মানুষের অন্তর কত অদ্ভুত—যা আজ সে অবহেলা করে, কাল তারই সামনে দাঁড়িয়েই তাকে কাঁপতে হয়। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা সেই চিরন্তন মুহূর্তের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, যখন সত্যের পরিণতি উন্মোচিত হবে, যখন গোপন সব বাস্তবতা আর পর্দার আড়ালে থাকবে না। নবীদের বাণী তখন আর মত বা ধারণা হিসেবে থাকবে না; তা হবে জীবন্ত, উজ্জ্বল, অপ্রতিরোধ্য সত্য। যারা দুনিয়ায় এ সত্যকে সহজে পাশ কাটিয়ে গেছে, তারা সেদিন নিজেরাই বলে উঠবে—আমাদের রবের রাসূলগণ তো সত্যই এনেছিলেন! কিন্তু এ স্বীকারোক্তি তখন আর ঈমানের দরজা খুলবে না, কারণ দরজা খোলার সময় তারা নিজেরাই তা বন্ধ করে রেখেছিল।

আয়াতটি কিয়ামতের দিনের এক গভীর মানসিক দৃশ্য এঁকে দেয়। মানুষ তখন সুপারিশকারী খুঁজবে, দুঃখে-ভয়ে বলবে—কেউ কি আছে, যে আমাদের জন্য সুপারিশ করবে? কিংবা আমাদের আবার দুনিয়ায় ফিরিয়ে দেওয়া হলে আমরা আগের মতো নয়, অন্যরকম জীবন যাপন করতাম। কিন্তু এই আর্তি হবে বিলম্বিত জাগরণের আর্তি—যে জাগরণ আসে তখন, যখন কর্মের ময়দান শেষ, আর হিসাবের ময়দান শুরু হয়ে গেছে। এখানে বিশেষ কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা না দিয়ে কুরআন মানবজাতির সার্বজনীন বাস্তবতাকেই উন্মোচন করছে: সত্যকে বিলম্বে মানা, আর অনুশোচনাকে সময়ের বাইরে রেখে দেওয়া।

শেষ বাক্যটি হৃদয় বিদীর্ণ করা এক ঘোষণা—তারা নিজেদেরই ক্ষতি করেছে; আর যেসব মিথ্যা ধারণা, মিথ্যা আশা, মিথ্যা উপাস্য, মিথ্যা ভরসা তারা তৈরি করেছিল, সব কিছু উধাও হয়ে যাবে। এটাই গাফলতের ভয়াবহতা: মানুষ নিজেকে হারায়, অথচ টের পায় তখন, যখন ফিরে পাওয়ার আর কোনো পথ থাকে না। সূরা আল-আরাফের সামগ্রিক প্রবাহে আদম-ইবলিস, নবীদের আহ্বান, জাতিসমূহের পতন, হিদায়াত ও আখিরাত—সবই এই সত্যকে ঘিরে ঘুরে: আল্লাহর রাসূলদের আহ্বান দেরিতে বুঝলে লাভ নেই। যারা আজ কুরআনের ডাকে সাড়া দেয়, তারাই আসলে সেই দিনের অনুশোচনা থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে নেয়।

মানুষের ভেতরে এক ভয়ংকর আত্মপ্রবঞ্চনা আছে—সে মনে করে, সত্যকে আজ এড়িয়ে গেলেও কালও যেন তার জন্য সময় রয়ে যাবে। কিন্তু এই আয়াত যেন সেই ভ্রান্ত আশ্বাসের বুক চিরে দেয়। কিয়ামতের দিন যখন “তাওয়ীল”—অর্থাৎ সত্যের চূড়ান্ত ফল, গোপন পরিণতি, অদৃশ্য বাস্তবতা—প্রকাশিত হবে, তখনই বোঝা যাবে, আল্লাহর রাসূলগণ কোনো কল্পকাহিনি নিয়ে আসেননি; তাঁরা এসেছিলেন সত্য নিয়ে, এমন সত্য নিয়ে যা জীবন বদলানোর জন্য, অহংকার ভাঙার জন্য, হৃদয় জাগানোর জন্য। দুনিয়ায় যাকে মানুষ দেরিতে বুঝতে চেয়েছিল, আখিরাতে তা আর বোঝার জন্য অবকাশ থাকবে না; সেখানে উপলব্ধি আসবে, কিন্তু তওবার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে।

সেদিন যারা দুনিয়ায় এই বাণীকে ভুলে ছিল, অবহেলা করেছিল, অন্তরের দেয়ালে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিল, তারা আকুল হয়ে বলবে—আমাদের জন্য কি কোনো সুপারিশকারী আছে? আমাদের যদি আরেকবার ফিরিয়ে দেওয়া হতো, আমরা কি ভিন্নভাবে বাঁচতাম না? কিন্তু এই আকুলতা হবে বিলম্বিত অনুতাপের আর্তনাদ। কারণ সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে কেবল স্বীকার করাই যথেষ্ট নয়; যে সময়ে স্বীকার করতে হয়েছিল, সে সময়েই তা গ্রহণ করতে হয়। মানুষ কত দ্রুত নিজের ভরসার জাল বুনে ফেলে, কত নাম, কত সম্পর্ক, কত বাহানা, কত ভ্রান্ত প্রত্যয়কে আশ্রয় করে; কিন্তু সেদিন সবই মিথ্যা হয়ে উড়ে যাবে। যাদের ওপর সে ভরসা করেছিল, যাকে নিয়ে সে অহংকার করেছিল, যা দিয়ে সে নিজের ভুলকে ঢেকে রেখেছিল—সব নিঃশেষ হয়ে যাবে।
আয়াতটির অন্তর্নিহিত কাঁপন এখানেই—মানুষের ক্ষতি কেবল শাস্তিতে নয়, ক্ষতি তার নিজের আত্মাকে হারিয়ে ফেলায়। সে দুনিয়ায় এমন এক জীবন বেছে নেয়, যেখানে হিদায়াত বারবার ডাক দেয়, কিন্তু সে জবাব দেয় না; তাকওয়া দরজায় কড়া নাড়ে, কিন্তু সে ভেতর থেকে সাড়া দেয় না। তারপর একদিন আসে, যখন সব পর্দা সরে যায়, আর তখন বোঝা যায়—সত্যকে দেরি করে মানা মানে শুধু সময় হারানো নয়, নিজেকেই হারানো। তাই এই আয়াত আমাদের কানে কানে নয়, হৃদয়ের গভীরে বলে: আজই সত্যকে গ্রহণ করো, আজই ফিরে এসো, আজই আল্লাহর ডাকে সাড়া দাও। কারণ কাল এমন এক দিন, যখন সবকিছু প্রকাশিত হবে, কিন্তু তখন আর কোনো নতুন জীবন শুরু করার অনুমতি থাকবে না।

মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর পরাজয় হচ্ছে সত্যকে না জানার পরাজয় নয়, সত্যকে জেনে-শুনে তাকে পিছিয়ে দেওয়া। এই আয়াত সেই দেরিতে জাগা হৃদয়ের ছবি আঁকে—যে হৃদয় দুনিয়ায় আল্লাহর রাসূলদের কথা শুনেও শুনতে চায়নি, বুঝেও বুঝতে দেয়নি, অবহেলায় ঢেকে রেখেছিল নিজের ভেতরের আলোকে। কিন্তু যখন কিয়ামতের পর্দা সরে যাবে, তখন আর সন্দেহ থাকবে না, থাকবে না অজুহাত, থাকবে না তর্ক। সেদিন সবাই বুঝবে—নবীদের আহ্বান ছিল সত্য, পথ ছিল সত্য, সতর্কবার্তাগুলোও ছিল সত্য। অথচ সত্যকে আজ যারা উপেক্ষা করে, কাল তাদেরই মুখে বেরিয়ে আসবে এমন স্বীকারোক্তি, যা দুনিয়ার কোনো দরজা খুলতে পারবে না।

কী করুণ সে দৃশ্য—মানুষ তখন সুপারিশকারী খুঁজবে, আবার ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করবে, যেন অতীতের শূন্যতাকে নতুন আমলে ভরতে পারে। কিন্তু কিয়ামতের সেই মুহূর্তে আফসোসের জবান আর কাজের বিকল্প হবে না। কারণ মানুষের সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু শাস্তি পাওয়া নয়; সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো নিজেকেই হারিয়ে ফেলা, নিজের অন্তরকে এমনভাবে নষ্ট করে ফেলা যে সত্য সামনে এসেও তা গ্রহণের শক্তি আর অবশিষ্ট থাকে না। তারা যা বানিয়ে বিশ্বাস করত, যা ভরসা করত, যা নিয়ে অহংকার করত—সবই সেদিন উবে যাবে। মিথ্যার ওপর দাঁড়ানো এক জীবন শেষ পর্যন্ত নিজেরই ভারে ভেঙে পড়ে।

এই আয়াত আমাদের আজই নিজের কাছে কঠিন প্রশ্ন করতে শেখায়—আমি কি সত্যকে জানি, অথচ পিছিয়ে দিচ্ছি? আমি কি বারবার তাওবার দরজা দেখে তবু ঢুকছি না? সমাজ যখন গাফিলতিকে স্বাভাবিক করে, যখন পাপকে অভ্যাসে পরিণত করে, তখন কিয়ামতের স্বীকৃতি অনেক দেরিতে এসে পড়ে। তাই আজই অন্তরকে জাগাতে হবে, কারণ আল্লাহর রাসূলদের কথা কেবল স্মৃতির বিষয় নয়; তা আত্মার ডাক, ফিরে আসার আমন্ত্রণ, আর আগামী দিনের অনিবার্য সাক্ষ্যের প্রস্তুতি। যে ব্যক্তি আজ নিজের আমলকে সংশোধন করে, সে কাল অনুতাপের অপমান থেকে বাঁচে। আর যে ব্যক্তি এখনোও বিলম্ব করে, তার জন্য এই আয়াত যেন কাঁপতে থাকা আয়না—যেখানে মানুষ দেখে, সত্যকে উপেক্ষা করলে শেষ পর্যন্ত মানুষ নিজেকেই হারায়।

মানুষ দুনিয়ায় অনেক কিছুই ভুলে থাকতে পারে, কিন্তু আখিরাতের দিন কোনো ভুলে থাকা আর কাজে আসবে না। যে সত্যকে আজ অস্বীকার করা হয়, সে সত্যই সেদিন মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে যাবে—নীরব, অটল, চূড়ান্ত। তখন বুঝে যাবে তারা, নবীদের কথা কল্পনা ছিল না, সতর্কবার্তা ছিল না বাড়াবাড়ি নয়; বরং তা ছিল রবের পক্ষ থেকে আসা নির্মল সত্য। আর সেই সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আজকের সব অজুহাত, সব তর্ক, সব আত্মপ্রবঞ্চনা ধুলো হয়ে উড়ে যাবে।
সেদিন মানুষের কণ্ঠে উঠে আসবে অনুতাপের সবচেয়ে বিলম্বিত স্বীকারোক্তি—হায়, আমরা যদি আগে শুনতাম, আগে মানতাম, আগে ফিরে আসতাম। সুপারিশের আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠবে, পুনরায় দুনিয়ায় ফেরার বাসনা জ্বলবে; কিন্তু তখন জানা যাবে, যে হৃদয়কে বারবার ডাক দেওয়া হয়েছিল, সে হৃদয়ই অবহেলায় কঠিন হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহর আয়াতের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক এটাই—এটি শুধু ভয় দেখায় না, এটি আমাদের আজকের সময়কে আয়নায় দাঁড় করায়। এখনো সুযোগ আছে, এখনো তওবার দরজা খোলা, এখনো অন্তরকে নরম করা যায়।
আসলে ক্ষতি শুধু সেই দিনের নয়; ক্ষতি শুরু হয়ে যায় তখনই, যখন মানুষ সত্যকে জেনেও দেরি করে। যারা মনগড়া ধারণার ওপর ভরসা করেছিল, তারা শেষমেশ নিজেরাই হারিয়ে গেল। তাই আজকের রাত, আজকের নীরবতা, আজকের অশ্রু—এগুলোকে হেলায় ফেলা উচিত নয়। যে অন্তর আজ আল্লাহর সামনে ঝুঁকে পড়ে, সে-ই একদিন নিরাপদ হবে; আর যে অন্তর অহংকারে শক্ত হয়ে যায়, সে-ই কিয়ামতের প্রভাতে নিজের মুখেই বলবে—আমাদের রবের রাসূলগণ তো সত্যই এনেছিলেন। তখন আফসোস থাকবে, কিন্তু ফিরে আসার রাস্তা থাকবে না।