মানুষের চোখের সামনে অনেক দৃশ্যই ভেসে ওঠে, কিন্তু সব দৃশ্য অন্তরে পৌঁছায় না। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা এমন এক অবস্থা স্মরণ করিয়ে দেন—তারা সেই জনপদের পাশ দিয়ে যাতায়াত করে, যার ওপর নেমে এসেছিল ধ্বংসের মন্দ বৃষ্টি। চোখে পড়ে বিধ্বস্ত চিহ্ন, মাটিতে মিশে যাওয়া এক সময়ের অহংকার, তবু অন্তর জাগে না। প্রশ্নটি তাই শুধু দেখার নয়; প্রশ্ন হলো, দেখেও কেন মানুষ দেখে না? কারণ বাহ্যিক দৃষ্টি থাকলেও যদি আখিরাতের বিশ্বাস না থাকে, তবে ধ্বংসস্তূপও শিক্ষায় রূপ নেয় না, বরং নিঃশব্দ পাথর হয়ে পড়ে থাকে মানুষের উদাসীনতার পাশে।

এখানে কুরআন আমাদের হৃদয়ের এক গভীর রোগ ধরিয়ে দেয়। মানুষ অনেক সময় নিজের জীবনকে এমনভাবে চালায়, যেন এ পৃথিবীই শেষ ঠিকানা, যেন মৃত্যুর পরে আর কোনো হিসাব নেই, কোনো প্রত্যাবর্তন নেই। তাই সে ধ্বংস দেখে, কিন্তু নড়ে না; কবরের নীরবতা দেখে, কিন্তু শিউরে ওঠে না; ভগ্ন জনপদ দেখে, কিন্তু নিজের ভবিষ্যৎ চিনে না। আয়াতের শেষ বাক্যটি এই অন্ধত্বের শেকড় খুলে দেয়—তারা পুনরুজ্জীবনের আশা করে না, অর্থাৎ তারা আখিরাতকে সত্য বলে হৃদয়ে ধারণ করে না। যে অন্তর পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে, তার কাছে ইতিহাসও নিরর্থক হয়ে যায়, উপদেশও দুর্বল হয়ে পড়ে।

সূরা আল-ফুরকানের সামগ্রিক সুরের সঙ্গে এ কথাটি গভীরভাবে মিলে যায়। এই সূরা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট করে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সান্ত্বনা দেয়, আর মানুষকে আখিরাতের দিকে ফিরিয়ে আনে। এখানে আল্লাহ যেন স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন—ধ্বংস কেবল অতীতের সংবাদ নয়, তা জীবন্ত সতর্কবার্তা। জনপদের ভাঙা দেয়াল, উজাড় ঘর, থেমে যাওয়া বসতি—এসবই বলে, ক্ষমতা স্থায়ী নয়, অবাধ্যতা নিরাপদ নয়, আর দুনিয়ার চাকচিক্য শেষ সত্য নয়। যে মানুষ এই সংকেতগুলোর ভেতরেও অনন্ত জীবনের ডাক শুনতে পায় না, তার অন্তর কেবল ব্যস্ত নয়, তার অন্তর মৃত্যুর মতো কঠিন হয়ে গেছে।

আল্লাহ তাআলা এখানে মানুষকে কেবল একটি দৃশ্যের সামনে দাঁড় করান না; তিনি অন্তরের পর্দা সরিয়ে দেখান, কীভাবে চোখ থাকা সত্ত্বেও হৃদয় অন্ধ হয়ে যায়। তারা সেই জনপদের পাশ দিয়ে যাতায়াত করে, যার ওপর নেমে এসেছিল ধ্বংসের মন্দ বৃষ্টি—অর্থাৎ এক সময়ের স্বচ্ছলতা, শক্তি, নিরাপত্তা, কৃতিত্ব, সবই যখন আল্লাহর শাস্তির সামনে তুচ্ছ হয়ে গেছে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া সহজ, কিন্তু ধ্বংসের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের অজেয়তার দাবি ভেঙে ফেলা কঠিন। এই আয়াত যেন বলে, ইতিহাস শুধু পড়ার জন্য নয়; ইতিহাসই এক নীরব আয়না, যেখানে প্রতিটি পথিকের নিজের মুখ দেখা উচিত। কিন্তু যে হৃদয় আখিরাতকে সত্য বলে মেনে নেয় না, সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েও নিজের পরিণতি দেখে না।

এখানেই আয়াতের গভীরতম আঘাত। তারা দেখে, তবু দেখে না; বুঝতে পারে, তবু উপলব্ধি করে না। কারণ তাদের ভেতরে পুনরুজ্জীবনের আশা নেই—অর্থাৎ মৃত্যুর পরে আবার উঠতে হবে, হিসাব দিতে হবে, ন্যায়ের সামনে দাঁড়াতে হবে, এই বিশ্বাস নেই। যে অন্তর মনে করে মাটি-ধুলোই শেষ, সে কোনো জনপদের পতনকে নিজের পরিণতির সংবাদ হিসেবে শোনে না। ফলে পৃথিবীর ধ্বংসস্তূপ তার কাছে কেবল অতীতের নিদর্শন হয়ে থাকে, আল্লাহর সতর্কবাণী হয়ে ওঠে না। কুরআন আমাদের শেখায়, আখিরাতের বিশ্বাস শুধু ভবিষ্যতের কথা নয়; সেটাই বর্তমানকে জাগিয়ে রাখে। যে মানুষ পুনরুত্থানকে সত্য জানে, সে ধ্বংস দেখেও অহংকার করতে পারে না, অন্যায়ের ওপর নিশ্চিন্ত থাকতে পারে না, আর নিজেকেও চিরস্থায়ী ভাবে না।
এই আয়াত তাই আমাদের ভেতরে এক ভয়াবহ প্রশ্ন ফেলে দেয়—আমরা কি কেবল ঘটনাগুলোর পাশ দিয়ে যাচ্ছি, নাকি সেগুলো থেকে আল্লাহর দিকে ফিরছি? ভগ্ন নগর, নিস্তব্ধ কবর, ঝরে-পড়া সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ—এসব কি আমাদের বলে না যে ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, গর্ব ভঙ্গুর, আর মানুষ তার রবের মুখাপেক্ষী? যে হৃদয় নূরের সন্ধানে কুরআন পড়ে, সে ধ্বংসের মধ্যেও হেদায়াত দেখতে পায়; আর যে হৃদয় আখিরাতকে ভুলে থাকে, তার সামনে কিয়ামতের ভাষা পর্যন্ত নিঃশব্দ হয়ে যায়। এই কারণে সূরা আল-ফুরকানের এই আয়াত শুধু এক ইতিহাসের বর্ণনা নয়, বরং এক জাগরণের ডাক: দেখো, স্মরণ করো, কেঁপে ওঠো; কারণ যিনি ধ্বংস দেখেও না-দেখার ভান করেন, তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের আত্মাকেই হারিয়ে ফেলেন।

মানুষের চোখের সামনে কখনো কখনো এমন সব ধ্বংসচিহ্ন এসে দাঁড়ায়, যা অন্তরকে নত করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা এমন এক জনপদের কথা স্মরণ করান, যার ওপর নেমে এসেছিল মন্দ বৃষ্টি—অর্থাৎ শাস্তির বৃষ্টি, ধ্বংসের চিহ্ন। তারা তার পাশ দিয়ে যাতায়াত করে, দেখে; কিন্তু দেখার মতো করে দেখে না। কারণ শুধু চোখ থাকলেই তো হয় না, হৃদয়ে যদি আখিরাতের বিশ্বাস না থাকে, তবে ভাঙা দেয়ালও শিক্ষা দেয় না, বরং কেবল পথের ধুলো হয়ে থাকে। কুরআন যেন এভাবেই আমাদের অন্তরের পর্দা সরিয়ে বলে: যে মানুষ পুনরুত্থানকে সত্য মানে না, তার কাছে ইতিহাসও নীরব, উপদেশও নীরব, কবরের ভাষাও নীরব।

এই আয়াতের শেকড়ে আছে আত্মবিস্মৃতির এক নির্মম সত্য—মানুষ যখন আল্লাহর সামনে ফিরে দাঁড়ানোর ভয় হারায়, তখন সে নিজের সীমা ভুলে যায়, সমাজে অহংকার, অবিচার, গাফলত আর নৈতিক পতন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। অথচ ভগ্ন জনপদের নীরবতা যেন আমাদের কানে কানে বলে, দুনিয়ার স্থায়িত্বের দাবি মিথ্যা, আর ফিরে যাওয়ার দিন অমোঘ। এ স্মরণে ভয়ও আছে, আশাও আছে; ভয় আছে, যদি আমরা ঘুমিয়ে থাকি তবে হিসাবের দিনে জেগে উঠতে হবে; আর আশা আছে, কারণ যে আজই জাগে, যে নিজের অন্তরকে প্রশ্ন করে, সে আল্লাহর রহমতের দরজায় ফিরে আসতে পারে। সূরা আল-ফুরকান আমাদের সেইদিকে ডাকে—নিজেকে জিজ্ঞেস করতে শেখায়: আমি কি শুধু দেখছি, নাকি শিক্ষা নিচ্ছি? আমি কি শুধু চলছি, নাকি রবের দিকে ফিরছি?

যে হৃদয় একদিন পুনরুত্থানের উপর ভরসা হারায়, তার জন্য ধ্বংসস্তূপও শুধু একখণ্ড দৃশ্য হয়ে থাকে। সে দেখে, কিন্তু শেখে না; স্মরণ করে, কিন্তু সেজদায় ঝোঁকে না; আল্লাহর নিদর্শনকে অতিক্রম করে যায়, অথচ নিজের শেষ গন্তব্যকে অতিক্রম করতে পারে না। এই আয়াত আমাদের সামনে এক অস্বস্তিকর সত্য তুলে ধরে—অন্তরের অন্ধত্ব অনেক সময় চোখের অন্ধত্বের চেয়েও ভয়ংকর। কারণ চোখের সামনে ভাঙা দেয়াল, নিশ্চিহ্ন জনপদ, নিস্তব্ধ ধ্বংস সবই দাঁড়িয়ে থাকে; কিন্তু যেই অন্তরে আখিরাতের বিশ্বাস জাগে না, সে হৃদয় এসবকে নিজের আয়না বানাতে পারে না।

তাই আজকের প্রশ্ন খুব নরম, কিন্তু ভেতরে ভেতরে খুবই কঠিন—আমরা কি সত্যিই আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, নাকি এখনও মনে মনে এই দুনিয়াকেই শেষ কথা ভাবছি? যে ব্যক্তি নিজের চারপাশের ধ্বংস, নিজের দুর্বলতা, নিজের কবরযাত্রা, নিজের হিসাবের দিনকে চিনে নেয়, তার চোখে অহংকারের পর্দা থাকে না। সে জানে, এই পথের শেষ আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো। আর তখনই বান্দার হৃদয় ভেঙে যায়, নরম হয়, তওবার জন্য প্রস্তুত হয়। হে আল্লাহ, আমাদের এমন অন্তর দাও, যা ধ্বংস দেখেও গাফেল থাকে না; এমন ঈমান দাও, যা পুনরুজ্জীবনকে সত্য জেনে প্রতিদিন আমাদের জীবনকে জাগিয়ে তোলে; আর এমন ফিরে আসা দাও, যা তোমার রহমতের দিকে এক বিনীত, কাঁপতে-কাঁপতে অগ্রসর হয়।