কখন আসবে সেই প্রতিশ্রুতি?—মানুষের অবিশ্বাস যখন এমন প্রশ্ন তোলে, তখন তা শুধু কৌতূহল থাকে না; তা হয়ে ওঠে সত্যকে তুচ্ছ করার এক ভঙ্গি। সূরা ইউনুসের এই আয়াতে কাফিররা বিদ্রূপের সুরে বলে, “এ ওয়াদা কবে আসবে, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক?” তাদের কথার ভেতরে কেবল সময়-জিজ্ঞাসা নেই, আছে অস্বীকারের ঔদ্ধত্য। তারা এমনভাবে চায়, যেন আল্লাহর সিদ্ধান্ত মানুষের ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা থাকবে; যেন আকাশ-জমিনের মালিককে তার নিজের বান্দারা তাড়াহুড়োর পাঠ শেখাতে পারে। কুরআন এই প্রশ্নকে উন্মোচন করে দেখায়—অবিশ্বাসী হৃদয় সত্যকে দেরি বলে, অথচ দেরি নয়, বরং আল্লাহর হিকমতই বহুবার মানুষের সামনে অবকাশের পর্দা টেনে ধরে।

এই আয়াত নাজিলের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো একটি ঘটনা নিশ্চিতভাবে স্থির নয়; তবে মক্কার সেই বিস্তৃত বাস্তবতা এখানে স্পষ্ট, যেখানে নবীজির দাওয়াত, কিয়ামত ও আখিরাতের সংবাদকে ঠাট্টা করা হতো। মুশরিক সমাজের কাছে “ওয়াদা” মানে ছিল অদৃশ্য এক হুমকি, আর তাদের জবাব ছিল কটাক্ষ—যেন সতর্কবার্তা কেবল ভয় দেখানোর জন্যই বলা হয়। কিন্তু কুরআনের চোখে এ প্রশ্ন মানুষের ভেতরের অন্ধতার সাক্ষ্য। কারণ সত্য কখনো মানুষের অস্বীকৃতিতে মিথ্যা হয় না; আর প্রতিশ্রুতি কখনো বাতিল হয় না শুধু এ কারণে যে কিছু মানুষ তা দেখে না, মানে না, বা দেখতে চায় না।

এই আয়াত কিয়ামতের অনিবার্যতার দিকে ইঙ্গিত করে, আবার একই সঙ্গে নবুয়তের সত্যতারও পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। রাসূলের দায়িত্ব ছিল গায়েবের সময়-সূচি ঘোষণা করা নয়; তাঁর দায়িত্ব ছিল সতর্ক করা, সোজা পথ দেখানো, এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্যকে পৌঁছে দেওয়া। তাই এই বিদ্রূপের ভেতরে আসলে একটি গভীর প্রশ্ন লুকিয়ে আছে: মানুষ কি আল্লাহর সংবাদকে বিশ্বাস করবে, নাকি নিজের তাচ্ছিল্যকে? যে জাতি আল্লাহর ওয়াদাকে ঠাট্টা করে, সে আসলে নিজের পরিণতিকেই ঠাট্টা করে। আর কুরআন নরম, কিন্তু তীব্র ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেয়—সত্যের প্রতিশ্রুতি বিলম্বিত মনে হলেও তা কখনো ব্যর্থ হয় না; বরং মানুষের অহংকারই শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়।

অবিশ্বাসী মুখের এই প্রশ্ন আসলে কেবল সময় জানতে চাওয়া নয়; এটি হৃদয়ের পর্দা টেনে ধরা এক উপহাস, যেখানে মানুষ নিজের সীমিত দৃষ্টিকে সত্যের মাপকাঠি বানাতে চায়। তারা ভুলে যায়, আল্লাহর ওয়াদা কোনো তাড়াহুড়োর জিনিস নয়, কোনো মানবিক ঘোষণার মতো বাতিলও নয়। যিনি সৃষ্টি করেছেন সময়কে, তিনি নিজে সময়ের বন্দি নন। তাই কিয়ামতকে যারা অসম্ভবের গল্প মনে করে, তারা মূলত নিজেদের ক্ষুদ্র বোধের ভিতরেই মহাসত্যকে বন্দি করতে চায়। কিন্তু আল্লাহর কথা যখন আসে, তখন দেরি আর অগ্রিম—দুটিই মানুষের হিসাব; আর তাঁর ফয়সালা আসে ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন তার মধ্যে হিকমতের পরিপূর্ণতা থাকে।

এই আয়াত আমাদের ভেতরের সেই দুর্বলতাকেও নাড়িয়ে দেয়, যেখানে আমরা সত্যকে কখনো বিলম্ব দেখে সন্দেহ করি, কখনো পরীক্ষার চাপ দেখে হাল ছেড়ে দিই। অথচ দেরির মধ্যেই অনেক সময় রহমতের গোপন দরজা থাকে, আর অবকাশের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তাওবার আহ্বান। কুরআন যেন কানে কানে বলে—বিদ্রূপের জবাব বিদ্রূপে নয়, ঈমানের দৃঢ়তায় দিতে হয়; কারণ শেষ বিচারে প্রশ্নের জবাব মানুষ দেবে না, দেবে তার আমল। যারা আজ “এ ওয়াদা কবে?” বলে তাচ্ছিল্য করে, কাল তারাই বুঝবে—যে সতর্কবাণীকে তারা হালকা ভেবেছিল, সেটিই ছিল সবচেয়ে ভারী সত্য। আর মুমিনের জন্য এই আয়াত এক নীরব কাঁপন: আল্লাহর প্রতিশ্রুতি দূরে মনে হলেও তা অনিশ্চিত নয়; বরং দৃশ্যমান না হলেও তা অবধারিত, আর অবধারিত সত্যের সামনে একদিন সব অহংকারই নিঃস্ব হয়ে যাবে।
তারা যখন বলে, “এ ওয়াদা কবে আসবে?”—তখন আসলে তারা সময় জানতে চায় না; তারা সত্যকে আঘাত করতে চায়। মানুষের অহংকার কখনো কখনো এমনই নিষ্ঠুর হয় যে, যা তার চোখে তৎক্ষণাৎ ধরা পড়ে না, তাকেই সে অবাস্তব বলে ধরে নেয়। অথচ আল্লাহর ওয়াদা কোনো মানুষের উচ্ছ্বাস নয়, কোনো কল্পকাহিনি নয়, কোনো দুর্বল অনুমানও নয়। এ হলো সেই সত্য, যা আসমান-জমিনের অস্তিত্বের মতোই দৃঢ়; পার্থক্য শুধু এই যে, মানুষ আকাশ দেখে, কিন্তু আখিরাতকে দেখে না—তবু দেখার অভাব বাস্তবতাকে মিথ্যা করে না।

এই প্রশ্নের ভেতরে লুকিয়ে থাকে আরেকটি প্রশ্ন: আমি কি সত্যিই প্রস্তুত? কারণ কিয়ামত কেবল দূরের কোনো দিন নয়; তা মানুষের ভেতরের জবাবদিহির দরজা খুলে দেয়। যে হৃদয় বারবার বলে, “পরে ভাবব”, “এখনো সময় আছে”, “এখনই কী দরকার”—সেই হৃদয় ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে, আর ঘুমন্ত আত্মা নিজের পরিণতি টেরও পায় না। কিন্তু কুরআন জাগাতে আসে। এই আয়াত যেন প্রত্যেক আত্মাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করে: তুমি কি আল্লাহর দেখা থেকে পালাতে পারবে? তুমি কি তোমার আমলের হিসাবকে স্থগিত রাখতে পারবে? দেরি মানুষকে নিরাপদ করে না; অনেক সময় দেরিই মানুষকে আরো গভীর গাফিলতির মধ্যে ডুবিয়ে দেয়।

তবু এই প্রশ্নের উত্তরে ভয়ই শেষ কথা নয়, আশাও আছে। আল্লাহ যখন ওয়াদা করেছেন, তখন তা শুধু শাস্তির ঘোষণা নয়; তা ন্যায়বিচারেরও ঘোষণা, সত্যেরও বিজয়, মিথ্যারও পতন। অবিশ্বাসীরা ঠাট্টা করে সময়ের চাকা ঘোরাতে পারে না; নবীদের কথাকে বিদ্রূপ করে আল্লাহর পরিকল্পনা থামাতে পারে না। বরং এই আয়াত আমাদের শেখায়, পৃথিবীর বাজারে সত্যের দাম কম দেখালেও আকাশের আদালতে তার ওজন অটল। তাই মুমিনের কাজ হলো প্রতিবার এ রকম বিদ্রূপের মুখে আরো বেশি আত্মসমীক্ষা করা, বেশি তাওবা করা, বেশি প্রস্তুত হওয়া। কারণ যে অন্তর আল্লাহর ওয়াদাকে সত্য বলে জেনে তার দিকে এগোয়, সে-ই আসলে ভয় ও রহমতের মাঝখানে সোজা পথ খুঁজে নেয়; আর সেই পথই মানুষকে শেষ পর্যন্ত তার রবের দিকে ফিরিয়ে নেয়।

আসলে এই প্রশ্ন—“এ ওয়াদা কবে?”—মানুষের ভেতরের সেই পুরোনো অসুস্থতাকেই ফাঁস করে দেয়, যেখানে হৃদয় সত্যকে অস্বীকার করার আগে তাকে দেরি বলেই উড়িয়ে দিতে চায়। কিন্তু আল্লাহর ওয়াদা সময়ের হাতে বন্দি নয়; সময়ই বরং তাঁরই সৃষ্টি, তাঁরই ইচ্ছার অধীন। আজ যে মানুষ বিদ্রূপ করে জিজ্ঞেস করে, কাল তারই সামনে এমন এক দিন আসতে পারে, যখন প্রশ্ন করার ভাষা থাকবে না, অজুহাত থাকবে না, শুধু থাকবে নগ্ন বাস্তবতা—হায়, আমরা কেন বিশ্বাস করিনি? কেন ফিরে আসিনি? কেন সত্যকে এত হালকা ভেবেছি?

এই আয়াত আমাদের কানে কাঁপন তুলে বলে দেয়: দুনিয়ার দেরি মানে অস্বীকারের সান্ত্বনা নয়, বরং পরীক্ষা দীর্ঘ হওয়া। আল্লাহ অবকাশ দেন, ছেড়ে দেন না; সুযোগ দেন, ভুলে যান না। নবী-রাসুলের সংবাদ, কুরআনের সতর্কবাণী, কিয়ামতের প্রতিশ্রুতি—কোনোটাই খালি কথা নয়। সুতরাং যারা আজও অবহেলায় আছে, তাদের জন্য সবচেয়ে সৎ প্রশ্ন হলো এই নয় যে ওয়াদা কবে আসবে; বরং আমি সেই দিনের জন্য কী প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি? কারণ দিনটি আসুক বা না-আসুক, সত্য তার নিজের পথে অটল, আর বান্দার জন্য মুক্তির দরজা এখনও খোলা—তাওবা, ঈমান, সিজদা, এবং আল্লাহর রহমতের দিকে ফিরে আসার দরজা।