এই আয়াতটি শুধু একটি উপমা নয়; এটি আত্মার ইতিহাস। এটি এমন এক মানুষের প্রতিচ্ছবি, যে আলো ছুঁয়েছিল, কিন্তু আলোর যোগ্যতা ধরে রাখতে পারেনি; যে সত্যের কাছাকাছি এসেছিল, কিন্তু সত্যের সাথে সত্য থাকতে পারেনি; যে আলোর পরিবেশে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু অন্তরে অন্ধকার লালন করেছিল। তাই শেষে আলো তার কাছে রইল না-থাকল শুধু অন্ধকার, এবং তার স্মৃতি। খেয়াল করুন, এখানে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাত্রা হয়নি; বরং আলো থেকে অন্ধকারে পতন হয়েছে। এটাই আয়াতের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক। কারণ যে মানুষ আলো কখনো দেখেইনি, তার অবস্থা একরকম; কিন্তু যে মানুষ আলো দেখেছে, আলোয় কিছুটা উষ্ণতা পেয়েছে, সত্যের দীপ্তি চোখে পড়েছে, অথচ তারপর সেই আলো হারিয়েছে-তার ট্র্যাজেডি অনেক গভীর। এই আয়াত মূলত সেই মুনাফিক হৃদয়ের কথা, যে ইসলামি পরিবেশে আসে, ঈমানের ভাষা জানে, সত্যের আলো দেখে, মুমিনদের সাথে মিশে, কুরআনের আওয়াজ শোনে-কিন্তু অন্তরে সত্যকে গ্রহণ করে না। ফলে কিছু সময় সে আলোর সুবিধা নেয়, কিন্তু আলোর মালিকানা পায় না।
“যে আগুন জ্বালালো”-এখানে আগুন আলো ও উষ্ণতার উৎস। অর্থাৎ তারা এমন এক অবস্থায় এসেছিল, যেখানে সত্য তাদের চারপাশে দৃশ্যমান হয়েছিল। মুমিনদের সমাজে তারা নিরাপত্তা পেয়েছিল, দুনিয়াবি কিছু লাভও পেয়েছিল, ঈমানের ভাষায় চলাফেরা করেছিল, দ্বীনের পরিবেশে দাঁড়িয়েছিল। এক ধরনের আলো তাদের ঘিরে ধরেছিল। কিন্তু এই আলো ছিল বহিরাগত; ভেতরে তা নূর হয়ে নামেনি।
সবাই যে আলোয় দাঁড়ায়, সবাই আলোকিত হয় না।
সবাই কুরআন শোনে, কিন্তু সবার ভেতরে কুরআন নামে না।
সবাই মসজিদে আসে, কিন্তু সবার অন্তর সিজদা করে না।
সবাই ঈমানের ভাষা জানে, কিন্তু সবার হৃদয় ঈমানের স্বাদ পায় না।
যখন আয়াত বলে, “আল্লাহ তাদের আলো কেড়ে নিলেন”-এখানে “আলো” কেড়ে নেওয়া হয়েছে, আগুন না। অর্থাৎ তাদের কাছে হয়তো বাহ্যিক কাঠামো, সামাজিক সংযোগ, ধর্মীয় শব্দ, পরিচয়ের কিছু আবরণ রয়ে গেছে; কিন্তু নূর নেই। তারা আকার জানে, রূহ জানে না। ভাষা জানে, স্বাদ জানে না। দীনকে দেখে, কিন্তু দীন তাদের ভেতরে আলো জ্বালায় না।
অস্থায়ী আলো আর স্থায়ী নূর এক জিনিস নয়।
কখনো মানুষ সত্যের খুব কাছে থেকেও সত্যের মানুষ হয় না।
সে আলো ব্যবহার করে, কিন্তু আলোকে ভালোবাসে না।
সে উষ্ণতা নেয়, কিন্তু আগুনের উৎসের কাছে আত্মসমর্পণ করে না।
ফলে একসময় তার যা ছিল, তা-ও হারিয়ে যায়।
এখানে “আল্লাহ তাদেরকে এমন অন্ধকারে ছেড়ে দিলেন”-এই অংশটি ভীষণ কাঁপানো। শুধু অন্ধকার না, “অন্ধকারসমূহ”-বহুবচনধর্মী অর্থও এতে ধরা পড়ে: সন্দেহের অন্ধকার, কপটতার অন্ধকার, নফসের অন্ধকার, অহংকারের অন্ধকার, গুনাহের অন্ধকার, আত্মপ্রবঞ্চনার অন্ধকার। এক অন্ধকার আরেক অন্ধকারকে ডাকে। মানুষ যখন অন্তরের আলো হারায়, তখন শুধু একটি বিষয়ে না, পুরো অস্তিত্বে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। তার নৈতিকতা দুর্বল হয়, দোয়ার স্বাদ শুকিয়ে যায়, গুনাহ সহজ লাগে, সত্যের প্রতি কোমলতা কমে যায়, উপদেশ ভারী লাগে, কুরআন আর ভিতর কাঁপায় না।
আরও ভয়ংকর হলো-“যেখানে তারা কিছুই দেখতে পায় না।”
এ অবস্থায় মানুষ বিপদে আছে, কিন্তু তা বোঝে না।
সে অন্ধকারে আছে, কিন্তু নিজের চোখকে সুস্থ মনে করে।
সে আলো হারিয়েছে, কিন্তু মনে করে সব নিয়ন্ত্রণে আছে।
এটাই আধ্যাত্মিক অন্ধত্বের সবচেয়ে কঠিন রূপ।
এই আয়াত ঈমানদারকেও প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয়। কারণ এখানে প্রশ্ন আসে:
আমার দ্বীনের সাথে সম্পর্কটা কি ভেতরের, নাকি শুধু চারপাশের?
আমি কি আলোকে ভালোবাসি, নাকি শুধু আলোয় দাঁড়ানোর সামাজিক নিরাপত্তা?
আমি কি কুরআনের শব্দ জানি, নাকি কুরআনের নূরও চাই?
আমি কি শুধু ধর্মীয় পরিচয়ধারী, নাকি সত্যিই আল্লাহর কাছে নত?
আমি কি আলোকে ধরে রাখতে চেষ্টা করছি, নাকি মনে করছি কাছে আছি বলেই সব ঠিক আছে?
আধ্যাত্মিকভাবে এই আয়াতের একটি বড় শিক্ষা হলো-আলো পাওয়া যত বড় নিয়ামত, আলো ধরে রাখা তার চেয়েও বড় আমানত। ঈমানের শুরু সহজ হতে পারে, কিন্তু স্থায়িত্ব আল্লাহর রহমত ছাড়া আসে না।
সত্যের সাথে পরিচয় পাওয়া বড় ব্যাপার, কিন্তু সত্যের কাছে আত্মসমর্পণই আসল ব্যাপার।
এই আয়াতে একধরনের নীরব সতর্কতা আছে তাদের জন্যও, যারা দীর্ঘদিন দ্বীনি পরিবেশে থেকেও ভেতরে ভেতরে শূন্য। মানুষের চোখে তারা অভ্যস্ত, পরিচিত, গ্রহণযোগ্য। কিন্তু তারা নিজেরাই জানে-কুরআন আর আগের মতো কাঁপায় না, দোয়া আর আগের মতো ওঠে না, নামাজ আর আগের মতো টানে না, গুনাহ আর আগের মতো ব্যথা দেয় না। এ লক্ষণগুলো হালকা কিছু না। এগুলো হয়তো সেই মুহূর্তের আগাম সংকেত, যখন আলো আছে মনে হলেও নূর সরে যেতে শুরু করেছে।
ঈমান জাগানিয়া দিক থেকে এ আয়াত মুমিনকে গভীরভাবে দোয়ার মানুষ বানায়। কারণ সে বুঝতে শেখে, আলো আমার কৃতিত্ব না; এটি আল্লাহর দান। আর যে দান কেড়ে নেওয়া যায়, তা নিয়ে অহংকার করা যায় না। তাই মুমিন শুধু বলে না “আমি হিদায়াতপ্রাপ্ত”; সে কাঁদে-“হে আল্লাহ, আপনি আমার নূর কেড়ে নেবেন না।”
এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে একজন মুমিনের দোয়া হওয়া উচিত:
আপনি যে আলো একদিন আমার হৃদয়ে জ্বালিয়েছেন,
তা নিভে যেতে দেবেন না।
আমাকে এমন মানুষ বানাবেন না,
যে আলো দেখে, কিন্তু আলোর মানুষ হয় না।
আমাকে এমন অন্তর দিন,
যেখানে কুরআন শুধু শব্দ না, নূর হয়ে নামে।
আমাকে এমন সিজদা দিন,
যেখানে অভ্যাস না, উপস্থিতি থাকে।
আমাকে এমন দীন দিন,
যা সামাজিক পোশাক না, অন্তরের সত্য হয়।
আমি যেন সেই মানুষের মতো না হই,
যে আগুন জ্বালিয়ে সাময়িক আলো পেল,
তারপর সব হারিয়ে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল।
সুরা বাকারার ১৭ নং আয়াতের গভীরতম শিক্ষা বোধহয় এই-
আলোর কাছে আসা যথেষ্ট না,
আলোর যোগ্য হওয়া জরুরি।
সত্যের পাশে দাঁড়ানো যথেষ্ট না,
সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ জরুরি।
দ্বীনের পরিবেশ পাওয়া যথেষ্ট না,
দ্বীনের নূর অন্তরে নামা জরুরি।
কারণ চারপাশের আলো একসময় সরে যেতে পারে।
তখন থাকবে শুধু অন্তরের আলো।
আর যদি অন্তরই অন্ধকারে ডুবে যায়,
তবে বাহ্যিক সব পরিচয় মানুষকে বাঁচাতে পারবে না।
যে হৃদয় এ আয়াত পড়ে ভয় পায়,
আলো হারানোর আশঙ্কায় কাঁপে,
আর নূর টিকিয়ে রাখার জন্য আল্লাহর কাছে ভিক্ষা চায়-
সেই হৃদয়ই এখনো আশাব্যঞ্জক।
কারণ নূর টিকে থাকে তাদের ভেতর,
যারা নূরকে নিজেদের অধিকার না,
রবের দান মনে করে।