কখনও মানুষের চোখ সত্য দেখে না; সে আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখে—এই সত্যকে মানতে হবে না। সূরা আল-আরাফের এই আয়াতে আমরা সেই ভয়ংকর মানসিকতার মুখোমুখি হই, যেখানে নিদর্শন যতই স্পষ্ট হোক, হৃদয় যদি বক্র হয় তবে তা আলোরূপে দেখা যায় না; বরং তাকে জাদু, প্রতারণা, কৌশল—যে নামেই হোক, অপবাদ দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এই কথায় অবিশ্বাসের শুধু এক মুহূর্ত নয়, এক দীর্ঘ রোগ ধরা পড়ে: হক সামনে এসে দাঁড়ালেও অন্তর তার জন্য খোলা নয়।
এটি কোনো নিরীহ ভুল বোঝাবুঝি নয়; এটি ইচ্ছাকৃত অস্বীকার। মূসা আলাইহিস সালামের কওমের পক্ষ থেকে এমন ভাষা উচ্চারিত হয়, যা প্রমাণের অভাবে নয়, বরং অহংকারের কারণে সত্যকে দমন করতে চায়। তারা যেন বলতে থাকে, নিদর্শন আনার দরকার নেই, কারণ আমরা শুরুতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি—তুমি আমাদের জন্য গ্রহণযোগ্য নও। এভাবেই কখনও কখনও মানুষের অন্তর নিজেরই কারাগার হয়ে ওঠে; সেখানে চোখ আছে, কিন্তু দেখা নেই; কান আছে, কিন্তু শোনা নেই; বুদ্ধি আছে, কিন্তু ন্যায়নিষ্ঠা নেই।
এই আয়াত আমাদের শুধু এক জাতির ইতিহাস শেখায় না, মানুষের অন্তর্গত পরাজয়ের ছবিও দেখায়। আল্লাহর আয়াত কখনও কারও জন্য হিদায়াতের দরজা খুলে দেয়, আবার কারও জন্য সেই একই দরজা হয়ে দাঁড়ায় অহংকারের আঘাতে বন্ধ। তাই কুরআন যখন নিদর্শনের কথা বলে, তখন প্রশ্ন শুধু ‘নিদর্শন এল কি না’ নয়; প্রশ্ন হয়, হৃদয় কি তা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত? যে অন্তর তাকওয়া হারিয়েছে, সে প্রমাণের ভিড়েও অন্ধ থেকে যায়। আর যে অন্তর আল্লাহর সামনে নরম, তার জন্য সামান্য আলোও যথেষ্ট হয়ে ওঠে পথ চেনার জন্য।
কখনও সত্য মানুষের সামনে এসে দাঁড়ায়, আর মানুষ তবু তাকে দেখে না—এমন নয়; বরং সে দেখতে চায় না। সূরা আল-আরাফের এই আয়াতে অবিশ্বাসের সেই ভয়ংকর মুখ খুলে যায়, যেখানে নিদর্শন যতই আসুক, হৃদয়ের জেদ তাকে আগেই অপবাদ দিয়ে রেখেছে। তারা বলে, “যা-ই আনো, তা দিয়ে আমাদের জাদু করতেই চাও”—অর্থাৎ, প্রমাণের আলোকে না, তাদের পূর্বনির্ধারিত অহংকারের অন্ধকারকে কেন্দ্র করেই তারা বিচার করছে। এ এক এমন রোগ, যেখানে চোখ কাজ করে কিন্তু অন্তর অস্বীকারের কাজে লিপ্ত থাকে; সেখানে হক উপস্থিত থাকলেও সে হককে হক বলে মানার সাহস থাকে না।
এই আয়াত আমাদের অন্তরের দিকে ফিরিয়ে দেয় এক তীক্ষ্ণ আয়না। আমরা কি সত্য শুনে তা গ্রহণ করি, নাকি নিজের পছন্দের বাইরে গেলে তাকে অস্বস্তিকর নামে ডাকতে শুরু করি? অনেক সময় নিদর্শন পৃথিবীতে স্পষ্ট, অথচ হৃদয় প্রস্তুত না থাকলে তা উপদেশ হয় না; বরং হয় বিতর্কের জ্বালানি। তাই ঈমান কেবল প্রমাণের ফল নয়, এটি আল্লাহর প্রতি নম্রতার ফল, তাকওয়ার ফল, ভাঙা হৃদয়ের ফল। যে হৃদয় নিজেকে বড় ভাবতে শেখে, সে সত্যকেও ছোট মনে করতে শেখে। আর যে হৃদয় আল্লাহর সামনে নত হয়, সে সামান্য ইশারাতেও পথ চিনে নেয়। এই আয়াত যেন আমাদের কানে বারবার বলে—সত্যকে জাদু বলার আগে নিজের অন্তরকে জিজ্ঞেস করো, সে কি আদৌ হিদায়াতের জন্য খোলা আছে?
কখনও সত্যের সবচেয়ে বড় পরাজয় প্রমাণের অভাবে নয়, বরং হৃদয়ের পূর্বনির্ধারিত অন্ধকারে। এই আয়াতে ফেরাউনের লোকদের কণ্ঠে এক ভয়ংকর জেদ উচ্চারিত হয়—তুমি যে নিদর্শনই আনো, আমরা তাকে ঈমানের দরজা খুলে দেওয়ার জন্য দেখব না; বরং তাকে জাদুর নাম দিয়ে সত্যকে দূরে ঠেলে দেব। এখানে জিদ আর অহংকার এমন এক পর্দা হয়ে দাঁড়ায়, যা চোখের সামনে আলো রেখেও অন্তরকে অন্ধ রাখে। মানুষ যখন নিজের কামনা, অভ্যাস, ক্ষমতা বা গর্বকে সত্যের উপরে বসায়, তখন নিদর্শনও তার কাছে রহমত থাকে না; হয়ে ওঠে অভিযোগের নতুন ভাষা।
এটাই সমাজের এক ভয়ংকর রোগ—যেখানে সত্যকে গ্রহণ করার সাহস কমে যায়, আর অস্বীকারকে সংস্কৃতি বানিয়ে ফেলা হয়। তখন মানুষ দলবদ্ধ হয়ে মিথ্যার পক্ষে দাঁড়ায়, যেন সত্যের সামনে নত হওয়া লজ্জার বিষয়, আর বাতিলের সঙ্গেই থাকা নিরাপত্তা। কিন্তু কুরআন আমাদের শেখায়, নিদর্শন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে হিদায়াতের জন্য; অবিশ্বাসী হৃদয় যদি তাকে প্রত্যাখ্যান করে, তবে আসলে সে নিদর্শনকে নয়, নিজের আত্মসমর্পণকেই অস্বীকার করে। এই অস্বীকারে এক ধরনের নীরব অহংকার লুকিয়ে থাকে—আমি বদলাতে চাই না, তাই সত্যও আমার কাছে সত্য নয়।
এই আয়াত আত্মসমালোচনার আয়না। আজ আমাদের হৃদয় কি এমন হয়ে গেছে যে, যা-ই শুনি, যা-ই দেখি, তাতেই অজুহাত খুঁজি? কোথাও কি সত্যের ডাককে আমরা পুরনো অভ্যাসের সুবিধায় চাপা দিচ্ছি? আল্লাহর কাছে ফেরা মানে শুধু ভাষায় ঈমান বলা নয়; মানে নিজের ভেতরের জেদকে ভাঙা, অপবাদকে ছেড়ে দিয়ে নত হওয়া। যে অন্তর সত্যের সামনে কোমল, সে সামান্য আলোকেই পথ চিনে নেয়; আর যে অন্তর বিদ্রোহে কঠিন, তার সামনে আসমানও খুলে দিলেও সে বলবে—এ তো কিছু নয়। তাই এই আয়াত আমাদের ভয় দেখায়, আবার আশা-ও জাগায়: এখনো যদি অন্তর জেগে ওঠে, এখনো যদি মানুষ নিজের ভ্রান্ত আত্মবিশ্বাস থেকে ফিরে আসে, তবে হিদায়াতের দরজা বন্ধ হয়নি।
কখনও আমরাও কি এমনই হই না? সত্যের আহ্বান শোনার পরও যদি আমরা নিজের পছন্দ, নিজের অহংকার, নিজের অভ্যাসকে আঁকড়ে ধরি, তবে নিদর্শন আমাদের জীবনেও অচেনা হয়ে যেতে পারে। কুরআন শুধু অতীতের এক জাতির কথা বলে না; সে আমাদের অন্তরের দিকে আয়না ধরে। যে অন্তর বিনয়ী, সে সামান্য আলোতেও পথ চিনে নেয়; আর যে অন্তর জেদী, সে সূর্যের সামনে দাঁড়িয়েও অন্ধকারের অভিযোগ তোলে। তাই এই আয়াত আমাদের কাঁপিয়ে দেয়—হিদায়াতের দরজা যদি খোলা থাকে, তবে তা অবহেলার নয়, কৃতজ্ঞতার বিষয়।
হে রব, আমাদের অন্তরকে এমন জেদ থেকে রক্ষা করুন, যা সত্যকে সত্য বলতেও কুণ্ঠিত হয়। আমাদের ভেতরের সেই নীরব অহংকার ভেঙে দিন, যে অহংকার নিদর্শন দেখেও ঈমানের দিকে এগোতে চায় না। আমাদেরকে এমন হৃদয় দিন, যা প্রমাণের অপেক্ষায় নয়, বরং বিনয়ের তৃষ্ণায় আপনার দিকে ফিরে আসে। কারণ শেষ পর্যন্ত জেতা যায় না কেবল তর্কে; জেতা যায় সেই হৃদয়ে, যে আল্লাহর সামনে নত হতে জানে।