যিনি সৃষ্টি করেন, তিনি কি কখনো তাঁরই সমান হতে পারেন, যে নিজে কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না? কুরআনের এই প্রশ্নটি আসলে তথ্যের প্রশ্ন নয়, হৃদয়ের প্রশ্ন। কারণ মানুষ অনেক সময় চোখের সামনে থাকা জিনিসকে বড় মনে করে বসে, আর যিনি সেই সব জিনিসকে অস্তিত্ব দিয়েছেন, তাঁকে ভুলে যায়। সূরা আন-নাহল-এর এই আয়াত আমাদের থামিয়ে দেয়, চিন্তা করতে বাধ্য করে, এবং স্মরণ করিয়ে দেয়—সৃষ্টি আর স্রষ্টা এক কাতারে দাঁড়াতে পারে না। যিনি জীবন দেন, রিজিক দেন, পথ দেখান, নিয়ামত দান করেন, তাঁর সামনে সব তৈরি জিনিস অসহায়, সীমাবদ্ধ, নির্ভরশীল। আর নির্ভরশীল কিছুকে উপাস্য বানানো মানে নিজের বোধকে অন্ধতার হাতে তুলে দেওয়া।
এই আয়াতের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো একক কারণ-নুযূলের কথা নিশ্চিতভাবে বলার প্রয়োজন নেই; বরং এটি কুরআনের সেই বৃহত্তর তাওহীদী ধারার অংশ, যেখানে আল্লাহ বারবার বান্দাকে দৃশ্যমান জগৎ দেখে অদৃশ্য সত্যে পৌঁছাতে ডাকেন। সূরা আন-নাহলে নিয়ামতের কথা খুব বিস্তৃতভাবে এসেছে—মৌমাছি, খাদ্য, পানি, জীবিকা, পথচলা, ভাষা, পরিবার, ও জীবনের নানা নিদর্শন। এই সব নিয়ামতের মাঝে মানুষকে শেখানো হচ্ছে যে, এত সৌন্দর্য, এত শৃঙ্খলা, এত উপকার যিনি সৃষ্টি করেছেন, তাঁরই ইবাদত করা উচিত। এখানে প্রশ্নটি শুধু যুক্তির নয়; এটি কৃতজ্ঞতারও প্রশ্ন। যে অন্তর নিয়ামতকে দেখে কিন্তু মুনেঈমকে দেখে না, সে আসলে বঞ্চনার ভেতরেই বেঁচে থাকে।
আর তাই আয়াতের শেষ প্রশ্ন—‘তোমরা কি চিন্তা করবে না?’—একটি কোমল কিন্তু তীক্ষ্ণ জাগরণ। কুরআন বান্দাকে জোর করে নয়, জাগিয়ে তুলে হিদায়েতের পথে নেয়। চিন্তা এখানে নিছক বুদ্ধির ব্যায়াম নয়; এটি হৃদয়ের সেজদা। যখন মানুষ বুঝতে শেখে যে কিছুই স্রষ্টার সমকক্ষ নয়, তখন তার ভেতরে অহংকার গলে যায়, শিরক ঝরে পড়ে, আর কৃতজ্ঞতার আলো জন্ম নেয়। এই আয়াতের ভাষা আমাদের শেখায়: যদি আল্লাহই স্রষ্টা হন, তবে ভরসা তাঁরই ওপর; যদি নিয়ামত তাঁরই দান হয়, তবে শুকরও তাঁরই প্রাপ্য; আর যদি সত্যই তাঁর পক্ষ থেকে আসে, তবে বান্দার কাজ হলো মাথা নত করে তা গ্রহণ করা।
যিনি সৃষ্টি করেন, তিনি কি কেবল একজন কারিগর—আর সৃষ্টি তো নিছক কাগজের ফুল? না, এ প্রশ্নের ভেতরে লুকিয়ে আছে হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো এক সত্য: সৃষ্টি আর স্রষ্টা কখনো এক হতে পারে না। যে কিছুকে অস্তিত্ব দিয়েছে, সে নিজে অস্তিত্বের মুখাপেক্ষী; যে প্রাণহীনকে প্রাণ দিয়েছে, সে নিজে প্রাণের উৎস নয়; যে অন্ধকারে আলো জ্বেলেছে, সে নিজে আলোহীন নয়। এ আয়াত যেন মানুষের ভেতরের ভুল তুলনাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। চোখ যা দেখে, হাত যা ছোঁয়, মন যা ভালোবাসে—সবই তো নিয়ামতের পর নিয়ামত; কিন্তু এসব নিয়ামতকে সামনে রেখে যদি মানুষ নিয়ামতদাতাকে ভুলে যায়, তবে সে উপহার আঁকড়ে ধরে দাতাকে হারিয়ে ফেলে।
আর এই দেখার পরেই আসে চিন্তার ডাক: তোমরা কি চিন্তা করবে না? এই প্রশ্নের উত্তর কেবল মস্তিষ্কের তর্কে নয়, আত্মার নতজানু হওয়ায়। কারণ চিন্তা মানুষকে বড় করে না—বরং ছোট করে; আর ছোট হয়ে যাওয়া হৃদয়ই আল্লাহর সামনে সবচেয়ে সুন্দর। যে সত্যকে চিনে নেয়, সে আর হারামের কাছে সেজদা করে না, মানুষের প্রশংসাকে প্রভু বানায় না, নীরবতায়ও তার অন্তর বলে—আমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আমি নিজের মালিক নই। এটাই তাওহীদের জাগরণ: স্রষ্টার সামনে বিনয়, নিয়ামতের সামনে কৃতজ্ঞতা, আর অন্ধ অনুকরণের ভিড়ে সত্যকে চিনে নেওয়ার সাহস।
যিনি সৃষ্টি করেন, তিনি কি কখনো সে সত্তার সমান হতে পারেন, যে নিজেই সৃষ্টি-নির্ভর, নিজেই সীমাবদ্ধ, নিজেই অভাবী? এই প্রশ্ন কেবল মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে নয়; এটি অন্তরের গোপন প্রতিমাগুলোকেও ভেঙে দেয়। কারণ মানুষ শুধু পাথরের সামনে সিজদা করে না, কখনো সম্পদকে, কখনো ক্ষমতাকে, কখনো খ্যাতিকে, কখনো নিজের অহংকারকে এমন মর্যাদা দেয়—যেন এরা-ই জীবনের মালিক। অথচ যার হাতে সৃষ্টি, জীবন, রিজিক, মৃত্যু, পথনির্দেশ; তাঁর সামনে সব কিছুর অবস্থান একান্তই দাসের মতো। তাই এ আয়াত আমাদের থামিয়ে দেয়, আর মনে করিয়ে দেয়—যে হৃদয় স্রষ্টাকে ভুলে সৃষ্টির দিকে ঝুঁকে পড়ে, সে আসলে নিজের দিকভ্রান্তিকেই ইবাদতের আসনে বসিয়ে দেয়।
এই আয়াতের প্রশ্ন-ভঙ্গি কুরআনের এক নরম কিন্তু তীক্ষ্ণ জাগরণ। আল্লাহ আমাদের শুধু যুক্তি দেন না, বিবেককে নাড়া দেন; শুধু প্রমাণ দেন না, আত্মাকে জাগিয়ে তোলেন। চারপাশের নিয়ামত এতই ঘন যে মানুষ বিস্মৃত হয়ে পড়ে—রুটি, পানি, বায়ু, দেহ, বুদ্ধি, সম্পর্ক, ঘর, পথ, আর অসংখ্য অদৃশ্য অনুগ্রহ। অথচ এসবের ভিড়ে যদি হৃদয় তাওহীদের দিকে না ফেরে, তবে কৃতজ্ঞতা শুকিয়ে যায়, আর কৃতজ্ঞতা শুকিয়ে গেলে নিয়ামতও পরীক্ষায় পরিণত হয়। তাই “তোমরা কি চিন্তা করবে না?”—এই ডাক আসলে অবহেলার ঘুম ভাঙানোর ডাক; এটি আমাদের শেখায়, প্রতিটি নিঃশ্বাসে স্রষ্টাকে স্মরণ করা, প্রতিটি লাভে তাঁকে দেখা, আর প্রতিটি ক্ষতিতে তাঁর দিকে ফিরতে জানা।
আজকের সমাজে অনেকেই বাহ্যিক শক্তিকে দেখে বিভ্রান্ত হয়, কিন্তু অন্তর জানে—ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, সম্পদ নিরাপত্তা নয়, মানুষ নিজেও নিজের জন্য যথেষ্ট নয়। এই আয়াত বান্দাকে নিজের অবস্থান চিনিয়ে দেয়: তুমি সৃষ্টি, তুমি উপার্জনকারী নও; তুমি গ্রহণকারী, মালিক নও; তুমি পথিক, গন্তব্য নও। তাই ভয় ও আশা—দুটোই আল্লাহর দিকে ফিরতে হবে। তাঁর সামনে দাঁড়ানোর দিন আসছে; সে দিন সৃষ্টির জাঁকজমক মুছে যাবে, আর অবশিষ্ট থাকবে শুধু সত্য। যে এখনই চিন্তা করে, সে রক্ষা পায়; যে এখনই কৃতজ্ঞ হয়, সে আরও আলোকিত হয়; আর যে স্রষ্টাকে সৃষ্টির ঊর্ধ্বে মানে, তার হৃদয় দুনিয়ার ভিড়েও নিঃশব্দে সিজদায় নুয়ে থাকে।
এই আয়াত আমাদের শুধু বিশ্বাস করতে বলে না, চিনতেও বলে। শুধু মুখে স্বীকার করতে বলে না, অন্তর দিয়ে বুঝতে বলে। কেননা তাওহীদ কেবল একটি বাক্য নয়; এটি চোখের দৃষ্টির শুদ্ধতা, বিবেকের জাগরণ, আর আত্মার বিনয়। যে মানুষ এক স্রষ্টার সামনে নত হতে শেখে, সে আর কোনো মিথ্যা শক্তির কাছে মাথা ঝোঁকায় না। আর যে মানুষ এ সত্য ভুলে যায়, সে নিজেই নিজের শিকল গড়ে নেয়। তাই আজ এই প্রশ্ন আমাদেরই জন্য: যিনি সৃষ্টি করেন, তাঁর সামনে কি আমি কৃতজ্ঞ? আমি কি তাঁর হালাল বিধানকে ভালোবেসেছি? আমি কি নিয়ামত পেয়ে আল্লাহকে স্মরণ করেছি, নাকি নিয়ামতের আড়ালে তাঁকেই হারিয়ে ফেলেছি?
অতএব, এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে অন্তর যেন নরম হয়। জিদ নয়, বিনয় আসুক। অহংকার নয়, তাওবা আসুক। কারণ স্রষ্টাকে চিনে ফেলা মানে জীবনের কেন্দ্র ফিরে পাওয়া। আর যে কেন্দ্র আল্লাহ, তার চারপাশে সব কিছুই শৃঙ্খলিত, পবিত্র, অর্থপূর্ণ। হে অন্তর, আজ তুমি চিনে নাও—যিনি সৃষ্টি করেন, তিনি কখনো সৃষ্টির সমান নন। তাঁর দয়ার কাছে ফিরে এসো, তাঁর নির্দেশের কাছে নত হও, এবং তাঁর নিয়ামতের জবাবে একটিই কথা হৃদয়ে বেঁধে নাও: তুমি ছাড়া আর কেউ সত্য উপাস্য নয়।