সূরা মারইয়ামের এই আয়াতটি হৃদয়ের ওপর এক অনিবার্য ঘন্টাধ্বনি। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করছেন, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে তথায় পৌছবে না; এটি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে স্থির, অবশ্যম্ভাবী ফায়সালা। কুরআনের ভাষায় এখানে যে “الورود” বা পৌঁছার কথা বলা হয়েছে, তা আখিরাতের সেই চূড়ান্ত মুহূর্তকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যখন কোনো প্রাণ আর নিজের শক্তিতে নিজেকে বাঁচাতে পারবে না। দুনিয়ার সব পালানো, সব অজুহাত, সব আত্মপ্রবঞ্চনা সেখানে থেমে যাবে। মানুষের সামনে তখন শুধু এক প্রশ্ন—সে আল্লাহর রহমতের ছায়ায় আছে কি না।
মারইয়াম, ঈসা ও যাকারিয়ার স্মৃতিতে ভরা এই সূরায় বারবার দেখা যায়—আল্লাহ কেমন করে দুর্বলতার ভেতর থেকেও নবীদের সম্মান, দোয়ার জবাব, এবং রহমতের দরজা খুলে দেন। সেই ধারাতেই এই আয়াত এসে দাঁড়ায়, যেন নরম আলোয় নয়, বরং ভয় ও আশা—দুইয়ের কাঁপন জাগিয়ে তোলে। কারণ আখিরাতের ফায়সালা কেবল শাস্তির ঘোষণা নয়; তা হলো সত্যের পূর্ণ উন্মোচন। কে আল্লাহকে স্মরণ করেছে, কে তাঁর সামনে নত হয়েছে, কে গুনাহের অন্ধকারে থেকেও ফিরে এসেছে—সবকিছু তখন প্রকাশ পাবে।
এ আয়াতের ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠিত শানে নুযূল বর্ণিত নয়; তাই এটিকে কুরআনের বৃহত্তর আখিরাত-চেতনার আলোয় বুঝতে হয়। এখানে কোনো মানুষই আল্লাহর নির্ধারিত সীমার বাইরে নয়—না নবীর নিকটাত্মীয়, না ক্ষমতাবান, না অসহায়। সূরার সামগ্রিক সুরও তাই: মানুষের ভঙ্গুরতা, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, আর শেষ আশ্রয় হিসেবে তাঁর রহমত। এ আয়াত আমাদের শেখায়, নাজাতের ভিত্তি নিজের দাবি নয়, নিজের কাজের গর্বও নয়; বরং অন্তরের ঈমান, তাওবা, এবং সেই রবের প্রতি নির্ভরতা—যাঁর ফায়সালা যেমন অনিবার্য, তেমনি তাঁর দয়া তাঁর বান্দাদের জন্য অশেষ।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, মানুষ আসলে কতটা নগ্ন, কতটা অনাবৃত, কতটা নির্ভরশীল। যাকে দুনিয়ার ভিড়ে এত শক্তিমান মনে হয়, তাকেও একদিন সেই নির্ধারিত সীমার সামনে আসতেই হবে—যে সীমা সে বানায়নি, ভাঙতেও পারবে না। আল্লাহ তাআলা ‘ورود’—পৌঁছানোর কথা বলেছেন; অর্থাৎ আখিরাতের বাস্তবতা কোনো ধারণা নয়, কোনো কল্পনা নয়, বরং এমন এক সত্য, যার দিকে প্রত্যেক প্রাণকে টেনে নেওয়া হচ্ছে। এখানে পালানোর দরজা নেই, কারণ এটাই রবের চূড়ান্ত ফায়সালা। এই এক বাক্য যেন মানুষের সব অহংকারকে নিঃশব্দ করে দেয়, সব দাবি, সব নিরাপত্তাবোধ, সব আত্মভোলাকে এক মুহূর্তে কাঁপিয়ে তোলে।
আসলে মানুষ বাঁচে তখনই, যখন সে মেনে নেয় যে তার শেষ আশ্রয় তার আমল নয়, তার বংশ নয়, তার নাম নয়; একমাত্র আল্লাহর দয়া। এ আয়াত আমাদের সেই ভাঙা দরবারে দাঁড় করায়, যেখানে নিজের উপর ভরসা করার সব সোপান ভেঙে যায়, আর দোয়ার সেজদা ছাড়া আর কোনো ভাষা থাকে না। তাই এই অনিবার্য ফায়সালার স্মরণ হৃদয়কে নিষ্ঠুর করে না, বরং নরম করে; ভীত করে না শুধু, জাগিয়ে তোলে। যে আজই নিজের অন্তরকে আল্লাহর সামনে নত করতে শিখল, তার জন্য সেই চূড়ান্ত পৌঁছানো ভয় নয়—বরং রহমতের দিকে এগোনোর এক প্রস্তুতি।
এই আয়াত মানুষের অহংকারের গায়ে এক অদৃশ্য হাত রেখে নীরবে বলে—তুমি কতটা দৌড়ালে, কতটা লুকালে, কতটা ব্যস্ত হলে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর নির্ধারিত সীমা এড়িয়ে যেতে পারবে না। তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে তথায় পৌঁছাবে না—এই বাক্য দুনিয়ার মায়াকে ভেঙে দেয়, হৃদয়ের ভেতর জমে থাকা আত্মভোলাভাবকে কাঁপিয়ে তোলে। মারইয়াম, ঈসা ও যাকারিয়ার স্মৃতিবাহী এই সূরায় যখন এমন ঘোষণা আসে, তখন বুঝতে হয়: আল্লাহর দরবারে মানুষের আসল পরিচয় তার পরিচয়পত্র নয়, তার আমল; তার বংশ নয়, তার বিনয়; তার দাবি নয়, তার আত্মসমর্পণ।
কিন্তু এই ভয়াবহ সত্যের মাঝেও কুরআন আমাদেরকে নিরাশ করতে চায় না। কারণ যে ফায়সালা অনিবার্য, সেই ফায়সালার মালিকই তো আর-রহমান। তাই মুমিনের কাঁপন আতঙ্কের কাঁপন নয়, জাগরণের কাঁপন; সে নিজের নফসকে জিজ্ঞেস করে—আমি কি এমনভাবে বেঁচে আছি, যেন একদিন আমাকে অবশ্যই সেই চূড়ান্ত উপস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে? সমাজ যখন গাফিলির উষ্ণ চাদরে ঘুমিয়ে থাকে, যখন মানুষ গুনাহকে হালকা করে দেখে, তখন এই আয়াত এসে অন্তরে শীতল আগুন জ্বেলে দেয়—সব হিসাব একদিন খোলা হবে, সব মুখোশ একদিন খুলে যাবে, আর যা কিছু অন্তরে লুকানো ছিল তা প্রকাশের আলোয় দাঁড়িয়ে যাবে।
তবু ঈমানের মর্ম এইখানেই—যে দরজায় সবাই পৌঁছাবে, সেখানে কারও আশ্রয় হবে কেবল আল্লাহর রহমতে। মানুষের কাজ নিজেকে প্রস্তুত করা, নিজের ভেতরের অন্ধকারকে চিনে নেওয়া, তাওবা দিয়ে হৃদয়কে ধুয়ে নেওয়া, আর প্রতিদিনের জীবনে আখিরাতের জন্য বাঁচতে শেখা। এই আয়াত আমাদেরকে মৃত্যুভয় নয়, বরং আল্লাহমুখী হতে শেখায়; কারণ যিনি ফায়সালা করেন, তিনিই তো ক্ষমা করতেও পারেন। সুতরাং চলুন, সেই অনিবার্য মুহূর্তকে স্মরণে রেখে আজকের পথকে পবিত্র করি—যেন আমরা যখন পৌঁছাই, তখন আমাদের ওপর দয়া নেমে আসে, আর হৃদয় বলে: হে রব, আমি দুর্বল ছিলাম, কিন্তু আপনার রহমতের দিকে ফিরেছি।
তাই এই আয়াত ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে এক অদ্ভুত আশাও এনে দেয়। কারণ যিনি অনিবার্যতা ঘোষণা করেন, তিনিই তো রহমতেরও মালিক। সূরা মারইয়ামের ভেতর দিয়ে যখন আমরা যাকারিয়ার দোয়া, মারইয়ামের পবিত্রতা, ঈসা আলাইহিস সালামের নিদর্শন, নবীদের সম্মানের স্মৃতি দেখি, তখন আখিরাত আর কেবল শাস্তির ভীতিকর নাম থাকে না; তা হয়ে ওঠে সত্যের মুখোমুখি হওয়ার স্থান, যেখানে আল্লাহর দয়ার দিকে ফেরার সুযোগও মানুষকে আজই দেওয়া হয়েছে। আজ যদি হৃদয় নরম না হয়, কাল যখন সব নড়বড়ে ভরসা ভেঙে পড়বে, তখন এই নরম হওয়ার সময় আর থাকবে না।
অতএব এই আয়াত আমাদের ডাকে—ফেরো, নিজের অন্তরকে দেখে নাও, গুনাহের বোঝা হালকা করার আগে দেরি কোরো না। যারা আল্লাহকে ভুলে ছিল, তাদের জন্য এ এক জাগরণ; যারা আল্লাহকে ভালোবাসে, তাদের জন্য এ এক সংযমী প্রস্তুতি; আর যারা ভেঙে পড়েছে, তাদের জন্য এ এক দরজা—যদি এখনই ফিরে আসে। আখিরাতের অনিবার্যতা ভয় জাগায়, কিন্তু সেই ভয়ই ঈমানকে জাগিয়ে তোলে; আর জেগে ওঠা ঈমান মানুষকে সিজদায় নামায়, কান্নায় ভেজায়, তাওবার দিকে টানে। শেষ পর্যন্ত বান্দার নিরাপত্তা তার নিজের শক্তিতে নয়, বরং তার রবের রহমতে।