আল্লাহ তাআলা বলেন, তিনি পৃথিবীর ভেতর মানুষের জন্য জীবিকার উপকরণ সৃষ্টি করেছেন, আর এমন সৃষ্টির জন্যও রিজিকের ব্যবস্থা রেখেছেন যাদের রিজিকদাতা মানুষ নয়। এই একটি বাক্যেই যেন মানুষের অহংকার ভেঙে যায়। আমরা কত সহজে ভাবি, আমি কাজ করেছি বলেই রুটি এসেছে, আমি পরিকল্পনা করেছি বলেই জীবন টিকে আছে, আমি দৌড়েছি বলেই প্রাপ্য এসেছে। অথচ এই আয়াত ধীরে ধীরে হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে—তোমার হাতে থাকা উপায়গুলোও তোমার হাতে নয়; উপায়কে উপায় বানিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আল্লাহর। ভূমি, পানি, বীজ, ফল, পশু, শ্রম, সম্পর্ক, বাজার, সময়—সবকিছু মিলেই রিজিকের পথ খুলে যায়, আর সেই পথের প্রত্যেক ধাপেই আছে রবের নিঃশব্দ দয়া।

এখানে ‘তাতে’ বলতে পৃথিবীর বুককে বোঝানো হয়েছে—এই মাটি যেন শুধু পা রাখার জায়গা নয়, বরং জীবনের জন্য গোপন ভাণ্ডার। আল্লাহ মানুষকে বলেননি, তোমরা রিজিক সৃষ্টি করো; বরং বলেছেন, আমি তোমাদের জন্য রিজিকের ব্যবস্থা করেছি। এই ভাষা মানুষের সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে। মানুষ কেবল উপার্জন করে না, আসলে তাকে উপার্জনের অনুমতি দেওয়া হয়; মানুষ কেবল সংগ্রহ করে না, তাকে সংগ্রহের সামর্থ্য দান করা হয়। আর আয়াতের শেষে যাদের রিজিকদাতা মানুষ নয়, তাদের কথা স্মরণ করানো হয়েছে—পরিবারের সবচেয়ে দুর্বল সদস্য, শিশু, অক্ষম, নির্ভরশীল প্রাণী, এমনকি এমন অসংখ্য সৃষ্টি যাদের জীবিকা মানুষের হাতে নয়। এভাবে আল্লাহ তাঁর রুবুবিয়্যাহকে দেখান: তিনি শুধু মানুষের প্রয়োজনই পূরণ করেন না, তিনি সেইসব সৃষ্টিরও অবলম্বন, যাদের জন্য আমাদের শক্তি সম্পূর্ণ অক্ষম।

সূরা আল-হিজর এমন এক সূরা, যেখানে কুরআনের সংরক্ষণ, আদম-ইবলিসের প্রথম ইতিহাস, নবীদের প্রতি সান্ত্বনা, আর অস্বীকারকারীদের পরিণতির কথা পাশাপাশি বয়ে চলে। এই আয়াত সে বৃহত্তর প্রবাহের মধ্যেই আসে—যেন তাওহিদের দৃষ্টি জমিনে স্থির করে দেওয়ার জন্য। যারা নবীকে অস্বীকার করে, তারা মূলত রিজিক ও ক্ষমতার প্রকৃত মালিককে ভুলে যায়; আর যারা বিশ্বাস করে, তারা পৃথিবীর উপকরণ দেখেও দাতাকে দেখে। এই আয়াত তাই শুধু জীবিকার কথা বলে না, হৃদয়কে শিখিয়ে দেয় কীভাবে বাঁচতে হয়: উপকরণকে নিয়ে নয়, উপকরণের মালিককে নিয়ে; সীমাবদ্ধতার ভেতর আতঙ্কিত হয়ে নয়, অসীম ব্যবস্থার প্রতি ভরসা নিয়ে।

পৃথিবীকে আমরা কত অবহেলায় দেখি—ধুলো, দালান, রাস্তা, ভোগ, তাড়াহুড়ো। অথচ এই আয়াত জানিয়ে দেয়, এই মাটির বুকের ভেতরই আল্লাহ এমন এক অদৃশ্য ভাণ্ডার রেখে দিয়েছেন, যেখানে জীবনের প্রতিটি প্রয়োজনের সূক্ষ্ম জবাব আছে। খাদ্য, জল, ফল, পশু, ফসল, কর্ম, উপায়, সুযোগ—সবই যেন তাঁর তৈরি করা নীরব ভাষা, যা বলে: তোমরা একা নও। মানুষ যখন রিজিককে নিজের কৃতিত্ব ভাবতে শুরু করে, তখন তার অন্তর সংকীর্ণ হয়ে যায়; কিন্তু যখন সে বুঝতে পারে রিজিকের উৎস আল্লাহ, তখন হৃদয় প্রশস্ত হয়, অহংকার গলে যায়, আর কৃতজ্ঞতার শ্বাসে জীবন আবার পবিত্র হয়ে ওঠে।

আরও গভীর কথা এইখানে—আল্লাহ শুধু মানুষকেই রিজিক দেননি; তিনি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, এমন কত সৃষ্টির জীবিকা তোমাদের দায়িত্বে নয়, বরং আমার দায়িত্বে। এই বাক্যে মানুষের ক্ষমতার সীমা, মালিকানার ভ্রম, এবং সৃষ্টিজগতের বিস্ময় একসাথে প্রকাশিত হয়। আমরা যাকে ‘আমার সম্পদ’ বলি, তা আসলে আমানত; যাকে ‘আমার ব্যবস্থা’ বলি, তা আসলে রবের প্রশস্ত দয়া। মানুষ নিজের সন্তানকে, নিজের পরিবারকে, নিজের দুর্বল নির্ভরশীলদেরও সম্পূর্ণভাবে টিকিয়ে রাখতে পারে না—একটি নিঃশ্বাস, একটি ফোঁটা দয়া, একটি দিনের নিরাপত্তাও মানুষের হাতে স্থায়ী নয়। তাই এ আয়াত হৃদয়কে নরম করে দেয়: হে মানুষ, তুমি জোগানদাতা নও; তুমি কেবল প্রাপ্তির পথে দাঁড়িয়ে থাকা এক দাস।
এই উপলব্ধি ঈমানকে বাস্তব করে তোলে। কারণ তাওহিদ কেবল মুখের স্বীকৃতি নয়, রিজিকের মুহূর্তে অন্তরের নির্ভরতা। যখন উপায় কমে যায়, যখন বাজার অনিশ্চিত হয়, যখন আশ্রয় দুলে ওঠে, তখন এই আয়াত কানে নয়, আত্মায় নাজিল হওয়ার মতো করে শোনায়: আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির জন্য পথ জানেন, এমনকি সেই পথ মানুষ দেখতেও পায় না। আর এই সত্যই নবীদের জন্যও সান্ত্বনা ছিল, তাদের জাতির অবাধ্যতা, অস্বীকৃতি ও পতনের অন্ধকারের মাঝেও। পৃথিবী যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই রিজিকেরও মালিক, আশ্রয়েরও মালিক, পরিণতিরও মালিক। কাজেই যে হৃদয় তাকে স্মরণ করে, সে দারিদ্র্যে ভেঙে পড়ে না; সে বুঝে যায়, জীবিকা শুধু পেট ভরার নাম নয়, বরং রবকে চেনার আরেকটি দরজা।

আল্লাহ তাআলা বলেন, পৃথিবীর ভেতর তিনি আমাদের জন্য জীবিকার উপকরণ রেখে দিয়েছেন, আর এমন সৃষ্টির জন্যও রিজিকের ব্যবস্থা করেছেন যাদের রিজিকদাতা আমরা নই। এই বাক্যটি মানুষের অহংকারের ওপর নীরব আঘাত। আমরা যতই পরিকল্পনা করি, পরিশ্রম করি, হিসাব কষি, তবু রিজিকের মূল দরজা আমাদের হাতে নয়। মাটি, পানি, বীজ, বাতাস, সময়, সম্পর্ক, সুযোগ—সবই আল্লাহর গড়া এক সূক্ষ্ম ব্যবস্থার অংশ। মানুষ কেবল উপায় ধরে; উপায়কে ফলবান করে তোলেন তিনি, যিনি আসমান-জমিনের মালিক।

এই আয়াতে সমাজের বাস্তব মুখও দেখা যায়। কেউ শক্তিমান, কেউ দুর্বল; কেউ দান করে, কেউ গ্রহণ করে; কেউ রিজিক বিতরণ করে বলে মনে করে, কেউ রিজিকের অপেক্ষায় কাঁদে। অথচ আল্লাহর দৃষ্টিতে সবাই একই প্রয়োজনের বন্দী। ধনীর হাতেও যা আছে, তা আমানত; গরিবের ঘরে যা নেই, তা-ও পরীক্ষা। তাই এই আয়াত আত্মসমালোচনার দরজা খুলে দেয়—আমরা কি রিজিকের মালিককে ভুলে গেছি? আমরা কি নিজেদের সামান্য ক্ষমতায় এমন অহংকার করেছি, যেন মানুষই জীবনের চূড়ান্ত ব্যবস্থাপক?

আর এই উপলব্ধি হৃদয়কে ভয় ও আশায় একসঙ্গে নত করে। ভয়, কারণ রিজিকের ভুল ব্যবহার জবাবদিহির দিনকে ভারী করে; আর আশা, কারণ যার হাতে আমার প্রয়োজনের চাবি, তাঁর রহমত আমার ধারণার চেয়েও বড়। পৃথিবী আমাকে শুধু বাঁচার উপকরণ দেয় না, বরং আমাকে ফিরতে শেখায়—যে রব আমাকে খাইয়েছেন, পরিয়েছেন, আশ্রয় দিয়েছেন, তিনিই একদিন আমার আমল, আমার নিয়ত, আমার নির্ভরতার হিসাব নেবেন। তখন মানুষের ভিড়, বাজারের শব্দ, দৌড়ঝাঁপ—সব স্তব্ধ হবে; আর স্পষ্ট হয়ে উঠবে, রিজিকও ছিল তাঁর, জীবনও ছিল তাঁর, আর প্রত্যাবর্তনও শেষ পর্যন্ত তাঁরই দিকে।

কখনো কি আমরা ভেবে দেখি, পৃথিবী যদি আল্লাহর এই গোপন ব্যবস্থাপনা থেকে এক মুহূর্তও সরে যেত, তবে আমাদের চেনা জীবন কোথায় দাঁড়াত? যে রুটি আমরা হাতে নিই, সেই রুটির আকাশ-পাতালজুড়ে লুকিয়ে আছে অগণিত অনুগ্রহ—মাটি, বৃষ্টি, বীজ, শ্রম, সময়, হেলাল-হারামের সীমা, মানুষের কৌশল, এবং এমন কত কিছু যা আমরা দেখি না। এই আয়াত আমাদের বুকের ভেতর জমে থাকা অহংকারকে নরম করে দেয়। মানুষ যতই শক্তিশালী মনে করুক নিজেকে, সে কেবল একজন মাখলুক; রিজিকের মালিক নয়, রিজিকের পথে চলা এক দরিদ্র মুসাফির মাত্র।
আর এই জায়গাতেই তাওহিদের সৌন্দর্য সবচেয়ে গভীর হয়ে ওঠে। আল্লাহ শুধু তোমার রিজিক দেন না, তিনি এমন সব সৃষ্টির ব্যবস্থাও করেন যাদের রিজিকের সঙ্গে তোমার কোনো দাবি-অধিকার নেই, তবু তাদের জন্যও তাঁর দয়া বিস্তৃত। তাহলে তোমার জীবনের ক্ষুদ্রতা, তোমার দুশ্চিন্তার ভার, তোমার অস্থিরতা—এসব কি তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে? না, কখনোই না। এই আয়াত যেন আমাদের হাতে গুঁজে দেওয়া এক নীরব শিক্ষা: উপায়কে দেখে নয়, উপায়ের পেছনের রবকে দেখে বাঁচো। কাজ করো, কিন্তু ভরসা রাখো না কাজের উপর; উপার্জন করো, কিন্তু শান্তি খোঁজো না টাকার স্তূপে; কারণ হৃদয়ের শান্তি রিজিকে নয়, রিজিকদাতার সান্নিধ্যে।
তাই আজ এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অন্তরকে প্রশ্ন করতে হয়—আমি কি সত্যিই আল্লাহর উপর নির্ভর করছি, নাকি কেবল নিজের পরিকল্পনার উপর? আমি কি তাঁর দেওয়া রিজিককে কৃতজ্ঞতায় গ্রহণ করছি, নাকি তা দিয়েই তাঁকে ভুলে যাচ্ছি? সূরা আল-হিজরের এই বাক্য আমাদের নামিয়ে আনে, আবার তুলে ধরে; আমাদের অভাব দেখিয়ে তাঁর পূর্ণতা দেখায়; আমাদের সীমা দেখিয়ে তাঁর অসীমতা অনুভব করায়। যে হৃদয় এই সত্য উপলব্ধি করে, সে আর দুনিয়াকে উপাস্য বানাতে পারে না। সে জানে, আমার রিজিকের মালিক আসমানের রব; আমার প্রয়োজনের খবর তিনিই রাখেন; আর আমার ভাঙা, অনিশ্চিত, তবু তাঁর দয়ার ওপর ঝুঁকে থাকা এই জীবনেই আছে ইমানের সবচেয়ে সুন্দর প্রশান্তি।