কুরআনের এই প্রশ্নটি বাহ্যিকভাবে খুবই সরল, কিন্তু অন্তরে পৌঁছালে তা যেন এক গভীর বজ্রধ্বনি। “বলুন পৃথিবী এবং পৃথিবীতে যারা আছে, তারা কার?”—এই প্রশ্নে আল্লাহ তাআলা মানুষের ভেতরের স্বীকৃতিকে জাগিয়ে তোলেন। কারণ পৃথিবী শুধু মাটির নাম নয়; এর মধ্যে রয়েছে মানুষের দেহ, প্রাণী, গাছপালা, নদী, পাহাড়, জীবনযাপন, ভোগ, ক্ষুধা, সামর্থ্য, দুর্বলতা—সবকিছু। আর এসবের দিকে তাকালে মুমিনের হৃদয় বুঝতে শেখে, যা কিছু চোখে দেখা যায়, তা আসলে কারও নিজের নয়; সবই একমাত্র মালিকের সৃষ্ট, তারই অধীন, তারই ব্যবস্থাপনায় টিকে আছে। এই আয়াত মানুষকে মালিকানা-ভ্রম থেকে বের করে এনে বান্দার সত্য পরিচয়ে দাঁড় করায়।
এখানে আল্লাহ এমনভাবে প্রশ্ন করেন, যেন গাফিল মানুষের সামনে আয়নার মতো একটি নীরব সত্য তুলে ধরা হয়। যদি তারা সত্যিই জানে, তবে বলুক—এই প্রশ্নটি অজানাকে জানার জন্য নয়, বরং জানা সত্ত্বেও অস্বীকার করার লজ্জা প্রকাশের জন্য। কুরআনের এই পদ্ধতিতে অহংকার ভেঙে যায়, কারণ মানুষ যতই দখলদারির ভাষা বলুক, জমিনের উপর তার ক্ষমতা সাময়িক; তার শ্বাস, তার ধন, তার শরীর, তার সময়—কোনোটিই তার নিজের নয়। পৃথিবীর অধিকারী হওয়া দূরের কথা, মানুষ তো পৃথিবীর অতিথি মাত্র। এই উপলব্ধি হৃদয়কে নরম করে, দৃষ্টিকে শুদ্ধ করে, এবং তাওহিদের সামনে নত হতে শেখায়।
সুরা আল-মুমিনুনের ধারায় এই প্রশ্নের স্থানও খুব অর্থবহ। এখানে মুমিনের পরিচয়, সৃষ্টি-রহস্য, নবীদের দাওয়াত, অবাধ্যতার পরিণতি এবং আখিরাতের নিশ্চিত বাস্তবতা ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে। পৃথিবী কার—এই প্রশ্ন আসলে শেষ বিচারের আগেই মানুষের বিবেককে জাগানোর প্রশ্ন। যে আজ পৃথিবীকে নিজের বলে ভাবছে, কাল তাকে এই পৃথিবী থেকেই বিদায় নিতে হবে; আর তখন বোঝা যাবে, মালিকানা ছিল কেবল ধার, আর ক্ষমতা ছিল কেবল পরীক্ষার অংশ। তাই এই আয়াত আমাদের শেখায়, সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে স্রষ্টাকে চেনো; মালিকানার দাবি শুনে তার মালিককে স্মরণ করো; আর পৃথিবীর প্রতিটি বস্তুর মধ্যে একটিই সত্য খুঁজে নাও—সবকিছুর উপর আল্লাহই একমাত্র অধিপতি।
বলুন, পৃথিবী কার?—এই প্রশ্নের ভেতরে এমন এক নীরব বজ্রপাত আছে, যা মানুষের অহংকারের স্তর ভেদ করে হৃদয়ের গভীরে গিয়ে আঘাত করে। আমরা যে জমিনে হাঁটি, যে মাটিতে ঘর বাঁধি, যে আকাশের নিচে স্বপ্ন গড়ি, যে অন্ন খেয়ে বাঁচি, যে জল পান করে তৃষ্ণা মেটাই—সবই তো এই পৃথিবীর অন্তর্ভুক্ত। অথচ এই পৃথিবী কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এর প্রতিটি কণা, প্রতিটি জীবন, প্রতিটি নিঃশ্বাস আল্লাহর সৃষ্টি ও অধীন। মানুষ কেবল সাময়িক ব্যবহারের অধিকার পায়, কিন্তু মালিক হতে পারে না। এ আয়াত হৃদয়কে শেখায়, যা তোমার হাতে আছে তা তোমার নয়; তুমি শুধু আমানতদার। আর আমানতদারের গর্ব যতই বড় হোক, সে শেষ পর্যন্ত মালিকের দরবারেই ফিরে যাবে।
আল্লাহ তাআলার এই প্রশ্নে যেন পৃথিবীর সমস্ত মুখোশ খুলে যায়। “বলুন, পৃথিবী এবং পৃথিবীতে যারা আছে, তারা কার?”—এই বাক্যটি শুধু তথ্য জানতে চায় না; বরং মানুষের ভেতরে জমে থাকা মালিকানা-অহংকারকে নরম কাঁপুনি দিয়ে ভেঙে দেয়। যে জমিনে আমরা হাঁটি, যে বাতাসে শ্বাস নিই, যে খাদ্যে বাঁচি, যে শরীরে শক্তি পাই, যে সন্তান-সম্পদকে আপন মনে করি—সবকিছুই তো এক মহান মালিকের দান। মানুষ নিজের নাম লিখে দেয়, দখলদারি করে, হিসাব কষে, দাবি তোলে; কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও সে কি সূর্যকে থামাতে পারে, বাতাসকে বেঁধে রাখতে পারে, মৃত্যুকে দূরে সরাতে পারে? পারে না। তাই এই আয়াত আমাদের শেখায়, যা কিছু আমাদের হাতে আছে তা আসলে আমাদের কাছে আমানত; আর আমানতদারির দিন একদিন অবশ্যই এসে দাঁড়াবে।
এই প্রশ্ন মুমিনের হৃদয়কে একদিকে ভয়ের দিকে, অন্যদিকে আশার দিকে টেনে নেয়। ভয়, কারণ আমি যে পৃথিবীকে নিজের মনে করে আঁকড়ে ধরেছি, সেটির ওপর আমার কোনো চূড়ান্ত অধিকার নেই; আমি কেবল পথচারী। আশা, কারণ যিনি পৃথিবীর মালিক, তিনি-ই বান্দার প্রতিপালক, দয়ার আধার, হিসাবের দিনও তিনি-ই ন্যায়বিচার করবেন। সমাজ যখন দখল, প্রতারণা, ভোগ আর আত্মকেন্দ্রিকতায় কঠিন হয়ে ওঠে, তখন এই আয়াত মানুষের অন্তরে ফিরে আসার ডাক দেয়—নিজেকে জিজ্ঞেস করো, আমি কি মালিকের পথে আছি, নাকি মালিকানার মিথ্যা নেশায় ডুবে আছি? কুরআন আমাদের চোখ মাটির দিকে নামায় না; বরং মাটির ভেতর দিয়ে আকাশের সত্য চিনতে শেখায়। তাই এই আয়াত শুনে মুমিনের হৃদয় কেঁপে বলে, যা কিছু আমি দেখি, সবই তাঁর; আর আমি নিজেও তাঁরই। একদিন আমাকে ফিরতেই হবে, আর সেই ফিরেই সত্য সফলতা।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মানুষের ভেতরের সব দাবি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। যে মাটি আমরা পায়ে মাড়াই, যে আকাশের নিচে আমরা স্বপ্ন বুনি, যে দেহ নিয়ে আমরা অহং করি—সবই তো সেই পৃথিবীরই অংশ, আর পৃথিবীও কারও সম্পত্তি নয়; তা একমাত্র রবের সৃষ্টি, তাঁর কর্তৃত্বের অধীন এক নীরব সাক্ষী। মানুষ যখন “আমার” বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন এই প্রশ্ন তাকে ফিরিয়ে আনে সত্যের দরজায়: তুমি যার উপর বসবাস করছ, যার রিযিক খাচ্ছ, যার বাতাসে নিশ্বাস নিচ্ছ—সে সব কিছুর মালিক কে? এই প্রশ্নের উত্তর উচ্চারণের জন্য নয়, হৃদয়ের গর্ব ভাঙার জন্য। কারণ যে অন্তর মালিককে চিনে, সে আর নিজের জন্য সীমাহীন অধিকার দাবি করে না; সে জানে, সে কেবল আমানতদার।
আর এই বোধই মুমিনকে আখিরাতের দিকে টেনে নেয়। পৃথিবী যদি কারও না হয়, তবে এখানকার জাঁকজমক, জমি, সম্পদ, পদ, খ্যাতি—কোনোটাই চিরস্থায়ী নয়। আজ যা হাতে আছে, কাল তা হাতছাড়া হতে পারে; আজ যে শক্তিশালী, কাল সে মাটির নিচে নীরব হয়ে যেতে পারে। তাই কুরআনের এই প্রশ্ন আমাদের দম্ভ ভাঙার পাশাপাশি তওবার দরজাও খুলে দেয়। যারা সত্যিই জানে, তারা বলবে—সবকিছু আল্লাহর। আর এই স্বীকারোক্তিই বান্দার মুক্তি: নিজের ক্ষুদ্রতাকে মেনে নিয়ে, রবের মহত্বে ফিরে আসা। যে হৃদয় এই প্রশ্নের সামনে নত হয়, তার জন্য পৃথিবী আর ফাঁদ থাকে না; তা হয়ে ওঠে শেষ সত্যের পথে এক ক্ষণস্থায়ী যাত্রাপথ।