সূরা ইউসুফের এই আয়াতে আমরা এক নবীর মুখ থেকে এমন এক দোয়া শুনি, যা কেবল কথার নয়—বরং দীর্ঘ জীবনের পরীক্ষায় গড়া এক অন্তরের স্বীকারোক্তি। ইউসুফ (আ.) বলছেন: হে আমার রব, আপনি আমাকে রাজ্য দান করেছেন, আর আপনিই আমাকে স্বপ্ন-সংকেত, ঘটনার মর্ম ও সময়ের ইশারা বোঝার জ্ঞান শিখিয়েছেন। এই স্বীকারোক্তির ভেতরে কোনো আত্মপ্রশস্তি নেই; আছে নিখাদ কৃতজ্ঞতা। ক্ষমতা এখানে গর্বের আসন নয়, বরং আমানতের ভার। জ্ঞানও এখানে অহংকারের অলংকার নয়, বরং আল্লাহর অনুগ্রহের নীরব সাক্ষ্য। যাঁর জীবনে কূপ, দাসত্ব, ফিতনা, কারাবাস—সবকিছু ছিল, তাঁর মুখে আজ শোনা যায় এই মধুরতম অনুভব: যা কিছু পেয়েছি, তা আমার কৌশলে নয়; আমার রবের দানে।
এরপর তিনি আসমান-জমিনের স্রষ্টাকে সম্বোধন করেন—ফাতিরাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ। অর্থাৎ যিনি শূন্য থেকে সৃষ্টি করেন, যিনি ভাঙা জীবনকেও নতুন করে গড়ে তুলতে পারেন, যিনি মানুষের পরিকল্পনার ওপরে নিজের পরিপূর্ণ পরিকল্পনা চালিয়ে যান। ইউসুফ (আ.)-এর সমগ্র জীবনী এই সত্যেরই ব্যাখ্যা: কখনো যা ক্ষতি মনে হয়েছে, তা ছিল রক্ষা; কখনো যা দেরি মনে হয়েছে, তা ছিল প্রস্তুতি; আর কখনো যা বিচ্ছেদ মনে হয়েছে, তা ছিল মিলনের পথে অদৃশ্য সিঁড়ি। এ আয়াতে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনাভিত্তিক শানে নুযূল প্রসিদ্ধভাবে বর্ণিত নয়; বরং এটি সূরা ইউসুফের শেষ প্রান্তের কথা, যখন দীর্ঘ কাহিনি শেষ হয়ে এসে দাঁড়ায় পরিণতির দরজায়—এবং নবীর অন্তর ঘোষণা করে যে, সমস্ত পরিবর্তনের পরও আল্লাহই তার একমাত্র অভিভাবক।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অংশটি হলো শেষ প্রার্থনা: আমাকে ইসলামের ওপর মৃত্যু দান করুন, আর আমাকে নেককারদের সাথে মিলিত করুন। আশ্চর্য, এখানে ইউসুফ (আ.) আল্লাহর কাছে দুনিয়ার স্থায়িত্ব চান না, রাজত্বের দীর্ঘতা চান না, জৌলুসের বাকি জীবন চান না; তিনি চান সুন্দর সমাপ্তি। এটি সেই ঈমানের ভাষা, যা জানে—মানুষের আসল সৌভাগ্য তার জীবনের উজ্জ্বলতায় নয়, মৃত্যুর অবস্থায়। এই দোয়ায় তাকদিরের সামনে বিনম্রতা আছে, পরকালীন সাক্ষাতের আকুতি আছে, এবং নেকদের সঙ্গ লাভের এক গভীর বাসনা আছে। ইউসুফ (আ.)-এর পুরো কাহিনির আলো এ বাক্যে এসে এক বিন্দুতে জড়ো হয়: আল্লাহর পরিকল্পনা কখনো দেরি করে না, কিন্তু মানুষের হৃদয়কে প্রস্তুত করে; আর যে হৃদয় সেই প্রস্তুতি বুঝে নেয়, সে ক্ষমতার মাঝেও দাস, নেয়ামতের মাঝেও ভিখারি, এবং জীবনের শেষে শান্তি খুঁজে পায় কেবল রবের কাছে।
ইউসুফ (আ.)-এর এই দোয়ায় ক্ষমতা যেন শেষ কথা নয়, বরং আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার এক নীরব সেতু। তিনি পেয়েছেন রাজ্য, পেয়েছেন ব্যাখ্যার জ্ঞান, পেয়েছেন মানুষের চোখে সাফল্যের উজ্জ্বলতা; কিন্তু অন্তর তবু থেমে নেই দুনিয়ার প্রশস্ত প্রান্তরে। কেননা নবীর দৃষ্টি জানে—নিয়ামত যত বড়ই হোক, তা চূড়ান্ত আশ্রয় নয়। প্রকৃত আশ্রয় সেই সত্তা, যিনি আসমান-জমিনের স্রষ্টা, যাঁর কুদরতের সামনে সিংহাসনও তুচ্ছ, আর মানুষের পরিকল্পনাও ধূলিকণার মতো। এ স্বীকারোক্তি তাই এক গভীর তাওহীদের ভাষা: যা কিছু অর্জন, তা আমার নয়; যা কিছু আছে, তা আমার রবের দান। হৃদয় এখানে কৃতজ্ঞ হয়, অহংকারে ফুলে ওঠে না।
আর “সৎকর্মশীলদের সাথে আমাকে মিলিত করুন”—এই আকুতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মুমিনের একাকী মুক্তি নেই; সে নেককারদের কাতারে, সত্যিকারের দাসদের সান্নিধ্যে, আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের সাথেই নিজের পরিণতি চায়। এখানে দুনিয়ার বিচ্ছিন্ন গৌরব ভেঙে পড়ে, আর আখিরাতের নীরব সত্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে: মানুষের প্রকৃত মর্যাদা সে কোথায় পৌঁছাল, তা নয়; সে কার সাথে মিলিত হলো। ইউসুফ (আ.)-এর এই দোয়া তাই আমাদের অন্তরকে জাগিয়ে তোলে—যে আল্লাহ তাকদির লিখেছেন, তিনিই তাকে সুন্দর করতে পারেন; যে আল্লাহ পরীক্ষা দিয়েছেন, তিনিই উত্তীর্ণ হওয়ার তাওফিক দেন; যে আল্লাহ শুরু করেছেন, তিনিই শেষটাও গড়ে দেন। আর মুমিনের সবচেয়ে গভীর আশা এটাই: জীবন যতই জটিল হোক, মৃত্যু যেন হয় ইসমের সঙ্গে, আর পরিণতি যেন হয় নেককারদের সঙ্গেই।
এখানে ইউসুফ (আ.) নিজের সারা জীবনের কাহিনিকে এক বিনম্র দোয়ার ভেতরে গুটিয়ে আনেন। তিনি ক্ষমতাকে নিজের কৃতিত্ব বলে উচ্চারণ করেন না, জ্ঞানকেও নিজের মেধার জয়গাথা বানান না; বরং সব কিছুর উৎসকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেন। এই স্বীকারোক্তি আমাদের অন্তরকে কাঁপিয়ে দেয়, কারণ মানুষ যতই উন্নতির শিখরে উঠুক, যতই সাফল্যের ভাষা বলুক, শেষ পর্যন্ত সে আল্লাহর দানধারী এক দরিদ্র বান্দাই। ইউসুফের জীবন আমাদের শেখায়, পরীক্ষা মানুষের মর্যাদা নষ্ট করে না; বরং যে পরীক্ষাকে ধৈর্যে বহন করতে পারে, আল্লাহ তার ভিতরে এমন গৌরব স্থাপন করেন যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু আসমানের দরবারে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
তারপর তিনি আসমান ও জমিনের স্রষ্টাকে ডেকে বলেন, আপনিই আমার কার্যনির্বাহী ইহকাল ও পরকালে। এ এক গভীর তাওহিদী ঘোষণা—যে হৃদয় জানে, মানুষ সহায় হতে পারে, কিন্তু অভিভাবক কেবল আল্লাহ; মানুষ পথ দেখাতে পারে, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে না; মানুষ সাময়িক আশ্রয় দেয়, কিন্তু চূড়ান্ত নিরাপত্তা কেবল রবের হাতেই। সমাজ যখন স্বার্থে ভরে ওঠে, সম্পর্ক যখন কূটকৌশলে জড়িয়ে পড়ে, তখন এই আয়াত আমাদের শিখিয়ে দেয়—নির্ভরতার কেন্দ্র বদলাতে হবে। অন্যায়, হিংসা, ক্ষমতার মোহ আর মানুষের প্রশংসার ভিড়ে আত্মা পথ হারায়; কিন্তু যে হৃদয় আল্লাহকে নিজের ওয়ালি হিসেবে গ্রহণ করে, সে আর কোনো মিথ্যা আশ্রয়ের কাছে মাথা নত করে না।
আর সবশেষে আসে সেই হৃদয়বিদারক প্রার্থনা: আমাকে ইসলামের ওপর মৃত্যু দিন, আর আমাকে নেককারদের সাথে মিলিত করুন। নবী হয়েও তিনি শেষ পরিণতি নিয়ে আল্লাহর কাছে মিনতি করেন—এতে আছে ভয়, কিন্তু হতাশা নেই; আছে আশা, কিন্তু গাফিলতি নেই। মানুষের জীবন যতই সুন্দর হোক, শেষ শ্বাসটাই তার আসল সাক্ষ্য। তাই ইউসুফ (আ.) আমাদের শেখান, সফলতার চূড়ায় দাঁড়িয়েও আত্মা যেন আল্লাহর কাছে কাঁপতে কাঁপতে বলে—হে রব, আমার অন্তরকে শেষ পর্যন্ত আপনার আনুগত্যে রাখুন, আমার মৃত্যুকে নিরাপদ করুন, আর আমাকে এমন নেককারদের সাথে যুক্ত করুন যাদের সঙ্গ জান্নাতের পথ। এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে হৃদয় বুঝে যায়: আসল বিজয় রাজ্য নয়, আসল জ্ঞান নয়, আসল গল্পের শেষ বাক্যটি—মুসলিম হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া।
ইউসুফ (আ.)-এর এই দোয়া আমাদের শেখায়—জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য ক্ষমতা পাওয়া নয়, বরং ক্ষমতার ভেতরেও নিজের হৃদয়কে আল্লাহর সামনে নত রাখা। তিনি রাজ্যের শিখরে দাঁড়িয়েও এমন ভাষায় কথা বলেন, যেন একজন দরবেশের কাঁপা অন্তর: হে আমার রব, আপনি-ই আমার অভিভাবক ইহকালেও, পরকালেও। এই স্বীকারোক্তির মধ্যে আছে এক গভীর সত্য—মানুষের হাতে যা কিছু আসে, তা স্থায়ী অধিকার নয়; সবই আমানত, সবই পরীক্ষা, সবই ফেরত যাওয়ার উপকরণ। তাই নবীও যখন নেয়ামতে পূর্ণ, তখনও তাঁর মুখে আসে ভয়ের সুর: যেন জীবন আমার ঈমানকে না কেড়ে নেয়, যেন শেষ মুহূর্তটি আমাকে আপনার আনুগত্যের বাইরে না ঠেলে দেয়।
আর কত মানুষ আছে, যারা কম পেয়ে অভিযোগ করে, বেশি পেয়ে ভুলে যায়; কিন্তু ইউসুফ (আ.) আমাদের সামনে এমন এক অন্তর রেখে গেলেন, যা দুনিয়ার শেষ সিঁড়িতে দাঁড়িয়েও আখিরাতের দরজা খুলে দেয়। তাঁর আকুতি—আমাকে মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দিন, আর আমাকে নেককারদের সঙ্গে মিলিয়ে দিন—এটাই মুমিনের শেষ চাওয়া হওয়া উচিত। কারণ সুন্দর জীবন থেকেও বড় হলো সুন্দর সমাপ্তি, আর বড়জোর অর্জন থেকেও বড় হলো আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ফেরা। এই আয়াত পড়ে মনে হয়, আমরা কি সত্যিই প্রস্তুত আমাদের শেষ বাক্যটার জন্য? আমরা কি এমন জীবন কাটাচ্ছি, যা মৃত্যুর সময় লজ্জা নয়, রহমতের আশা জাগায়? ইউসুফ (আ.)-এর এই দোয়া আমাদের বুকের ভেতর কাঁপন ধরাক—যেন আমরা বুঝি, তাকদিরের প্রতিটি বাঁকে আল্লাহ আছেন, পরীক্ষার প্রতিটি অন্ধকারে আল্লাহ আছেন, আর ফিরবার শেষ ঠিকানাও তাঁরই দরবার।