এই আয়াত যেন মানুষের অন্তরকে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে তোলে: তোমাদের রব কে? উত্তরটি সরল, কিন্তু এর ভিতরে আছে সমস্ত অস্তিত্বের রহস্য—তিনি আল্লাহ। আকাশ ও জমিন তাঁরই সৃষ্টি; এ সৃষ্টি কোনো আকস্মিকতা নয়, কোনো অন্ধ শক্তির খেলা নয়, বরং জ্ঞান, ইচ্ছা ও ক্ষমতার নিখুঁত প্রকাশ। ছয় দিনে সৃষ্টি করার কথা উল্লেখ করে কুরআন আমাদের শেখায়, আল্লাহর কাজ মানুষের তাড়াহুড়োর মাপে বাঁধা নয়; তিনি যা ইচ্ছা করেন, যেমন ইচ্ছা করেন, তেমনই করেন। আমাদের চোখের সামনে প্রতিদিন যে জগৎ খুলে যায়, সেটিও আসলে এক মহান রবের পরিকল্পিত শাসনের ভেতরেই খুলছে।
আরশের উপর ইস্তিওয়ার কথা এসে মানুষের কল্পনা থমকে যায়। এটি আমাদেরকে আল্লাহর মহিমা স্মরণ করায়, অথচ তাঁর সত্তাকে সৃষ্টির মতো করে ভাবতে নিষেধ করে। এরপর রাত ও দিনের পরস্পর-অনুসরণ, সূর্য-চন্দ্র-নক্ষত্রের বশীভূত চলা—সবকিছু যেন এক মহাজাগতিক সিজদা। দিন রাতের পেছনে ছুটে আসে, কিন্তু কখনোই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে না; আলো অন্ধকারকে অতিক্রম করে, তবু একে অন্যকে মুছে ফেলে না। এ শৃঙ্খলা আমাদের হৃদয়ে বলে, যে রব এত সূক্ষ্মভাবে আকাশের নকশা রক্ষা করেন, তিনি মানুষের গোপন কাজও দেখেন, তার তওবাও শোনেন, তার অবাধ্যতাও লিপিবদ্ধ রাখেন।
সূরা আল-আরাফের ধারাবাহিকতায় এই আয়াত একটি বড় মোড়ের মতো। আদম-ইবলিসের কাহিনি, নবীদের আহ্বান, জাতিসমূহের পতন—সব কিছুর মাঝখানে কুরআন বারবার মানুষকে ফিরিয়ে আনে তাওহিদের কেন্দ্রে: যে সত্তা সৃষ্টি করেন, আদেশও তাঁরই। অর্থাৎ হিদায়াত কেবল নৈতিক উপদেশ নয়; এটি রবুবিয়্যতের স্বীকৃতি। যার কাছে সৃষ্টি-জগৎ আল্লাহরই, তার কাছে জীবন-জীবিকা-সম্মান-ভয়-আশাও আল্লাহরই হওয়া উচিত। এই বোধই তাকওয়ার শিকড়, আর তাকওয়ার শেষ ঠিকানা আখিরাতের জবাবদিহি। যখন মানুষ বুঝে ফেলে যে সে নিজের মালিক নয়, তখন তার হৃদয় নরম হয়, অহংকার ভেঙে পড়ে, আর সে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়।
এই আয়াত শুধু আকাশের দিকে তাকাতে বলে না; এটি মানুষের ভেতরের অহংকারের মূলে আলো ফেলে। যে সত্তা আসমান-যমীনকে শূন্য থেকে অস্তিত্ব দান করেন, তাঁর সামনে মানুষের দম্ভ কত ক্ষুদ্র, কত ভঙ্গুর, কত অস্থির। আমরা কত সহজে নিজের পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত মনে করি, অথচ আমাদের শ্বাসও তাঁরই নিয়ন্ত্রণে। আল্লাহর রবুবিয়্যতের এই ঘোষণা হৃদয়কে শিখিয়ে দেয়—এ জগৎ অনাথ নয়, মালিকহীন নয়, উদ্দেশ্যহীনও নয়। সবকিছুই এক জ্ঞানময় শাসনের অধীনে চলছে; তাই মুমিনের জীবনও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নয়, বরং রবের দিকে ফিরতে থাকা এক নিরন্তর যাত্রা।
এই আয়াতের শেষের বাক্যটি—সৃষ্টিও তাঁর, আদেশও তাঁর—মুমিনের অন্তরে এক গভীর প্রশান্তি ও ভয় একসঙ্গে জাগিয়ে তোলে। সৃষ্টি মানে তিনি আদি থেকে অস্তিত্ব দেন; আদেশ মানে তিনি জীবনের পথ নির্ধারণ করেন। তাই হিদায়াত কোনো মানব-উদ্ভাবন নয়, বরং সেই রবের ডাকে সাড়া দেওয়া, যিনি সব কিছুর উপর কর্তৃত্বশালী এবং সব কিছুর অন্তর্নিহিত সত্য জানেন। এখানে আখিরাতের স্মরণও মৃদুভাবে জেগে ওঠে: যে রব এ মহাবিশ্বকে এমন শৃঙ্খলায় পরিচালনা করেন, তাঁর সামনে ফিরে দাঁড়ানোর দিনও অবশ্যম্ভাবী। তখন মানুষের সব অজুহাত, সব অহংকার, সব ভুলে থাকা—সবই নীরব হয়ে যাবে।
এই আয়াত এমনভাবে রবকে সামনে আনে, যেন হঠাৎ করে মানুষের অন্তরে জানালার পর্দা সরে যায়। প্রশ্নটা আর তাত্ত্বিক থাকে না—তোমাদের প্রতিপালক কে? তিনি আল্লাহ, যিনি আকাশমণ্ডল ও ভূমণ্ডলকে সৃষ্টি করেছেন, এবং তারপর আরশের উপর ইস্তিওয়া করেছেন—কোনো অনুপস্থিত শাসক নন, কোনো দূর-দূরান্তের দর্শক নন। তিনি রাতকে দিনের উপর জড়ো করেন, দিনকে রাতের পিছনে ধাবিত করেন; সূর্য-চন্দ্র-নক্ষত্রকে আপন আদেশে চলতে বাধ্য করে দেন। এই শৃঙ্খলার দিকে তাকালে হৃদয় বুঝে নেয়: জীবনের যে ব্যস্ততা, সমাজের যে ঘূর্ণি, মানুষের যে দাবি—সবই যদি সত্যি সত্যি নজরদারিহীন হতো, তবে রাত এত নিয়মে দিনকে খুঁজে পেত না, পথভ্রষ্ট হতো নক্ষত্রের দৌড়। আর যখন সৃষ্টির এমন হিসাব-নিকাশ দৃশ্যমান, তখন নিজের ভেতরের হিসাবও স্থগিত থাকার কথা নয়।
তাই কুরআনের ‘সৃষ্টি ও আদেশ’—আল-খালক ও আল-আমর—এই দুইয়ের স্মরণ আমাদের আত্মাকে জাগিয়ে তোলে: তোমার জীবন শুধু ঘটনার সমষ্টি নয়; তা রবের বিধান ও ব্যবস্থাপনার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত। যে মানুষ অহংকারে নিজেকে বড় ভাবতে চায়, তাকে আয়াত থামিয়ে দেয়—কারণ আকাশ-জমিনের মালিকানা তাঁরই, চলার অধিকার তাঁরই; তোমার ক্ষমতা এক মুহূর্তের নয়, তোমার সিদ্ধান্ত একা নিজে থেকে জন্মায় না। আবার যে মানুষ হতাশায় ডুবে যায়, তার কাছেও এই কথাই ফেরে—আল্লাহ সৃষ্টি করেন, আবার আদেশও দেন; অর্থাৎ পথ আছে, তওবার দর আছে, সংশোধনের আলো আছে। সমাজে যখন ন্যায় হারায়, হৃদয় যখন কঠিন হয়, লোকেরা যখন সত্যকে ঢেকে ফেলে—তখন এই আয়াত যেন কাঁপিয়ে বলে, ফিরে যাও রবের সামনে; কারণ প্রতিটি আত্মা একদিন নিজ কাজের সাক্ষী হবে, আর প্রতিটি নিঃশ্বাসেরও উত্তর দিতে হবে।
সবচেয়ে গভীরভাবে, এই আয়াত মানুষকে আখিরাতের দিকে টানে—যেখানে রাত-দিনের দৌড় থামে, কিন্তু হিসাব শুরু হয়। আজ আমরা যে আনন্দ সাজাই, যে ভয় চাপা দিই, যে অন্যায়কে অভ্যাস বানাই—সব কিছুর শেষে দাঁড়িয়ে থাকবে না কোনো বাহ্যিক শক্তি, থাকবে না মানুষের দাবি; থাকবে আল্লাহর রবুবিয়্যত, তাঁর অধিকার, তাঁর আদেশ। মনে রেখ, তোমার হৃদয়ও একসময় ‘আলো-অন্ধকারের মতো’ ঘুরে যাবে—ভুল ঢেকে দেবে, তারপর সত্য উঠে আসবে; কিন্তু তোমার প্রতিফলন নির্ভর করবে তুমি আজ কোন দিকটাকে বেছে নিচ্ছ। বরকতময় সেই রবই তোমাকে ডেকে নিচ্ছেন—তোমার ভয়কে আশায় রূপান্তর করতে, তোমার আশা যেন তওহিদের পথে স্থির থাকে; যাতে আত্মা যখন ফিরে আসে, সে যেন শুধু কষ্টের ভিড় নিয়ে না ফিরে আসে, বরং তাকওয়া নিয়ে ফিরে আসে, এবং সৃষ্টির সেই মালিকের সামনে শান্তি পায়।
যে রব আসমান-জমিনকে সৃষ্টি করেছেন, রাতকে দিনের গায়ে জড়িয়ে দেন, দিনের শ্বাসে রাতকে তাড়া করান, সূর্য-চন্দ্র-নক্ষত্রকে তাঁর হুকুমে বেঁধে রেখেছেন—তিনি কি মানুষের বিদ্রোহে অচল হয়ে যান? না, বরং মানুষই প্রতিটি নিঃশ্বাসে তাঁর মুখাপেক্ষী। এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে অহংকারের কপাল নত হয়ে আসে। কারণ যে মাটিকে আমরা পদতলে ফেলি, সেই মাটির প্রতিটি কণা তাঁর হুকুমে টিকে আছে; যে আকাশকে অবহেলায় দেখি, তা-ও তাঁর কুদরতের এক খোলা নিদর্শন। সৃষ্টি তাঁর, আদেশও তাঁর। অতএব জীবনের মানে কেবল বেঁচে থাকা নয়; জীবনের মানে হলো সেই রবকে চেনা, যাঁর হাতে আমাদের শুরু, আমাদের গতি, আমাদের প্রত্যাবর্তন।
মানুষ যখন নিজের হাতের কৃতিত্বে মুগ্ধ হয়ে পড়ে, তখন এই আয়াত তাকে ফিরিয়ে আনে বিস্ময়ে, বিনয়ে, তওবায়। জগতের এই সুশৃঙ্খল চলাচল আমাদের বলে দেয়—আখিরাতও সত্য, হিসাবও সত্য, এবং সেই দিনের বিচারও কারও হাতে নয়, একমাত্র আল্লাহর হাতে। রাত-দিন যেমন পাল্টায়, তেমনি এ জীবনও একদিন বদলে যাবে; একদিন এই চোখ আলো হারাবে, এই হৃদয় দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে আলাদা হবে, আর তখন সম্বল হবে শুধু ঈমান, শুধু আমল, শুধু রবের রহমত। তাই আজই অন্তরকে শোধরানো দরকার। যে রব এত মহিমাময়, তাঁর সামনে অনুগত হওয়াই মুক্তি; আর তাঁর থেকে বিমুখ হওয়াই চূড়ান্ত ক্ষতি। তওবা করো, ভয় করো, ভালোবেসে সিজদায় নত হও—কারণ বিশ্বজগতের প্রতিপালকই একমাত্র সত্য আশ্রয়।