এই আয়াতটি মানুষের অন্তরের শেষ উচ্চারণকে সামনে আনে—যখন আল্লাহর শাস্তি এসে পড়ে, তখন আর কোনো ভাষা থাকে না, আর কোনো জবাব বাঁচে না; তখন শুধু একটাই বাক্য কাঁপতে কাঁপতে বের হয়ে আসে: আমরা ছিলাম জালিম। কত অজুহাত, কত আত্মপক্ষ, কত অবহেলার পর্দা মানুষ বানায় নিজের জন্য; কিন্তু আখিরাতের সত্যের সামনে, কিংবা দুনিয়াতেই আল্লাহর পাকড়াও নেমে এলে, সেই সব পর্দা ছিঁড়ে যায়। তখন বোঝা যায়, মিথ্যা নিরাপত্তা ছিল আসলে ধোঁয়া, আর গুনাহ ছিল ভিতরে জমে থাকা এক নীরব আগুন।

সূরা আল-আরাফের এই অংশে আল্লাহ তা‘আলা পূর্ববর্তী জাতিগুলোর পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। নির্দিষ্ট কোনো একক ঐতিহাসিক ঘটনার সীমায় এটিকে বেঁধে দেওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং এটি মানবজাতির সামগ্রিক বাস্তবতা—যে সমাজ অহংকারে হিদায়াত প্রত্যাখ্যান করে, সত্যকে দেরিতে গ্রহণ করে, এবং ন্যায়কে বারবার পদদলিত করে, তাদের পরিণাম এক ভয়াবহ আত্মস্বীকারে এসে ঠেকে। আযাব যখন সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন মানুষের কণ্ঠে তর্কের শক্তি থাকে না; শুধু নিজের জুলুমের স্বীকৃতি থাকে।

এই আয়াত আমাদের শেখায়, জুলুম কেবল অন্যের অধিকার নষ্ট করা নয়; জুলুম হলো আল্লাহর সীমাকে হালকা ভাবা, নাফরমানিকে স্বাভাবিক করা, এবং তওবার দরজা খোলা থাকা সত্ত্বেও দেরি করে ফেলা। কুরআন আমাদের ভয় দেখায় যেন আমরা ধ্বংসের পরে অনুতাপ না শিখি, বরং হিদায়াতের আলোয় আগেই জেগে উঠি। কারণ আখিরাতের ময়দানে যখন সত্য উন্মোচিত হবে, তখন সবচেয়ে মর্মান্তিক বাক্যটি আর কবিতার মতো শোনাবে না—তা হবে পোড়া হৃদয়ের স্বীকারোক্তি: নিশ্চয় আমরা অত্যাচারী ছিলাম।

আল্লাহর আযাব যখন নেমে আসে, তখন মানুষের ভাষা বদলে যায়। যে মুখ একদিন অহংকারে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, যে হৃদয় একদিন বারবার সতর্কবার্তা শুনেও নরম হয়নি, সে-ই মুখ শেষে কাঁপতে কাঁপতে বলে ওঠে—নিশ্চয় আমরা জালিম ছিলাম। এ কোনো বিজয়ের ভাষা নয়, এ কোনো মর্যাদার উচ্চারণও নয়; এ হলো ধ্বংসের কিনারে দাঁড়িয়ে মানুষের নিজের বিরুদ্ধে দেওয়া সাক্ষ্য। যত অজুহাত, যত আত্মপক্ষ, যত গর্বের দেয়াল—সব ভেঙে পড়ে যখন আল্লাহর পাকড়াও এসে মানুষের অন্তরের ভেতর পর্যন্ত আলো ফেলে। তখন স্পষ্ট হয়ে যায়, জুলুম শুধু অন্যের ওপর অবিচার নয়; জুলুম হলো আল্লাহর দেওয়া হিদায়াতকে অবজ্ঞা করা, সত্যকে পেছনে ঠেলে দেওয়া, আর নিজের আত্মাকে অন্ধকারে বন্দী রাখা।

এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, তওবা হলো আযাবের আগের আশ্রয়; আযাবের পরে উচ্চারিত অনুতাপ অনেক সময় শুধু শোকের শব্দ হয়ে থাকে। মানুষ দুনিয়াতে যতদিন অবকাশ পায়, ততদিনই তার সামনে ফিরে আসার দরজা খোলা থাকে; কিন্তু যখন ফল এসে যায়, তখন বীজের জন্য আর কান্না কাজ করে না। তাই কুরআন আমাদের কেবল অতীত জাতিগুলোর পতন শোনায় না, বরং আমাদের হৃদয়ের দরজায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করে—তুমি কি এখনো নিজের জুলুম চিনতে পারছ? তুমি কি এখনো আল্লাহর দিকে ফিরে আসবে, নাকি সত্যকে দেরি করে, শেষ মুহূর্তের অসহায় স্বীকারোক্তিতে নিজেকে সমর্পণ করবে? সূরা আল-আরাফের এই বাণী আমাদের তাকওয়ার দিকে ডাকে, যেন আযাবের সামনে নয়, রহমতের দুয়ারেই আমাদের মুখ থেকে বের হয় বিনম্র স্বীকারোক্তি, আর আমরা বলে উঠি—হে রব, আমরা জালিম ছিলাম; আপনি আমাদের ক্ষমা করুন, আমাদের সোজা পথে ফিরিয়ে নিন।
আল্লাহ যখন তাঁর পাকড়াও সামনে এনে দেন, তখন মানুষের সব সাজানো ভাষা ধসে পড়ে। যে জবাবকে মানুষ দিনভর বুকের ভেতর পুষে রেখেছিল, যে যুক্তিকে দিয়ে সে নিজের ভুলকে বৈধ বানাতে চেয়েছিল, সে-সবই তখন অর্থহীন ধুলোর মতো উড়ে যায়। এই আয়াত আমাদের খুব নীরবে কিন্তু খুব নির্মমভাবে জানিয়ে দেয়—আযাবের মুহূর্তে মানুষ আর কিছুই বলতে পারে না, শুধু বলতে পারে: আমরা ছিলাম জালিম। অর্থাৎ দোষের মূল জায়গাটা আর বাইরের কোনো ঘটনায় নয়, নিজের ভেতরের জুলুমে। নিজের নফসকে ছাড় দিয়েছি, সত্যকে ঠেকিয়ে রেখেছি, আল্লাহর সতর্কবার্তাকে হালকা করেছি—শেষে যখন সত্য সামনে দাঁড়ায়, তখন আর অজুহাত থাকে না, থাকে শুধু ভাঙা হৃদয়ের স্বীকারোক্তি।

এখানে এক ভয়ংকর সামাজিক পাঠও আছে। কোনো জাতি, কোনো সমাজ, কোনো পরিবার যখন অন্যায়কে স্বাভাবিক করে ফেলে, যখন দুর্বলকে চাপা দেওয়া, সত্যকে এড়িয়ে যাওয়া, ন্যায়কে বিলম্বিত করা আর আত্মপ্রবঞ্চনাকে বুদ্ধিমত্তা মনে করা শুরু করে, তখন পতন দূরে থাকে না। আল্লাহর রাহমত অসীম, কিন্তু সেই রাহমতের দরজায় পৌঁছাতে হলে জুলুমের পথ ছেড়ে ফিরতে হয়; নইলে হিদায়াতের আহ্বান বারবার এলে-ও অন্তর পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। সূরা আল-আরাফের এই সতর্কবার্তা যেন আমাদের সমাজের প্রতিটি বিবেককে জাগিয়ে দেয়—যাতে আমরা মন্দকে শুধু মন্দ হিসেবে না দেখে, তাকে নিজেদের নীরব সম্মতির কারণে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠতে না দিই।

তাই এই আয়াত তাওবার দাওয়াতও বটে, আতঙ্কের দাওয়াতও বটে। আতঙ্ক এ কারণে যে, দেরি হয়ে গেলে অনুতাপও কেবল ইতিহাস হয়ে থাকে; আর দাওয়াত এ কারণে যে, আজও দরজা খোলা আছে, আজও ফিরবার সময় আছে, আজও ‘আমরা ছিলাম জালিম’ বলে আল্লাহর সামনে নত হওয়ার সুযোগ আছে। যে হৃদয় এখনই জেগে ওঠে, সে আযাবের ভাষা শোনার আগেই করুণাময়ের দিকে ফিরে যায়। আর যে হৃদয় সত্যকে এড়িয়ে চলতে চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তার শেষ উচ্চারণও হতে পারে এই একই বাক্য—কিন্তু তখন তা মুক্তির নয়, বিলম্বিত বেদনার ভাষা হবে। আল্লাহ আমাদেরকে সেই দেরির দুঃখ থেকে হেফাজত করুন, এবং আমাদের অন্তরকে এমন জাগিয়ে দিন, যাতে আমরা আযাব আসার আগেই জুলুম থেকে ফিরে আসতে পারি।

এই আয়াত যেন আমাদের বুকের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব বিচারক। আজ আমরা যতই নিজেদের নির্দোষ সাজাই, যতই ভুলকে নাম দিই পরিস্থিতি, অভ্যাস, চাপ বা সময়ের—আল্লাহর সামনে গিয়ে সেই সব নাম টিকবে না। তখন মানুষের মুখে যে শেষ বাক্যটি কাঁপতে কাঁপতে ওঠে, সেটি নতুন কোনো ভাষা নয়; সেটি চিরন্তন সত্যের স্বীকার—আমরাই ছিলাম জালিম। যে হৃদয় আজও সতর্ক হয় না, যে চোখ আজও কাঁদে না, সে হৃদয়ের জন্য এই আয়াত এক নির্মম করুণা: দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই ফিরে এসো।

জুলুম শুধু মানুষের ওপর নয়; কখনো তা নিজের আত্মার ওপরও হয়। গুনাহের প্রতিটি মুহূর্তে মানুষ নিজের অন্তরকে ক্ষতবিক্ষত করে, নিজের ফিতরাতের আলোকে চাপা দেয়, নিজের রবের ডাককে পিছিয়ে দেয়। তারপর যখন আযাবের ছায়া নেমে আসে, তখন বোঝা যায়—যা এতদিন তুচ্ছ মনে হয়েছিল, সেটাই ছিল ধ্বংসের দরজা। সেদিন অনুতাপ সত্যি হয়, কিন্তু দেরির কারণে সে অনুতাপ আর মুক্তির চাবি থাকে না; সে শুধু পুড়ে যাওয়া হৃদয়ের আর্তি হয়ে থাকে।

তাই এখনই প্রয়োজন সেই স্বীকারোক্তি, যা আযাবের সামনে নয়, রহমতের সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চারিত হয়: হে আল্লাহ, আমি অন্যায় করেছি। আমি নিজেকে ধ্বংসের পথে নিয়েছি। তুমি আমাকে ফিরিয়ে নাও। কিয়ামতের ভয়, আখিরাতের হিসাব, পূর্ববর্তী জাতিগুলোর পতন—সবই আমাদের শেখায়, সত্যকে অবহেলা করার মূল্য খুব ভয়ংকর। যে মানুষ আজই নিজের জুলুম চিনে নেয়, তওবার দরজায় কাঁপতে কাঁপতে ফিরে আসে, আল্লাহ তার জন্য দয়া খুলে দিতে পারেন। কিন্তু যে অহংকারে ঘুমিয়ে থাকে, তার জেগে ওঠা হতে পারে কেবল আযাবের শব্দে।