এরপর তাদের পরে আমি বহু সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছি—এই সংক্ষিপ্ত বাক্যের ভেতরেই যেন মানব-ইতিহাসের দীর্ঘ নদী বয়ে যায়। একটি জাতি আসে, তার কোলাহল, তার ক্ষমতা, তার সভ্যতা, তার দাবি—সবই সময়ের বুকে লেখা হয়; তারপর সময়ই ধীরে ধীরে সেগুলো মুছে দেয়। আল্লাহ এখানে আমাদের জানিয়ে দিচ্ছেন, মানুষের আগমন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, আর জাতির উত্থান-পতনও কোনো স্বয়ংক্রিয় শক্তির খেলা নয়; সবই তাঁর সৃষ্টি, তাঁর ইচ্ছা, তাঁর পরিকল্পনার অধীন। এই আয়াত মানুষের অহংকারকে ছোট করে দেয়, কারণ যে সত্তা এক প্রজন্মের পরে আরেক প্রজন্ম গড়ে তুলছেন, তাঁর কাছে কোনো সম্প্রদায়ই চূড়ান্ত নয়, কোনো ইতিহাসই চিরস্থায়ী নয়।
সূরা আল-মুমিনুনের এই ধারাবাহিক বর্ণনায় আল্লাহ প্রথমে মানুষের সৃষ্টির বিস্ময়, তারপর নবীদের আগমন, তারপর উম্মতসমূহের পরিবর্তন—সবকিছুকে এমনভাবে সাজান যেন হৃদয় বুঝে ফেলে: জীবন কেবল উপস্থিতি নয়, একটি পরীক্ষা। এখানে নির্দিষ্ট কোনো একক ঘটনার কারণে আয়াতটি নাযিল হয়েছে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই; বরং এটি কুরআনের বৃহত্তর ভাষ্য, যেখানে মানবসভ্যতার ওঠানামা, সত্য অস্বীকারের পরিণতি, এবং আল্লাহর নবী-ইতিহাসের ধারাবাহিক শিক্ষা একসঙ্গে উপস্থিত। মানুষ যদি নিজের সময়, তার শক্তি, তার সংখ্যাধিক্য দেখে বিভ্রান্ত হয়, তবে এই আয়াত তাকে স্মরণ করায় যে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম বদলালেও সত্য একটাই থাকে: রব এক, মালিক এক, এবং প্রত্যাবর্তন তাঁরই কাছে।
আসলে ‘কুরূনান আখরীন’—‘অন্য বহু সম্প্রদায়’—শব্দযুগল মানুষের ইতিহাসকে শুধু বসতি, বংশ বা জনসংখ্যার হিসেবে দেখে না; এটি দেখায় দায়িত্ব, অবকাশ, ও জবাবদিহির ধারাবাহিকতা। আজ যে মানুষ বেঁচে আছে, সে এক দীর্ঘ কাহিনির অংশ—তার আগে কত জাতি এসে গেছে, কত শক্তিশালী ঘরবাড়ি, কত বড় বাজার, কত উজ্জ্বল নাম, সবই মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। তাই এই আয়াত কেবল অতীতের খবর নয়; এটি আমাদের ভেতরে একটি কাঁপন জাগানোর জন্য। আল্লাহ নতুন সম্প্রদায় সৃষ্টি করেন, কিন্তু কোনো সম্প্রদায়কেই তিনি ছেড়ে দেন না; তিনি সময়ের পাতায় নতুন নাম লিখেন, আর সেই নামগুলোকেও পরীক্ষা করেন তাওহীদের আলোয়, ন্যায়ের মানদণ্ডে, এবং আখিরাতের স্মৃতিতে।
এরপর তাদের পরে আমি বহু সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছি—এই বাক্যটি যেন কালের দরজায় হাত রেখে আমাদের থামিয়ে দেয়। এক জাতির শান, শক্তি, সভ্যতা, ভাষা, বাজার, প্রাসাদ, যুদ্ধ, আনন্দ—সবই আসে, আবার চলে যায়; কিন্তু আল্লাহর সৃষ্টি-ধারা থামে না। তিনি এক সম্প্রদায় শেষ হলে আরেক সম্প্রদায়কে দাঁড় করান, যেন মানুষ বুঝতে পারে, পৃথিবী কারও স্থায়ী ঘর নয়, আর ইতিহাস কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। যে চোখের সামনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম গড়ে ওঠে, ভেঙে পড়ে, হারিয়ে যায়, তার অন্তর যদি না নড়ে, তবে সে আসলে সময় দেখছে, কিন্তু সত্য দেখছে না। এই আয়াত আমাদের অহংকারকে কেটে ছোট করে দেয়, কারণ মানুষ যত বড়ই হোক, সে কেবল এক কড়ি—আর আল্লাহই সমগ্র প্রবাহের মালিক।
এই আয়াতের নীরব ভেতরে আখিরাতের স্মরণও জেগে ওঠে। যে সত্তা এভাবে প্রজন্ম সৃষ্টি করেন, তিনি তো পুনরুত্থান ঘটাতেও সক্ষম; যে মানুষকে একবার অস্তিত্ব দেন, তিনি হিসাবের দিনের জন্য আবারও দাঁড় করাতে পারেন। তাই মানব-ইতিহাস কোনো এলোমেলো গল্প নয়, বরং একটি গোপন মঞ্চ—যেখানে জন্ম, মৃত্যু, ক্ষমতা, পতন, পরীক্ষা, প্রত্যাবর্তন সবই ঘটছে আল্লাহর নির্ধারিত পরিমাপে। মুমিনের হৃদয় এখানে আতঙ্কিতও হয়, আশ্বস্তও হয়: আতঙ্কিত হয় এই ভেবে যে মানুষ কত তুচ্ছ, আর আশ্বস্ত হয় এই ভেবে যে সবকিছুই এক মহাজ্ঞানের হাতে। ফলে সে আর নিজেকে স্থায়ী ভাবে না, নিজের প্রজন্মকে পরম ভেবে বসে না; বরং জানে, শেষ কথা ইতিহাসের নয়, আল্লাহর।
এরপর তাদের পরে আমি বহু সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছি—এই কথাটি যেন মানব-ইতিহাসের ওপর নেমে আসা এক গভীর নীরব ঘণ্টাধ্বনি। এক জাতি আসে, তার বাজার জমে, তার প্রাসাদ উঁচু হয়, তার ভাষা গর্জে ওঠে, তার শক্তি তাকে অমর ভেবে বসে; কিন্তু সময়ের প্রবাহে সবই সরে যায়, আর তার জায়গায় নতুন মুখ, নতুন শহর, নতুন দাবি, নতুন ভুল, নতুন আশা এসে দাঁড়ায়। আল্লাহ আমাদের জানিয়ে দেন, এই পালাবদল কাকতাল নয়; এটি তাঁর কুদরতের ধারাবাহিক প্রকাশ। মানুষ ভাবে সে স্থায়ী, অথচ সে নিজেই প্রজন্মের ভিড়ে একটি ক্ষণ; তার ইতিহাসও আল্লাহর হাতে লেখা একটি ক্ষুদ্র পঙ্ক্তি মাত্র।
এই আয়াত হৃদয়ের অহংকার ভেঙে দেয় এবং একই সঙ্গে দায়িত্বের আলো জ্বালায়। যদি তোমার আগে বহু সম্প্রদায় এসে থাকে, তবে তোমার পরেও আসবে; যদি তাদের জৌলুস শেষ হয়ে গিয়ে থাকে, তবে তোমার জৌলুসও নিরাপদ নয়। কাজেই সমাজের অবস্থা, পরিবারে নৈতিকতা, জনজীবনের ন্যায্যতা, মানুষের অন্তরের পরিশুদ্ধি—সবকিছু নিয়েই মানুষকে জবাব দিতে হবে। আল্লাহ প্রজন্মের পর প্রজন্ম সৃষ্টি করেন, যেন আমরা বুঝি: প্রতিটি নতুন উম্মত আসলে নতুন পরীক্ষা, নতুন আমানত, নতুন সম্ভাবনা। এখানে ভয় আছে, কারণ ক্ষমতা-ধন-সভ্যতা কিছুই চিরস্থায়ী নয়; আর আশা আছে, কারণ যে রব এক প্রজন্মের পরে আরেক প্রজন্মকে আনে, তিনি তাওবা করা হৃদয়কেও নতুন করে তুলতে সক্ষম।
সূরা আল-মুমিনুনের এই প্রবাহে সৃষ্টি, নবীদের সংগ্রাম, উম্মতসমূহের উত্থান-পতন—সবকিছু মিলিয়ে একটাই ডাক শোনা যায়: মানুষ! নিজের সীমা চিনে নাও, তারপর তোমার রবের দিকে ফিরে যাও। তোমার জীবনের উত্তরাধিকার হবে না তোমার ইমারত, না তোমার পরিচিতি, না তোমার কণ্ঠস্বর; উত্তরাধিকার হবে তোমার ঈমান, তোমার আমল, তোমার অন্তরের সত্যতা। আল্লাহ যখন বহু সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছেন, তখন তিনি আমাদের শেখাচ্ছেন—কারও জন্যই স্থায়িত্বের প্রতিশ্রুতি নেই, কিন্তু তাঁর রহমতের দরজা খোলা আছে। তাই এই আয়াত সামনে এনে আমাদের হৃদয় যেন বলে: হে আল্লাহ, আমাদেরকে এমন প্রজন্মের অন্তর্ভুক্ত করো, যারা তোমাকে ভুলে না, যারা ইতিহাসে হারিয়ে গিয়ে তোমার স্মরণ থেকে হারিয়ে যায় না, বরং তোমার পথে দৃঢ় হয়ে পরিণতির দিনে সফল হয়।
তাই এই আয়াত আমাদের শুধু ইতিহাস শেখায় না, হৃদয়ের অহংকার ভাঙতেও শেখায়। আমরা যে দেহে চলি, যে সমাজে বাঁচি, যে প্রজন্মের উপর ভর করে আছি—সবই আল্লাহর সৃষ্টি-ধারা। তিনি নতুন সম্প্রদায় সৃষ্টি করেন, পুরোনোদের সরিয়ে দেন, এক জাতির পরে আরেক জাতির আগমন ঘটান, যাতে মানুষ বুঝে ফেলে: স্থায়িত্ব কেবল তাঁরই, মালিকানা কেবল তাঁরই, এবং ফিরতে হবে একদিন তাঁরই কাছে। এই বোধ যার অন্তরে জেগে ওঠে, সে ক্ষমতার নেশায় অন্ধ হয় না; সে নিজেকে বড় বলে দাবি করে না; সে ভাঙা হৃদয়ে বলে, হে আল্লাহ, আমাকে এমন বানিও না, যেন আমি মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাই, আর তোমার সামনে দাঁড়ানোর কথা ভুলে যাই।
সুতরাং এই আয়াতের নীরবতাই বড় শিক্ষা: ইতিহাস এগোয়, প্রজন্ম বদলায়, কিন্তু আল্লাহর হুকুম বদলায় না। মানুষ আসে, যায়; সম্প্রদায় গড়ে, ভাঙে; তবু আসমান ও জমিনের রব একটাই থাকেন। যে এ সত্যে আত্মসমর্পণ করে, তার ভেতর এক গভীর প্রশান্তি নেমে আসে—কারণ সে বুঝে যায়, পৃথিবীর পরিবর্তনই তার চূড়ান্ত পরিচয় নয়; তার আসল পরিচয়, সে একজন বান্দা, এবং বান্দার মর্যাদা এখানেই যে সে নিজের ক্ষণস্থায়িত্ব চিনে নিয়ে চিরস্থায়ী রবের দিকে ফিরে যায়।