এই আয়াতটি এক ধরনের আসমানি বিচার। আগের আয়াতে তারা নিজেদের পরিচয় দিয়েছে-“আমরা তো কেবল সংশোধনকারী।” আর এই আয়াতে আল্লাহ নিজেই তাদের আসল পরিচয় ঘোষণা করলেন-না, তোমরা সংশোধনকারী নও; তোমরাই ফাসাদকারী। এই “সাবধান!” শব্দটির ভেতরে এক তীব্র ধাক্কা আছে। যেন আল্লাহ পর্দা সরিয়ে দিচ্ছেন, মুখোশ খুলে দিচ্ছেন, আত্মপ্রবঞ্চনার ওপর বজ্রপাত করছেন।

এখানে সবচেয়ে কাঁপিয়ে দেওয়া বিষয় হলো-ফাসাদ তারা করছে, কিন্তু উপলব্ধি করছে না। অর্থাৎ বিপদ শুধু কাজের মধ্যে নয়, চেতনার মধ্যেও। মানুষ ভুল করতেই পারে; গুনাহ করতেই পারে; ভ্রান্তিও হতে পারে। কিন্তু যখন সে নিজের ভ্রান্তিকে আর ভ্রান্তি মনে করে না, তখন সেই অন্ধকার অনেক গভীর হয়ে যায়। কারণ তখন সে আর আলো খুঁজবে না। তখন সে আর তওবা করবে না। তখন সে আর ফিরে আসার প্রয়োজন বোধ করবে না।

এই আয়াত আমাদের শেখায়, আধ্যাত্মিক পতনের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ হলো-নিজের ক্ষয়কে উন্নতি মনে করা, নিজের বিচ্যুতিকে প্রজ্ঞা ভাবা, নিজের অন্যায়কে ন্যায্যতা দেওয়া, নিজের ধ্বংসকে সংস্কারের ভাষায় সাজিয়ে তোলা।

দার্শনিকভাবে এটি মানুষের আত্ম-ভ্রমের গভীরতম চিত্র। মানুষ কেবল অন্যকে ভুল বোঝে না, নিজেকেও ভুল বোঝে। সে নিজের উদ্দেশ্যকে অতিরিক্ত পবিত্র মনে করে, নিজের ব্যাখ্যাকে চূড়ান্ত মনে করে, নিজের অবস্থানকে নিরাপদ ধরে নেয়। ফলে সে নিজের কর্মের প্রকৃত ফল দেখতে পায় না। সে ভেবে নেয়-আমি তো ভালোই করছি। অথচ তার হাত দিয়েই সম্পর্ক ভাঙছে, সত্য দুর্বল হচ্ছে, আস্থা নষ্ট হচ্ছে, অন্তর অন্ধকার হচ্ছে, সমাজে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, ঈমানের রং ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

এখানে “ফাসাদ” শব্দটি আবারও গভীরভাবে ভাবার মতো। ফাসাদ শুধু রক্তপাত না। ফাসাদ মানে আল্লাহর স্থাপন করা ভারসাম্য নষ্ট করা। অন্তরের ফাসাদ, চিন্তার ফাসাদ, নৈতিকতার ফাসাদ, সম্পর্কের ফাসাদ, সামাজিক আস্থার ফাসাদ, দ্বীনের ভাষা বিকৃত করার ফাসাদ-এসবও সমান ভয়ংকর। কখনো একজন মানুষের জিহ্বা সমাজের চেয়ে বেশি ভাঙন ঘটাতে পারে। কখনো একটি ধারণা, একটি বিকৃত ব্যাখ্যা, একটি মিথ্যা ধার্মিকতা, একটি অভিনয়পূর্ণ নেতৃত্ব-পুরো প্রজন্মের ঈমানি বোধ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আর যারা এসব ঘটায়, তারা অনেক সময় নিজেদের খুব দরকারি, বুদ্ধিমান, বাস্তববাদী, এমনকি সংস্কারকও মনে করে।

এই আয়াত তাই শুধু একটি গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করছে না; এটি একটি চিরন্তন আধ্যাত্মিক রোগের নাম বলছে-অন্তর এমনভাবে অসুস্থ হয়ে যাওয়া, যেখানে সত্যিকারের আত্মসমালোচনা মরে যায়।

মুমিনের জন্য এখানে বড় শিক্ষা হলো: নিজের সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যাওয়া খুব বিপজ্জনক। “আমি তো ঠিক আছি”, “আমি তো ভালোই করছি”, “আমার উদ্দেশ্য তো ভালো”-এই কথাগুলো সবসময় নিরাপদ না। কারণ নফস খুব চতুর। সে মানুষকে পাপে টানে সরাসরি, আবার কখনো পাপকে নেকির পোশাক পরিয়েও টানে। সে অন্যায়কে “হিকমাহ” বলে, আপসকে “বাস্তবতা” বলে, ভীরুতাকে “ভদ্রতা” বলে, দ্বীনহীনতাকে “উদারতা” বলে, আর ফাসাদকে “সংশোধন” বলে চালিয়ে দিতে পারে।

আধ্যাত্মিকভাবে এ আয়াত আমাদেরকে নিজেকে নিয়ে ভয় করতে শেখায়। অন্যের ভণ্ডামি দেখা সহজ, নিজের ভেতরের ফাটল দেখা কঠিন। আমরা খুব সহজেই বুঝতে পারি কে মিথ্যা বলছে, কে লোক দেখাচ্ছে, কে বিভ্রান্ত করছে। কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে আমরা নরম, যুক্তিপ্রবণ, অজুহাতপ্রিয়। এখানেই এই আয়াতের আলো প্রয়োজন।

এটি আমাকে প্রশ্ন করতে শেখায়:
আমি যা করছি, তাতে সত্য শক্ত হচ্ছে, নাকি দুর্বল?
আমার কারণে মানুষ আল্লাহর দিকে ফিরছে, নাকি দূরে যাচ্ছে?
আমার কথা, আমার পোস্ট, আমার আচরণ, আমার সিদ্ধান্ত-এগুলো কি অন্তরে নূর বাড়ায়, নাকি কেবল উত্তেজনা, বিভাজন, অহংকার ও বিভ্রান্তি বাড়ায়?

আমি কি সংশোধন করছি, নাকি অজান্তেই নষ্ট করছি?
আমি কি আল্লাহর কিতাবের সামনে নিজেকে মাপছি, নাকি নিজের মনকে মানদণ্ড বানিয়ে ফেলেছি?

এই আয়াতে “তারা উপলব্ধি করে না” কথাটাই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ উপলব্ধি হারিয়ে গেলে মানুষ আধ্যাত্মিকভাবে প্রায় অন্ধ হয়ে যায়। তখন সে আয়াত শুনেও নিজের জন্য নেয় না। উপদেশ শুনেও ভাবে অন্যদের জন্য। সমালোচনা শুনে আত্মশুদ্ধি না করে রাগ করে। তওবার দরজা সামনে থাকলেও নিজের রোগকে রোগ বলে মানতে পারে না।

এ কারণেই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় নিয়ামতগুলোর একটি হলো-সুস্থ আত্মসমালোচনা। যে মানুষ নিজের ভুলের সম্ভাবনাকে ভয় পায়, সে বেঁচে আছে। যে মানুষ দোয়া করে, “হে আল্লাহ, আমার ভেতরের ফাসাদ আমাকে দেখিয়ে দিন”-তার জন্য এখনো আশা আছে। যে কাঁদতে পারে এই ভেবে যে, “আমি বুঝি ঠিক আছি, কিন্তু আপনি জানেন আমি আসলে কী”-সে এখনো ধ্বংসের শেষ সীমানায় পৌঁছেনি।

ঈমান জাগানিয়া দিক থেকে এই আয়াত আমাদের সামনে এক গভীর সত্য স্থাপন করে: সত্যের মানদণ্ড আমি না, আল্লাহ। নিজেকে সংশোধনকারী ভাবলেই সংশোধনকারী হওয়া যায় না। মানুষের প্রশংসা পেলেই কল্যাণকর হওয়া যায় না। গ্রহণযোগ্য হলেই সঠিক হওয়া যায় না। প্রভাবশালী হলেই হকপন্থী হওয়া যায় না। আল্লাহ যাকে ফাসাদকারী বলেন, তার সব বাহ্যিক সৌন্দর্য এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ে।

এই আয়াত মুমিনকে নরম করে, থামায়, নামিয়ে আনে। তাকে শেখায়-তুমি নিজের নিয়তকেও পরীক্ষা করবে, নিজের ভাষাকেও, নিজের ক্রোধকেও, নিজের আদর্শবাদকেও, নিজের দাওয়াকেও, নিজের অবস্থানকেও। কারণ নফস শুধু হারাম দিয়ে মানুষকে ভাঙে না; কখনো কখনো “আমি তো ভালোই করছি” এই ভাবনাটাই সবচেয়ে বড় পর্দা হয়ে দাঁড়ায়।

একজন মুমিনের তাই বারবার বলা দরকার:
হে আল্লাহ,
আমাকে এমন মানুষ বানাবেন না
যে নষ্ট করে অথচ ভাবে সে গড়ছে।
আমাকে এমন অন্তর দিন
যে অন্তর সত্যের সামনে নরম থাকে।
আমাকে আমার ভুল দেখার চোখ দিন।
আমাকে আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে রক্ষা করুন।
আমার ভেতরের লুকানো ফাসাদকে
আপনি নিজেই চিহ্নিত করে দিন।
আমি যেন নিজের কাছে নিরাপদ বোধ করে
আপনার কাছে ধ্বংসপ্রাপ্ত না হই।
সুরা বাকারার ১২ নং আয়াতের গভীরতম শিক্ষা বোধহয় এই-
মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর হারিয়ে যাওয়া তখনই,
যখন সে আর বুঝতেই পারে না যে সে হারিয়ে গেছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর অন্ধকার তখনই,
যখন মানুষ অন্ধকারকে আলো মনে করে।
সবচেয়ে ভয়ংকর ফাসাদ তখনই,
যখন তা সংশোধনের ভাষায় আত্মপ্রকাশ করে।
তাই বাঁচার পথ একটাই-
নিজেকে কম বিশ্বাস করা,
আল্লাহর কিতাবকে বেশি মানদণ্ড বানানো,
এবং সবসময় এই ভয় রাখা:
হে আল্লাহ, আমি যেন নিজের অজান্তে
সত্যের বিরুদ্ধে না দাঁড়াই।
কারণ যে মানুষ নিজের ভেতরের ফাসাদকে ভয় করে,
আল্লাহর রহমতে সেই মানুষই
একদিন সত্যিকারের ইসলাহর পথে পৌঁছে যায়।