তোমাদের সামনে কি আমার আয়াতসমূহ পঠিত হত না? তোমরা তো সেগুলোকে মিথ্যা বলতে। এই বাক্যটি কেবল এক প্রশ্ন নয়; এটি কিয়ামতের ময়দানে এক ভয়াবহ আত্মসমর্পণবিহীন নীরবতার মধ্যে নিক্ষিপ্ত সত্যের বজ্রধ্বনি। আল্লাহ তাআলা এখানে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, সত্য মানুষের সামনে অনুপস্থিত ছিল না, আড়ালে ছিল না, অস্পষ্ট ছিল না। বারবার তা তিলাওয়াত হয়েছে, বারবার তা আহ্বান করেছে, বারবার হৃদয়কে জাগাতে চেয়েছে। তবু যখন মানুষ অহংকারকে বেছে নেয়, প্রবৃত্তিকে বেছে নেয়, সত্যকে নয়—তখন অস্বীকার শুধু একটি মতপার্থক্য থাকে না; তা হয়ে ওঠে আত্মার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য, নিজেরই নাজাতের পথ রুদ্ধ করার এক নীরব সিদ্ধান্ত।
সূরা আল-মুমিনুনের এ অংশে মুমিনের সফলতার বিপরীতে কাফিরদের পরিণতি স্পষ্ট করে তোলা হচ্ছে, যেন মানুষ বুঝে নেয়—আল্লাহর আয়াতকে মিথ্যা বলা কোনো ছোট ভুল নয়, বরং হৃদয়ের এমন রোগ যা অন্তরকে ধীরে ধীরে সত্যের আলো থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এই সূরায় মুমিনের বৈশিষ্ট্য, মানবসৃষ্টির বিস্ময়, নবীদের সংগ্রাম এবং আখিরাতের চূড়ান্ত ফলাফল একে একে সামনে আসে। সেই বিস্তৃত ধারার ভেতরেই এই আয়াত একটি কঠিন আয়না হয়ে দাঁড়ায়: যে ব্যক্তি জীবনের পথে আল্লাহর নসিহত শুনেও তা উপেক্ষা করে, যে ব্যক্তি প্রতিবার আলোর দরজা সামনে পেয়েও অন্ধকারের সঙ্গে সন্ধি করে, তার সামনে একদিন জবাবদিহির মুহূর্ত আসবেই। তখন অস্বীকারের জন্য আর কোনো অজুহাত থাকে না, কেবল লজ্জা থাকে, আফসোস থাকে, আর সত্যকে ছোট করে দেখার ক্ষতিটাই সামনে এসে দাঁড়ায়।
এ আয়াত আমাদেরও চুপচাপ জিজ্ঞেস করে—আমরাও কি এমন কোনো মুহূর্তে আল্লাহর বাণী শুনে সেটিকে কেবল তথ্য হিসেবে পার করেছি, নাকি অন্তর দিয়ে তা গ্রহণ করেছি? কুরআনের আহ্বান সব যুগেই একই: মানুষকে আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে বের করে সিজদার দিকে ফেরানো, গাফলত থেকে জাগিয়ে তোলা, এবং সফলতার আসল মানে শেখানো। সফলতা বাহ্যিক ক্ষমতা নয়, ভোগ নয়, আত্মগরিমাও নয়; সফলতা হলো সত্যকে সত্য বলে মানা, এবং হৃদয়কে তার সামনে নত করা। যে অন্তর আয়াত শুনেও অস্বীকারে স্থির থাকে, সে আসলে নিজেরই পরকালকে সংকুচিত করে ফেলে। আর যে অন্তর কেঁপে উঠে আল্লাহর কথার কাছে ফিরে আসে, তার জন্যই খুলে যায় মুক্তির পথ, রহমতের পথ, এবং চিরস্থায়ী সফলতার পথ।
কিয়ামতের সেই প্রশ্নে যেন মানুষের ভেতরের সব অজুহাত নিঃশেষ হয়ে যায়। আল্লাহর আয়াত তো তখনও দূরে ছিল না, আকাশের অন্তরালে লুকোনো ছিল না, মানুষের হৃদয়ের জন্য অচেনাও ছিল না; বরং বারবার তিলাওয়াত হয়ে এসেছে, শুনিয়েছে, ডাক দিয়েছে, জাগাতে চেয়েছে। কিন্তু যে হৃদয় শুনেও নরম হয়নি, যে আত্মা সত্যকে চিনেও তাকে ঠেলে সরিয়েছে, তার জন্য অস্বীকার আর শুধু এক বৌদ্ধিক অবস্থান থাকে না—তা হয়ে ওঠে অবাধ্যতার অভ্যাস, অহংকারের জমাট অন্ধকার। এই অন্ধকারে মানুষ নিজেরই ক্ষতি করে; কারণ সে সত্যকে অমান্য করে আসলে আল্লাহকে নয়, নিজের মুক্তির দরজাকেই অস্বীকার করে।
আল্লাহর আয়াত মানুষের সামনে উপস্থিত ছিল—পাঠ হচ্ছিল, শোনা যাচ্ছিল, অন্তরকে ডাকছিল। তবু কেউ কেউ তা মিথ্যা বলেছিল। এই স্বীকারোক্তি কেবল অতীতের কোনো জাতির গল্প নয়; এটি প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য আয়নার মতো। কারণ সত্য যখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন তাকে প্রত্যাখ্যান করা আর নিরীহ ভুল থাকে না—তা হয়ে যায় অন্তরের সেই সিদ্ধান্ত, যেখানে মানুষ আল্লাহর ডাকের চেয়ে নিজের অহংকারকে বড় করে দেখে। কিয়ামতের দিন এই প্রশ্ন তাই একেবারে নগ্ন করে দেবে মানুষের ভেতরের অবস্থা: সত্য কি তোমার কাছে আসেনি? এসেছিল; বারবার এসেছিল। তবে তুমি কি তার সামনে নত হয়েছিলে, নাকি তাকে অস্বীকারের অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিলে?
মুমিনের জীবন এই প্রশ্নের বিপরীত স্রোতে বয়ে চলে। সে জানে, আয়াত কেবল তিলাওয়াতের শব্দ নয়; তা আত্মাকে জাগানোর, সমাজকে শোধরানোর, মানুষকে স্রষ্টার দিকে ফিরিয়ে আনার আহ্বান। আর যে সমাজ আল্লাহর আয়াতকে কানে তোলে, কিন্তু হৃদয়ে তোলে না, সে ধীরে ধীরে নিজের ভেতরেই শূন্য হয়ে যায়। সেখানে সত্যের চেয়ে অভ্যাস প্রিয় হয়ে ওঠে, হেদায়েতের চেয়ে ভোগবিলাস প্রিয় হয়ে ওঠে, এবং শেষে মানুষ নিজেরই হাতে নিজের ওপর জবাবদিহির দরজা বন্ধ করে ফেলে। এই আয়াত আমাদের থামিয়ে দেয়, চিন্তা করতে বাধ্য করে—আমি কি সত্যকে শুনছি, নাকি কেবল শুনে যাচ্ছি? আমি কি আল্লাহর বাণীর কাছে নত হচ্ছি, নাকি নীরবে তাকে পাশ কাটিয়ে চলেছি?
তাই এ আয়াত আমাদের হৃদয়ে ভয় জাগায়, আবার আশা-ও জাগায়। ভয় এই জন্য যে, আয়াত অস্বীকারের পরিণতি ভয়াবহ; আর আশা এই জন্য যে, আজও ফিরে আসার দরজা খোলা আছে। যে হৃদয় এখনো কাঁপে, যে চোখ এখনো অশ্রুপাত করতে পারে, যে বিবেক এখনো আল্লাহর কথা শুনে অস্থির হয়—তার জন্য নাজাতের পথ মৃত নয়। কিয়ামতের সেদিন সফলতা তাদেরই, যারা আয়াতের সামনে আত্মসমর্পণ করেছিল, নিজেদের খেয়াল-খুশির সামনে নয়। সুতরাং এই মুহূর্তে অন্তরকে জিজ্ঞেস করতে হয়: আমার ভেতরে কি সত্যের প্রতি বিনয় আছে, নাকি অস্বীকারের পুরোনো রোগ? কারণ আল্লাহর আয়াতকে যারা মিথ্যা বলেছিল, তাদের জন্য অবশেষে কেবল জবাব ছিল; আর যারা সত্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করেছিল, তাদের জন্য ছিল অনন্ত সাফল্যের দরজা।
কিয়ামতের সেই প্রশ্নে মানুষের সব অজুহাত ঝরে পড়ে যাবে। কারণ আল্লাহর আয়াত সামনে ছিল, তিলাওয়াত ছিল, বুঝবার সুযোগ ছিল, ফিরে আসবার ডাক ছিল; কিন্তু হৃদয় যদি অহংকারে কাঠ হয়ে যায়, তবে সত্যের আলোও সেখানে দাগ কাটে না। তখন আফসোস শুধু মনে জাগে না, সে আফসোস নিজেই এক শাস্তি হয়ে দাঁড়ায়—যে কানে কুরআন শোনা হয়েছিল, সে কান কেন নরম হলো না; যে চোখ নিদর্শন দেখেছিল, সে চোখ কেন সিজদায় ভিজল না; যে হৃদয়কে বারবার ডাক দেওয়া হয়েছিল, সে হৃদয় কেন জবাব দিল না।
এই আয়াত আমাদের বুকের ভেতর এক নীরব কাঁপন জাগায়। আমরা কি এমন নই, যারা কখনো সত্য শুনেও তা পিছিয়ে দিই, সত্যের দাবি বুঝেও সময়ের অজুহাতে তাকে ঠেলে সরাই? আল্লাহর আয়াত মিথ্যা বলার অর্থ কেবল ভাষায় অস্বীকার নয়; কখনো তা হয় অবহেলা, কখনো তা হয় গাফিলতি, কখনো তা হয় নিজের নফসকে সত্যের চেয়েও বড় করে তোলা। আর এভাবেই মানুষ ধীরে ধীরে এমন এক দূরত্বে পৌঁছে যায়, যেখানে তওবার দরজাও চোখের সামনে থাকে, কিন্তু হৃদয় আর সেই দরজার দিকে হাঁটতে পারে না।
তাই আজকের এই বাক্য আমাদের জন্য শুধু সতর্কতা নয়, ফিরে আসার দাওয়াত। যে রব আমাদের সামনে তাঁর আয়াত পাঠিয়েছেন, তিনিই আবার রহমতের দরজা খোলা রেখেছেন—যদি আমরা অনুতাপে নত হই, যদি সত্যের সামনে নিজেকে ভেঙে দিই, যদি আর দেরি না করি। আখিরাতের সফলতা তাদেরই, যারা আয়াতকে অস্বীকার করেনি, বরং আয়াতের সামনে নিজেদের অস্বীকার করেছে; যারা অহংকারকে কবর দিয়েছে, আর ঈমানকে জীবিত রেখেছে। হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরকে এমন করো, যা তোমার বাণী শুনে কঠিন হয় না; বরং ভয়ে, ভালোবাসায়, ও প্রত্যাবর্তনের তৃষ্ণায় কেঁপে ওঠে।