআন শুধু দোষীদের সতর্ক করে না, নির্লিপ্তদেরও জাগিয়ে তোলে। কারণ সমাজের পতন অনেক সময় একদিনে আসে না; তা আসে ছোট ছোট নৈতিক আপসের ভেতর দিয়ে, ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে। আর তাওবাহর দরজা ঠিক ততটাই প্রশস্ত, যতটা গভীর মানুষের পতন। যে হৃদয় আল্লাহর দিকে ফিরে, সে শুধু নিজের মুক্তিই চায় না; সে সংশোধনের আলো হতে চায়।
এখানে ভয়ও আছে, আশা-ও আছে। ভয় এই কারণে যে আল্লাহ ফাসাদকে দেখেন, এবং তা অবহেলা করেন না। আশা এই কারণে যে আল্লাহর দয়া অনর্থের চেয়েও বড়, যদি মানুষ ফিরে আসে। সূরা আন-নামলের এই ধারাবাহিক আয়াতগুলো আমাদের শেখায়, কুরআন কেবল ইতিহাস নয়—এ এক জীবন্ত মাপকাঠি, যা ব্যক্তিকে, পরিবারকে, নেতৃত্বকে, সমাজকে বিচার করে। যে নিজের অন্তরকে জিজ্ঞেস করে, ‘আমি কি সংস্কারের পক্ষে, না অনর্থের পাশে?’—সে-ই এই আয়াতের আলো পায়। আর যে আল্লাহর সামনে বিনীত হয়, সে বুঝে যায়: সত্যিকার শক্তি মানুষকে দমনে নয়, ন্যায়কে প্রতিষ্ঠায়; সত্যিকার সফলতা ফাসাদে নয়, ইমানের আলোয় সংশোধনে।
এই আয়াত আমাদের শেখায়, মুসলিম হওয়া মানে শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের নিরাপদ কোণে আশ্রয় নেওয়া নয়; বরং যেখানে অন্যায় দেখব, সেখানে অন্তরে ঘৃণা জন্মাবে, যেখানে ফিতনা দেখব, সেখানে সত্যের দিকে ফিরতে চাইব, যেখানে মানুষকে ক্ষতবিক্ষত হতে দেখব, সেখানে নিজের আত্মাকে প্রশ্ন করব। কারণ ঈমান শুধু কান্না নয়, ঈমান দায়িত্বও। আর দায়িত্বহীন ধার্মিকতা অনেক সময় নীরব ফাসাদের পাশে দাঁড়িয়েই নিজেকে নিরাপদ ভাবে। কিন্তু কুরআন এমন নিরাপত্তার মিথ্যা ঘুম ভেঙে দেয়। সে বলে, আল্লাহর জমিনে অনর্থ করে বেড়ানো এবং সংশোধনের পথ এড়িয়ে চলা—এ দু’টি একসাথে থাকলে হৃদয়ের অন্ধকার ক্রমে সমাজের অন্ধকার হয়ে দাঁড়ায়।
আজ এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজের ভেতর তাকাক। আমি কি অনর্থের অংশ? আমি কি নীরবতায় অন্যায়ের সুবিধাভোগী? আমি কি সংশোধনের বদলে শুধু মন্তব্য করি, আর তাতে নিজের দায় এড়িয়ে যাই? হে আল্লাহ, আমাদের এমন অন্তর দাও যা ফাসাদের সৌন্দর্য দেখে মোহিত হয় না, এমন চোখ দাও যা অন্যায়ের ঝলকানিতে অন্ধ হয় না, এমন জিহ্বা দাও যা সত্যকে ভয় পায় না, আর এমন পদক্ষেপ দাও যা সংশোধনের দিকে যায়। কারণ শেষ পর্যন্ত শহর টেকে মানুষে নয়, নৈতিকতায়; আর হৃদয় বাঁচে তখনই, যখন সে তোমার সতর্কবাণীর সামনে কাঁপতে জানে।