কখনো সত্যের পথে দাঁড়ানো মানে একা হয়ে যাওয়া; আর কখনো সেই একাকীত্বের ওপর মানুষের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের ঝড় নেমে আসে। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল ﷺ-এর সামনে সেই নির্মম দৃশ্যটি তুলে ধরেছেন: লোকেরা তাঁকে দেখে গ্রহণ করে না, চিনে না, বরং হাস্য-উপহাসের পাত্র বানায়। তারা অবজ্ঞার সুরে জিজ্ঞেস করে, “এ-ই কি সেই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ রাসূল করে পাঠিয়েছেন?” প্রশ্নটি যেন প্রশ্ন নয়; এটা অহংকারের দম্ভ, অন্ধত্বের বিদ্রূপ, এবং সত্যকে ছোট করে দেখার অসুস্থ অভ্যাস। কিন্তু কুরআন এ দৃশ্য বর্ণনা করেও অবনত হয় না; বরং যেন বলে, দেখো, সত্য কখনো জনতার হাসিতে মিথ্যা হয়ে যায় না।
এই আয়াত নবীকে সান্ত্বনা দেয়, আর সেই সান্ত্বনা কেবল এক যুগের জন্য নয়; কিয়ামত পর্যন্ত যত সত্যপথিক থাকবে, তাদের জন্যও এতে আশ্বাস আছে। যারা আল্লাহর দাওয়াত বহন করে, তাদেরও অনেক সময় এমন দৃষ্টি, এমন ঠাট্টা, এমন কটাক্ষ সহ্য করতে হয়। মানুষ যখন বাহ্যিক মানদণ্ডে নবুয়ত ও হিদায়াতকে মাপে, তখন সে হৃদয়ের আলোকে চিনতে পারে না; সে বড়লোকি, ক্ষমতা, বাহ্যিক প্রভাব, কৌতুকপূর্ণ ভাষা—এসবকেই সত্যের মাপকাঠি বানিয়ে ফেলে। অথচ আল্লাহর রাসূলকে বিদ্রুপ করা আসলে সত্যের বিরুদ্ধেই বিদ্রুপ করা। এই আয়াত আমাদের শেখায়, মানুষের হাসি যদি সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তবে মুমিনের কাজ সেই হাসিতে ভেঙে পড়া নয়; বরং আল্লাহর কাছে আরও দৃঢ় হওয়া।
বৃহত্তর কুরআনি প্রেক্ষাপটে এই অবজ্ঞা নতুন কিছু নয়। মক্কার কাফিররা নবী ﷺ-এর দাওয়াতকে বহুবার হাস্যরস, অপবাদ, এবং ঠাট্টার মাধ্যমে আড়াল করতে চেয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ সত্যের দিকে না আসে। এই সূরার ধারাবাহিকতায় মিথ্যা, গর্ব, আখিরাত অস্বীকার, এবং আল্লাহর আয়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার রোগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই এই আয়াত শুধু একটি কটুক্তির খবর নয়; এটা মানুষের অন্তরের রোগ শনাক্ত করে। যে হৃদয় অহংকারে অন্ধ, সে রাসূলকে ‘আশ্চর্য’ মনে করে; আর যে হৃদয় বিনয়ী, সে রাসূলের মধ্যে আল্লাহর রহমতের আলোকরেখা দেখে। এভাবে আয়াতটি নববী মর্যাদাকে উঁচু করে ধরে, আর আমাদেরও শেখায়—সত্যের বাহককে তুচ্ছ মনে করা মানে, নিজেরই অন্তরকে অন্ধতার হাতে তুলে দেওয়া।
মানুষের বিদ্রুপ অনেক সময় কেবল একটি হাসি নয়; তা হয় হৃদয়ের অন্ধকার থেকে ছুড়ে মারা একটি তীর। যখন সত্য তাদের অভ্যাস ভেঙে দেয়, যখন নূর তাদের অহংকারের ঘরে প্রবেশ করে, তখন তারা নবীকে নিয়ে ঠাট্টা করে—যেন ঠাট্টা করলে নুবুওয়তের মর্যাদা ক্ষয়ে যাবে, যেন উপহাস করলে আল্লাহর পাঠানো হেদায়েতের আলো নিভে যাবে। কিন্তু এই আয়াতে যে দৃশ্য আঁকা হয়েছে, তা আসলে বিদ্রুপকারীর নয়, বরং বিদ্রুপের অসারতার উন্মোচন। রাসূল ﷺ-কে দেখে মানুষ যখন বলে, “এ-ই কি সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ রাসূল করে পাঠিয়েছেন?”—তখন তারা নিজেরাই প্রকাশ করে দেয় যে তারা বাহ্যিক আকার দেখছে, অন্তরের সত্য নয়; মানুষের চেহারা দেখছে, আল্লাহর নির্বাচন নয়; পৃথিবীর মানদণ্ড দিয়ে আসমানের সিদ্ধান্তকে মাপতে চাইছে।
এ আয়াত আমাদের নিজেদের দিকেও ফিরিয়ে আনে। আমরা কি সত্যকে তার ভেতরের মহিমায় চিনতে পারি, নাকি আমরা এখনও লোকচক্ষুর মোহে বন্দি? আমরা কি আল্লাহর বাছাইকে সম্মান করি, নাকি বাহ্যিক জৌলুস, সামাজিক ক্ষমতা, আর শব্দের জোরে সত্য-মিথ্যার বিচার করি? রাসূল ﷺ-এর প্রতি বিদ্রুপ দেখিয়ে কুরআন যেন মুমিনের অন্তরে একটি কাঁপন জাগিয়ে দেয়: হে হৃদয়, যে সত্য আজ উপহাসের পাত্র, কাল সে-ই হবে মুক্তির দরজা। তাই অপমানের মধ্যেও ধৈর্য ধরো, অবজ্ঞার মধ্যেও স্থির থাকো, এবং জেনে রাখো—যাকে আল্লাহ রাসূল করেছেন, তাকে মানুষের বিদ্রুপ নয়, বরং আল্লাহর নুসরাহ-ই উঁচু করবে।
যে সমাজ অন্তর দিয়ে সত্যকে চিনতে শেখে না, সে চোখ দিয়ে শুধু বাহ্যিক রূপ দেখে; আর তখনই নবীও তাদের কাছে উপহাসের লক্ষ্য হয়ে ওঠেন। আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর প্রতি এই বিদ্রুপ আসলে মানবহৃদয়ের গভীর রোগের প্রকাশ—অহংকার, জড়তা, এবং নিজের ভ্রান্ত মানদণ্ডকে সত্য ভেবে নেওয়ার জেদ। তারা যেন বলছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে হিদায়াত এসেও যদি আমাদের অভ্যাস, আমাদের নেতৃত্ব, আমাদের স্বার্থকে না ছোঁয়, তবে আমরা তাকে হাস্যকর বলে উড়িয়ে দেব। কিন্তু সত্যকে নিয়ে ঠাট্টা করা মানেই সত্যকে ছোট করা নয়; বরং নিজের আত্মাকে আরও অন্ধ, আরও ভারী করে তোলা। মানুষের ঠোঁটের হাসি ক্ষণিকের, অথচ আল্লাহর দরবারে সেই হাসির জবাব দীর্ঘ ও কঠিন হতে পারে।
এই আয়াত আমাদের নিজেদেরও থামিয়ে জিজ্ঞেস করায়—আমরাও কি কখনো সত্যকে তার মর্যাদায় গ্রহণ করতে দেরি করি না? আমরা কি কখনো এমন শব্দ, এমন আচরণ, এমন অবহেলার ভেতর দাঁড়িয়ে যাই না, যেখানে কুরআনের আহ্বানকে হালকা মনে হয়? নবীকে বিদ্রুপ করা যারা করেছিল, তাদের ভেতরে ছিল কুফরের অন্ধকার; কিন্তু মুমিনের ভেতরেও যদি গাফিলতির ধুলো জমে, তবে সে ধীরে ধীরে সেই অন্ধকারের সীমানার দিকে এগিয়ে যায়। তাই এই আয়াত শুধু ইতিহাস নয়, নিজের হিসাব নেওয়ার দরজা। আজও কুরআনের মুখোমুখি হয়ে আমাদের হৃদয় কী বলে—সমর্পণ, না অবজ্ঞা? চোখের সামনে যখন হক স্পষ্ট হয়, তখন সেটিকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার সাহসই সবচেয়ে ভয়ংকর বিদ্রূপ।
তবু এই আয়াতের ভেতর সান্ত্বনার অমোঘ আলো আছে। রাসূল ﷺ-কে মানুষ অবজ্ঞা করলেও আল্লাহ তাঁকে অবজ্ঞিত হতে দেন না; মানুষ তাঁকে হাসির পাত্র বানালেও আল্লাহ তাঁর রাসূলকে সত্যের সর্বোচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেন। এ এক আশ্বাস—যে আল্লাহর পথে হাঁটে, তাকে মানুষের দৃষ্টির কাছে নিজের মূল্য প্রমাণ করতে হয় না; তার কাজ শুধু আল্লাহর কাছে সত্য থাকা। তাই মুমিনের হৃদয় যেন আজ নরম হয়, কিন্তু দুর্বল না হয়; ভীত হয়, কিন্তু ভেঙে না পড়ে। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের হাসি নয়, আল্লাহর ফয়সালাই চূড়ান্ত। আর সেই ফয়সালার সামনে একদিন সবাই দাঁড়াবে—যে বিদ্রুপ করেছে, যে নীরবে সহ্য করেছে, যে কুরআনের আলোকে গ্রহণ করেছে, আর যে এখনও অন্ধকারকে আঁকড়ে আছে। তখনই বোঝা যাবে, কারা সত্যকে উপহাস করেছিল, আর কারা সত্যের আশ্রয়ে নিরাপদ ছিল।
আজও যে হৃদয় কুরআনের আলোয় জাগে, তাকে অনেক সময় দুনিয়ার চোখে সাদাসিধে, দুর্বল, অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়। কিন্তু আল্লাহ যাকে সম্মান দেন, মানুষের উপহাস তার কিছুই করতে পারে না। এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের বুক কেঁপে ওঠা উচিত—আমরা কি কখনো সত্যকে হালকা করেছি? কাকে দেখে আমরা উপহাস করেছি, কাকে দেখে আমরা ঈমানের বদলে অভিজাত জ্ঞান, অহংকার আর দম্ভকে বড় মনে করেছি? রাসূলকে নিয়ে বিদ্রূপের এই দৃশ্য শুধু ইতিহাস নয়; এটা আমাদের নিজের ভেতরের পরীক্ষাও।
হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরকে এমন করো না যে আমরা সত্যকে দেখে হাসি, আর বাতিলকে দেখে নীরব থাকি। আমাদের ভেতর থেকে সেই অন্ধ বিদ্রূপ মুছে দাও, যে বিদ্রূপ মানুষকে সত্য থেকে দূরে ঠেলে দেয়। আমাদের এমন বিনয় দাও, যাতে আমরা আপনার রাসূল ﷺ-এর মর্যাদা হৃদয়ে বহন করতে পারি, তাঁর সুন্নাহর সামনে নত হতে পারি, আর কুরআনের আহ্বানে লজ্জিত ও জেগে উঠতে পারি। যে সত্যকে মানুষ বিদ্রূপ করে, আমরা যেন তারই কাছে আত্মসমর্পণ করি—কারণ অবশেষে বিজয় বিদ্রূপের নয়, হিদায়াতেরই।