সূরা মারইয়ামের এই আয়াতে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, আর আমাদের হৃদয়ের ভেতরেও এক গভীর স্থিরতা নামিয়ে দিচ্ছেন: “সুতরাং তাদের ব্যাপারে আপনি তাড়াহুড়া করবেন না। আমি তো তাদের গণনা পূর্ণ করছি মাত্র।” মানুষের চোখে অনেক সময় অবাধ্যতা, অহংকার, জুলুম বা সত্য অস্বীকারের জবাব দ্রুত আসা উচিত বলে মনে হয়। কিন্তু আল্লাহর শাসন তেমন নয়। তিনি কাউকে আকস্মিকভাবে ছেড়ে দেন না, আবার তড়িঘড়ি করে পাকড়াওও করেন না। তিনি প্রতিটি প্রাণকে, প্রতিটি নিঃশ্বাসকে, প্রতিটি কর্মকে তাঁর নির্ধারিত মাপে গুনে চলেন—যেন দুনিয়ার উপর নেমে আসে এক নীরব কিন্তু অমোঘ হিসাবের ছায়া।

এই আয়াতের সরাসরি সুর হলো আখিরাতের দিকে তাকিয়ে ধৈর্য ধরা। সূরা মারইয়াম জুড়ে আমরা যাকারিয়ার দোয়া, মারইয়ামের পবিত্রতা, ঈসা আলাইহিস সালামের অলৌকিক জন্ম, নবীদের স্মৃতি, আর রহমতের অশ্রু মিশ্রিত ইতিহাস দেখি। সেই ধারাবাহিকতার ভেতর এই বাক্যটি যেন বলে, নবীদের পথ কখনো ত্বরিত ফলের পথ নয়; এটি প্রতীক্ষা, বিশ্বাস, এবং আল্লাহর প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসার পথ। সত্যকে অস্বীকারকারীরা হয়তো আজও দম্ভে দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু তাদের জন্যও আল্লাহর কাছে এক গণনা চলতে থাকে—একটি পূর্ণতা, যা মানুষের অজান্তে নীরবে অগ্রসর হয়।

সাবাবুন নুযুলের নির্দিষ্ট কোনো ঘটনা এখানে নিশ্চিতভাবে স্থির নয়; তবে আয়াতের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট স্পষ্টভাবে মক্কি সত্যকে ধারণ করে—মুশরিকদের অস্বীকার, নবীদের প্রতি অবহেলা, এবং আখিরাতকে দুর্বল করে দেখার প্রবণতার মধ্যে এই বাণী নাযিল হয়ে হৃদয়কে সংশোধন করে। এটি কেবল শাস্তির বিলম্বের কথা নয়; এটি আল্লাহর ন্যায়বিচারের পরিমাপের কথা। মানুষের তাড়াহুড়ার বিপরীতে আল্লাহর “গণনা” পূর্ণতার দিকে যায়, যেখানে কোনো কণা বাদ পড়ে না, কোনো কান্না হারিয়ে যায় না, কোনো জুলুম অনির্ণীত থাকে না। তাই এই আয়াত মুমিনকে শেখায়—দেখে বিচলিত হয়ো না, অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত দিয়ো না; আল্লাহর হিসাব চলছে, আর তাঁর হিসাবেই শেষ কথা।

মানুষের অন্তর খুব তাড়াতাড়ি চায়; অবিচার দেখলে তাৎক্ষণিক বিচার, সত্যকে অপমানিত হতে দেখলে তৎক্ষণাৎ প্রতিফল, জুলুমকে দেখে সঙ্গে সঙ্গেই পতন—এই ব্যাকুলতা আমাদের সহজাত। কিন্তু আল্লাহর কিতাব আমাদের বারবার শিখিয়ে দেয়, সবকিছু মানুষের তাড়নার মাপে চলে না। “সুতরাং তাদের ব্যাপারে আপনি তাড়াহুড়া করবেন না।” এই বাক্যে শুধু অবিশ্বাসীদের জন্য নয়, আমাদের নিজেদের হৃদয়ের জন্যও এক শান্ত, কঠোর সতর্কতা আছে। যেন বলা হচ্ছে—তোমার রাগ দিয়ে কসম মাপো না, তোমার অস্থিরতা দিয়ে আল্লাহর হিকমতকে বিচার কোরো না। তিনি যখন ‘গণনা’ করেন, তা কেবল সংখ্যা গোনা নয়; তা হলো প্রতিটি সুযোগ, প্রতিটি অবকাশ, প্রতিটি অবাধ্যতার নীরব দলিল জমা করা। দুনিয়ার উপরের স্তরে তারা যেন দণ্ডমুক্ত, কিন্তু আসমানের দরবারে তাদের প্রতিটি নিঃশ্বাসও হিসাবের বাইরে নয়।

সূরা মারইয়ামের সুরই এমন—যাকারিয়ার দোয়ার কান্না, মারইয়ামের নির্জন পবিত্রতা, ঈসা আলাইহিস সালামের নিদর্শন, নবীদের উত্তরাধিকার—সবকিছুই যেন আমাদের শিখিয়ে যায় যে আল্লাহর রহমত ধীরে আসে, কিন্তু তা ভুল করে আসে না; আর তাঁর ন্যায়বিচারও দেরি করতে পারে, কিন্তু হারিয়ে যায় না। এই আয়াত তাই মুমিনের বুকের উপর এক অদৃশ্য হাত রেখে বলে: শান্ত হও, অপেক্ষা করো, ভেঙে পড়ো না। কারণ আখিরাতের হিসাব দুনিয়ার চোখে দেখা যায় না। কত মানুষ আজ শক্তির আসনে বসে আছে, আর কত সত্যনিষ্ঠ হৃদয় আজ নিঃশব্দে কষ্ট সহ্য করছে—কিন্তু “আমি তো তাদের গণনা পূর্ণ করছি মাত্র” এই ঘোষণার সামনে দুনিয়ার সব দৃশ্য সাময়িক। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর গণনাই সত্য, তাঁর সময়ই সঠিক, আর তাঁর আদালতেই সব মুখোশ খুলে যাবে।
এই আয়াতের ভেতরে এক আশ্চর্য শীতলতা আছে—যেন আল্লাহ তাঁর নবীকে, আর তাঁর মাধ্যমে আমাদেরও, বুকের ব্যাকুলতা থেকে ফিরিয়ে বলছেন: ধৈর্য হারিও না, তাড়াহুড়া করো না। যারা সত্যকে অস্বীকার করে, জুলুমকে অভ্যাস বানায়, কৃতজ্ঞতার বদলে অহংকারকে বেছে নেয়—তাদের ব্যাপারে আল্লাহ উদাসীন নন। তিনি তাদের প্রতিটি দিন, প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি পদক্ষেপ গুনে চলেছেন। মানুষের চোখে এটা অনেক সময় দেরি মনে হয়; কিন্তু আল্লাহর কাছে দেরি নয়, এটা ন্যায়বিচারের নিখুঁত মাপ। সূরা মারইয়ামের ধারাবাহিক স্মৃতিগুলো—যাকারিয়ার মিনতি, মারইয়ামের পবিত্র একাকিত্ব, ঈসা আলাইহিস সালামের নিদর্শন—সবই আমাদের শেখায় যে আল্লাহর রহমত যেমন সত্য, তাঁর হিসাবও তেমনি সত্য।

মানুষ প্রায়ই ভাবে, যারা সীমালঙ্ঘন করে তারা কেন এখনই ভেঙে পড়ে না? কেন তাদের প্রাসাদ এখনই ধুলো হয় না? কিন্তু এই আয়াত আমাদের অন্তরের চোখ খুলে দেয়: দৃশ্যমান বিলম্ব আর ছাড় দেওয়া এক জিনিস নয়। আল্লাহর নীরব গণনা চলতে থাকে, আর বান্দা নিজের অজান্তেই তাঁর ফয়সালার দিকে এগোয়। তাই মুমিনের হৃদয় একদিকে কাঁপে, অন্যদিকে শান্ত হয়—কাঁপে এই ভেবে যে জুলুমেরও জবাব আছে, শান্ত হয় এই ভেবে যে হিসাবের মালিক মানুষ নয়, আল্লাহ। নিজের জীবনের দিকেও এই আয়াত আঙুল তোলে: আমরা কি সত্যিই নিজেদের হিসাব নিচ্ছি, নাকি শুধু অন্যের পতন দেখার জন্য অধীর হয়ে আছি? যে হৃদয় নিজের অবস্থা না দেখে অন্যের শাস্তি দেখতে চায়, সে হৃদয় এখনো পূর্ণ জাগেনি।

শেষ পর্যন্ত এটাই আখিরাতের শিক্ষা: দুনিয়া কোনো চূড়ান্ত বিচারালয় নয়, এ কেবল চলমান গণনার মাঠ। এখানে যা লিপিবদ্ধ হচ্ছে, সেখানে তা প্রকাশ পাবে; এখানে যা উপেক্ষিত মনে হচ্ছে, সেখানে তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তাই মুমিনের জীবনে ভয় থাকবে—পাপের ভয়, হিসাবের ভয়; আর আশা থাকবে—তাওবার দরজা, রহমতের বিস্তার, ক্ষমার সমুদ্রের আশা। সূরা মারইয়াম আমাদেরকে নবীদের স্মৃতির ভেতর দিয়ে এই মর্মে পৌঁছে দেয় যে, আল্লাহর দিকে ফেরা মানেই সত্যের দিকে ফেরা, নিজের ভেতরের জবাবদিহির দিকে ফেরা। তাঁর গণনা ভুল করে না, শেষ বিচারে কোনো অণুও হারায় না। অতএব ধৈর্য ধরো, হৃদয়কে স্থির করো, এবং জেনে রাখো—মানুষের তাড়াহুড়া নয়, আল্লাহর পূর্ণ হিসাবই শেষ সত্য।

মানুষের তাড়াহুড়ো আসলে অজ্ঞতারই আরেক নাম। আমরা দেখি, আর সঙ্গে সঙ্গে বিচার চাই; আমরা কাঁপি, আর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিশোধ চাই। কিন্তু এই আয়াত শেখায়—আল্লাহর দরবারে কোনো কিছু হারিয়ে যায় না, কোনো জুলুম অসম্পূর্ণ থাকে না, কোনো অবাধ্যতা অগণিত থাকে না। তিনি তাদের গণনা পূর্ণ করছেন; অর্থাৎ সময়ের বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি অবহেলা, প্রতিটি অহংকার—সবই এক অদৃশ্য খাতায় লিখিত হচ্ছে। দুনিয়ার নীরবতা অনেক সময় আমাদের ভুল বোঝায়, কিন্তু আকাশের নিচে আল্লাহর ন্যায়ের নীরবতা কখনো শূন্য নয়।

তাই মুমিনের কাজ হুকুম দেয়া নয়, ধৈর্য ধরা; রাগে অন্ধ হওয়া নয়, হৃদয়কে জাগ্রত রাখা। নবীদের স্মৃতিময় এই সূরায় আমরা শিখি, আল্লাহর প্রিয় বান্দারা প্রতীক্ষার মধ্যেও ভেঙে পড়েননি, কারণ তারা জানতেন—ফয়সালার মালিক আল্লাহ, আর হিসাবের দিনটি অনিবার্য। আজ যদি সত্যের পথে হাঁটতে গিয়ে তোমার বুক ভারী হয়, যদি জালিমের ঔদ্ধত্য দেখে তোমার অন্তর ব্যথিত হয়, তবে এই আয়াতকে হৃদয়ের কাছে জড়িয়ে ধরো। আল্লাহ দেরি করেন না; তিনি শুধু গণনা পূর্ণ করেন। আর যখন সেই পূর্ণতা এসে যায়, তখন এক মুহূর্তের অবকাশও মানুষের হাতের মুঠো থেকে ফসকে যায়।

সুতরাং নিজের জন্যও তাড়াহুড়া কোরো না, অন্যের জন্যও নয়। নিজের গুনাহের ক্ষমা চাও, নিজের অন্তরকে নরম করো, নিজের আমলকে সত্যের সামনে দাঁড় করাও। কারণ আজ যে চোখে দুনিয়ার হিসাব দেখি, কাল সেই চোখই আখিরাতের নির্ভুল মাপের সামনে কেঁপে উঠবে। সূরা মারইয়ামের এই শেষ সুর যেন হৃদয়ে রেখে যায় এক নির্মল ভয় ও আশার মিশ্র দীপ্তি: আল্লাহ আছেন, তাঁর হিসাব চলছে, আর আমরা প্রত্যেকেই সেই গণনার মধ্যেই আছি। অতএব ফিরে এসো, যতক্ষণ ফিরে আসার দরজা খোলা আছে।