কখনো মানুষের অন্তর এমন অন্ধ হয়ে যায় যে, কল্যাণকে সে আল্লাহর দয়া হিসেবে দেখে না, বরং নিজের অধিকার বলে দাবি করে; আর বিপদ এলে সে তাতেই অন্যকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। সূরা আল-আরাফের এই আয়াতে সেই পুরোনো, কিন্তু আজও জীবন্ত রোগের ছবি আঁকা হয়েছে—শুভদিন এলে মানুষ বলে, “এটা তো আমাদেরই প্রাপ্য,” আর দুঃসময় এলে নবী মূসা আলাইহিস সালাম ও তাঁর সঙ্গীদের ওপর অশুভতার অপবাদ চাপায়। আশ্চর্য এই অহংকার! যে হৃদয় কৃতজ্ঞতার নরম আলো হারায়, সে শেষ পর্যন্ত সত্যেরও শত্রু হয়ে দাঁড়ায়।

এই বক্তব্যের প্রেক্ষাপট বিস্তৃতভাবে ফেরাউন-গোষ্ঠীর সেই মানসিক জগত, যেখানে নিদর্শন আসত, আহ্বান আসত, সতর্কতা আসত; কিন্তু তারা হিদায়াতের দিকে না ঝুঁকে নিজেদের দম্ভকে আরও শক্ত করত। তাদের জীবনে অনুকূলতা এলে তারা তা নিজেদের কৃতিত্ব ভেবে নিত, আর প্রতিকূলতা এলে নবীর দাওয়াতকে অশুভ বলে চিহ্নিত করত। কুরআন এখানে মানুষের বাহ্যিক প্রতিক্রিয়াকে ভেদ করে অন্তরের আসল ব্যাধি দেখিয়ে দেয়—আল্লাহকে কেন্দ্র না করে নিজের নফসকে কেন্দ্র বানানো।

আয়াতের শেষ বাক্যটি যেন আকাশচেরা এক সতর্কবাণী: তাদের অকল্যাণের উৎস মূসা ও তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে নয়, বরং আল্লাহর জ্ঞানে নিহিত—অর্থাৎ কে পথ হারাবে, কে হিদায়াত গ্রহণ করবে, কার অন্তর জিদে পাথর হবে, সবই তাঁর সার্বভৌম জ্ঞানের অধীন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা বোঝে না; তারা বাহ্যিক ঘটনাকে ধরে ব্যাখ্যা করে, অথচ অন্তরের নীতি ও ঈমানের সত্যকে দেখতে শেখে না। তাই এই আয়াত আমাদেরও জাগিয়ে তোলে—শুভে অহংকার নয়, কৃতজ্ঞতা; বিপদে দোষারোপ নয়, আত্মসমালোচনা; আর সব অবস্থায় আল্লাহর সামনে নত হওয়াই তাকওয়ার প্রথম দরজা।

মানুষের হৃদয় যখন অহংকারে মোটা হয়ে যায়, তখন সে কল্যাণকে আল্লাহর দান হিসেবে নয়, নিজের স্বাভাবিক অধিকার হিসেবে দেখতে শেখে। আলো এলে সে কৃতজ্ঞ হয় না, বরং নিজেকে বড় ভাবতে থাকে; আর অন্ধকার এলে সে নিজের অন্তরের দীনতা খুঁজে না পেয়ে অন্যকে দায়ী করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই আয়াতে সেই বিকৃত মানসিকতার উন্মোচন হয়েছে—যারা মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াতের মুখোমুখি হয়েছিল, তারা সুদিনে আত্মতুষ্টির মসৃণ ঢালে দাঁড়িয়ে বলত, এ তো আমাদেরই জন্য; কিন্তু দুঃখ এলে সত্যের কণ্ঠকে অপবাদ দিত। যেন মানুষের সুখ-দুঃখের সব রহস্য শেষ পর্যন্ত কোনো নবীকে দোষারোপ করলেই মুছে যায়! অথচ আল্লাহর জ্ঞান থেকে কোনো কিছুই আড়াল নয়; বান্দার ভাগ্য, পরীক্ষা, ধমক, অনুগ্রহ—সবই তাঁর সূক্ষ্ম জ্ঞানের জালে বাঁধা।

এখানেই এই আয়াত আমাদের হৃদয়ের দিকে তাক করতে শেখায়। কারণ ফেরাউনি মানসিকতা শুধু প্রাচীন কোনো জাতির ইতিহাস নয়; তা আজও মানুষের ভেতরে বেঁচে থাকে, যখন সে অনুগ্রহ পেলে আল্লাহকে ভুলে যায়, আর বিপদ এলে তাকদীরের হিসাব না বুঝে অভিযোগের আঙুল তোলে। হিদায়াতের পথে চলা মানুষ জানে—সুখের মুহূর্ত ইমানকে কোমল করে, আর কষ্টের মুহূর্ত ইমানকে শাণিত করে; উভয় অবস্থাই পরীক্ষার অংশ। কিন্তু যে অন্তর তাকওয়ার আলো হারিয়েছে, সে প্রতিটি নিদর্শনকেই নিজের অহংকার রক্ষার অস্ত্র বানায়। এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত নিরাপত্তা শুভদিনের আরামে নয়, বরং আল্লাহর সামনে নত হওয়ার মধ্যে; প্রকৃত জ্ঞান নিজের সুবিধাকে সত্য মনে করা নয়, বরং প্রতিটি কল্যাণে কৃতজ্ঞ হওয়া এবং প্রতিটি বিপদে নিজের রবের দিকে ফিরে যাওয়া।
মানুষের নফস কত বিচিত্র! অনুগ্রহ এলে সে বুক ফুলিয়ে বলে, এ তো আমারই যোগ্যতা, আমারই কৌশল, আমারই পরিশ্রমের ফল। অথচ সে ভুলে যায়—রিজিকের দরজা খুলে দেওয়াও আল্লাহর ইচ্ছা, আর বন্ধ হয়ে যাওয়া-ও তাঁরই হিকমত। এই আয়াতে ফেরাউন-সমাজের ভেতরের সেই অন্ধ অহংকার উন্মোচিত হয়, যেখানে কল্যাণকে সত্যের সাক্ষী হিসেবে না দেখে, বরং নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বানানো হয়। শুভদিন মানুষকে নম্র করে না, যদি অন্তর আগে থেকেই আল্লাহবিমুখ হয়ে থাকে; বরং সেই শুভদিনই তখন তার গর্বের খাদ্য হয়ে ওঠে।

আর বিপদ এলে মানুষের জবান কত তাড়াতাড়ি নষ্ট কথা খুঁজে নেয়! সে দুঃখের কারণ নিজের গুনাহে, সমাজের অবিচারে, কিংবা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সতর্কবার্তায় খোঁজে না; বরং দোষ চাপায় নবী, হিদায়াত, সত্যপন্থী মানুষদের ওপর। মূসা আলাইহিস সালামের সঙ্গীদের ‘অলক্ষণ’ বলা আসলে সত্যকে অপমান করারই আরেক নাম। সত্যের আহ্বান যখন হৃদয়ে জায়গা পায় না, তখন মানুষ নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে অন্যকে অভিযুক্ত করে। অথচ আল্লাহর জ্ঞান থেকে কিছুই লুকায় না—কারও কণ্ঠস্বর, কারও অভিযোগ, কারও নিন্দা, কারও গোপন বিদ্বেষ; সবই তাঁর ইলমের ভেতরে নিবন্ধ।

এই আয়াত আমাদেরকে নিজের দিকে ফিরিয়ে আনে। সুখ এলে মনে পড়ুক, এটি পরীক্ষা; আর দুঃখ এলে মনে পড়ুক, এটিও পরীক্ষা। কল্যাণে অহংকার নয়, কৃতজ্ঞতা চাই; বিপদে দোষারোপ নয়, আত্মসমালোচনা চাই। যে হৃদয় আল্লাহকে ভয় করে, সে জানে—জীবনের প্রতিটি ওঠানামা কোনো অন্ধ কাকতাল নয়; এর মধ্যে আছে রবের শিক্ষা, বান্দার সংশোধন, আর আখিরাতের প্রস্তুতি। মানুষ যখন নিজের ভিতরকার অন্ধকারকে দেখতে শেখে, তখনই তার জন্য হিদায়াতের দরজা খুলে যায়। আর যে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তার জন্য শাস্তির মধ্যেও রহমতের পথ গোপনে প্রস্তুত থাকে।

মানুষের হৃদয় যখন আল্লাহর দিকে নত হয় না, তখন সে কল্যাণকে নেয় প্রাপ্য হিসেবে, আর বিপদকে দেখে শত্রু হিসেবে। আজও কত হৃদয় এমনই—সাফল্য এলে নিজের যোগ্যতা ফুলে-ফেঁপে ওঠে, আর ব্যর্থতা এলে কাউকে না কাউকে দোষ দিতে মন চায়। কিন্তু এই আয়াত মনে করিয়ে দেয়, সত্যিকারের দৃষ্টিশক্তি হলো সেই চোখ, যা প্রতিটি নিয়ামতের পেছনে আল্লাহর দয়া দেখে, আর প্রতিটি কষ্টের মধ্যে নিজের সীমা, নিজের গাফিলতি, নিজের মুখ ফেরানোর বিষয়টি চিনে নেয়। যে অন্তর নিজেকে নির্দোষ ভাবতে শেখে, সে ধীরে ধীরে সত্যকেও দোষী বানিয়ে ফেলে।

ফেরাউন-গোষ্ঠীর এই মানসিকতা কেবল এক জাতির গল্প নয়; এটি মানব অহংকারের পুরনো রোগ। নবী এলে মানুষকে বদলাতে বলেন, আর অহংকারের হৃদয় বদলানোর বদলে বাহানা খোঁজে। তাই কখনো সে বলে, ‘এটা আমাদের জন্যই’; কখনো বলে, ‘এই বিপদ তাদের কারণেই।’ অথচ মানুষের ভাগ্য, মানুষের সংকট, মানুষের মুক্তি—সবই আল্লাহর জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত; তাঁর বিধান, তাঁর হিকমত, তাঁর পরীক্ষা থেকে কিছুই বাইরে নয়। এই উপলব্ধি মানুষকে ভাঙে, কিন্তু সেই ভাঙনই তাকে সত্যের কাছে নিয়ে যায়। যে ভাঙতে পারে, সে বাঁচে; যে ভাঙতে চায় না, সে নিজের অহংকারেরই বন্দি হয়ে থাকে।

এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিটি মুমিনের হৃদয় কাঁপা উচিত: আমি যখন ভালো পাই, তখন কি আল্লাহকে স্মরণ করি, নাকি নীরবে নিজেকেই সেজদা করি? আর কষ্ট এলে কি আমি তাওবা ও আত্মসমালোচনার পথে ফিরি, নাকি দোষের তীর ছুড়ে দিই অন্যের দিকে? হে আল্লাহ, আমাদের এমন অন্তর দাও, যা নিয়ামতে কৃতজ্ঞ, বিপদে সবরশীল, আর হিদায়াতের সামনে বিনম্র। আমাদের সেই অন্ধ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাঁচাও, যা কল্যাণে গর্ব করে, বিপদে অভিযোগ করে, আর শেষ পর্যন্ত সত্যের আলোও চিনতে পারে না।