এই আয়াতটি এমন এক ভয়ংকর সত্য উন্মোচন করে, যা মানুষের আত্মাকে গভীরভাবে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আগের আয়াতে আমরা দেখলাম, মুনাফিকরা ঈমানকে উপহাস করে, মুমিনদের নিয়ে তামাশা করে, দ্বীনের ভাষাকে নিজেদের দ্বিচারিতার মুখোশ বানায়। আর এখানে আল্লাহ তাদের সেই উপহাসের চূড়ান্ত জবাব দিচ্ছেন। কিন্তু এই জবাব দুনিয়াবি প্রতিশোধের ভাষায় না; এটি আরও সূক্ষ্ম, আরও গভীর, আরও ভয়ংকর-আল্লাহ তাদের নিজেদের বিভ্রান্তির ভেতর ছেড়ে দেন।
“আল্লাহ তাদের সঙ্গে উপহাস করেন”-এই অংশটি বুঝতে হলে খুব সূক্ষ্মভাবে বুঝতে হবে। আল্লাহর কোনো গুণই সৃষ্টির মতো নয়। এখানে “উপহাস” মানে মানুষের মতো ঠাট্টা করা নয়; বরং এর অর্থ হলো, তারা যেভাবে সত্যকে তুচ্ছ করেছে, আল্লাহ তাদের সেই মিথ্যা নিরাপত্তাবোধ, সেই ভুয়া চালাকি, সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে তাদের বিরুদ্ধে ফিরিয়ে দেন। তারা ভেবেছিল, তারা ঈমানকে ব্যবহার করবে, মুমিনদের ফাঁকি দেবে, দুই দিকেই সুবিধা নেবে, আর খুব চতুরভাবে বেঁচে থাকবে। আল্লাহ দেখিয়ে দেন-আসল উপহাস তো তোমাদের সাথেই হচ্ছে; কারণ তোমরা নিজেদের খুব বুদ্ধিমান ভাবছ, অথচ ধ্বংসের দিকেই হাঁটছ।
মানুষ যখন সত্যকে নিয়ে খেলা করে, একসময় সত্য তার সাথেও খেলা করে না; বরং তাকে ছেড়ে দেয়।
আর সত্য হারিয়ে যাওয়ার পর মানুষের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো-সে ভাবে সব ঠিক আছে।
এই আয়াতের দ্বিতীয় অংশটি আরও ভয়ংকর: “এবং তাদেরকে তাদের অবাধ্যতার মধ্যে বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াতে ছেড়ে দেন।”
এটাই সম্ভবত সবচেয়ে বড় শাস্তিগুলোর একটি। আগুনে পোড়ার শাস্তি তো আখিরাতে আছে, কিন্তু দুনিয়াতে একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ শাস্তি হলো-সে পথ হারাবে, অথচ নিজেকে পথেই মনে করবে। সে অন্ধকারে থাকবে, অথচ ভাববে সে আলোতে আছে। সে অবাধ্যতার ভেতর ডুবে থাকবে, অথচ সেটাকেই স্বাধীনতা ভাববে। সে দ্বিমুখী জীবনযাপন করবে, অথচ নিজেকে বাস্তববাদী বলবে। সে আত্মার রোগে আক্রান্ত হবে, অথচ নিজেকে খুব সচেতন মানুষ মনে করবে।
“ছেড়ে দেন”-এই ধারণাটিই খুব কাঁপানো।
কিন্তু কুরআন শেখায়, কখনো কখনো শাস্তি হলো-মানুষকে তার বেছে নেওয়া গোমরাহিতেই ছেড়ে দেওয়া।
সে ডাক পাবে, কিন্তু সাড়া দেবে না।
সে আয়াত শুনবে, কিন্তু তা তাকে বদলাবে না।
সে উপদেশ পাবে, কিন্তু তা তার অন্তরে নামবে না।
সে বারবার ভুল করবে, আর ভুলকে ভুল মনে করার শক্তিও হারাবে।
এ এক আধ্যাত্মিক পরিত্যাগ।
দার্শনিকভাবে এটি মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও আধ্যাত্মিক পরিণতির সবচেয়ে গভীর সংযোগগুলোর একটি। মানুষ শুরুতে নিজের সিদ্ধান্ত নেয়। সে সত্যের সামনে নত হবে, নাকি অভিনয় করবে; সে আনুগত্য করবে, নাকি সুবিধাবাদী হবে; সে তওবা করবে, নাকি পাপকে হালকা করবে। এই সব সিদ্ধান্ত জমতে জমতে একসময় তার চরিত্র হয়, তারপর নিয়তি-সদৃশ অভ্যাসে পরিণত হয়। তখন আল্লাহ তাকে তার সেই পছন্দের ভেতর ছেড়ে দেন। সে আর বাইরে থেকে টেনে তোলা আলো অনুভব করতে পারে না।
মুনাফিকের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এখানেই-সে হারিয়ে গেছে, কিন্তু তার হারিয়ে যাওয়াও তার কাছে হারিয়ে যাওয়ার মতো মনে হয় না। সে বিভ্রান্ত, কিন্তু বিভ্রান্তিকেই কৌশল মনে করে। সে অবাধ্য, কিন্তু নিজেকে স্মার্ট ভাবে। সে ঈমানের ওজন হারিয়েছে, কিন্তু ধর্মীয় ভাষা এখনো ব্যবহার করতে পারে। এই অবস্থাই ভয়ংকর।
আধ্যাত্মিকভাবে এই আয়াত আমাদের শেখায়, আল্লাহর পক্ষ থেকে “হেদায়াত” যেমন নিয়ামত, তেমনি “নিজের অবস্থার ভেতর ছেড়ে দেওয়া” শাস্তি। মানুষ যদি চায় আল্লাহ তাকে ধরুন, টানুন, ভাঙুন, ফিরিয়ে আনুন-তবে তার অন্তরে অন্তত সত্যের প্রতি সম্মান, ভুলের প্রতি লজ্জা, তওবার প্রতি আকুলতা থাকতে হবে। কিন্তু যখন সে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যার জীবন বেছে নেয়, তখন সবচেয়ে বড় ভয় হওয়া উচিত-আল্লাহ আমাকে আমার ভেতরকার অন্ধকারেই না ছেড়ে দেন।
আমি কি কখনো গুনাহ করতে করতে এমন জায়গায় পৌঁছে গেছি, যেখানে গুনাহ আর ভারী লাগে না?
আমি কি কখনো সত্য শুনে আর আগের মতো কাঁপি না?
আমি কি কখনো দ্বীনের ভাষা জানি, কিন্তু দ্বীনের ব্যথা জানি না?
আমি কি কখনো মনে করি, আমি খুব সচেতন, খুব বুদ্ধিমান-কিন্তু আল্লাহর কাছে আমি আসলে বিভ্রান্ত?
আমি কি কখনো এমন কিছুতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, যা আমাকে ধীরে ধীরে আলো থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোই মানুষকে বাঁচায়। কারণ যে ভয় পায়-“হে আল্লাহ, আপনি আমাকে ছেড়ে দেবেন না”-সে এখনো পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি।
আল্লাহর হেদায়াত ছাড়া মানুষ নিজে নিজে স্থির থাকতে পারে না।
মানুষের বুদ্ধি সীমিত, আবেগ পরিবর্তনশীল, নফস প্রতারণাপূর্ণ, সমাজ চাপসৃষ্টিকারী, শয়তান ধূর্ত।
তাই মুমিনের সবচেয়ে বড় ভরসা নিজের ধার্মিকতা না; আল্লাহর রহমত।
সে জানে, আমি ভালো আছি কারণ আমি ভালো-এটা পুরো সত্য না।
আসল সত্য হলো, আল্লাহ এখনো আমাকে পুরোপুরি ছেড়ে দেননি।
এই উপলব্ধি মানুষকে বিনয়ী করে।
সে অন্যকে দেখে অহংকার করে না।
সে নিজের ঈমান নিয়ে আত্মতুষ্ট হয় না।
সে দোয়া করে। কাঁদে। ভয় পায়। ফিরে আসে।
কারণ সে জানে, পথভ্রষ্ট হওয়া শুধু জ্ঞানহীনদের সমস্যা না; আল্লাহর সাহায্য ছাড়া যে কেউ ভেসে যেতে পারে।
সুরা বাকারার ১৫ নং আয়াতের গভীরতম কাঁপন বোধহয় এখানে-
সবচেয়ে বড় বিপদ হলো না যে মানুষ পাপে পড়েছে,
বরং এই যে সে পাপেই স্থির হয়ে গেছে।
সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো না বাহ্যিক দুঃখ,
বরং এই যে অন্তর আর সত্যের দিকে ফিরতে চায় না।
সবচেয়ে ভয়ংকর হারানো হলো না সম্পদ হারানো,
বরং হেদায়াত হারানো।
আর সবচেয়ে নির্মম অবস্থা হলো-
মানুষ ভেবে যাচ্ছে সে খুব চালাক,
অথচ আল্লাহ তাকে তার বিভ্রান্তিতেই ঘুরতে ছেড়ে দিয়েছেন।
তাই একজন মুমিনের দোয়া হওয়া উচিত:
আমাকে কখনো আমার নফসের হাতে ছেড়ে দেবেন না।
আমাকে আমার কৌশল, আমার যুক্তি, আমার বাহ্যিক ধার্মিকতার ওপর নির্ভরশীল করবেন না।
আমি ভুল করলে আমাকে ধরুন।
আমি দূরে গেলে আমাকে টানুন।
আমি গাফিল হলে আমাকে জাগিয়ে দিন।
আমি যেন এমন মানুষ না হই,
যে বিভ্রান্তির ভেতর ঘুরে বেড়ায়
আর তবুও ভাবে সে সঠিক পথে আছে।
আমাকে আপনার হেদায়াতের ভেতর বাঁচিয়ে রাখুন।
কারণ আপনি যদি ছেড়ে দেন,
তবে আমার বুদ্ধি আমাকে বাঁচাতে পারবে না,
আমার ভাষা আমাকে বাঁচাতে পারবে না,
আমার পরিচয়ও আমাকে বাঁচাতে পারবে না।
শেষ পর্যন্ত,
আল্লাহর রহমতে ধরা পড়া
আল্লাহর পক্ষ থেকে ছেড়ে দেওয়া অপেক্ষা অসীম ভালো।
কারণ যাকে আল্লাহ ভাঙেন,
তাকে তিনি গড়তেও পারেন।
কিন্তু যাকে তিনি তার অন্ধকারেই ছেড়ে দেন,
তার জন্য বিপদ সত্যিই গভীর।