এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, যেন কিয়ামতের আদালতের দরজা একটু ফাঁক হয়ে গেছে। আল্লাহ বলছেন, যাদের কাছে রাসূল প্রেরিত হয়েছেন, তাদেরও তিনি জিজ্ঞেস করবেন; আর যাঁরা বার্তা বহন করেছেন, তাঁদেরও তিনি জিজ্ঞেস করবেন। অর্থাৎ এ পৃথিবীতে কিছুই অগোচর নয়, কারও কাছে ওহির আলো পৌঁছেছে কি না, সে আলোকে কেউ গ্রহণ করেছে কি না, কিংবা অবহেলা, অস্বীকার, বিকৃতি, অথবা উদাসীনতার অন্ধকারে সে আলো নিভিয়ে দিয়েছে কি না—সবকিছুই একদিন প্রশ্নের মুখে আসবে। এই প্রশ্ন কেবল তথ্য জানার জন্য নয়; এটি জবাবদিহির সেই কঠিন মুহূর্ত, যখন মানুষের বাহানা, গর্ব, সামাজিক অজুহাত, পারিবারিক উত্তরাধিকার, এবং বাহ্যিক ধার্মিকতার মুখোশ—সব খসে পড়বে।

এই সূরা আল-আরাফের প্রারম্ভিক ধারায় আদম-ইবলিসের কাহিনি, হিদায়াতের আহ্বান, এবং পূর্ববর্তী জাতিসমূহের পরিণতির স্মরণ—সবকিছুই একই সত্যকে ঘিরে ঘোরে: আল্লাহর নির্দেশের সামনে মানুষকে একদিন দাঁড়াতেই হবে। তাই এখানে মানুষের কাছে প্রশ্ন হবে, বার্তা পৌঁছেছিল তো? হককে চেনার পর তাকে কী করা হয়েছিল? আর রাসূলগণের কাছে প্রশ্ন হবে, তাঁরা কি স্পষ্টভাবে পৌঁছে দিয়েছিলেন, দাওয়াতের হক আদায় করেছিলেন, এবং নিজের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করেছিলেন? এই প্রশ্নে রাসূলগণ নির্দোষ; বরং মানবজাতির ভ্রষ্টতা বা গ্রহণশীলতা প্রকাশ পাবে, যেন প্রমাণিত হয়—আল্লাহর হুজ্জত মানুষের ওপর পূর্ণ হয়েছে।

এ আয়াত মানুষের অন্তরকে নরম করে, কারণ এটি মনে করিয়ে দেয় যে দুনিয়ার বড় বড় হিসাবের পেছনে এক গভীরতর হিসাব দাঁড়িয়ে আছে: ওহির প্রতি কী আচরণ করেছি আমরা? হিদায়াতকে সম্মান করেছি, না কি কেবল শুনে সরিয়ে রেখেছি? তাকওয়ার পথে পা রেখেছি, না কি আখিরাতের ডাককে দূরের কোনো কথা ভেবে কাটিয়ে দিয়েছি? যারা বার্তা বহন করেন, তাঁদের জন্যও এটি এক ভারী আমানতের স্মরণ; আর যাদের কাছে বার্তা পৌঁছে গেছে, তাদের জন্য এটি এক ভীতিময় আয়না। কিয়ামতের দিন প্রশ্ন আসবে, এবং সেই প্রশ্নের উত্তরে কেবল সত্য, তাওবা, ও আল্লাহর রহমতের আশ্রয়ই মানুষকে কিছুটা বাঁচাতে পারে।

এই আয়াত যেন কিয়ামতের এক নীরব ঘণ্টাধ্বনি—মানুষের অন্তরে জমে থাকা সব অজুহাতের ওপর, আর ইতিহাসের ধুলোমাখা পর্দার ওপর আল্লাহর চূড়ান্ত জিজ্ঞাসার ছায়া। যাদের কাছে রসূল এসেছিলেন, তাদেরও জিজ্ঞেস করা হবে; আর যাঁরা রসূল, তাঁদেরও জিজ্ঞেস করা হবে। অর্থাৎ সত্য কখনোই কেবল শোনা-না-শোনার গল্প নয়, এটি এক জবাবদিহির পথ—বার্তা পৌঁছেছে কি না, পৌঁছে থাকলে হৃদয় তা কতখানি গ্রহণ করেছে, তা কি অবহেলায় হারিয়ে গেছে, নাকি অহংকারে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। মানুষের কাছে তখন জাত, বংশ, সময়, পরিবেশ, সমাজ—কোনো পর্দাই কাজে আসবে না; কারণ আল্লাহর দরবারে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো: তোমার কাছে হিদায়াত এসেছিল, তুমি তার সঙ্গে কী আচরণ করেছিলে?

আর রসূলগণের প্রশ্নও আমাদের কাঁপিয়ে দেয়। কারণ এতে বোঝা যায়, দাওয়াতের দায়িত্ব নিজস্ব সাফল্য দিয়ে বিচার হবে না; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে কীভাবে পৌঁছে দেওয়া হলো, কীভাবে সত্যের আমানত বহন করা হলো, সেটাই মূল মানদণ্ড। তাই এই আয়াত একদিকে মানবজাতিকে জাগিয়ে তোলে, অন্যদিকে নবীদের মর্যাদাকেও উজ্জ্বল করে—তাঁরা নিজেরা নয়, ওহির বিশ্বস্ত বাহক। সূরা আল-আরাফের শুরু থেকেই যে আদম-ইবলিসের সংঘাত, হিদায়াত ও গোমরাহির দ্বন্দ্ব, আর জাতিসমূহের পতনের ইশারা চলে আসছে, এই আয়াত সেই সমগ্র ইতিহাসকে এক বাক্যে দাঁড় করায়: মানুষকে একদিন আল্লাহর সামনে জবাব দিতেই হবে। আজ যারা শুনেও চুপ, যারা সত্য জেনে ওজর খোঁজে, যারা পথ চিনেও পথের দাম দেয় না—তাদের জন্য এ আয়াত ভয়ে কাঁপা এক আয়না। আর যার অন্তরে ঈমান জেগে আছে, তার জন্য এটি আশ্বাসও বটে: সত্য হারিয়ে যায় না, হিসাব ছাড়া কিছুই পড়ে থাকে না, এবং শেষ বিচারে আল্লাহই ন্যায়ের পরম মালিক।
এই প্রশ্নের ভয়েই হৃদয় কেঁপে ওঠে, কারণ এখানে বাহ্যিক পরিচয়ের কোনো আশ্রয় নেই। মানুষ কেবল নিজেকে “ভাল” বলে প্রমাণ করবে না; তাকে বলা হবে, যা শোনানো হয়েছিল, তা সে কী করেছিল। সমাজে কত মতের ভিড়, কত প্রথার চাপ, কত উত্তরাধিকারী অন্ধকার—সবকিছুর ওপরে দাঁড়িয়ে শেষ কথা হবে আল্লাহর প্রশ্ন। যাদের কাছে রাসূলগণ এসেছিলেন, তারা কি সত্য শুনে নীরব হয়েছিল, নাকি অহংকারে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল? তারা কি হিদায়াতকে গ্রহণ করেছিল, নাকি অভ্যাসের গায়ে আঁকড়ে ধরে বেঁচেছিল? এই আয়াত আমাদের শেখায়, বার্তা পৌঁছানো মানেই দায়িত্ব শেষ নয়; বরং তখনই মানুষের আসল পরীক্ষা শুরু হয়।

আর যাঁরা বার্তা বহন করেছেন, তাঁদেরও আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন—কেমনভাবে পৌঁছে দিয়েছেন, কোনো কিছু লুকিয়েছেন কি না, সত্যকে বিকৃত করেছেন কি না, দাওয়াতের আমানতকে হেলাফেলা করেছেন কি না। এতে একদিকে রাসূলগণের মর্যাদা আরও উজ্জ্বল হয়, অন্যদিকে মানুষের জবাবদিহি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। কিয়ামতের সেই ময়দানে গর্বের অবকাশ থাকবে না, কারণ সবকিছুই আল্লাহর সামনে উন্মুক্ত হবে; অন্তরের গোপন ইচ্ছা, সমাজের সম্মিলিত ভণ্ডামি, ধর্মের নামে আত্মপ্রবঞ্চনা—সবই প্রকাশ পাবে। কিন্তু এই ভয়ই মুমিনের জন্য রহমত, যদি তা তাকে জাগিয়ে তোলে। আজই নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হয়: আমার কাছে যে সত্য পৌঁছেছে, আমি কি তাকে সম্মান করেছি? আমি কি নিজের নফসের বিরুদ্ধে, আল্লাহর হকের পক্ষে দাঁড়িয়েছি? নাকি আমি এমন একজন হয়েছি, যার কাছে বার্তা এসেছে, কিন্তু হৃদয় তবু অন্ধই রয়ে গেছে?

এই আয়াত আমাদের অহংকারের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। মানুষ কত অজুহাতে নিজেকে বাঁচাতে চায়—কেউ বলে জানতাম না, কেউ বলে সবাই এমনই করে, কেউ বলে সময় ছিল না, কেউ বলে পরিবেশ এমন ছিল। কিন্তু কিয়ামতের ময়দানে এসব কথা ধুলো হয়ে উড়ে যাবে। তখন প্রশ্ন হবে, সত্য পৌঁছেছিল কি না; আর পৌঁছে থাকলে হৃদয় তার সামনে নত হয়েছিল কি না। আল্লাহর প্রশ্ন মানুষের স্মৃতির সীমায় বাঁধা নয়; তা অন্তরের গুপ্ত ইচ্ছা, অবহেলার দীর্ঘ অভ্যাস, আর হিদায়াতের প্রতি নীরব প্রতিরোধ—সবকিছুর ওপরই পড়বে। যাদের কাছে রাসূলগণ প্রেরিত হয়েছেন, তাদেরও জবাব দিতে হবে; আর যাঁরা বার্তা বহন করেছেন, তাঁদেরও জবাব দিতে হবে। সত্যের বোঝা যার কাঁধে এসেছে, তার আর নির্ভার থাকার সুযোগ কোথায়?

এই চিন্তা মানুষকে কেবল ভয়ের মধ্যে ফেলে না, বরং কোমলভাবে জাগিয়ে তোলে। কারণ জবাবদিহির অর্থ শুধু শাস্তির আশঙ্কা নয়, বরং আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে সত্য কথা বলার মর্যাদা। আজকের জীবন যেন ঢেকে রাখে—কত কিছু, কত মুখোশ, কত আত্মপ্রবঞ্চনা। কিন্তু আখিরাতে ঢাকার কিছু থাকবে না; সেদিন অন্তরই সাক্ষী হবে, কানই সাক্ষ্য দেবে, পথই প্রকাশ করবে। তাই আজই সেই অন্তরকে নরম করতে হয়, আজই সেই অবহেলাকে অশ্রু দিয়ে ধুতে হয়। যে ব্যক্তি আজ আল্লাহর ডাকে সাড়া দেয়, কাল সে অপমানিত হবে না। আর যে ব্যক্তি আজ বার্তা শুনেও হৃদয় বন্ধ করে রাখে, তার নীরবতা একদিন ভয়ানক প্রশ্ন হয়ে ফিরে আসবে। হে আল্লাহ, আমাদেরকে এমন বানিয়ো না যাদের কাছে সত্য পৌঁছেছিল অথচ তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল; বরং আমাদেরকে সেইসব মানুষের অন্তর্ভুক্ত করো, যারা শুনে নত হয়, জেনে তওবা করে, এবং আপনার সামনে লজ্জিত হৃদয়ে ফিরে আসে।