মানুষের জীবনে যত ভ্রমণ, যত অর্জন, যত অহংকার—সবশেষে একটি অমোঘ গন্তব্য আছে: তাঁর কাছেই তোমাদের সবার প্রত্যাবর্তন। এই বাক্যটি শুধু মৃত্যু-সংবাদ নয়, এটি অস্তিত্বের কেন্দ্রভেদী ডাক। আমরা যে পৃথিবীতে নিজেদের স্থায়ী ভাবি, সেই পৃথিবীই একদিন হাতছাড়া হবে; কিন্তু আল্লাহর দরবার হাতছাড়া হওয়ার নয়। তাঁর ওয়াদা সত্য—এখানে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। তিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, আবার পুনরায় সৃষ্টি করবেন; কারণ সৃষ্টি করা যেমন তাঁর কুদরতের প্রকাশ, পুনরুজ্জীবনও তেমনি তাঁর কুদরতেরই আরেক উজ্জ্বল সাক্ষ্য। জীবনের শুরু যদি তাঁর হাতে হয়, তবে শেষও কি তাঁর হাতের বাইরে থাকতে পারে?

এই আয়াতে কিয়ামতের চিন্তা ভয় জাগানোর জন্য নয়, বরং ন্যায়ের জন্য জাগানোর ডাক। যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে, তাদের পুরস্কার হবে কেবল প্রতিদান নয়, ইনসাফের সঙ্গে প্রতিদান—অর্থাৎ তাদের শ্রম এক বিন্দুও অপচয় হবে না, তাদের অশ্রু, তাদের ধৈর্য, তাদের লুকানো সিজদা, তাদের ভাঙা হৃদয়ের দোয়া—সবই আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত। আর যারা কুফর করেছে, তাদের সামনে ফুটন্ত পানির শাস্তির কথা বলা হয়েছে—এ এমন এক পরিণতি, যার মাধ্যমে কুফরের অন্তর্গত নিষ্ঠুরতা, সত্য অস্বীকারের চূড়ান্ত অপমান, এবং আল্লাহর দাওয়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ভয়াবহ ফল প্রকাশ পায়।

সূরা ইউনুসের এই ধারাবাহিক বক্তব্যে মক্কার অবিশ্বাসীদের সেই মানসিকতার জবাবও রয়েছে, যারা রিসালাতকে অস্বীকার করেছিল এবং পুনরুত্থানকে অসম্ভব ভাবত। নির্দিষ্ট কোনো একক শানে নুযূল এখানে প্রামাণ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়; তবে সূরার বৃহত্তর প্রসঙ্গ স্পষ্ট করে দেয় যে, এটি তাওহীদ, নবুয়ত, কুরআনের সত্যতা এবং আখিরাত অমান্যকারীদের প্রতি আল্লাহর চূড়ান্ত সতর্কবার্তার অংশ। এই আয়াত মুমিনকে আশ্বস্ত করে—আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়াই শেষ কথা, এবং সেই ফিরে যাওয়া নিছক বিচার নয়; তা হবে রহমতপ্রাপ্ত ঈমানের জন্য সম্মান, আর অস্বীকারের জন্য অনিবার্য জবাবদিহি। হৃদয়ের গভীরে বসলে এই আয়াত আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে বদলে দেয়: আমরা কী করছি, কেন করছি, এবং একদিন কার সামনে দাঁড়াব—এই প্রশ্নের সামনে মানুষ আর উদাস থাকতে পারে না।

মানুষের সমস্ত পথচলা শেষ পর্যন্ত একটি দরজার সামনে এসে থামে—আর সেই দরজার ওপারে আছেন আল্লাহ। এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রত্যাবর্তন কাকতাল নয়, সৃষ্টির অন্তর্লিখিত সত্য। আমরা যাকে জীবন মনে করে আঁকড়ে ধরি, তা আসলে অস্থায়ী ছায়া; আর যাঁর দিকে ফিরে যেতে হবে, তিনি চিরস্থায়ী বাস্তবতা। তাই আল্লাহর ওয়াদা সত্য—এ কথা কেবল খবর নয়, এ হচ্ছে হৃদয়ের ওপর নেমে আসা এক অমোঘ সিলমোহর। বান্দা হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান থেকে সে হারায় না; বান্দা ভুলে যেতে পারে, কিন্তু হিসাবের দিন ভুলে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।

তিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেন, তারপর আবার সৃষ্টি করবেন—এখানেই তাওহীদের জ্যোতি কিয়ামতের অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে। যে সত্তা শূন্য থেকে অস্তিত্ব দান করতে পারেন, তিনি কি ভেঙে যাওয়া দেহ, মাটিতে মিশে যাওয়া অস্থি, বিস্মৃত নাম-নিশানা আবার জাগিয়ে তুলতে অক্ষম হতে পারেন? পুনর্জীবন কোনো কল্পকথা নয়; এটি সেই সৃষ্টিকর্তার প্রতিশ্রুতি, যিনি শুরুতে জীবন দিয়েছেন এবং শেষেও জীবন ফিরিয়ে আনবেন। নবুয়তের সত্যতা, কুরআনের সতর্কতা, এবং আখিরাতের ঘোষণা—সবকিছু এক সুরে বলছে, এই পৃথিবী বিচারহীন নয়; এখানে যা কিছু হয়, তা এক মহা আদালতের প্রস্তুতি।
আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে, তাদের প্রতিদান হবে ইনসাফের সাথে—অর্থাৎ আল্লাহ তাদের কোনো কষ্টকে অবহেলা করবেন না, কোনো সৎকর্মকে ছোট করে দেখবেন না। এ প্রতিশ্রুতি মুমিনের জন্য সান্ত্বনা: আপনি যদি অন্ধকারে থেকেও সত্যের পক্ষে দাঁড়ান, আপনার দাঁড়িয়ে থাকা বৃথা যাবে না। কিন্তু যারা কুফর বেছে নিয়েছে, তাদের পরিণতি হবে ভয়াবহ—উত্তপ্ত পানীয়, যন্ত্রণাময় আযাব, নিজের অস্বীকারেরই নির্মম ফল। এই দৃশ্য শুধু শাস্তির বর্ণনা নয়; এটি আল্লাহর রহমতের আরেক রূপ, কারণ শাস্তির হুঁশিয়ারি মানুষকে ঘুম থেকে জাগায়। যে হৃদয় আজ এ কথায় কেঁপে ওঠে, সে-ই হয়তো কাল আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে; আর এটাই এই আয়াতের গভীর করুণা—ফেরার আগে ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান।

মানুষের জীবনে কত গন্তব্য, কত পরিকল্পনা, কত স্বপ্ন—তবু সবকিছুর শেষে একটি অচল সত্য দাঁড়িয়ে আছে: তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে তোমাদের সবাইকে। এই ফিরে যাওয়া কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি আল্লাহর অনড় ওয়াদা, যার মধ্যে কোনো ভাঙন নেই, কোনো ব্যত্যয় নেই। আমরা যাকে জীবন বলি, তার শুরু যেমন তাঁর হাতে, শেষও তেমনি তাঁরই হাতে। প্রথম সৃষ্টির বিস্ময় যদি তাঁর কুদরতের প্রমাণ হয়, তবে পুনরায় সৃষ্টি করা কেন অসম্ভব হবে? যে সত্তা শূন্য থেকে অস্তিত্ব দান করেন, তিনি নিশ্চয়ই ভেঙে যাওয়া দেহকে, ছড়িয়ে যাওয়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে, হারিয়ে যাওয়া পরিচয়কে আবারও একত্র করতে সক্ষম। এ আয়াত মানুষের অন্তরে সেই কম্পন জাগায় যা গাফিলতির ঘুম ভেঙে দেয়—আমি কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাচ্ছি, আর কার সামনে দাঁড়াতে হবে?

এখানে মুমিনের জন্য আছে এক অপার সান্ত্বনা, আর মানবসমাজের জন্য আছে এক নির্মম আয়না। যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে, তাদের প্রতিদান হবে ইনসাফের সাথে—অর্থাৎ আল্লাহ তাদের পরিশ্রমকে অপূর্ণ রাখবেন না, তাদের ত্যাগকে তুচ্ছ করবেন না, তাদের একাকী অশ্রু, নীরব দুআ, গোপন ইবাদত—কিছুই হারিয়ে যাবে না। পৃথিবীতে অনেক সময় ন্যায়বিচার অসম্পূর্ণ থাকে, ভালো মানুষ অবহেলিত হয়, নিষ্ঠা পুরস্কার পায় না; কিন্তু আসমানের দরবারে কোনো সৎকর্মই বৃথা যায় না। আর যারা কুফরকে বেছে নিয়েছে, তারা শুধু এক বৌদ্ধিক অস্বীকারের দায়েই ধরা পড়বে না; তারা সত্যকে অস্বীকার করে নিজেদের অন্তরকেই অন্ধকারে নিক্ষেপ করেছে। তাদের সামনে ফুটন্ত পানির ভয়াবহ শাস্তি ও যন্ত্রণাদায়ক আযাবের উল্লেখ যেন আমাদের হৃদয়ে আগুনের মতো সতর্কতা জাগায়—মানুষের অবাধ্যতা কখনোই আল্লাহর ন্যায়বিচারের বাইরে পালাতে পারে না।

তবু এই কঠিন ঘোষণার মাঝেও আল্লাহর রহমতের বিস্তৃত আকাশ অনুভব করা যায়। কারণ আল্লাহ শুধু শাস্তির কথা বলেন না; তিনি ফিরে আসার পথও খুলে দেন, তাওবার দরজাও খোলা রাখেন, হেদায়েতের আলোও পাঠান। এই আয়াত আমাদের শেখায়, জীবনকে হালকা করে দেখার সময় নেই, সমাজকে নৈতিক শূন্যতার হাতে ছেড়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই। প্রত্যেকে নিজের আমল নিয়ে ফেরার পথে আছে—কেউ আলো নিয়ে, কেউ অন্ধকার বয়ে। তাই প্রতিটি দিন হোক আত্মসমালোচনার দিন: আমার ঈমান কি শুধু মুখের কথা, নাকি নেক আমলে তার ছায়া পড়েছে? আমার জীবন কি আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর যোগ্য হচ্ছে? সূরা ইউনুসের এই আয়াত আমাদের কাঁদায়, আবার দাঁড় করায়; ভয় দেখায়, আবার আশা জাগায়। কারণ শেষ কথা এটাই—ফিরে আসা নিশ্চিত, হিসাব নিশ্চিত, এবং আল্লাহর ন্যায়ের সাথে তাঁর রহমতও নিশ্চিত।

এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মানুষের সমস্ত দাবি, সমস্ত ভোগ, সমস্ত অহংকার হঠাৎই কত ক্ষুদ্র মনে হয়। যে হাত আমাদের প্রথমবার গড়েছে, সেই হাতই আবার আমাদের ফিরিয়ে নেবে; যে সত্তা শূন্য থেকে অস্তিত্ব দিয়েছেন, তাঁর জন্য পুনর্জীবন কোনো অসম্ভব বিস্ময় নয়। তাই মৃত্যুকে এখানে শেষ বলা যায় না—এ তো শুধু প্রত্যাবর্তনের দ্বার। আমরা যেদিন আল্লাহর দিকে ফিরে যাব, সেদিন কোনো বংশ পরিচয়, কোনো সম্পদ, কোনো মুখোশ আমাদের রক্ষা করবে না; রক্ষা করবে শুধু সেই ঈমান, যা অন্তরকে সত্যের কাছে নত করেছে, আর সেই সৎকর্ম, যা গোপনে-প্রকাশ্যে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেছে।

আর যাদের অন্তর সত্যকে অস্বীকার করে অন্ধ হয়ে গেছে, তাদের জন্য ফুটন্ত পানির শাস্তির উল্লেখ আমাদের ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং আমাদের জাগিয়ে তোলার জন্য। আল্লাহ কাউকে জুলুম করেন না; মানুষই নিজের কুফর, অবহেলা, জেদ ও গাফিলতির হাত ধরে নিজের পরিণতি ডেকে আনে। এই আয়াতে ন্যায়বিচারের সঙ্গে রহমতের ছায়াও আছে—কারণ আল্লাহ আজই সতর্ক করছেন, আজই ফিরতে বলছেন, আজই তওবার দরজা খুলে রেখেছেন। তাই যে হৃদয় এখনো নরম আছে, সে যেন দেরি না করে; কারণ ফিরতে হবে তো শেষ পর্যন্ত তাঁর কাছেই। আর সেই ফিরে যাওয়াই হবে কারও জন্য শান্তি, কারও জন্য আফসোস—সবই সত্য, সবই নিশ্চিত, সবই আল্লাহর ওয়াদার অন্তর্ভুক্ত।