সত্য যখন মানুষের সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন তার ভাষা অনেক সময় কানে লাগে তিক্ত, চোখে লাগে অস্বস্তিকর। সূরা ইউনুসের এই আয়াতে মূসা (আ.) ফেরাউনের লোকদের সেই অন্ধ উক্তির জবাব দিচ্ছেন—তারা সত্যকে দেখেও তাকে যাদু বলছে। মূসা (আ.)-এর প্রশ্নে এক গভীর তিরস্কার আছে: সত্য কি সত্যই থাকবে না, যতক্ষণ না তোমরা তাকে মেনে নাও? নাকি তোমাদের অহংকার এতটাই মোটা হয়ে গেছে যে, আল্লাহর নিদর্শনও তোমাদের চোখে কেবল ভেল্কি? আর তিনি শেষ বাক্যে এমন এক চিরন্তন বিধান স্মরণ করিয়ে দেন—যাদুকর কখনো প্রকৃত সফলতা পায় না। কারণ মিথ্যার সব কৌশল সাময়িক ঝলক দেখাতে পারে, কিন্তু টিকতে পারে না, বাঁচাতে পারে না, মুক্তি দিতে পারে না।

এই আয়াতের পেছনে যে বৃহত্তর কোরআনিক প্রেক্ষাপট, সেখানে মূসা (আ.)-এর মুজিযা আর ফেরাউনের দরবারের জাদুকরদের জাহিরি প্রতিযোগিতা নয়, বরং সত্য ও মিথ্যার, হেদায়েত ও জিদ্দের, আল্লাহর পক্ষের নিদর্শন ও মানুষের বানানো ছলনার মুখোমুখি সংঘর্ষ। কোরআন এখানে কোনো কাহিনি বলছে শুধু আবেগের জন্য নয়; বলছে যেন মানুষ বুঝে নেয়, নবুয়ত কোনো যাদু নয়, ওহি কোনো প্রতারণা নয়, আর আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত সত্য কখনো মানুষের কূটচালে হার মানে না। ফেরাউনি মানসিকতা বারবার একই রকম—যখন যুক্তি হেরে যায়, তখন অপবাদ আসে; যখন আলো প্রবেশ করে, তখন অন্ধকার তাকে নাম দিতে চায় ‘যাদু’।

এই আয়াত আমাদের হৃদয়েও প্রশ্ন তোলে: সত্য এলে আমরা কি তাকে চিনতে চাই, নাকি নিজের সুবিধা বাঁচাতে তাকে নতুন নাম দিই? কুরআনের সত্যতা, নবীদের দাওয়াত, তাওহীদের নিখুঁত আহ্বান—সবই মানুষের অহংকারের সামনে এমনই এক পরীক্ষা। কারণ হেদায়েতের কাছে মাথা নত করা মানে শুধু একটি কথা মানা নয়; মানে নিজের ভাঙনকে স্বীকার করা, নিজের প্রভুত্বের দাবি ছেড়ে দেওয়া, এবং আল্লাহর সামনে সত্যিকার অর্থে দাস হয়ে দাঁড়ানো। এই আয়াত তাই শুধু ফেরাউনের লোকদের জবাব নয়; এটি প্রত্যেক যুগের মানুষের জন্য এক কাঁপানো আয়না—সত্যকে ‘যাদু’ বলে এড়িয়ে গেলে শেষ পর্যন্ত হারবে কে? মানুষ নিজেই। আর আল্লাহর সত্য, তাঁর রহমত ও তাঁর নিদর্শন, সব কিছুর ওপরে বিজয়ী হয়েই থাকে।

সত্য যখন মানুষের দরজায় এসে কড়া নাড়ে, তখন অহংকারের ভেতর থেকে প্রথমে যে শব্দটি ওঠে, তা অনেক সময় “সত্য” নয়—অপবাদ। এই আয়াতে মূসা (আ.) যেন মানব-ইতিহাসের চিরচেনা এক দুর্বলতা উন্মোচন করছেন: সত্য সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও, হৃদয় যদি বদ্ধ থাকে, তবে তাকে সত্য বলে মানতে কষ্ট হয়। তখন মানুষ তার নিজের অস্বস্তিকে ঢাকতে গিয়ে আল্লাহর নিদর্শনকেও যাদু বলে ফেলে। কিন্তু সত্য তো মানুষের অনুমতিতে সত্য হয় না; আল্লাহর পক্ষ থেকে যা এসেছে, তা মানুষের স্বীকৃতির আগে-পরেও একইভাবে আলোকিত। নবুয়তের কণ্ঠে তাই এক অসাধারণ দৃঢ়তা থাকে—সে কাঁপে না, সে নতি স্বীকার করে না মিথ্যার সামনে। কারণ নবী মিথ্যার সঙ্গে আপস করেন না; তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সত্যকে মানুষের বিদ্রূপের নিচে নামতে দেন না।

আর শেষে যে কথাটি উচ্চারিত হয়—যাদুকর সফল হয় না—তাতে শুধু একটি পেশার নিন্দা নেই; আছে এক মহাজাগতিক ঘোষণা। যাদু, ছলনা, ভেল্কি, বাহ্যিক মোহ—এসব মানুষের চোখে ক্ষণিকের বিস্ময় জাগাতে পারে, কিন্তু হৃদয়কে বাঁচাতে পারে না, আত্মাকে মুক্ত করতে পারে না, আখিরাতের দাঁড়িপাল্লায় কোনো ওজনও রাখে না। সফলতা কেবল সেই পথেই, যেখানে আল্লাহর সত্যের সামনে মানুষ নরম হয়, বিনীত হয়, আত্মসমর্পণ করে। ফেরাউনি মানসিকতা মানুষকে শেখায় চোখে দেখা জিনিসকে তুচ্ছ করতে; আর মূসা (আ.)-এর এই জবাব আমাদের শেখায়, সত্যকে যাদু বলার মধ্যে আসলে যাদু নেই, আছে মানুষের নিজের অন্তরের অন্ধতা। যে হৃদয় আল্লাহকে চেনে, তার কাছে নিদর্শন আর কেবল কৌশল থাকে না; তা হয়ে ওঠে জাগরণের ডাক, তাওহীদের কণ্ঠস্বর, আর ধ্বংসের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা এক জাতির জন্য শেষবারের মতো করুণ সতর্কবার্তা।
সত্য যখন মানুষের দরজায় কড়া নাড়ে, তখন অহংকার প্রথমে তাকে চিনতে চায় না। মূসা (আ.)-এর এই প্রশ্নে সেই চিরচেনা মানব-দুর্বলতা ধরা পড়ে—“সত্যের ব্যাপারে এমন কথা কেন বলছ, যখন তা তোমাদের কাছে এসে গেছে?” অর্থাৎ সত্য যদি স্পষ্ট হয়, প্রমাণ যদি সামনে দাঁড়ায়, আল্লাহর নিদর্শন যদি জীবন্ত হয়ে ওঠে, তবে তাকে “যাদু” বলে উড়িয়ে দেওয়ার সাহস আসে কোথা থেকে? আসলে অনেক সময় মানুষ সত্যকে অস্বীকার করে যুক্তির অভাবে নয়, হৃদয়ের রোগে। যে হৃদয় ক্ষমতার নেশায় অন্ধ, যে মন নিজের অবস্থান হারাতে ভয় পায়, সে সত্যের আলোকে আনন্দ নয়, হুমকি মনে করে। তখন সে ন্যায়ের কণ্ঠকে ষড়যন্ত্র বলে, নবুয়তের ডাকে ভেল্কি বলে, আর আল্লাহর কুদরতকে মানুষের কৌশল বলে অপবাদ দেয়।

আয়াতের শেষ বাক্যটি যেন আকাশের মতো নির্মম এবং স্নিগ্ধ—“যাদুকররা সফল হয় না।” সফলতা এখানে সাময়িক বাহবা নয়; সফলতা মানে সত্যের সামনে টিকে থাকা, আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া, পরিণামে মুক্তি পাওয়া। যাদু ঝলক দেখাতে পারে, কিন্তু হৃদয় বদলাতে পারে না; ভয় সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু হিদায়েত দিতে পারে না; মানুষকে তাক লাগাতে পারে, কিন্তু আল্লাহর বিধান থামাতে পারে না। কিয়ামতের দিন এই পার্থক্য আরও নগ্ন হয়ে উঠবে—কারা ছিল নিদর্শনের অনুসারী, আর কারা ছিল চমকের পূজারি। তাই এই আয়াত শুধু ফেরাউনের দরবারের কাহিনি নয়; এটি আমাদের অন্তরের আদালতেও পৌঁছে যায়। আজও কি আমরা সত্য এলে তাকে গ্রহণ করি, নাকি নিজের স্বার্থ বাঁচাতে তাকে অন্য নামে ডাকতে থাকি? মূসা (আ.)-এর এই দৃঢ় কণ্ঠ আমাদের শেখায়, সত্যের সামনে নম্র হওয়াই ঈমান, আর সত্যকে অস্বীকার করে নিজের অহংকারকে বাঁচানোই সবচেয়ে বড় পরাজয়।

সত্য যখন সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন তাকে নাম বদলে, রং বদলে, শব্দ বদলে মিথ্যা বানাতে মানুষের বুক কাঁপে না; বরং অহংকারই তাকে সাহস দেয়। মূসা (আ.)-এর এই জবাব সেই অহংকারের গালে এক নির্মম আয়না—তোমরা সত্যকে সত্য বলবে না, শুধু এ কারণেই কি তা সত্য থাকবে না? আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা নিদর্শন কি মানুষের অনুমোদনের মুখাপেক্ষী? না, বরং মানুষের অন্তরের পর্দাই তাকে বিকৃত করে। এ আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নবুয়তের আলো কখনো মিথ্যার সঙ্গে সমান হয় না; ওহির সত্য কখনো ভেল্কিবাজির মতো ক্ষণিকের চমক নয়। যেটা আল্লাহর পক্ষ থেকে, তা গভীর, ভারী, স্থায়ী, হৃদয়ভেদী। আর যেটা মানুষের বানানো, তার ঝলক আছে, কিন্তু নূর নেই; শব্দ আছে, কিন্তু হিদায়াত নেই।

এখানেই মুমিনের জন্য ভয় ও আশা একসাথে জেগে ওঠে। ভয়, এই জন্য যে সত্যকে চিনেও যদি মানুষ জিদ ধরে, তবে তার অন্তর ধীরে ধীরে অন্ধ হয়ে যায়। আর আশা, এই জন্য যে আল্লাহ সত্যকে অবশেষে প্রকাশ করেন, যদিও কিছুক্ষণের জন্য তা অপমানিত মনে হয়। ফেরাউন-সংস্কৃতির সর্বশেষ পরিণতি ছিল পরাজয়; জাদুর নামের আড়ালে যে মিথ্যা দাঁড়াতে চেয়েছিল, তা ডুবে গিয়েছিল সত্যের সামনে। তাই এই আয়াত কেবল অতীতের ঘটনা নয়—এ আজও আমাদের হৃদয়ের দরবারে এক প্রশ্ন: আমার কাছে যখন কুরআনের সত্য, হক্কের ডাক, তাওহীদের স্পষ্ট আলো আসে, আমি কি তাকে বিনয়ের সঙ্গে গ্রহণ করি, নাকি নিজের প্রবৃত্তির দেয়ালে লিখে দিই, ‘এও তো কিছু একটা?’

আজ এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা যেন নিজেদেরই বিচার করি। কতবার সত্য এসেছে, আর আমরা তাকে শুনেছি কিন্তু মানিনি; বুঝেছি কিন্তু নত হইনি; দেখেছি কিন্তু স্বীকার করিনি। কতবার মনের ভেতর ফেরাউনের এক ক্ষুদ্র ছায়া জেগেছে—অহংকারের ছায়া, অস্বীকারের ছায়া, আত্মপ্রবঞ্চনার ছায়া। আল্লাহ যেন আমাদের সেই অন্ধত্ব থেকে রক্ষা করেন, যা সত্যকে যাদু বলে; আর সেই শুষ্কতা থেকেও রক্ষা করেন, যা কুরআনের নূরকে কেবল শব্দ মনে করে। হে হৃদয়, আজ নরম হও। হে আত্মা, আজ থেমে যাও। মূসা (আ.)-এর কণ্ঠে যে দৃঢ়তা, তাতে লুকিয়ে আছে বান্দার তাওহীদ; আর আমাদের জন্য শিক্ষা এই—সত্য এলে তার সামনে মাথা নিচু করাই মুক্তি, কারণ যাদু কখনো সফল হয় না, কিন্তু আল্লাহর হক্ক অবশেষে বিজয়ী হয়।