ফিরআউনের ছায়া যখন মানুষের বুকের উপর লম্বা হয়ে নেমে আসে, তখন ঈমানও যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সূরা ইউনুসের এই আয়াতে মুমিনদের কণ্ঠে আমরা শুনি এমন এক দোয়া, যা ভয়ের ভাষা নয়; বরং তাওহীদের অটল আশ্রয়ে দাঁড়ানো হৃদয়ের ভাষা। তারা বলে, আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করেছি। অর্থাৎ আমাদের শক্তি নয়, আমাদের জনসমর্থন নয়, আমাদের সামান্য সংখ্যাও নয়—আমাদের ভরসা একমাত্র সেই রব, যাঁর হাতে ফেরাউন-ক্ষমতারও পতাকা, আর যাঁর ইচ্ছার সামনে জালেমের সব কৌশল কাগজের মতো নরম। তারপর তারা কাঁপতে কাঁপতে নয়, ঈমানের দৃঢ়তায় বলে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে এই জালেম কওমের জন্য ফিতনা করো না। যেন তারা বোঝাতে চায়, হে আল্লাহ, আমাদের দুর্বলতা যেন সত্যের ওপর আঘাতের বাহানা না হয়ে যায়; আমাদের পরাজয় যেন বাতিলকে সাহসী করে না তোলে; আমাদের ঈমান যেন অন্যদের জন্য হেদায়েতের দরজা হয়ে থাকে, বিভ্রান্তির অন্ধকার না হয়।
এই আয়াতের পেছনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। হযরত মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল এক উদ্ধত, দমনকারী শাসনব্যবস্থা; এমন এক পরিবেশ, যেখানে সত্যকে মানা মানেই জীবনের নিরাপত্তা হারানোর ঝুঁকি। কুরআন আমাদের জানায়, মূসার কওমের অল্প কিছু মানুষই তখন ঈমান এনেছিল, এবং ভয় ছিল ফেরাউন ও তার লোকদের। এই বাস্তবতার ভেতরেই মূসা আলাইহিস সালাম তাদেরকে তাওয়াক্কুলের দিকে ডেকেছিলেন, আর তারা জবাব দিয়েছিল এমন এক দোয়ায়, যেখানে নির্ভরতা ও বিনয় একসঙ্গে মিশে গেছে। এখানে কোনো সাজানো নাটক নেই; আছে নিপীড়নের মধ্যে জন্ম নেওয়া খাঁটি ঈমান। আছে সেই মানবিক বেদনা, যেখানে মুমিন চায় না তার দুর্বলতা সত্যকে দুর্বল করে দেখাক। তাই তারা আল্লাহর কাছে শুধু বাঁচার জন্য নয়, বাঁচার ভেতরে সত্যের মর্যাদা রক্ষার জন্যও প্রার্থনা করে।
এখানে আমাদের জন্য এক গভীর শিক্ষা রয়ে গেছে। মুমিনের তাওয়াক্কুল কখনো দায়িত্বহীন আত্মসমর্পণ নয়; তা হলো অন্তরের এমন এক স্থিতি, যেখানে সব কারণ গ্রহণ করেও হৃদয় বুঝে নেয়—কারণগুলোর মালিক আল্লাহ। আর জালেম শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে দোয়া করা মানে কেবল ব্যক্তিগত নিরাপত্তা চাওয়া নয়; বরং এই কামনা করা যে, আমাদের জীবনে এমন কোনো পরিণতি না আসুক যা সত্যের মুখে কালিমা লেপে দেয়। কুরআন আমাদের বারবার শেখায়, জাতি ও মানুষের পরিণতি আল্লাহর হাতে; বাতিলের উত্থান সাময়িক, আর হেদায়েতের আলো স্থায়ী। এই আয়াত তাই শুধু অতীতের একটি ঘটনা নয়, এটি প্রতিটি যুগের মুমিনের হৃদয়ে ঝরে পড়া এক ফিসফিসানি: হে আমাদের রব, আমাদের ভরসাকে তুমি কবুল করো, আমাদের দুর্বলতাকে তুমি ঢেকে দাও, আর আমাদের ঈমানকে এমন দৃঢ় করো যেন আমরা কারও ফিতনা না হই, বরং তোমার রহমতের পথে এক জীবন্ত সাক্ষ্য হয়ে উঠি।
ফিরআউনের প্রাসাদ যতই উঁচু হোক, মুমিনের অন্তর সেখানে মাথা নত করে না; কারণ তার হৃদয়ের কিবলা মানুষ নয়, আল্লাহ। এই আয়াতে সেই চরম মুহূর্তের ভাষা শোনা যায়, যখন বাহ্যিক শক্তির সব সিঁড়ি ভেঙে পড়ে, আর ভরসার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে কেবল রব্বুল আলামিন অবশিষ্ট থাকে। “আল্লাহর উপর ভরসা করেছি”—এ কথা শুধু মুখের উচ্চারণ নয়; এটি এমন এক আত্মসমর্পণ, যেখানে মানুষ নিজের দুর্বলতাকে ঢেকে রাখে না, বরং তা আল্লাহর কুদরতের সামনে অর্পণ করে। তাওহীদের গভীরে দাঁড়িয়ে সে জানে, জালেমের শক্তি যতই চোখধাঁধানো হোক, তা স্থায়ী নয়; আর যাঁর হাতে রাজত্ব, তাঁর কাছে আশ্রয় নেয়া ছাড়া মুক্তির আর কোনো দরজা নেই।
এই আয়াত তাওয়াক্কুলের এমন এক চিত্র এঁকে দেয়, যেখানে ভয় হার মানে, কিন্তু হৃদয় কঠিন হয় না; দুর্বলতা থাকে, কিন্তু ভরসা ভেঙে যায় না। এখানে ঈমান আমাদের শেখায়, জুলুমের মুখে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজের শক্তির হিসাব করে না, আল্লাহর রহমতের দরজা খোঁজে। আর এটাই নবুয়তের দাওয়াতের সারকথা: আল্লাহকে রব মানা মানে, অন্য সব কর্তৃত্বের ভিতরেও তাঁরই ফয়সালাকে সর্বোচ্চ স্বীকার করা। সূরা ইউনুসের এই বাক্য তাই কেবল একটি দোয়া নয়—এটি এক জীবন্ত আকীদা, এক ভেতর থেকে উঠে আসা আহ্বান, যে আহ্বানে মুমিন বলে: হে আল্লাহ, আমাদেরকে এমন করে বাঁচাও, যাতে আমাদের ঈমান তোমার দ্বীনের সাক্ষী হয়; আমাদেরকে এমনভাবে বাঁচাও, যাতে জালেমের ফিতনা আমাদের মাধ্যমে নয়, বরং তোমার নূরের সামনে পরাস্ত হয়।
এই কথার ভেতরে আছে এক অদ্ভুত মুমিন-স্নিগ্ধ শক্তি। তারা আল্লাহর উপর ভরসা করেছে, অথচ ভরসার সঙ্গে আছে বিনয়ের কাঁপনও; কারণ তাওয়াক্কুল কখনো আত্মপ্রসাদ নয়, বরং অন্তরের সমস্ত ভর আল্লাহর হাতে সমর্পণ। জালেম কওমের সামনে দাঁড়ালে মানুষকে সবচেয়ে আগে যে জিনিসটি ভেঙে ফেলে, তা হলো আশ্রয়ের ভুল ঠিকানা। কিন্তু মুমিনের আশ্রয় ঠিকানা হারায় না; সে জানে, শক্তির আসল মানদণ্ড মানুষের হাতে নয়, রবের ফয়সালায়। তাই তার দোয়া নিছক নিরাপত্তার প্রার্থনা নয়, বরং সত্যকে সত্য রাখার মিনতি—হে আমাদের রব, আমাদের ঈমান যেন এমন পরিণত না হয় যে, তার কারণে বাতিল আরও উদ্ধত হয়ে ওঠে, আর সত্যের পথ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
এখানে সমাজের বাস্তবতা খুব গভীরভাবে ধরা আছে। জালেম যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন সে শুধু শরীরকে নয়, মানুষের মনকেও শাসন করতে চায়; ভয়কে নিয়ম বানায়, নীরবতাকে নীতি বানায়, আর অন্যায়ের ছায়াকে যেন স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সেই অন্ধকারের ভেতরে মুমিনের এই প্রার্থনা আমাদের শেখায়, ঈমান মানে শুধু নিজে বেঁচে থাকা নয়, বরং এমনভাবে বাঁচা, যাতে আল্লাহর পথে হাঁটা মানুষদের জন্য সত্যের পথ বন্ধ না হয়। আমরা নিজের জীবনেও কতবার অন্যায়ের সামনে নত হয়ে পড়ি, কতবার সুবিধার জন্য নীরব থাকি, কতবার জালেমের ফিতনাকে সহ্যযোগ্য মনে করি—এই আয়াত আমাদের অন্তরকে জিজ্ঞেস করে, তোমার তাওয়াক্কুল কি কেবল মুখের কথা, নাকি বিপদের সামনে দাঁড়িয়ে সত্যের দিকে ফিরে আসার সাহস?
আর তাই এই আয়াত হৃদয়কে একসঙ্গে ভয় ও আশার মধ্যে দাঁড় করায়। ভয়—এই ভেবে যে, যদি আল্লাহর সাহায্য না আসে, তবে মানুষ নিজের শক্তিতে কতই বা টিকে থাকবে; আর আশা—এই ভেবে যে, যাঁর কাছে মুমিনরা সমর্পিত হয়, তাঁর দয়া জালেমের কৌশলের চেয়েও বড়। যে হৃদয় সত্যিই আল্লাহর উপর ভরসা করে, সে পরাজয়ের মধ্যেও ভেঙে পড়ে না, আবার বিজয়ের মধ্যে অহংকারীও হয় না; সে নিজের পরিণতি আল্লাহর হাতে রেখে আত্মসমালোচনায় নত থাকে। এ আয়াত আমাদের শেখায়, ঈমানের প্রকৃত নিরাপত্তা বাহ্যিক স্বস্তিতে নয়, বরং রবের দরবারে নিরাপদ হওয়ায়। মানুষ যখন বলে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে জালেমদের ফিতনা বানিয়ো না, তখন সে আসলে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে, সমাজের অন্ধকারকে চিনে নেয়, আর সমস্ত পথ শেষে আবার আল্লাহর রহমতের দিকেই ফিরে যায়।
হে আমাদের রব, আমাদেরকে জালেম কওমের জন্য ফিতনা করো না—এ প্রার্থনা কেবল তৎকালীন এক জাতির জন্য নয়; এটি প্রতিটি যুগের মুমিনের কান্না, প্রতিটি দুর্বল ঈমানের আশ্রয়। কারণ কখনো কখনো মানুষের পদস্খলন অন্যদের কাছে সত্যকে সন্দেহের আসনে বসায়, আর কখনো একদল জালেম নিজেদের শক্তিকেই প্রমাণ ভেবে বসে। তাই এই আয়াত শেখায়, মুমিন শুধু নিজের মুক্তি চায় না; সে চায়, তার ঈমান যেন কারও বিভ্রান্তির কারণ না হয়, তার বিপর্যয় যেন বাতিলের হাত শক্ত না করে, তার জীবন যেন আল্লাহর দীনকে হেয় করার উপকরণ না হয়ে ওঠে।
আজও অন্তরগুলো সেই একই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়—কোথাও ক্ষমতার অহংকার, কোথাও নীরব ভীতি, কোথাও সত্যের দাম, কোথাও ন্যায়ের ক্ষয়। কিন্তু এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ শিখে, আসল নিরাপত্তা শক্তিশালী হাতে নয়, সিজদার ভেজা কপালে; আসল মুক্তি মানুষের প্রশংসায় নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টিতে। তাই যখন জুলুমের শব্দ ঘনিয়ে আসে, যখন অন্তর কেঁপে ওঠে, তখন মুখে ফিরুক এই তাওয়াক্কুলের স্বীকারোক্তি: আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করেছি। আর হৃদয়ে জেগে থাকুক সেই অনুনয়—হে রব, আমাদের ঈমানকে রক্ষা করো, আমাদের পদচ্যুতি দিয়ে কাউকে অন্ধকারে ফেলো না, আমাদেরকে তোমার রহমতের দিকে এমনভাবে ফিরিয়ে নাও, যেন আমরা তোমারই হয়ে বাঁচি, তোমারই হয়ে মরি।