সূরা ইউনুসের এই আয়াতে নবী ﷺ-এর কণ্ঠে এমন এক পবিত্র ঘোষণা উচ্চারিত হয়, যা দাওয়াতের অন্তরসত্তাকে উন্মোচন করে দেয়: যদি তোমরা মুখ ফিরিয়েও নাও, তবু আমি তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক চাই না। আমার প্রতিদান মানুষের হাতে নয়, আল্লাহরই কাছে। এই বাক্যে নবুওতের এক অনন্য সৌন্দর্য আছে—এ দাওয়াত বাজারের পণ্য নয়, নেতৃত্বের লোভ নয়, ব্যক্তিগত স্বার্থের চুক্তিও নয়; এটি কেবল সত্যের আহ্বান। যে ডাকে নিজের পকেট, নিজের প্রতিপত্তি, নিজের নাম খোঁজা হয়, তার ভিতরে সন্দেহ জেগে ওঠে; কিন্তু যে ডাকে নিজের জন্য কিছু না চেয়ে শুধু আল্লাহর দিকে ডাকেন, তার বাণীতে থাকে আসমানের স্বচ্ছতা। তাই এই আয়াত কেবল একটি কথা নয়, দাওয়াতের নৈতিক শুদ্ধতার ঘোষণা—নবী মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকেন, মানুষের কাছ থেকে কিছু নিতে নয়।
এই কথার পেছনে নির্দিষ্ট কোনো সহীহ ও সুপ্রতিষ্ঠিত শানে নুযূল নির্ভরযোগ্যভাবে বর্ণিত নয়; তবে সূরার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট স্পষ্ট করে দেয় যে, মক্কার মুশরিকরা বারবার নবী-বার্তাকে প্রত্যাখ্যান করছিল, অবিশ্বাস ও বিদ্রূপের পর্দা টেনে সত্যকে আড়াল করছিল। এমন এক পরিবেশে রাসূলুল্লাহ ﷺ জানিয়ে দিলেন, সত্য গ্রহণ করা না-করার দায় মানুষের; কিন্তু সত্য পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নবীর। মানুষ ফিরলে দাওয়াতের মর্যাদা কমে না, বরং মানুষের অব্যবস্থাপনার মধ্যেও আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো নবীদের সততা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এই আয়াতে যেন বলা হচ্ছে—আমি তোমাদের দ্বারে কোনো পারিশ্রমিকের কাঙাল নই; আমি আল্লাহর বান্দা, তাঁরই তরফ থেকে আদিষ্ট এক আহ্বানবাহক।
আর শেষ বাক্যটি হৃদয়ে গভীরভাবে বিঁধে যায়: ‘আমার প্রতি নির্দেশ রয়েছে যেন আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত হই।’ অর্থাৎ নবী ﷺ নিজেকে আল্লাহর সামনে সম্পূর্ণ সমর্পিত করেন, তাঁর দাওয়াতের উৎস যেমন আল্লাহ, তাঁর আনুগত্যের পথও তেমনি আল্লাহর বিধানে বাঁধা। এখানে ‘মুসলিম’ মানে কেবল নাম নয়, বরং আত্মসমর্পণের জীবন—ইচ্ছা, অহং, দাবি, তর্ক, সবকিছু আল্লাহর ফয়সালার কাছে নত করা। এই আয়াত তাওহীদের এক নীরব বজ্রধ্বনি: উপাস্য এক, প্রতিদানদাতা এক, নির্দেশদাতা এক। তাই যে ব্যক্তি সত্যের পথে হাঁটে, তাকে শিখতে হয়—মানুষের প্রশংসা নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টিই তার মূলধন; মানুষের প্রত্যাখ্যান নয়, আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্যতাই তার আসল সাফল্য।
যখন সত্যের ডাক মানুষের কাছে পৌঁছে, তখন অনেকেই প্রথমে জিজ্ঞেস করে—এতে কী লাভ? কিন্তু নবুয়তের কণ্ঠে এই প্রশ্নের কোনো জায়গা নেই। এই আয়াত যেন দাওয়াতের বুকের ওপর এক স্বচ্ছ আয়না ধরে দেয়: আমি তোমাদের কাছে কোনো বিনিময় চাই না। যে হৃদয় আল্লাহর পক্ষ থেকে কথা বলে, সে হৃদয় মানুষের মজুরি-ভিক্ষায় নত হয় না। তার আহ্বান কোনো ব্যক্তিগত মহিমা গড়তে আসে না, কোনো দল গঠনের কারবারও নয়; সে আসে বান্দাকে বান্দার আসল মালিকের দিকে ফেরাতে। এই নির্লোভতা নবী-বার্তার সৌন্দর্যকে এমন এক পবিত্রতা দেয়, যেখানে সত্য নিজের আলোতে দাঁড়িয়ে থাকে, মানুষের প্রশংসা বা প্রত্যাখ্যানের ওপর ভর করে না।
তবু যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, নবীর কণ্ঠে লুকিয়ে থাকে না কোনো অভিমান, না কোনো ক্ষোভের ব্যবসা। তিনি যেন বলে দিচ্ছেন—সত্যকে গ্রহণ করা বা প্রত্যাখ্যান করা তোমাদের ইচ্ছা; কিন্তু আমার দাওয়াতের পবিত্রতা তোমাদের সাড়া-নির্ভর নয়। আমি তোমাদের কাছে কোনো বদলা চাই না, কোনো স্বীকৃতির খাতিরে কথা বলি না, কোনো দুনিয়াবি লাভের জন্য সত্যকে নরম করি না। মানুষের কাছ থেকে কিছু না চাওয়ার এই নির্লোভতা আসলে নবুয়তের সিলমোহর; যেখানে স্বার্থ নেই, সেখানে মিথ্যার গন্ধও কমে আসে। হৃদয় তখন টের পায়—এ আহ্বান বাজারের ডাক নয়, এ তো আসমানের দরজায় কড়া নাড়া।
আরও গভীর কথা হলো, প্রতিদান আল্লাহর কাছে—এই ঘোষণা শুধু রাসূলের নয়, প্রতিটি সত্যের পথের মানুষের জন্যও এক আয়না। দুনিয়া প্রায়ই এমনভাবে গড়া যে, এখানে স্বীকৃতি না পেলে অন্তর ক্লান্ত হয়ে পড়ে, মানুষের অবহেলা আত্মাকে ভেঙে দেয়। কিন্তু এই আয়াত শেখায়, মুমিনের কাজ হলো আল্লাহর দিকে ফিরতে থাকা; মানুষের মুখ নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টিই তার মানদণ্ড। আজ যে সমাজে সত্য কথা বললে অস্বস্তি জন্মায়, ন্যায় চাইলে ব্যঙ্গ নেমে আসে, তাওহীদের ডাক শুনে অনেকে দূরে সরে যায়—সেই সমাজেও দাওয়াত থেমে থাকে না, কারণ দাওয়াতের মালিক মানুষ নয়, আল্লাহ। আর শেষ বাক্যটি—‘আমাকে আদেশ করা হয়েছে যেন আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত থাকি’—এ যেন অহংকার ভেঙে চূর্ণ করে দেয়। নবী নিজেই আল্লাহর সামনে পূর্ণ আনুগত্যে নত; তবে আমাদের জন্য তো আরও বেশি প্রয়োজন এই আত্মসমর্পণ। জীবনের গোপন ও প্রকাশ্য সব দরজায় দাঁড়িয়ে এ আয়াত আমাদের জিজ্ঞেস করে: তুমি কি সত্যিই আল্লাহর কাছে ফিরেছ, নাকি কেবল কথায় ঈমান এনেছ? মানুষকে সন্তুষ্ট করার দৌড়ে তুমি ক্লান্ত; এবার অন্তরকে ফিরিয়ে দাও সেই রবের দিকে, যাঁর কাছে-ই সব প্রতিদান, সব হিসাব, সব প্রত্যাবর্তন।
এই আয়াতের শেষভাগে এসে একটি মর্মভেদী সত্য সামনে দাঁড়ায়: আর আমাকে আদেশ করা হয়েছে, আমি যেন মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত থাকি। অর্থাৎ নবুওতও স্বেচ্ছাচার নয়, বরং পরিপূর্ণ আনুগত্যের নাম। রাসূল ﷺ-ও আল্লাহর আদেশের সামনে নিজেকে সমর্পণ করেছেন; তাহলে আমাদের অহংকার কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? মানুষ যখন নিজের অবস্থান, নিজের ব্যাখ্যা, নিজের পছন্দকে সত্যের ওপরে বসায়, তখন সে ধীরে ধীরে বন্দিত্বের ভিতরেই স্বাধীনতা খোঁজে। কিন্তু ইসলাম শেখায়—আল্লাহর কাছে নত হওয়াতেই মুক্তি, আর তাঁর হুকুমের কাছে হৃদয় সোপর্দ করাতেই শান্তি।
যে দাওয়াত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, সে দাওয়াত মুখ ফেরালেও ভেঙে পড়ে না; কারণ তার জ্বালানি মানুষের প্রশংসা নয়, রবের সন্তুষ্টি। এই আয়াত আমাদেরও ভেতর থেকে প্রশ্ন করে—আমরা কি সত্যকে গ্রহণ করি, নাকি সত্যকে তখনই গ্রহণ করি যখন তা আমাদের স্বার্থ, অভ্যাস, ইগো আর সামাজিক স্বীকৃতির সঙ্গে মেলে? কিয়ামতের দিন মানুষের প্রশংসা কোনো ওজন বহন করবে না; তখন কাজের রূহই হবে নিয়ত, আর নিয়তের ওজনই নির্ধারণ করবে আমাদের পরিণতি। তাই আজ, এই মুহূর্তেই, অন্তরকে নরম করা দরকার। আল্লাহর দিকে ফিরে আসা দরকার। কারণ যে হৃদয় বিনিময় চায় না, শুধু রবকে চায়, তারই মধ্যে নবুওতের আলো কিছুটা হলেও নেমে আসে।