বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আলিফ-লা-মা-রা—তারপর কুরআন নিজের পরিচয় নিজেই দিয়ে দেয়: এগুলো সুস্পষ্ট গ্রন্থের আয়াত। এই সূচনাটি যেন হৃদয়ের দরজায় নরম কিন্তু অচল এক আঘাত। কুরআন কোনো ধোঁয়াশা নয়, কোনো বিভ্রান্তির জাল নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নেমে আসা এমন আলো, যার ভাষা সরল, কিন্তু তার গভীরতা সমুদ্রের চেয়েও বিস্তৃত। সূরা ইউসুফের শুরুতেই এই ঘোষণা আমাদের জানিয়ে দেয়, সামনে যে কাহিনি খুলবে তা নিছক গল্প নয়; তা হিদায়াতের মানচিত্র, তাকদিরের নিঃশব্দ ভাষ্য, আর মানবহৃদয়ের ভেতরের ভাঙন ও উত্তরণের এক মহাসত্য।
এই সূরার প্রথম আয়াত যেন আসন্ন ঘটনার দরজায় দাঁড়িয়ে আমাদের বলে, সবকিছু প্রকাশ পাবে আল্লাহর নির্ধারিত বয়ানে, মানুষের অনুমানে নয়। ইউসুফ আলাইহিস সালামের জীবন ছিল এক দীর্ঘ পরীক্ষা—শৈশবের স্বপ্ন, ভাইদের হিংসা, বিচ্ছেদের অন্ধকার, দাসত্বের অপমান, পবিত্রতার কঠিন সাধনা, কারাগারের নিঃসঙ্গতা, আর শেষে সম্মানিত উত্তরণের বিস্ময়। কিন্তু এসব কিছুর আগে কুরআন আমাদের থামিয়ে দেয় এবং মনে করিয়ে দেয়: এই কাহিনির সূচনায়ই আল্লাহ তাঁর কিতাবকে ‘মুবীন’—সুস্পষ্ট, উন্মুক্ত, দীপ্তিমান—হিসেবে পরিচয় করাচ্ছেন। অর্থাৎ যা ঘটতে যাচ্ছে, তার প্রতিটি বাঁকে আল্লাহর হিকমত আছে; যা প্রথমে ভাঙন মনে হয়, তা শেষ পর্যন্ত হতে পারে রহমতের নির্মাণ।
এই আয়াতের মক্কী প্রেক্ষাপটও হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অবতীর্ণ হচ্ছিল সেই বাণী, যা বিশ্বাসী হৃদয়কে সান্ত্বনা দেয় এবং সত্যের পথে দাঁড়ানো মানুষকে দৃঢ় করে। বিশেষ কোনো নির্ভরযোগ্য একক ঘটনার সঙ্গে এই আয়াতকে বেঁধে দেওয়া নিরাপদ নয়; বরং এর বৃহত্তর উদ্দেশ্য হলো—অবিশ্বাস, কষ্ট, অপেক্ষা, এবং অদৃশ্য পরিকল্পনার মধ্যে মুমিনকে স্থির রাখা। ইউসুফের কাহিনি তাই শুধু একটি নবীর কাহিনি নয়, এটি সেইসব হৃদয়েরও কাহিনি যারা জানে না পরের দিন কী আসবে, কিন্তু জানে আল্লাহর কিতাব কখনো অস্পষ্ট নয়। মানুষের চোখে পথ হারানোও যদি আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ হয়, তবে মুমিনের কাজ হলো কিতাবকে আঁকড়ে ধরা, ধৈর্যকে সঙ্গী করা, আর বিশ্বাসকে এমন এক আলোতে পরিণত করা, যা অন্ধকারকেও হেদায়েতের পথে বদলে দেয়।
আলিফ-লা-মা-রা—তারপর কুরআন যেন নীরবে জানিয়ে দেয়, মানুষের চোখে যা ছড়ানো অক্ষর, আল্লাহর কাছে তা সুসংহত সত্য। এগুলো সুস্পষ্ট কিতাবের আয়াত। এখানে অস্পষ্টতা নেই, তবে হৃদয়কে নরম না করলে তার আলো ধরা পড়ে না। কারণ কিতাব সুস্পষ্ট, কিন্তু মানুষ অনেক সময় নিজের কামনা, ভয়, পূর্বধারণা আর ভাঙা অভিজ্ঞতার পর্দা দিয়ে তা পড়তে চায়। তখন আয়াত থাকে একই, কিন্তু অন্তর থাকে অন্যত্র। সূরা ইউসুফের শুরুতে এই ঘোষণা আমাদের শেখায়—আল্লাহর বাণী কেবল তথ্য দেয় না; তা পথ দেখায়, হৃদয়কে উল্টে দেয়, আর সময়ের ভিতর লুকানো অর্থকে ধীরে ধীরে উন্মোচন করে।
আর ইউসুফ আলাইহিস সালামের জীবন থেকে যে আলো সবচেয়ে তীব্রভাবে জ্বলে ওঠে, তা হলো পবিত্রতা—একাকিত্বে, কামনায়, অপমানে, বন্দিত্বে, এবং অপেক্ষার দীর্ঘ রাতে নিজের অন্তরকে আল্লাহর জন্য রক্ষা করা। মানুষ যত বড় পরীক্ষা দিয়ে যায়, তার আসল পরিচয় তত স্পষ্ট হয়। কেউ ভেঙে পড়ে, কেউ বিক্রি হয়ে যায় নিজের নফসের কাছে, আর কেউ আল্লাহর সাহায্যে নিজের ভেতরকার পবিত্রতা আঁকড়ে ধরে। এই আয়াত তাই শুধু একটি সূরার ভূমিকা নয়; এটি আমাদের হৃদয়ের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা এক আহ্বান—তুমি কি কিতাবকে সত্যিই সুস্পষ্ট হিসেবে গ্রহণ করবে, নাকি নিজের জীবনের জটিলতাকে আল্লাহর বাণীর চেয়ে বড় করে দেখবে? যে অন্তর কুরআনের সামনে নত হয়, তার জন্য তাকদির আর অন্ধ নিয়তি থাকে না; তা হয়ে ওঠে রবের লিখে রাখা এক পরিপূর্ণ পরিকল্পনা, যার শেষ পরিণতি রহমত।
আলিফ-লা-মা-রা—এই উচ্চারণে যেন মানুষের জ্ঞান থেমে যায়, আর আসমানী জ্ঞানের দরজা ধীরে খুলে যায়। কুরআন নিজেকে যখন বলে, এগুলো সুস্পষ্ট কিতাবের আয়াত, তখন সে আমাদের অহংকার ভেঙে দেয়, আবার পথও দেখায়। কারণ হৃদয়ের যত জট, জীবনের যত অন্ধকার, তাকদিরের যত প্রশ্ন—সবকিছুর ওপর আল্লাহর বাণী স্থির আলো হয়ে নেমে আসে। সূরা ইউসুফের সূচনা আমাদের জানিয়ে দেয়, সামনে যে কাহিনি আসছে তা শুধু অতীতের কথা নয়; এটি এমন এক সত্য, যেখানে পরীক্ষা নিষ্ঠুর মনে হলেও তার ভিতরে লুকিয়ে থাকে রহমতের সূক্ষ্ম পরিকল্পনা।
মানুষ অনেক সময় নিজের জীবনের ভাঙন দেখে ভাবে, সবই বুঝি এলোমেলো। কিন্তু এই আয়াত বলে, কিতাব যখন সুস্পষ্ট, তখন ঘটনাও অর্থহীন থাকে না। ইউসুফ আলাইহিস সালামের জীবনে হিংসা ছিল, বিচ্ছেদ ছিল, কষ্ট ছিল, কিন্তু সবকিছুর ওপর ছিল আল্লাহর লিখন। তাই মুমিনের কাজ কেবল ব্যথা গোনে থাকা নয়; নিজের অন্তরকে জিজ্ঞেস করা—আমি কি আল্লাহর বয়ানের আলোতে নিজের অবস্থাকে দেখছি? নাকি নফসের অন্ধকারে পড়ে আছি? এই প্রশ্নই আত্মসমালোচনার দরজা খুলে দেয়, আর সেই দরজা দিয়েই তাওবার নরম বাতাস ভেতরে ঢোকে।
সমাজ যখন বিভ্রান্ত হয়, সত্যকে আড়াল করে, ধৈর্যকে দুর্বলতা ভাবে, আর পবিত্রতাকে কষ্টকর পথ মনে করে—তখন এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আল্লাহর কিতাবই শেষ কথা। তার সুস্পষ্টতা শুধু বুদ্ধির জন্য নয়, হৃদয়ের জন্যও; যেন মানুষ জানে, রাগ, হিংসা, লোভ আর কামনার ঝড়ের মাঝেও ফিরে আসার এক ঠিকানা আছে। ইউসুফের কাহিনি আমাদের শেখায়, আল্লাহর পরিকল্পনা কখনও মানুষের তাড়াহুড়োর মতো নয়; তা ধীর, গভীর, আর পূর্ণ হিকমতে ভরা। তাই ভয়ও থাকবে, আশা-ও থাকবে—ভয় এই জন্য যে আমরা কোথাও আল্লাহ থেকে দূরে সরে না যাই, আর আশা এই জন্য যে তাঁর সুস্পষ্ট কিতাবের আলোয় সবচেয়ে বিপন্ন হৃদয়ও আবার ফিরে আসতে পারে।
মানুষ কখনো নিজের কাহিনি নিজে লিখতে চায়, অথচ তার হাত কাঁপে, তার জ্ঞান অসম্পূর্ণ, তার দৃষ্টি খণ্ডিত। আল্লাহর লেখা কিন্তু এমন নয়। তিনি ভাঙনকে মিলনের ভূমিকা বানান, দুঃখকে উত্তরণের সোপান বানান, অন্ধকারকে নূরের আগমনী সংবাদ বানান। এই আয়াত আমাদের নরম হাতে ধরে বলে—যা বুঝতে পারছ না, তা অস্বীকার কোরো না; যা সহ্য করতে পারছ না, তাতে হিকমত নেই ভেবো না; যা বিলম্বিত হচ্ছে, তা অপচয় ভাবো না। ইউসুফের কাহিনির প্রতিটি বাঁক আমাদের শেখায়, তাকদির নিষ্ঠুর নয়; বরং অনেক সময় তা আমাদের ধারণার চেয়েও মমতাময়, যদিও তার পথ চোখে পড়ে না।
তাই এই সূরা শুরু হওয়ার আগেই হৃদয়কে প্রস্তুত করতে হয়। কারণ এখানে যে কথা বলা হবে, তা শুধু কানে শোনার জন্য নয়, আত্মাকে নত করার জন্য। কুরআনের সুস্পষ্টতা আমাদের তর্কের অহংকার ভেঙে দেয়, আর আল্লাহর পরিকল্পনা আমাদের মুখে নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি নামিয়ে আনে: হে রব, আমি জানি না; আপনি জানেন। আমি দুর্বল; আপনি শক্তিমান। আমি বিভ্রান্ত; আপনার কিতাব সুস্পষ্ট। ইউসুফ আলাইহিস সালামের পথ ধরে আমরা যেন এটাই শিখি—পরীক্ষা আসুক, পবিত্রতার জন্য একাকিত্ব আসুক, বিলম্ব আসুক; কিন্তু কুরআনের আলোর ওপর ভরসা যেন এক মুহূর্তও না কমে। কারণ শেষ কথা আমাদের নয়, আল্লাহর। আর তাঁর লেখা কাহিনিতে কখনোই অকারণ কোনো বেদনা থাকে না।