এই আয়াতটি এক ভয়ংকর অথচ শান্ত সত্যকে সামনে এনে দাঁড় করায়: কোনো সম্প্রদায়, কোনো জাতি, কোনো সভ্যতা তার নির্ধারিত কালকে অগ্রে যেতে পারে না; আবার সেই সময় এলে তাকে ঠেকিয়েও রাখা যায় না। মানুষের চোখে ইতিহাস অনেক সময় শক্তি, জনবল, উন্নতি, শাসন আর পতনের দীর্ঘ ধারা বলে মনে হয়। কিন্তু কুরআন সেই ইতিহাসের অন্তরালে আরও গভীর একটি সত্তা দেখায়—আল্লাহর নির্ধারিত সময়। মানুষের পরিকল্পনা যত বড়ই হোক, আল্লাহর ফয়সালার সামনে তা কেবল সীমিত এক ছায়া। তাই এই আয়াত শুধু জাতির জন্য নয়, ব্যক্তির জন্যও হৃদয় কাঁপানো সতর্কবার্তা: তোমারও একটি ‘أَجَل’ আছে; দেরি করে জাগার সুযোগ চিরকাল থাকবে না।
সূরা আল-মুমিনুনের এই অংশে মুমিনের অন্তর্গত পরিচয়, সৃষ্টির বিস্ময়, নবীদের সংগ্রাম, অস্বীকারকারীদের পরিণতি—সবকিছু মিলিয়ে এক গভীর আখিরাতমুখী চেতনা গড়ে ওঠে। এই আয়াতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সহিহ ও সুস্পষ্ট শানে নুযূল প্রতিষ্ঠিত নয়; তবে এর ব্যাপক প্রেক্ষাপট স্পষ্টভাবে বোঝা যায় মক্কী কুরআনের সেই বাস্তবতা থেকে, যেখানে সত্যের আহ্বান অস্বীকার করা লোকেরা নিজেদের শক্তিকে স্থায়ী ভেবেছিল। আল্লাহ তাদের মনে করিয়ে দেন, জাতির পতনও মানুষের ইচ্ছায় নয়, আর বিলম্বও মানুষের চাতুর্যে নয়। সময়ের মালিক একমাত্র তিনিই।
অতএব এই আয়াত আকাশের মতো বিশাল এক সতর্কতা নিয়ে আসে: যে সমাজ আল্লাহকে ভুলে আত্মপ্রশংসায় ডুবে যায়, সে বুঝতে না বুঝতেই তার নির্ধারিত কালের কিনারায় পৌঁছে যায়। আর যে মুমিন এই সত্য হৃদয়ে ধারণ করে, সে আর অহংকারে ফুলে ওঠে না; সে প্রস্তুত হয়, তওবায় ফিরে আসে, আমলে নরম হয়, চোখের জল দিয়ে অন্তর ধোয়। কারণ সফলতা সেই নয় যে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকা; সফলতা হলো, নির্ধারিত সময়ের আগে ঈমানকে জাগিয়ে তোলা, এবং সময় এসে গেলে আল্লাহর সামনে লজ্জিত না হয়ে দাঁড়ানো।
আল্লাহর এই বাক্যটি মানুষের অহংকারের বুকের ওপর এক নীরব কিন্তু চূড়ান্ত হাত রেখে দেয়: কোনো সম্প্রদায় তার নির্ধারিত কালকে অতিক্রম করতে পারে না, আবার সেই কালের মুখে এসে থামিয়েও রাখা যায় না। সভ্যতা নিজেকে যতই অমর ভাবুক, রাষ্ট্র যতই শক্তির প্রাসাদ তোলে, জনপদ যতই বিস্তৃত হয়—সবকিছুই এক অদৃশ্য মাপের ভেতর বাঁধা। মানুষ সময়কে নিজের হাতে মুঠোবন্দি করতে চায়, কিন্তু সময় আসলে আল্লাহর ফয়সালার আনুগত্য করে। এই আয়াত আমাদের শেখায়, ইতিহাস কেবল ঘটনার প্রবাহ নয়; ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে আল্লাহর ‘أَجَل’-এর নিঃশব্দ পদচিহ্ন আছে।
সূরা আল-মুমিনুনের এই আয়াত যেন হৃদয়ের ভেতর এক কঠিন আলো জ্বেলে দেয়: সত্যের সামনে দাঁড়ানোর সময় নষ্ট করো না, কারণ ফয়সালার সময় এলে দেরির আর সুযোগ থাকবে না। নবীদের দাওয়াত, মুমিনদের সংগ্রাম, অস্বীকারকারীদের অনুতপ্ত পরিণতি—সব মিলিয়ে কুরআন আমাদের শেখায়, স্থায়ী শক্তি মানুষের নয়, আল্লাহর। তাই সফলতা সেই নয় যে দুনিয়া তোমাকে দীর্ঘ সময় দেয়; সফলতা হলো, তোমার সময় শেষ হওয়ার আগেই তুমি আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে পেরেছ কি না। নির্ধারিত কালকে জানা মুমিনকে আতঙ্কিত করে না; বরং তাকে কোমল, সজাগ, বিনীত এবং আখিরাতমুখী করে তোলে।
কুরআন এখানে আমাদের চোখের সামনে ইতিহাসের এক অদৃশ্য শৃঙ্খল টেনে ধরে: কোনো উম্মত তার নির্ধারিত কালকে অগ্রে যেতে পারে না, আবার পেছাতেও পারে না। মানুষ ভাবে, ক্ষমতা থাকলে সময়কে থামানো যায়; সম্পদ থাকলে পতনকে ঠেকানো যায়; আর জনবল থাকলে পরিণতিকে পিছিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু আল্লাহর ফয়সালার সামনে সব শক্তি ক্ষণিকের কাঁপুনি মাত্র। এ আয়াত জাতিগুলোর জন্য যেমন সত্য, তেমনি প্রতিটি হৃদয়ের জন্যও সত্য—একটি মানুষেরও একটি নির্ধারিত সময় আছে, একটি নির্ধারিত সীমা আছে, যেখানে পৌঁছালে আর কোনো অজুহাত চলে না, কোনো বিলম্ব কাজে লাগে না।
এখানে ভয় জাগে, আবার শান্তিও আসে। ভয়—এই জন্য যে, আমরা প্রায়ই জীবনকে দীর্ঘ মনে করে অবহেলা করি, আর আজকেই তওবা, আজকেই সংশোধন, আজকেই ফিরে আসার ডাককে আগামীকালের হাতে তুলে দিই। শান্তি—এই জন্য যে, পৃথিবী নিছক বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে নেই; এর প্রতিটি উত্থান-পতন, প্রতিটি জয়-পরাজয়, প্রতিটি সভ্যতার উন্মেষ ও বিলুপ্তি আল্লাহর জ্ঞানে, আল্লাহর পরিমাপে, আল্লাহর নির্ধারণে আবদ্ধ। যে সত্তা জাতিকে সময়মতো উঠিয়ে দেন, তিনিই সময়মতো নামিয়ে দেন। তাই মুমিন ইতিহাস দেখে অহংকার করে না, শিক্ষা নেয়; সাফল্য দেখলে মুগ্ধ হয় না, কৃতজ্ঞ হয়; পতন দেখলে নিরাশ হয় না, সতর্ক হয়।
এই আয়াত হৃদয়কে প্রশ্ন করে: তুমি কি নিজের ‘أَجَل’ জানো? তুমি কি নিশ্চিত যে অনুতাপের জন্য আরেকটি দিন পাবে? কেউ জানে না তার ডাক কখন আসবে, তাই মুমিনের বুদ্ধি হলো দেরি না করা। অন্তরকে আজই নরম করতে হয়, গুনাহের সঙ্গে সম্পর্ক আজই ছিন্ন করতে হয়, সালাত, ইস্তিগফার, হালাল-হারাম, হক-হুকুক—সবকিছু আজই ঠিক করতে হয়। কারণ কালের দরজা মানুষ খোলে না; কেবল আল্লাহ খোলেন, এবং যখন তিনি বন্ধ করেন, তখন কোনো শক্তিই তা ফিরিয়ে নিতে পারে না। এই সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে হৃদয় বলুক: হে আল্লাহ, আমাদের সময়কে বরকত দাও, আমাদের অন্তরকে জাগিয়ে দাও, আর আমাদেরকে সেই বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করো, যারা নির্ধারিত সময় আসার আগে তোমার দিকে ফিরে এসেছে।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মানুষের অহংকার যেন নিজেই নিজের কবর খুঁড়ে। আমরা কত কিছু নিয়েই দেরি করি, কত কিছুই আবার জোর করে এগিয়ে নিতে চাই; কিন্তু আমাদের জীবনের শেষ সীমা, আমাদের উত্থান-পতনের সময়, আমাদের সুযোগের দরজা—সবই আল্লাহর হাতে লেখা। যে জাতি নিজেকে অজেয় ভাবে, তারও একটি মাপা কাল আছে। যে হৃদয় তওবা থেকে দূরে সরে, তারও একটি নির্ধারিত মূহূর্ত আছে। তাই সময়কে অবহেলা করা মানে আসলে নিজের আত্মাকে অবহেলা করা। এখনই হয়তো ফিরে আসার ডাক; এখনই হয়তো ক্ষমা চাওয়ার শেষ নরম সময়।
মুমিনের কাজ হলো এই নির্ধারিত কালের সত্যকে ভয় থেকে নয়, জাগরণ থেকে গ্রহণ করা। কারণ যে আল্লাহ সময়কে বেঁধে রেখেছেন, তিনিই তওবার দরজাও খোলা রেখেছেন। তিনিই আমাদের সৃষ্টি করেছেন, পথ দেখিয়েছেন, নবীদের পাঠিয়েছেন, আর শেষে এই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন—কোনো কিছুই চিরকাল স্থগিত থাকে না। না শাস্তি, না অবকাশ, না সুযোগ, না মৃত্যু। কাজেই হৃদয় যেন নরম হয়, চোখ যেন জাগে, আর আমল যেন সত্য হয়। আজই যদি জীবন হঠাৎ থেমে যায়, তাহলে আমার হাতে কী থাকবে? এই প্রশ্নের সামনে ভেঙে পড়াই মুমিনের জন্য নাজাতের শুরু।