সূরা মারইয়ামের এই আয়াতের মধ্যে এক অদ্ভুত কম্পন আছে: “অতঃপর তাদের মধ্যে যারা জাহান্নামে প্রবেশের অধিক যোগ্য, আমি তাদের বিষয়ে ভালোভাবে জ্ঞাত আছি।” মানুষের চোখ অনেক সময় বাহ্যিক দৃশ্য দেখে, আর হৃদয় খুব দ্রুত রায় দিয়ে ফেলে। কে বেশি শক্ত, কে বেশি ধার্মিক, কে বেশি ভদ্র, কে বেশি নিরাপদ—এই সব হিসাব মানুষ করে। কিন্তু আল্লাহর বিচার এমন নয়; তিনি অন্তরের গোপন নকশা জানেন, গুনাহের ভিতরে লুকানো জেদও জানেন, অবাধ্যতার পেছনের অহংকারও জানেন, আর জানেন কার পথ তাকে শেষ পর্যন্ত জাহান্নামের দিকে টেনে নিচ্ছে। এই আয়াত আমাদের শেখায়, আখিরাতের দরজায় যোগ্যতার মানদণ্ড মানুষের ধারণা নয়, আল্লাহর পূর্ণ জ্ঞান।
সূরা মারইয়ামের প্রবাহে এই বাক্যটি আসে এমন এক প্রসঙ্গে, যেখানে সত্য অস্বীকারকারী, অহংকারী এবং আখিরাতকে তুচ্ছজ্ঞানকারী মানুষের পরিণতি স্মরণ করানো হচ্ছে। এখানে নির্দিষ্ট কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার নির্ভরযোগ্য, নিশ্চিত বর্ণনা প্রতিষ্ঠিত নয়; তাই আয়াতকে তার বৃহত্তর কুরআনিক প্রেক্ষাপটেই বুঝতে হয়। নবীদের স্মৃতি, রহমতের দৌলত, এবং আল্লাহর সামনে মানুষের চূড়ান্ত দাঁড়ানোর দৃশ্য—এসবের মাঝখানে এই সতর্কবাণী যেন অন্তরকে জাগিয়ে তোলে: পাপ কখনও শুধু একটি কাজ থাকে না, তা ধীরে ধীরে চরিত্র হয়ে দাঁড়ায়; আর সেই চরিত্রই যদি তাওবা ছাড়া জমে যায়, তবে মানুষ নিজেই নিজের জন্য আগুনের দিকে পথ প্রশস্ত করে।
এই আয়াত ভয় জাগায়, কিন্তু তা নিষ্ঠুরতার ভয় নয়; তা এমন ভয়, যা মানুষকে জাগিয়ে তোলে, নরম করে, ফিরিয়ে আনে। কারণ যিনি জানেন কারা জাহান্নামের অধিক যোগ্য, তিনিই আবার তাওবার দরজাও খুলে রেখেছেন। সুতরাং মুমিনের কাজ হলো অন্যকে বিচার করা নয়, নিজের অন্তরকে রক্ষা করা; নিজের গোপন শির্ক, হিংসা, অহংকার, অবহেলা ও গাফলতকে আল্লাহর সামনে পুড়িয়ে ফেলা। সূরা মারইয়াম আমাদের বারবার মনে করায়—রহমত নিকটবর্তী, কিন্তু সেই রহমতের মর্যাদা বোঝে শুধু সে-ই, যে আখিরাতের সত্যকে হৃদয়ে ধারণ করে।
মানুষের চোখে অনেক কিছুই নিরীহ, অনেক কিছুই সামান্য, আবার অনেক কিছুই শক্তি ও মর্যাদার চিহ্ন বলে মনে হয়। কিন্তু সূরা মারইয়ামের এই আয়াত সেই বাহ্যিক মানচিত্রকে চূর্ণ করে দেয়। আল্লাহ ঘোষণা করছেন, অতঃপর তাদের মধ্যে যারা জাহান্নামে প্রবেশের অধিক যোগ্য, তিনি তাদের বিষয়ে ভালোভাবেই জানেন। এ কোনো অনুমান নয়, কোনো সামাজিক রায় নয়, কোনো আবেগী পক্ষপাতও নয়। অন্তরের ভেতরে যে অহংকার লুকিয়ে থাকে, সত্যের সামনে যে জেদ মাথা তোলে, নসিহতের দরজায় যে হৃদয় কঠিন হয়ে যায়—আল্লাহ তা-ও জানেন। মানুষ কেবল পথ দেখে, আর আল্লাহ দেখেন পথের শেষ কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে।
তাই এই আয়াত কেবল অন্যদের সম্পর্কে নয়, আমার নিজের অন্তরের জন্যও। আমি কি এমন পথে হাঁটছি, যা আমাকে আল্লাহর কাছে প্রিয় করে, নাকি এমন অভ্যাসে ডুবে আছি, যা নীরবে আমাকে আগুনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে? মানুষ হয়তো আমাকে দেখে ভদ্র, শান্ত, নিরাপদ বলবে; কিন্তু আল্লাহ তো সেই ভেতরের সত্যটিই জানেন, যা আমি নিজেও অনেক সময় আড়াল করি। কিয়ামতের দিনে আড়াল থাকবে না, অজুহাত থাকবে না, প্রশংসার শব্দেও পর্দা পড়বে না। তখন কেবল তাঁর পূর্ণ জ্ঞান, পূর্ণ ন্যায়, আর মানুষের আমলের নিখুঁত পরিণতি সামনে দাঁড়াবে। এই আয়াত হৃদয়কে কাঁপিয়ে বলে—আজই নিজের জায়গা খুঁজে নাও, কারণ আল্লাহই ভালো জানেন কে জাহান্নামের অধিক যোগ্য, আর কে তাঁর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় পাওয়ার উপযুক্ত।
মানুষের বিচার কতই না অসম্পূর্ণ! আমরা কেবল মুখ দেখি, শব্দ শুনি, কিছু আচরণে মুগ্ধ হই, আবার কিছু দৃশ্য দেখে দ্রুত নিন্দা করি। কিন্তু এই আয়াত অন্তরের গভীর দিকে আলো ফেলে দেয়—জাহান্নামের পথ কার জন্য বেশি উপযোগী, তা মানুষের জল্পনা নয়; তা আল্লাহর অখণ্ড জ্ঞানের বিষয়। তিনি জানেন কোন হৃদয় সত্যকে জেনেও অস্বীকার করেছে, কোন আত্মা বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও অহংকারে শক্ত হয়েছে, কোন গুনাহ কেবল একটি ভুল নয়, বরং একটানা অবাধ্যতার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মানুষের কাছে যা আড়াল, আল্লাহর কাছে তা স্পষ্ট; মানুষের কাছে যা অল্প, আল্লাহর কাছে তা পরিণতির মানচিত্র।
এই জন্যই সূরা মারইয়াম আমাদের শুধু নবীদের করুণ স্মৃতি শোনায় না; সে আমাদের নিজেদেরও আয়নায় দাঁড় করায়। যাকারিয়ার প্রার্থনা, মারইয়ামের পবিত্রতা, ঈসা আলাইহিস সালামের নিদর্শন, ইবরাহিম ও অন্য নবীদের সত্যের ডাক—সবই যেন এক মহান প্রশ্নে এসে জড়ো হয়: আমরা এই সত্যের সামনে কী করলাম? সমাজ যখন সত্যকে উপহাসে, গুনাহকে স্বাভাবিকতায়, আর আখিরাতকে দূরের গল্পে পরিণত করে, তখন এই আয়াত এক শীতল সতর্কবার্তা হয়ে নেমে আসে। কারও বাহ্যিক সাফল্য তাকে নিরাপদ করে না, আর কারও গোপন পাপ তাকে তৎক্ষণাৎ ধ্বংস করে না—কিন্তু আল্লাহর কিতাবে সবকিছু জমা হতে থাকে, এবং একদিন সেই জমারই চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটবে।
তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের অন্তর কাঁপা উচিত, আবার আশা হারানোও উচিত নয়। কারণ যে আল্লাহ জাহান্নামের যোগ্যদেরও ভালো জানেন, তিনিই তাওবার দরজা খুলে রেখেছেন, তিনিই বান্দার ভাঙা হৃদয়কে ফিরিয়ে নিতে পারেন। আজ যদি আমরা নিজের ভেতরের অহংকার, জেদ, গাফলত, এবং গোপন পাপকে চিনতে পারি, তবে সেটাই প্রথম রহমতের দরজায় কড়া নাড়া। আখিরাত দূরের নয়; আত্মা প্রতিদিন তার দিকে ফিরে যাচ্ছে। প্রশ্ন শুধু এই—আমরা কোন দিকে এগোচ্ছি? আল্লাহর জ্ঞানের সামনে লুকানোর কিছু নেই; তাই বুদ্ধিমান সেই, যে আজই নিজের হিসাব শুরু করে, চোখের জলকে তওবার ভাষা বানায়, আর অন্তরের অন্ধকারকে রবের নূরে ধুয়ে নিতে চায়।
সূরা মারইয়ামের নবীদের স্মৃতি আমাদের শেখায়—যাকারিয়ার দোয়া, মারইয়ামের পবিত্রতা, ঈসা আলাইহিস সালামের সত্যবাণী, আর আখিরাতের এই কঠিন স্মরণ—সবই একই সুরে বলে: আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার আগে গাফিলতির ঘুম ভেঙে দাও। আজ যে গুনাহকে ছোট মনে হয়, কাল তা-ই আগুনের দিকে টেনে নেওয়া শিকল হতে পারে। আর আজ যে তওবা অশ্রু হয়ে ঝরে, কাল তা-ই হতে পারে মুক্তির সেতু।
তাই নিজের ব্যাপারে অহংকার নয়, ভয় আর আশা—দুই-ই নিয়ে বাঁচা জরুরি। আমরা জানি না, আমাদের ভিতরে কোন গোপন জেদ আমাদের নষ্ট করছে; কিন্তু আল্লাহ জানেন। আমরা জানি না, কোন অনুতাপ আমাদের উদ্ধার করবে; কিন্তু আল্লাহর রহমত তার চেয়ে বড়। এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে হৃদয় নরম হয়—হে আল্লাহ, আমাদের এমন অন্তর দাও, যা জাহান্নামের পথে দৌড়ায় না; বরং তোমার ক্ষমা, তোমার সন্তুষ্টি, এবং আখিরাতের নিরাপত্তার দিকে ফিরে আসে।