আল্লাহ তাআলা প্রশ্নের ভঙ্গিতে এমন এক সত্যকে সামনে আনেন, যা মানুষের অন্তরের ঢাকনা খুলে দেয়: যখন আযাব সত্যিই এসে পড়বে, তখন কি বিশ্বাসের কথা মনে পড়বে? “এখন” কি সেই সময়, যখন অবহেলার পর হঠাৎ মুখে স্বীকারোক্তি এসে যাবে? এই আয়াত আমাদের সামনে এক কঠিন আয়না তুলে ধরে—মানুষ অনেক সময় সতর্কবার্তাকে তাড়না মনে করে, হুঁশিয়ারিকে বিরক্তি ভাবে, আর সত্যের ডাককে দূরের কোনো কথা ভেবে সরিয়ে রাখে। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সতর্কতা আসে, তা খালি ভয় দেখানো নয়; তা হচ্ছে রহমতের আগুন-ঝলমলে দরজা, যার ভেতর দিয়ে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া হয়।
এই আয়াত সূরা ইউনুসের বৃহত্তর সুরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত—এ সূরা বারবার তাওহীদ, রিসালাত, কুরআনের সত্যতা, কিয়ামতের বাস্তবতা এবং সত্য অস্বীকারকারীদের শেষ পরিণতি স্মরণ করিয়ে দেয়। এখানে আল্লাহ মানুষের সেই মানসিকতাকে স্পর্শ করেছেন, যারা সত্যকে তর্কের বিষয় বানায়, কিন্তু বাস্তবের মুহূর্তে এসে মাথা নিচু করতে বাধ্য হয়। আযাব যখন সংঘটিত হয়ে যায়, তখন ঈমানের দরজা যেন নয়; তখন সত্য নিজেকে এমনভাবে প্রকাশ করে যে অস্বীকারের আর জায়গা থাকে না। কিন্তু সেই সময়ের স্বীকারোক্তি আর ইচ্ছাকৃত আত্মসমর্পণ নয়—তা মূলত বাধ্যতামূলক উপলব্ধি, যার সঙ্গে জীবনের আগের স্বাধীন বাছাইয়ের মূল্য মিলিয়ে দেখা হয়।
বড় পরিসরে এটি কেবল এক জাতির গল্প নয়, বরং প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য সতর্কতা। যে সমাজ সত্য শুনেও সময় নষ্ট করে, যে হৃদয় বারবার আহ্বান পেয়ে তারপরও কেবল “পরে” বলে, সে হৃদয় একদিন এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারে যেখানে “পরে” আর থাকে না। এই আয়াত তাই আমাদের কানে এক নরম কিন্তু বিধ্বংসী আহ্বান: কিয়ামতের আগে জাগো, আযাব আসার আগে ফিরে এসো, আল্লাহর রহমতকে অবহেলা করো না। কারণ দেরিতে আসা স্বীকারোক্তি অনেক সময় সত্যের দরবারে যথেষ্ট হয় না; আর যিনি আজই নত হন, তাঁর জন্যই তাওবার দরজা জীবিত, প্রশস্ত, এবং রহমতে ভরা।
আল্লাহর এই প্রশ্নে এক অদ্ভুত কম্পন আছে। মানুষ যতদিন ইচ্ছার পর্দায় লুকিয়ে থাকে, ততদিন সত্যকে দূরে ঠেলে দিতে পারে; কিন্তু যখন অবধারিত বাস্তবতা এসে মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন আর অস্বীকারের ভাষা থাকে না, থাকে কেবল বিলম্বিত স্বীকারোক্তির ভাঙা শব্দ। এই আয়াত যেন বলছে—তোমরা যে সত্যকে আজ হেলাফেলা করছ, একদিন তা এমন স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে অস্বীকারের সব বাহানা গলে যাবে। কিন্তু তখনকার ঈমান সেই ঈমান নয়, যা হৃদয়কে নরম করে, ইচ্ছাকে ভেঙে দেয়, আর বান্দাকে আল্লাহর দিকে বিনয়ী করে তোলে; তখনকার স্বীকার হলো বাধ্য বাস্তবতার সামনে নত হওয়া, স্বেচ্ছা আত্মসমর্পণ নয়।
সূরা ইউনুসের এই আয়াত আমাদের কিয়ামতের দিকে তাকাতে শেখায়, কিন্তু ভয় দিয়ে নয়; বরং এমন এক রহমতময় সতর্কতায়, যা বিলম্বকে পছন্দ করে না। কারণ আল্লাহর ন্যায়বিচার শুধু শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়, মানুষকে জাগিয়ে তোলার জন্যও। যে হৃদয় আজ নরম হয়, সে-ই রক্ষা পায়; যে অন্তর আজ কেঁদে ওঠে, সে-ই ফিরে আসতে পারে। কিন্তু যে মানুষ সত্যকে কালকের জন্য তুলে রাখে, তার কাছে কাল শেষ পর্যন্ত এমন এক দরজা হয়ে দাঁড়ায়, যেখান দিয়ে অনুতাপ ঢোকে, কিন্তু কৃতজ্ঞ আত্মসমর্পণ বেরিয়ে যায় না। তাই এই আয়াতের ডাক খুব সরল, খুব কঠিন, খুব করুণ—আযাব এসে গেলে নয়, তার আগে ঈমান আনো; সত্যকে বিপর্যয়ের অপেক্ষায় রেখো না, বরং আজই তাকে হৃদয়ের সিংহাসনে বসাও।
আল্লাহ তাআলা এখানে এমন এক প্রশ্ন ছুড়ে দেন, যার সামনে মানুষের সব গর্ব, সব অবহেলা, সব মিথ্যা আশ্বাস একে একে ভেঙে পড়ে। আযাব যখন এসে পড়বে, তখন ঈমানের কথা স্মরণ হবে—কিন্তু সে হবে দেরির কান্না, সময় হারানো আফসোস, আর অন্তরের বাধ্যতামূলক স্বীকারোক্তি। যে হৃদয় সত্যকে আগে ডাকতে শেখেনি, সে হৃদয় বিপর্যয়ের মুখে এসে শুধু কেঁপে ওঠে; কিন্তু কাঁপা আর আত্মসমর্পণ এক জিনিস নয়। এই আয়াত আমাদের শেখায়, আল্লাহর হুঁশিয়ারি কখনো নিষ্ঠুরতা নয়; বরং তা এমন এক রহমত, যা বিপর্যয় আসার আগেই মানুষকে জাগাতে চায়। কিয়ামতের সেই নিরুপায় মুহূর্তের আগে আজই ফিরে আসাই বুদ্ধিমানের পথ, আজই চোখ মেলে দেখা, আজই সত্যকে সত্য হিসেবে মেনে নেওয়া।
মানুষের সমাজে এক অদ্ভুত অহংকার আছে—সত্যকে যতক্ষণ তাত্ত্বিক রাখা যায়, ততক্ষণ তা নিয়ে তর্ক চলে; কিন্তু সত্য যখন বাস্তব হয়ে দরজায় দাঁড়ায়, তখন আর কোনো তর্ক থাকে না, থাকে শুধু নত হওয়ার সময়। সূরা ইউনুস আমাদের এভাবেই স্মরণ করিয়ে দেয় যে আল্লাহর বাণী খেলনার বস্তু নয়, আর কিয়ামত কোনো দূরের গল্পও নয়। যারা সতর্কবার্তাকে তাড়াহুড়া বলে উপহাস করে, তারা আসলে নিজের আত্মাকেই ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে মুমিন নিজের হিসাব নেয়—আমি কি সত্যকে আজই গ্রহণ করছি, নাকি এমন এক মুহূর্তের অপেক্ষায় আছি, যখন আর গ্রহণের মূল্য থাকবে না? হে হৃদয়, এখনই জেগে ওঠ; কারণ আযাব আসার পরের ঈমান চোখের জল আনতে পারে, কিন্তু আল্লাহর দরবারে তাতে আর ফিরে আসার সেই মধুর দরজা খোলা থাকে না।
আল্লাহ এখানে শুধু তিরস্কার করছেন না; তিনি মানুষের আত্মপ্রতারণাকে উন্মোচন করছেন। আমরা অনেকেই সত্যকে সামনে পেয়েও পিছিয়ে দিই, ভালো করে জেনেও সময় চাই, হৃদয়ে নরম হওয়া সত্ত্বেও বিলম্বকে বেছে নিই। কিন্তু কিয়ামতের ঘনঘটা, মৃত্যু, অথবা আযাবের মুহূর্ত এসে গেলে তখন যে ঈমান জাগে, তা আর ইখলাসের প্রশান্ত প্রার্থনা হয় না; তা হয় বাধ্যতার কান্না, যা সত্যকে মেনে নেয় ঠিকই, কিন্তু ফিরবার সময়টুকু হারিয়ে ফেলে।
এই আয়াত মানুষকে ভয় দেখাতে নয়, জাগিয়ে তুলতে নাজিল হওয়ার মতো এক জাগরণ। আল্লাহর রাসূলের ডাকে, কুরআনের সতর্কবার্তায়, জীবন-নিঃশ্বাসের প্রতিটি ভাঙনে যে করুণা লুকানো আছে, তা আগে বুঝতে পারাই মুমিনের সৌভাগ্য। যে জাতি সতর্কতাকে অবহেলা করে, সে শেষ মুহূর্তে সত্যকে চিনলেও তার সামনে কেবল আফসোসের দরজা খোলে; আর যে বান্দা আগে থেকেই নত হয়, সে আযাবের আগেই রহমতের ছায়ায় আশ্রয় পায়।
আজও এই আয়াত আমাদের কানে আঘাত করে বলে—এখনই কি তোমার জন্য যথেষ্ট সময় নয়? এখনও কি হৃদয়কে কোমল করে ফিরবে না? আযাব নেমে এলে বিশ্বাসের ঘোষণা মুখে উচ্চারিত হতে পারে, কিন্তু অন্তরের বাঁচা আর তখন থাকে না; তাই কিয়ামতের আগে, সুযোগ থাকতেই, সত্যকে সত্য হিসেবে মেনে নাও, আল্লাহর সামনে ভেঙে পড়ো, এবং সেই ঈমানকে বেছে নাও যা বিলম্বের নয়, আত্মসমর্পণের।