এই আয়াতে অবিশ্বাসের এক গভীর ও করুণ মুখ দেখা যায়। মানুষ যখন সত্যের সামনে নত হতে চায় না, তখন সে প্রমাণ খোঁজে না; বরং পুরোনো অভ্যাসে আশ্রয় নেয়। তারা বলে, “আমাদেরকেও এ কথাই বলা হয়েছিল, আমাদের পূর্বপুরুষদেরকেও এ কথাই শোনানো হয়েছিল।” অর্থাৎ, আখিরাতের আহ্বান, পুনরুত্থানের হুঁশিয়ারি, জবাবদিহির ডাক—সবকিছু তাদের কাছে নতুন কোনো সতর্কবার্তা নয়, বরং এমন এক পুরোনো কথা, যা তারা শুনেছে, উপেক্ষা করেছে, এবং শেষে তুচ্ছ বলে উড়িয়ে দিতে শিখেছে। এই এক বাক্যে যেন মানুষের অহংকার, গাফিলতি, এবং অন্তরের বন্ধ দরজাগুলোর ছবি আঁকা আছে।
“এ তো পূর্ববতীদের কল্পকথা”—এই কথার মধ্যে অবিশ্বাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপটি লুকিয়ে আছে। কারণ যখন সত্যকে মানুষ যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করতে পারে না, তখন সে তাকে কাহিনি বলে ছোট করে। অথচ কুরআন মানুষকে বারবার এমন এক দৃষ্টিভঙ্গির দিকে ডাকে, যেখানে সৃষ্টি, জীবন, মৃত্যু, পুনরুত্থান—সবকিছুই নিছক ঘটনাপ্রবাহ নয়; বরং আল্লাহর নিদর্শন, তাঁর ক্ষমতার ঘোষণা, এবং মানুষের জন্য অনিবার্য পরীক্ষার মঞ্চ। সূরা আল-মুমিনুনের সামগ্রিক আলোচনায় মুমিনের নম্রতা, মানবসৃষ্টির বিস্ময়, নবীদের সংগ্রাম, এবং আখিরাতের সফলতার যে ধারাবাহিক ছবি আছে, এই আয়াত তার বিপরীতে এক অন্ধ মনস্তত্ত্বকে উন্মোচন করে—যে মন সত্য শুনেও সত্য হতে দেয় না।
এখানে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার কঠোর বর্ণনা না থাকলেও, এটি মক্কি কুরআনের সেই বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ, যেখানে রাসূল ﷺ-এর আহ্বানের জবাবে কুরাইশি জাহিলিয়াত বারবার এমনই ভাষা ব্যবহার করত। তারা ভাবত, প্রাচীনদের নামে কথা বললেই হয়তো সত্যকে দুর্বল করা যাবে। কিন্তু আল্লাহর বাণী পুরোনো বা নতুনের মানদণ্ডে মাপা হয় না; সত্যের মানদণ্ড হলো তা মানুষের অন্তরকে জাগায় কি না, মানুষকে আল্লাহর দিকে ফেরায় কি না, এবং আখিরাতের সামনে নত হতে শেখায় কি না। যারা আকাশের নিদর্শন, মাটির রহস্য, নিজের সৃষ্টির দুর্বলতা, এবং মৃত্যুর নিশ্চিত ডাক দেখেও কেবল বলে “কাহিনি”, তাদের হৃদয়ে সমস্যা জ্ঞানস্বল্পতা নয়—বরং আত্মাভিমান। আর এই আত্মাভিমানই মানুষকে সত্যের আলো থেকে দূরে সরিয়ে অন্ধকারের সঙ্গে আপস করায়।
মানুষের হৃদয় যখন অহংকারে মোড়ানো থাকে, তখন সত্যও তার কাছে ভারী লাগে। সে কুরআনের আহ্বান শুনে নীরবভাবে নত হতে চায় না; বরং পুরোনো অভ্যাসের মতো বলে ফেলে, এ তো বহু আগেই শোনা কথা, এ তো পূর্বপুরুষদের কানে পৌঁছেছিল। এই বাক্যের মধ্যে কেবল অস্বীকার নেই, আছে আত্মরক্ষার ছলনা; আছে অন্তরের সেই ক্লান্তি, যা হকের সামনে দাঁড়াতে ভয় পায়। কারণ সত্য যদি সত্যিই সত্য বলে মেনে নেয়, তবে জীবনকে বদলাতে হবে, হিসাবকে মানতে হবে, নিজের ইচ্ছার উপরে আল্লাহর ফয়সালাকে স্থান দিতে হবে। আর এটাই গাফিলদের কাছে সবচেয়ে কঠিন। তাই তারা আখিরাতকে ‘কাহিনি’ বানিয়ে ফেলে, যেন নাম বদলালে জবাবদিহির ভয়ও মিলিয়ে যায়।
এখানে কুরআন আমাদের অন্তরকে এক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়: আমরা কি সত্যকে বুঝি, নাকি সত্যের কাছে নত হতে অস্বস্তি বোধ করি? যে ব্যক্তি নিজের অহংকারকে রক্ষা করতে চায়, সে সবসময় হককে পুরোনো গল্প বলে উড়িয়ে দেবে; আর যে হৃদয় আল্লাহর কাছে জবাবদিহির ভয়ে কাঁপে, সে প্রতিটি আয়াতে জীবন খুঁজে পায়। তাই এই আয়াত কেবল অবিশ্বাসীদের নিন্দা নয়, মুমিনের জন্যও একটি আয়না। কোথাও কি আমরাও সত্য শুনে অভ্যস্ততায় ঝিমিয়ে পড়িনি? কোথাও কি আমরা আখিরাতের স্মরণকে দূরের কোনো কথা বানিয়ে ফেলিনি? যে দিন মানুষ বুঝবে ‘পূর্ববতীদের কাহিনি’ বলে ঠাট্টা করা আসলে নিজের ভবিষ্যৎকে অস্বীকার করা, সে দিনই তার অন্তর কেঁপে উঠবে। আর যে অন্তর কেঁপে ওঠে, সেই অন্তরই হয়ত একদিন সিজদায় ভেঙে পড়ে আল্লাহর করুণায় ফিরে আসে।
মানুষের অন্তর যখন সত্যের ওজন বইতে চায় না, তখন সে সত্যকে হালকা বানাতে চায়। সে বলে, “এ তো আগেও শোনা হয়েছে, আমাদের পূর্বপুরুষরাও শুনেছে।” এই বাক্যের ভেতর শুধু অস্বীকার নেই, আছে এক ধরনের আত্মরক্ষা—নিজের ভেতরের খালি হয়ে যাওয়া ঢাকতে পুরোনো ভিড়ের আশ্রয় নেওয়া। যখন সমাজে জবাবদিহির ভয় মরে যায়, তখন কণ্ঠস্বর বড় হয়, কিন্তু হৃদয় ছোট হয়ে যায়। আখিরাতের কথা তখন আর স্মরণের দরজা খুলে না; বরং কেবল কানে লাগে, তারপর গলে যায় অভ্যাসের ধুলায়।
কুরআন যেন আমাদের সামনে সেই অদ্ভুত মানবদৃশ্যটি দাঁড় করায়—যেখানে মানুষ নিজের চোখে সৃষ্টি দেখে, নিজের নিঃশ্বাসে মৃত্যু অনুভব করে, নিজের জীবনের ভঙ্গুরতা টের পায়, তবু বলে: “সবই কল্পকথা।” কী আশ্চর্য! যে হৃদয় জন্মের রহস্যে নত হয় না, সে মৃত্যুর ডাক শুনেও জাগে না। যে অন্তর আল্লাহর নিদর্শনে ভিজে না, সে নবীদের আহ্বানকেও পুরোনো গল্প বলে এড়িয়ে যায়। আর এভাবেই গাফিলতি ধীরে ধীরে অহংকারে পরিণত হয়—সত্যকে অস্বীকার করার চেয়ে বড় বিপদ তখন আর কিছু থাকে না, কারণ অস্বীকার করা হৃদয় একদিন নিজেরই পরিণতিকে মিথ্যা ভাবতে শেখে।
এই আয়াত আমাদেরকে নিজের দিকে ফিরিয়ে আনে। আমি কি সত্য শুনে তাকে বিচার করছি, নাকি পুরোনো ধারণা দিয়ে তাকে মেপে ছোট করছি? আমি কি আখিরাতকে মনে রেখে বাঁচছি, নাকি পৃথিবীর কোলাহলে এমন ডুবে আছি যে শেষ দিনের ডাকও আমার কাছে দূরের বাতাস? মুমিনের পথ এখানে ভিন্ন: সে প্রশ্নকে ভয় পায় না, কিন্তু অহংকারকে ভয় পায়; সে আল্লাহর কথা শুনে বলে, “আমরা শুনলাম ও মানলাম,” আর কাঁপতে কাঁপতে নিজের আমলকে যাচাই করে। কারণ সত্য কল্পকথা নয়; সত্য হলো সেই পথ, যা শেষ পর্যন্ত রবের দিকে ফেরার নাম। আর যে ফেরার প্রস্তুতি নেয়, তার জন্য এই দুনিয়ার প্রতিটি দিনই জবাবদিহির আগের এক নীরব মঞ্জিল।
কিন্তু আশ্চর্য এই যে, যে মানুষ আজ আল্লাহর সতর্কবাণীকে “পুরোনো কাহিনি” বলে উড়িয়ে দেয়, কাল তার নিজের শ্বাস, নিজের শরীর, নিজের কবর—সবই তাকে নতুন করে সত্যের মুখোমুখি করবে। তখন আর পূর্বপুরুষের দোহাই চলবে না, চলবে না অভ্যাসের আড়াল, চলবে না কটাক্ষের হাসি। যেদিন আসমান-জমিনের মালিক প্রশ্ন করবেন, “তুমি কি ভেবেছিলে, আমি তোমাকে এমনি-এমনি ছেড়ে দিয়েছিলাম?” সেদিন ‘কল্পকথা’ বলা জিহ্বাটিও নিশ্চুপ হয়ে যাবে; আর হৃদয় বুঝবে, সে আসলে কাহিনিকে মিথ্যা বলেনি, নিজের পরিণতিকেই অস্বীকার করেছিল।
এই আয়াত আমাদের সামনে এক ভয়ার্ত আয়না ধরে। মানুষ কখনো সত্যকে অপছন্দ করে বলে না—অধিকাংশ সময় সে সত্যকে পুরোনো, পরিচিত, পুনরাবৃত্ত, তুচ্ছ বলে এড়িয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহর বাণী পুরোনো হয় না; পুরোনো হয় কেবল মানুষের অবাধ্য হৃদয়। সৃষ্টির নিদর্শন, নবীদের দীর্ঘ সংগ্রাম, আখিরাতের অবশ্যম্ভাবী হিসাব—সবকিছু মিলিয়ে কুরআন যেন আমাদের আত্মাকে জাগিয়ে বলছে: অবহেলা করো না, কারণ একদিন তুমি নিজেরই অস্বীকারের বোঝা নিয়ে দাঁড়াবে। হে আল্লাহ, আমাদের এমন হৃদয় দাও যা সত্য শুনে তর্কে যায় না, নতি স্বীকার করে; এমন চোখ দাও যা তোমার নিদর্শন দেখে; এবং এমন জীবন দাও, যা কল্পকথার মোহ নয়, আখিরাতের প্রস্তুতিতে ভিজে থাকে।