যখন দীর্ঘ শোক মানুষের বুককে এমনভাবে জড়িয়ে ধরে যে নিশ্বাসও ভারী হয়ে ওঠে, তখন এই আয়াত যেন আকাশ থেকে নেমে আসা এক কোমল অথচ দৃঢ় আহ্বান: “বৎসগণ! যাও, ইউসুফ ও তার ভাইকে তালাশ কর এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।” এখানে ইয়াকুব আলাইহিস সালাম তাঁর সন্তানদের সামনে কেবল একটি খোঁজের নির্দেশই রাখেননি; তিনি তাদের হৃদয়ের ভেতরও একটি দরজা খুলে দিয়েছেন। বহু বছর ধরে বিচ্ছেদ, কান্না, অপূর্ণতা আর অজানা নিয়তির মধ্যে যে পরিবারটি ভেঙে পড়েছিল, সেই পরিবারে এখন ঈমানের শেষ প্রদীপটি জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে—আল্লাহর রহমত কখনও শেষ হয়ে যায় না।
সূরা ইউসুফের এই জায়গায় আমরা একটি গভীর মানসিক ও আধ্যাত্মিক বাস্তবতার সামনে দাঁড়াই। ইউসুফ আলাইহিস সালামের কাহিনি শুরু থেকেই পরীক্ষা, ষড়যন্ত্র, কূপ, দাসত্ব, জেল, অপবাদ, ক্ষমতা—সবকিছুর ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়েছে; কিন্তু এই আয়াত দেখায়, আল্লাহর পরিকল্পনা বাহ্যিক ভাঙনের চেয়েও অনেক বড়। যাঁরা বাহ্য দৃষ্টিতে হারিয়ে যাওয়া মনে করেছিলেন, তাঁদের কেউই আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে যাননি। তাই “রওহুল্লাহ” বা আল্লাহর রহমতের শ্বাস, প্রশান্তি, বিস্তৃত অনুগ্রহ—এর থেকে নিরাশ হতে নিষেধ করা হয়েছে। মুমিনের হৃদয় জানে, উপায় বন্ধ হলে দরজা বন্ধ হয় না; বরং তখনই অদৃশ্য রহমতের পর্দা নড়ে ওঠে।
এই আয়াতের পারিবারিক আবহও খুব তাৎপর্যপূর্ণ। ইয়াকুবের পরিবারে একটি সামাজিক-মানসিক সংকট ছিল: সন্তানেরা এক ভাইকে হারিয়েছে, আরেক ভাইয়ের সন্ধান অনিশ্চিত, পিতার চোখ অশ্রুতে ঝাপসা। তবু তিনি হতাশার ভাষা ব্যবহার করেন না; তিনি পুনরায় সন্ধানের ভাষা শেখান, আর সঙ্গে শেখান ঈমানের ভাষা। এতে বুঝি—আল্লাহর নবীর জীবনেও দুঃখ আসে, কিন্তু দুঃখই শেষ কথা নয়। নিরাশা এমন এক অন্ধকার, যা মানুষকে আল্লাহর দরজা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়; আর এই আয়াত সেই অন্ধকারের বিরুদ্ধে মুমিনের চিরন্তন ঘোষণা: আল্লাহর রহমত থেকে কেবল তারাই নিরাশ হয়, যাদের অন্তর ঈমানের আলো হারিয়েছে।
ইয়াকুব আলাইহিস সালামের এই আহ্বান যেন ভাঙা হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা এক দোয়ার ভাষা। তিনি বলেন, “যাও, ইউসুফ ও তার ভাইকে তালাশ কর।” কত বছরের অপেক্ষা, কত রাতের অশ্রু, কত অজানা শূন্যতা এই একটি বাক্যের ভিতরে জমে আছে! নবী পিতার মুখে এ কথা কেবল একটি খোঁজের নির্দেশ নয়; এটি সেই ঈমানের ঘোষণা, যা অন্ধকারকে শেষ কথা বলতে দেয় না। মানুষ হারিয়ে গেছে বলে মনে হতে পারে, সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে বলে মনে হতে পারে, সময় সবকিছু ঢেকে ফেলেছে বলে মনে হতে পারে; কিন্তু আল্লাহর তাকদিরের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া কিছুই সত্যিকারের হারায় না। যিনি যেকোনো কূপ থেকে তুলে আনতে পারেন, যিনি যেকোনো বিচ্ছেদকে পুনর্মিলনের সোপান বানাতে পারেন, তাঁর পরিকল্পনা মানুষের হিসাবের বন্দি নয়।
এই আয়াতে ইয়াকুব আলাইহিস সালাম সন্তানদেরকে শুধু অনুসন্ধানের আদেশ দিচ্ছেন না; তিনি তাদের ভাঙা হৃদয়ের ওপর আল্লাহর দরবারে ফিরে আসার শিক্ষা রাখছেন। “ইউসুফ ও তার ভাইকে তালাশ কর”—এ কথার ভেতরে আছে এক পিতা-হৃদয়ের হাহাকার, কিন্তু তারও অধিক আছে এক নবীর দৃঢ় বিশ্বাস। মানুষ যখন হারায়, তখন চোখ যা দেখে, মন তা-ই সত্য মনে করে; কিন্তু মুমিন জানে, হারিয়ে যাওয়া জিনিসও আল্লাহর পরিকল্পনার বাইরে হারায় না। যাকে কূপে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, যাকে বছর বছর বিচ্ছেদের অন্ধকারে ফেলে রাখা হয়েছিল, তাকেই আল্লাহ একদিন এমন জায়গায় পৌঁছে দেন, যেখানে রাজনীতি নয়, তাকদির কথা বলে; কৌশল নয়, রহমত কথা বলে। তাই এই আয়াতের বুকচেরা ডাক আমাদের শেখায়, অদৃশ্য প্রক্রিয়ায়ও আল্লাহ কাজ করেন—আমরা শুধু ভাঙি, কিন্তু তিনি গড়েন; আমরা শুধু কাঁদি, কিন্তু তিনি পথ তৈরি করেন।
এরপর আসে সেই হৃদয়কাঁপানো বাক্য: “আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।” নিরাশা কেবল একটি অনুভূতি নয়; এটি কখনও কখনও ঈমানের ক্ষয়, কখনও হৃদয়ের ভেতর জমে থাকা অন্ধকার। মানুষ যখন বারবার আঘাত পায়, যখন দুঃখ দীর্ঘ হয়, যখন দোয়া যেন আকাশে উঠে ফিরে আসে না—তখন শয়তান ফিসফিস করে বলে, আর কিছু হবে না। কিন্তু এই আয়াত সেই ফিসফিসানিকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। আল্লাহর রওহ—তাঁর প্রশান্তি, তাঁর দয়া, তাঁর উদ্ধার, তাঁর স্বস্তির বাতাস—মুমিনের জন্য বন্ধ নয়। যে রব কূপ থেকে নবীকে তুলতে পারেন, দাসত্ব থেকে ক্ষমতায় উঠাতে পারেন, বিচ্ছেদ থেকে মিলন ঘটাতে পারেন, তাঁর রহমতের দরজা কি মানুষের হতাশায় বন্ধ হয়ে যাবে? না, কখনও না।
সমাজ যখন কঠোর হয়, হৃদয় যখন পাথরের মতো রুক্ষ হয়ে ওঠে, তখন মানুষ একে অন্যকে ভুলে যায়; দুর্বলকে চাপা দেয়, বিপন্নকে দমিয়ে রাখে, আর দীর্ঘ অপেক্ষাকে ব্যর্থতা ভেবে বসে। কিন্তু এই আয়াত মুমিনকে শেখায়, নিজের নফসের হিসাব নিতে, নিজের দৃষ্টিকে সংশোধন করতে, এবং আল্লাহর পরিকল্পনার সামনে নত হতে। যে ব্যক্তি তওবা করে, ধৈর্য ধরে, আশা বাঁচিয়ে রাখে, সে আসলে তার আত্মাকে জীবিত রাখে। আর যে আল্লাহর রহমত সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করে, সে নিজের হৃদয়ের দরজাই বন্ধ করে দেয়। তাই আজ এই আয়াত আমাদের দিকে ফিরে তাকায়—তুমি কি এখনও তোমার রবকে চিনো? তুমি কি দেরিকে অস্বীকার হিসেবে দেখছ, নাকি তাকদিরের গভীর কাজ হিসেবে? ইউসুফের কাহিনি শেষে একটি সত্যই উজ্জ্বল হয়: আল্লাহর রহমত দেরি করতে পারে, কিন্তু ব্যর্থ হয় না; আর যে হৃদয় নিরাশ নয়, সে হৃদয়ই শেষ পর্যন্ত আলোর কাছে পৌঁছে যায়।
এই আয়াতের ভেতর এক অদ্ভুত কোমলতা আছে—যেন দীর্ঘ শোকের শেষে কোনো পিতা তাঁর সন্তানদের বুকে টেনে না নিয়ে, বরং তাদেরকে আকাশের দিকে তাকাতে শেখাচ্ছেন। তিনি বলছেন, ইউসুফকে খোঁজো, তার ভাইকেও খোঁজো, আর আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। কত বড় কথা! মানুষ যখন প্রিয়জন হারায়, সুযোগ হারায়, ভবিষ্যৎ হারায়, তখন তার মুখে সাধারণত প্রথম যে শব্দটি জমে ওঠে তা হলো “শেষ।” কিন্তু ঈমানের ভাষা “শেষ” বলে না; ঈমান বলে, “এখনও আল্লাহ আছেন।” ইয়াকুব আলাইহিস সালামের এই ডাক আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মুমিনের জীবন শুধু অপেক্ষার নয়, অনুসন্ধানেরও; শুধু কাঁদার নয়, আল্লাহর দিকে ফিরে দাঁড়ানোরও। কারণ যে হৃদয় আল্লাহকে চেনে, সে জানে—তাকদিরের পর্দা যতই ঘন হোক, তাঁর রহমতের আলো নিভে যায় না।
ইউসুফ আলাইহিস সালামের কাহিনির শেষ প্রান্তে এসে আমরা বুঝি, আল্লাহর পরিকল্পনা কখনও মানুষের হিসাবের মধ্যে বাঁধা থাকে না। কূপ থেকে প্রাসাদ, অপমান থেকে সম্মান, বিচ্ছেদ থেকে মিলন—সবই তাঁর লিখনে এমনভাবে জুড়ে আছে, যা প্রথমে বোঝা যায় না, পরে স্মরণে কাঁপন জাগায়। এই আয়াত আমাদের চোখের জলকে নিষিদ্ধ করে না; বরং সেই জলের ওপর দিয়ে আশার সেতু তৈরি করে। যে ব্যক্তি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়, সে কেবল একটি আশাই হারায় না, সে নিজের রবের সম্পর্কে ধারণাকেও সংকীর্ণ করে ফেলে। তাই আজ যদি কোনো প্রিয় বিষয় তোমার নাগালের বাইরে থাকে, যদি কোনো দোয়া বারবার ফিরেও আসে, যদি কোনো ঘর নীরবতায় ভরে থাকে, তবে মনকে বলো—আল্লাহর রহমত শেষ হয়নি। দরজাগুলো বন্ধ মনে হলেও, তাঁর নিকট থেকে ফয়েজের দরজা বন্ধ হয় না। অন্তরকে নরম করো, তাওবা করো, তাড়াহুড়া কমাও, এবং সেই এক বিশ্বাস বুকে বাঁচিয়ে রাখো—যা ইয়াকুবের কান্নাকে ভেঙে দেয়নি, বরং কান্নার ভেতরেও তাঁকে রবের দিকে স্থির রেখেছিল।