আল্লাহ তাআলা বলেন: তিনি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন, তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, এবং তাতে প্রত্যেক বস্তুকে সুপরিমিতভাবে উৎপন্ন করেছেন। এই একটি আয়াতেই যেন সৃষ্টিজগতের নীরব সাক্ষ্য কথা বলতে শুরু করে। জমিন শুধু পদতলের মাটি নয়; এটি আল্লাহর কুদরতের বিস্তৃত মিহরাব, যেখানে স্থিতি আছে, ভারসাম্য আছে, জীবনের জন্য প্রস্তুতি আছে। পর্বত এখানে কেবল দৃশ্যের সৌন্দর্য নয়; তা আল্লাহর এক মহান নিদর্শন, যা পৃথিবীর গতি-স্থিতি, মানুষের বসবাস, এবং সৃষ্টির শৃঙ্খলাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আর সব কিছুর ‘মাওযূন’ হওয়া—পরিমিত, মাপা, ভারসাম্যপূর্ণ হওয়া—জানিয়ে দেয় যে সৃষ্টিতে অযথা কিছু নেই; কোথাও বাড়াবাড়ি নেই, কোথাও অপূর্ণতা নেই, সবই হিকমতের মাপে গাঁথা।
সূরা আল-হিজরের সামগ্রিক সুরে আমরা দেখি এক দিকে কুরআন সংরক্ষণের অটুট প্রতিশ্রুতি, অন্য দিকে হযরত আদম আলাইহিস সালামের সামনে ইবলিসের অহংকার, তারপর নবীদের পথে চলা মানুষদের প্রতি সান্ত্বনা, এবং সত্য অমান্যকারী জাতিগুলোর পতনের সতর্কবার্তা। এই আয়াত সেই বৃহত্তর সুরের ভেতর সৃষ্টির ভারসাম্যের ভাষায় কথা বলে। যে আল্লাহ জমিনকে স্থির করেছেন, তিনিই ওহীকেও রক্ষা করেন; যে আল্লাহ পর্বতকে স্থান দিয়েছেন, তিনিই সত্যকে মানুষের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম। তাই এই আয়াত শুধু প্রকৃতির বর্ণনা নয়, এটি ঈমানের একটি দরজা—যেখান দিয়ে বান্দা বুঝতে শেখে, আল্লাহর সৃষ্টিতে শৃঙ্খলা আছে বলেই তাঁর বিধানেও শৃঙ্খলা আছে।
নির্দিষ্ট কোনো সহীহভাবে প্রতিষ্ঠিত শানে নুযূল এখানে পাওয়া গেলে তা উল্লেখ করা যেত; তবে এ আয়াতকে মূলত সূরার বিস্তৃত মক্কী প্রেক্ষাপটেই বুঝতে হয়। মক্কায় যখন অস্বীকার, উপহাস, এবং সত্যের বিরুদ্ধে একধরনের কষ্টকর পরিবেশ তৈরি হচ্ছিল, তখন এমন আয়াত মুমিন হৃদয়কে জানিয়ে দিত: তোমরা যে রবকে ডাকো, তিনি শুধু আকাশের রব নন, তিনি এই বিস্তৃত পৃথিবীরও রব; তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তা অযথা নয়, আর যা রক্ষা করতে চান তা কেউ নষ্ট করতে পারে না। তাই এই আয়াতের ভেতর তাসবিহ জাগে—সৃষ্টি নীরবে বলে, সুবহানাল্লাহ; জমিন বলে, সুবহানাল্লাহ; পর্বত বলে, সুবহানাল্লাহ; এবং মানুষের অন্তরও শেখে, এত পরিমিত সৃষ্টির সামনে নিজের অহংকার কত ক্ষুদ্র।
এই আয়াত যেন আমাদের চোখকে জমিনের ওপর নামিয়ে আনে, আর অন্তরকে তার পেছনের মালিকের দিকে তুলে দেয়। আল্লাহ তাআলা পৃথিবীকে শুধু ছড়িয়ে দেননি, তাকে বাসযোগ্য করেছেন; শুধু পর্বত স্থাপন করেননি, স্থিরতার ভাষা শিখিয়েছেন; শুধু উদ্ভিদ উৎপন্ন করেননি, প্রতিটি জিনিসকে মাওযূন—মাপজোক করা, ভারসাম্যপূর্ণ, প্রয়োজনমতো—রূপে প্রকাশ করেছেন। এখানে সৃষ্টির মধ্যে এক অনুপম শৃঙ্খলা আছে, কিন্তু সেই শৃঙ্খলা কোনো শীতল গণিত নয়; তা জীবনের জন্য করুণা, বান্দার জন্য আশ্বাস। মানুষ যখন অস্থিরতার মধ্যে কাঁপে, এই আয়াত তাকে বলে: যে রব তোমার পায়ের নিচে পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন, তিনিই তোমার ভেঙে যাওয়া হৃদয়কেও স্থির করার ক্ষমতা রাখেন।
অতএব এই আয়াত পড়লে শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখলেই চলবে না; এর ভেতরকার মাকসাদ বুঝতে হবে। পৃথিবীর বিস্তার আমাদের জন্য এক আহ্বান—হাঁটো, বাস করো, কিন্তু সীমা ভুলে যেয়ো না; পর্বতের স্থিতি আমাদের শেখায়—ঈমানও এমন হতে হবে, নড়বড়ে নয়; আর মাওযূন সৃষ্টির বোধ আমাদের কাঁপিয়ে বলে—আল্লাহর কাজের মধ্যে অপচয় নেই, তাড়াহুড়ো নেই, বিশৃঙ্খলা নেই। তাই মুমিন যখন ভূমির দিকে তাকায়, সে মাটির গন্ধের ভেতরও তাসবিহ শোনে; আকাশের নিচে, পাহাড়ের ছায়ায়, শস্যের অঙ্কুরে সে দেখে এক মহান রাব্বের কুদরত। আর তার হৃদয় নরম হয়ে বলে: হে আল্লাহ, যেমন তুমি পৃথিবীকে স্থির রেখেছ, তেমনি আমাদের অন্তরকেও তোমার হেদায়েতের ওপর স্থির রাখো।
আল্লাহ তাআলা যখন বলেন, “আমি ভু-পৃষ্ঠকে বিস্তৃত করেছি”, তখন তিনি শুধু পৃথিবীর আকৃতি জানান না; তিনি বান্দার অন্তরে স্থিরতার এক নীরব দাওয়াত রাখেন। এই জমিন আমাদের পায়ের নিচে এত নত, এত অনুগত, তবু কত মহিমান্বিত! তারপর পাহাড়—রওয়াসি—স্থাপন করা হলো, যেন দুনিয়ার দুলুনি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্থিরতা কেবল বাহ্যিক দৃশ্যের নাম নয়; সত্যিকার স্থিরতা আসে সেই রবের দিকে ঝুঁকে, যিনি সবকিছুকে পরিমাপে গড়েছেন। মানুষ যতই আপন শক্তির গল্প শোনাক, এই আয়াত তার গর্বের ভিতরে নরম কাঁপন ধরায়: তুমি যা দেখছ, তা তোমার হাতে ওঠেনি; তা এক পরিমিত কুদরতের সৃষ্টি।
আর যখন বলা হলো, “আমি তাতে প্রত্যেক বস্তু সুপরিমিতভাবে উৎপন্ন করেছি”, তখন জীবনের প্রতিটি শ্বাস যেন হিসেবের আওতায় এসে দাঁড়ায়। গাছের ফল, মাটির উর্বরতা, বৃষ্টির পথ, ঋতুর পালাবদল, জীবিকার বিস্তার—সবই মাওযূন, মাপে বাঁধা, ভারসাম্যে গাঁথা। এই পরিমিত সৃষ্টিই আমাদের সমাজকে শেখায়: বাড়াবাড়ি ধ্বংস ডেকে আনে, অবিচার ভারসাম্য ভেঙে দেয়, আর কৃতজ্ঞতার অভাব অন্তরের রিজিক শুকিয়ে ফেলে। যে জাতি আল্লাহর মাপে সন্তুষ্ট থাকে না, সে শেষে নিজেরই তৈরি করা বিশৃঙ্খলায় হারিয়ে যায়; আর যে বান্দা প্রতিটি নেয়ামতে তাসবিহ পড়ে, সে ধুলোর মাঝেও জান্নাতের সুর শুনতে পায়।
সূরা আল-হিজরের বৃহত্তর সুরে এ আয়াত এক গভীর আশ্রয় হয়ে আসে—কুরআন সংরক্ষিত, আদম-ইবলিসের কাহিনিতে অহংকারের পরিণতি স্পষ্ট, নবীদের প্রতি সান্ত্বনার ভাষা অব্যাহত, আর ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর ছায়া আমাদের কাঁধে সতর্কতার হাত রাখে। সুতরাং মুমিনের কাজ কেবল আকাশের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হওয়া নয়; বরং পৃথিবীর এই বিস্তার, পাহাড়ের এই স্থিতি, সৃষ্টির এই পরিমিতি দেখে নিজের হৃদয়কে প্রশ্ন করা: আমার জীবন কি মাওযূন? আমার কামনা, কথা, আয়-ব্যয়, রাগ, সম্পর্ক—সব কি আল্লাহর মাপে আছে? যে বান্দা এই প্রশ্নে কেঁপে ওঠে, সে-ই আসলে জেগে ওঠে। তারপর সে বুঝে, ফিরতে হবে সেই রবের কাছে, যিনি জমিন বিস্তৃত করেছেন, আর অন্তরের সংকীর্ণতাও যদি চান, প্রশস্ত করে দিতে পারেন কেবল তাঁর রহমতেই।
সূরা আল-হিজরের সুর আমাদের শেখায়, কুরআন সংরক্ষিত; আদমের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও ইবলিসের পথও মানুষের সামনে খোলা; নবীদের জন্য সান্ত্বনার দরজা বন্ধ হয়নি; আর যারা সত্য অমান্য করেছে, তাদের পতন ইতিহাসে এক এক করে লেখা হয়েছে। এই আয়াত সেই মহান ধারারই আরেকটি আলোকরেখা—সৃষ্টি নিজের ভাষায় তাসবিহ করে, আর মানুষ যদি অশ্রদ্ধা নিয়ে তাকায়, তবে সে শুধু পাহাড়ই দেখে, পেছনের হাতে গড়া মহিমা দেখে না। তাই ভূমির বিস্তার আমাদের শেখায় প্রশস্ত হৃদয়; পর্বতের স্থিতি শেখায় দৃঢ়তা; আর মাওযূন সৃষ্টির বোধ শেখায় কৃতজ্ঞতা, সংযম, এবং রবের সামনে নত হওয়া।
যদি আজও অন্তর কাঁপে, তবে তা অকারণে নয়। এই কাঁপনই হয়তো তওবার দরজা। কারণ সৃষ্টিজগতের এই ভারসাম্য শুধু চিন্তার বিষয় নয়, আত্মসমালোচনার আয়নাও বটে। আমি কি আমার জীবনে আল্লাহর মাপে চলেছি, নাকি ইচ্ছা-অহংকারের তাড়নায় সবকিছু বেখাপ্পা করে ফেলেছি? আমার কথা, আমার কামনা, আমার সম্পর্ক, আমার উপার্জন—সবকিছু কি মাওযূন? নাকি আমি নিজেই সেই ভারসাম্য হারানো ধ্বংসস্তূপ, যার ভেতর থেকে তাসবিহের বদলে হাহাকার বেরোয়? হে আল্লাহ, তুমি যেমন পৃথিবীকে স্থিতি দিয়েছ, তেমনি আমাদের অন্তরকেও তোমার যিকিরে স্থির করে দাও; আমাদেরকে তোমার পরিমিত সৃষ্টির শিক্ষা বুঝিয়ে দাও, আর আমাদের জীবনে তোমার কুদরতের সামনে বিনয় ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট রেখো না।