কিছু মানুষের হৃদয় এমন, তারা সত্যের মুখোমুখি হলে যুক্তি খোঁজে না; খোঁজে অজুহাত। নবীর আহ্বান যখন তাদের ভিতরের জড়তা, অহংকার আর পাপকে নাড়িয়ে দেয়, তখন তারা বলে—“তোমাকে এবং তোমার সঙ্গীদেরকে আমরা অকল্যাণের কারণ মনে করি।” সূরা আন-নামলের এই আয়াতে সেই পুরোনো মানব-দুর্বলতা নগ্ন হয়ে ওঠে: কল্যাণ-অকল্যাণের সিদ্ধান্তকে তারা আল্লাহর হাতে না রেখে একটি মানুষ, একটি দাওয়াত, বা একটি বাস্তবতাকে দোষী বানাতে চায়। অথচ নবীর জবাব অল্প কথায় আসমানসম স্পষ্ট—“তোমাদের মঙ্গলামঙ্গল আল্লাহর কাছে; বরং তোমরা এমন এক সম্প্রদায়, যাদেরকে পরীক্ষা করা হচ্ছে।”
এখানে অন্ধ কুসংস্কারের মুখোমুখি তাওহীদের দৃঢ়তা দাঁড়িয়ে যায়। অশুভ লক্ষণ, অপয়া ভাব, অমঙ্গলের অদৃশ্য ফাঁদ—এসব আসলে মানুষের দুর্বল হৃদয়েরই আবরণ। যখন অন্তর আল্লাহর ফয়সালার উপর ভরসা হারায়, তখন সে আসমানের দিকে তাকানোর বদলে মাটির কোনো ঘটনাকে ভাগ্য বলে ধরে নেয়। কিন্তু কুরআন শেখায়, শুভ-অশুভের চূড়ান্ত মালিক কোনো বস্তু, কোনো দিন, কোনো মানুষ নয়; আল্লাহই সব কিছুর মালিক, জ্ঞানী ও ফয়সালাকারী। এই জবাবের মধ্যে একদিকে রয়েছে আকীদার পবিত্রতা, অন্যদিকে মানুষের আত্মপ্রতারণার উপর কঠিন আঘাত—যে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে, সে শেষ পর্যন্ত নিজের অন্তরকেই অভিযুক্ত করে।
এই আয়াতের প্রেক্ষাপট মূলত সালেহ আলাইহিস সালামের জাতির ঘটনা; এটি কোনো ব্যক্তিগত কাহিনি নয়, বরং কুরআনের বিস্তৃত ইতিহাসে বারবার দেখা এক মানব-সমাজের মুখচ্ছবি। যখন নবি-রাসুলদের আহ্বান সমাজের ভ্রান্ত ভরকেন্দ্রকে নাড়িয়ে দেয়, তখন ক্ষমতা, অভ্যাস, এবং নাফস নিজেদের রক্ষা করতে “অকল্যাণ” নামের একটি শব্দ তৈরি করে। কিন্তু আল্লাহ বলেন, আসলে তারা পরীক্ষা করা হচ্ছিল। অর্থাৎ সংকটটি বাইরের নয়, ভেতরের; দাওয়াত নয়, হৃদয়ের অবস্থা। যে জাতি নিদর্শন দেখেও না জাগে, যে কুরআনের সতর্কবাণী শুনেও নিজেকে সংশোধন করে না, তার কাছে সত্যই এক পরীক্ষা—সে আলো হয়ে খুলবে, না কি অন্ধকার হয়ে ভেঙে পড়বে।
কিছু হৃদয় আছে, যাদের চোখে সত্যের আলোও প্রথমে ভয় হয়ে ধরা দেয়। তখন তারা নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে ঢাকতে অন্যকে দোষী বানায়। তাই তারা বলেছিল, “তোমাকে এবং তোমার সঙ্গীদেরকে আমরা অকল্যাণের কারণ মনে করি।” নবীর পথে দাঁড়ালে তাদের ভিতরের ভাঙন যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে; ঈমানের ডাক তাদের কাছে শান্তি নয়, অস্বস্তি হয়ে আসে। অথচ কুরআন আমাদের শেখায়, এই অন্ধ ধারণা কোনো আসমানি সত্য নয়; এটা মানুষের দুর্বল অন্তরের তৈরি ছায়া মাত্র। আল্লাহর দীনি আহ্বান কখনো অপয়া নয়—অপয়া হলো সেই চোখ, যা হিদায়াতের সামনে দাঁড়িয়েও নিজের অন্ধকারকে সত্য ভেবে বসে।
আর তাই আয়াতের শেষে নেমে আসে এক ভয়াবহ অথচ করুণ ঘোষণা: “বরং তোমরা এমন সম্প্রদায়, যাদেরকে পরীক্ষা করা হচ্ছে।” অর্থাৎ তোমাদের সামনে যে হক এসে দাঁড়িয়েছে, সেটাই তোমাদের জন্য মাপকাঠি; এখন তোমরা কী করো, সেটাই প্রকাশ করবে তোমাদের অন্তরে ঈমান আছে, না অহংকারের মরিচা। জীবন শুধু সুখ-দুঃখের নাম নয়; এটি আল্লাহর পরীক্ষাক্ষেত্র, যেখানে মানুষকে সত্যের কাছে নত হতে শেখানো হয়। যে ব্যক্তি প্রতিটি কঠিন মুহূর্তকে অপয়া মনে করে, সে আসলে তার রবের হিকমতকে ছোট করে দেখছে; আর যে অন্তর বলে, “আমার সব কিছুই আল্লাহর হাতে,” সেই অন্তরই কুসংস্কারের অন্ধকার ছিন্ন করে তাওহীদের প্রশান্ত আলোয় পৌঁছে যায়।
মানুষ যখন সত্যের কাছে নত হতে চায় না, তখন সে সত্যকে দোষী বানায়। নিজের ভেতরের অবাধ্যতা, অহংকার, এবং পাপের ভার ঢাকতে গিয়ে সে বলে—এটাই অশুভ, এটাই অমঙ্গল। অথচ সালেহ (আ.)-এর এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু বজ্রকঠিন জবাব মানুষকে ফিরিয়ে আনে তাওহীদের কেন্দ্রে: তোমাদের ভাগ্য, তোমাদের কল্যাণ-অকল্যাণ, তোমাদের অন্তরের পরিণতি আল্লাহর সিদ্ধান্তের অধীন। কোনো নবী, কোনো দাওয়াত, কোনো সত্যপথ আল্লাহর হুকুম ছাড়া অমঙ্গলের উৎস হতে পারে না; বরং অমঙ্গল জন্ম নেয় সেই হৃদয়ে, যে হৃদয় হেদায়াতকে অপছন্দ করে।
এই আয়াত আমাদের সমাজকেও আয়নার সামনে দাঁড় করায়। যখন এক জাতি সত্যের আহ্বানকে অপয়া বলে, তখন বুঝতে হবে সমস্যা বাতাসে নয়, তাদের দৃষ্টিতে; ঘটনা-প্রবাহে নয়, তাদের অন্তরে। মানুষের একটি বড় অসুখ হলো—আত্মসমালোচনা না করে বাইরের কিছুর উপর দোষ চাপানো। কিন্তু কুরআন বারবার শেখায়, আল্লাহ মানুষের কৃতকর্ম, নিয়ত, জেদ, কৃতঘ্নতা—সবকিছুকেই দেখেন। আর যে সমাজ নিজের ভুলকে স্বীকার না করে অন্যকে অপয়া বানায়, সে সমাজ আসলে পরীক্ষার ভেতরেই পড়ে আছে; তার সামনে খোলা হয়েছে হক ও বাতিলের পথ, কিন্তু সে কোন দিকে হাঁটবে, সেটাই তার চূড়ান্ত জবাব।
তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে মুমিনের অন্তর কেঁপে ওঠে—আমি কি কখনো আল্লাহর ফয়সালাকে না বুঝে কোনো মানুষ, কোনো সময়, কোনো পরিস্থিতিকে অশুভ ভেবেছি? আমি কি নিজের গুনাহকে ঢাকতে গিয়ে অন্যকে দায়ী করেছি? এই প্রশ্নগুলোই আত্মাকে জাগায়। কারণ ঈমান শুধু মুখের ঘোষণা নয়; ঈমান হলো আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, নিজের ভেতরের সত্যকে মেনে নেওয়া, এবং ভয় ও আশা—দুটোকেই আল্লাহর হাতে সোপর্দ করা। যারা পরীক্ষা থেকে পালায়, তারা অন্ধকারে বন্দী হয়; আর যারা পরীক্ষাকে আল্লাহর দরবারে বুঝে নেয়, তারা ধীরে ধীরে পরিশুদ্ধ হয়।
যখন মানুষ আল্লাহর হুকুমের সামনে নতি স্বীকার করতে চায় না, তখন সে সত্যকে অশুভ বলে, আর নিজের অবাধ্যতাকে স্বাভাবিক বলে মানতে চায়। এই আয়াতে তাদের মুখে যেন সেই চিরচেনা অজুহাতই ফিরে এসেছে—নবীর উপস্থিতিকে, সত্যের আলোকে, আল্লাহর পথে ডাকে তারা নিজের অন্ধকারের কারণ বানাতে চেয়েছে। কিন্তু নবী সালেহ আলাইহিস সালামের জবাব আমাদের অন্তর কাঁপিয়ে দেয়: মঙ্গল-অমঙ্গলের চূড়ান্ত মালিক আল্লাহ। মানুষকে ঘিরে যে ফয়সালা, যে লাভ-ক্ষতি, যে উত্থান-পতন—সবই তাঁর জ্ঞানের অধীন। তাই কোনো ঈমানদারের জন্য শোভা পায় না কুসংস্কারের কাছে হৃদয় সঁপে দেওয়া, কিংবা নিজের গুনাহকে ঢাকতে ভাগ্যকে দোষী বানানো।
আসলে পরীক্ষা এখানেই—অন্তর আল্লাহকে মানবে, নাকি অদৃশ্য আশঙ্কাকে? মানুষ যখন পরীক্ষায় পড়ে, তখন তার ভাষা বদলে যায়, তার যুক্তি বদলে যায়, এমনকি তার প্রতিবাদও বদলে যায়; কিন্তু আসমানের দৃষ্টিতে সত্য বদলায় না। সূরা আন-নামলের এই আয়াত আমাদের শেখায়, জীবনের প্রতিটি অস্বস্তি, প্রতিটি সংকট, প্রতিটি ভয়কে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নাও; কারণ তিনিই বিচারক, তিনিই মালিক, তিনিই শেষ ফয়সালাকারী। আজ যদি হৃদয় কাঁপে, তবে কাঁপুক গুনাহের বোঝায়; আজ যদি চোখ ভিজে, তবে ভিজুক তওবার অশ্রুতে। নবীদের অস্বীকারকারীদের মতো না হয়ে আমরা যেন বলি—হে আল্লাহ, আমাদের দেখার চোখ দাও, তোমার নিদর্শন বোঝার অন্তর দাও, আর আমাদেরকে এমন এক সম্প্রদায় থেকে বের করে আনো, যারা পরীক্ষাকে অহংকারে হারিয়ে ফেলে।