আল্লাহ বলেন, তোমরা যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা করতে চাও, তা শেষ করতে পারবে না। এই একটিমাত্র বাক্যেই মানুষের অহংকার ভেঙে যায়, আর হৃদয়ের সামনে খুলে যায় এক অগণিত জগত। শ্বাস-প্রশ্বাস, দৃষ্টি, ভাষা, খাদ্য, নিরাপত্তা, সম্পর্ক, সময়, তাওবা, হিদায়াত—যা কিছু আমরা প্রতিদিন স্বাভাবিক বলে ধরে নিই, তার প্রতিটিই আসলে রবের করুণা। নেয়ামত এখানে কেবল দেহের আরাম নয়; আত্মার জন্য আলো, পথের জন্য দিশা, অন্তরের জন্য আশ্রয়। মানুষ সংখ্যা গুনতে জানে, কিন্তু দানের গভীরতা মাপতে পারে না; কারণ আল্লাহর অনুগ্রহ সমুদ্রের মতো, আর আমাদের উপলব্ধি তার তীরের নুড়ির মতোও নয়।
এই আয়াতের আশ্চর্য সৌন্দর্য হলো, অগণন দানের ঘোষণা শেষ হয় ক্ষমা ও দয়ার কথায়: নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু। যেন আল্লাহ বলছেন, মানুষ যতই অকৃতজ্ঞ হোক, ভুলে যাক, পথচ্যুত হোক—তবু আমার দরজা বন্ধ নয়। সূরা আন-নাহলে নেয়ামতের বিস্তার, তাওহীদের প্রমাণ, হালাল-হারামের সীমারেখা, দাওয়াতের ধৈর্য এবং ঈমানের দৃঢ়তা—সবই একই স্রোতে প্রবাহিত। মৌমাছির নিখুঁত জীবনব্যবস্থার কথা এই সূরাতেই আমাদের চোখের সামনে আসে, যেন ছোট এক সৃষ্টির সংগঠিত জীবনও ঘোষণা করে: রব এক, দাতা এক, বিধানদাতা এক। আর সেই এক রবের অনন্ত দান মানুষের অন্তরে শোকরকে জাগিয়ে তোলে, না-শোকরের অন্ধকারকে ভেঙে দেয়।
এই আয়াতের নির্দিষ্ট কোনো ঐতিহাসিক শানে নুযূল নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়; তবে এর প্রসঙ্গ সমগ্র সূরার বিস্তৃত শিক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। মক্কি পরিবেশে, যখন মানুষ সত্যের আহ্বান অস্বীকার করত, তখন নেয়ামতের স্মরণ ছিল তাওহীদের এক নরম কিন্তু তীক্ষ্ণ ডাক—দেখো, যে আল্লাহ তোমাকে অস্তিত্ব দিয়েছেন, তিনিই তোমাকে হিদায়াতের পথ দেখাচ্ছেন। ইতিহাস, সমাজ, বিধান, পরিবার, খাদ্য, ন্যায়বিচার—সব ক্ষেত্রেই এই আয়াতের ছায়া বিস্তৃত: মানুষ যেন জানে, যা কিছু তার হাতে আছে তা তার অধিকার নয়, আমানত। আর যে হৃদয় নেয়ামত চিনে, সে কৃতজ্ঞ হয়; আর যে কৃতজ্ঞ হয়, সে রবের ক্ষমা ও দয়ার দিকে বিনীতভাবে ফিরে আসে।
আল্লাহর নেয়ামত গুনতে বসা মানে এক নদীর জলকে আঙুলে মাপতে চাওয়া—যতই ধরা হোক, ততই ফসকে যায়। নিঃশ্বাসের ভেতর যে জীবন, চোখের পাতায় যে রক্ষাকবচ, রুটির কণায় যে টেকার শক্তি, সম্পর্কের উষ্ণতায় যে সান্ত্বনা, সময়ের ভাঁজে যে সুযোগ, তাওবার দরজায় যে ফিরে আসার অনুমতি—এসবের কোনটি গোনা যায়? মানুষ শুধু পায় না; মানুষ বাঁচে নেয়ামতের মধ্যে, ডুবে থাকে দানের স্রোতে, অথচ অনেক সময় অনুভবও করে না সে কত বড় অনুগ্রহের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে। এই আয়াত হৃদয়ের অহংকার ভেঙে দেয়। কারণ যখন বান্দা বুঝতে শেখে, সবকিছুই তাঁর রবের দান, তখন নিজের কৃতিত্বের মিথ্যা মুকুট মাটিতে পড়ে যায়, আর তাওহীদের নীরব সত্য বুকের গভীরে জ্বলে ওঠে।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মানুষের ভেতরের হিসাব-নিকাশ থেমে যায়। আমরা কত কিছুই না “আমার” বলে ভেবে নিই—আমার পরিশ্রম, আমার উপার্জন, আমার বুদ্ধি, আমার পরিকল্পনা। অথচ একটু থমকে তাকালেই বোঝা যায়, দেহের প্রতিটি স্পন্দনেও ঋণের সুর বাজে। যে চোখ দেখে, সে চোখও দান; যে জিহ্বা কথা বলে, সে জিহ্বাও দান; যে হৃদয় ভালো-মন্দ বুঝতে পারে, সেই হৃদয়ের আলোও দান। মানুষ নেয়ামতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নেয়ামতকে ভুলে যায়, আর ভুলে যাওয়ার এই অভ্যাসই অকৃতজ্ঞতার সবচেয়ে গভীর পর্দা। আল্লাহর দান গোনা যায় না—কারণ তাঁর দান কেবল উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রত্যেক অনুপস্থিত বিপদকে দূরে সরিয়ে রাখার মধ্যেও লুকিয়ে আছে। আমরা যা পাই তা দেখি, কিন্তু যা থেকে বাঁচি তার খবর কতই বা রাখি?
এ কারণেই এই আয়াত শুধু প্রশংসার নয়, আত্মসমালোচনারও আয়াত। যদি নেয়ামত অগণন হয়, তবে কৃতজ্ঞতাও কি কেবল মুখের একটি শব্দে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে? কৃতজ্ঞতা মানে হৃদয়ের নরম হয়ে যাওয়া, রবের সামনে অহংকার ভেঙে পড়া, হালালকে আলিঙ্গন করা, হারামকে ভয় করা, আর দাওয়াতের পথে ধৈর্য ধারণ করা। যে সমাজ নেয়ামতকে হক মনে করে, সে সমাজ দ্রুত অবমাননার অন্ধকারে পড়ে; কিন্তু যে সমাজ নেয়ামতকে আমানত মনে করে, সে সমাজের মধ্যে ন্যায়, সংযম, পারস্পরিক দয়া ও নিরাপদ জীবন গড়ে ওঠে। এই আয়াতের শেষে আল্লাহ নিজেকে ক্ষমাশীল ও দয়ালু বলে পরিচয় করান—যেন বান্দা বারবার ভুলে গেলেও ফিরে আসার দরজা খোলা থাকে। তাই আজ হৃদয়কে বলো, এত নেয়ামতের সামনে আর কীভাবে গাফিল থাকি? ফিরে এসো, কারণ দানের সমুদ্রের মালিকই ক্ষমার সমুদ্রও।
মৌমাছির মতো ক্ষুদ্র এক সৃষ্টিও রবের নির্দেশে এমন মধুর ফল বয়ে আনে—আর মানুষ, যে নিজেই নেয়ামতের ভেতর ডুবে আছে, সে কি করে বলে তার কিছুই প্রয়োজন নেই? এই আয়াত তাই শুধু গণনার অক্ষমতার কথা বলে না; বলে, অকৃতজ্ঞ হৃদয়ের দীনতা। যে চোখে আলো, যে জিহ্বায় কথা, যে হৃদয়ে আশা, যে ঘরে সামান্য শান্তি, যে পাপে ভেঙে পড়েও তাওবার দরজা খোলা—এসবের কোনোটিই আমাদের হাতের তৈরি নয়। আমরা শুধু গ্রহণ করি; দান করেন তিনি। আর এই উপলব্ধি যখন হৃদয়ে নামে, তখন অহংকার গলে যায়, এবং বান্দা বুঝতে শেখে: সে মালিক নয়, সে মেহমান; সে দাতা নয়, সে ভিখারি—কিন্তু এমন ভিখারি, যাকে রহমত ফিরিয়ে দেয় না।
তাই এই আয়াতের শেষে ক্ষমা ও দয়ার কথা যেন এক সফরশেষের আশ্রয়। যদি আমাদের কৃতজ্ঞতা অসম্পূর্ণ হয়, যদি জিহ্বা শুকিয়ে যায়, যদি অন্তর প্রয়োজনমতো ঝুঁকতে না পারে, তবু আল্লাহর দরজা আমাদের জন্য উন্মুক্ত। তাঁর নেয়ামত গণনা করা যায় না, আর তাঁর ক্ষমাকেও ছোট করে দেখা যায় না। মানুষ যখন নিজের সীমা বুঝে, তখনই সে সত্যিকার ঈমানের দ্বারে পৌঁছে। সেদিন বান্দা আর নেয়ামত চাওয়ার আগে নিজের হৃদয়কে শুদ্ধ করতে শেখে, হালালকে ভালোবাসতে শেখে, হারামকে ভয় করতে শেখে, দাওয়াতে ধৈর্য ধরতে শেখে, এবং প্রতিটি নিশ্বাসে বলে: হে আল্লাহ, আমি তোমার দানের যোগ্য নই, কিন্তু তোমার রহমতের আশা থেকে আমি বঞ্চিত নই।