এই আয়াতের উচ্চারণে যেন আকাশ ফেটে এক প্রশ্ন নেমে আসে—তোমাদের কল্পিত শরীকদের মধ্যে কে আছে, যে প্রথমবার এই সৃষ্টিজগৎকে অস্তিত্ব দিতে পারে, আবার হারানো জীবনকে ফিরিয়ে আনতে পারে? প্রশ্নটি শুধু মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে নয়; এটি মানুষের অন্তরের সব ভ্রান্ত ভরসার বিরুদ্ধে এক নির্লজ্জ সত্যের আঘাত। যে হাতে একবার আদিম শূন্যতা থেকে জীবন জেগে উঠেছে, সে হাতের বাইরে আর কারও কোনো ক্ষমতা থাকে না। মানুষ অনেক কিছুকে আশ্রয় বানায়, কিন্তু এই আয়াত সেই আশ্রয়গুলোকেই পরীক্ষা করে—শেষ বিচারে কে সৃষ্টি করে, কে ফিরিয়ে আনে, কে শুরু করেছিল, কে শেষটা নির্ধারণ করবে? উত্তর একটাই, কুরআন নিজেই তা উচ্চারণ করে: আল্লাহই প্রথমবার সৃষ্টি করেন, এবং তিনিই আবার পুনরায় সৃষ্টি করবেন।
সূরা ইউনুসের এই প্রেক্ষাপটে মক্কার মুশরিকদের সামনে তাওহীদের সত্যকে তীক্ষ্ণ ও স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। তারা আল্লাহকে একেবারে অস্বীকার করত না; কিন্তু তাঁর সঙ্গে অক্ষম সত্তাদেরও অংশীদার ভাবত, যেন উপাসনার আসনে বসার অধিকার বহুজনের মধ্যে ভাগ করা যায়। এই আয়াত সেই ভ্রান্ত ভাগাভাগিকে ভেঙে দেয়। সৃষ্টি আর পুনরুত্থান—এই দুই মহান সত্য কেবল ক্ষমতার দাবি নয়, বরং রবুবিয়্যাহর চূড়ান্ত সাক্ষ্য। যে সত্তা মানুষকে প্রথম নিঃশ্বাস দিয়েছিলেন, তিনি চাইলে তাকেই আবার জাগিয়ে তুলতে পারেন। তাই পুনরুত্থানকে অস্বীকার করা মানে শুধু আখিরাতকে অস্বীকার করা নয়; তা আল্লাহর ক্ষমতার পরিধিকেই সংকুচিত করে দেখার দুঃসাহস।
এই কথার গভীরে কিয়ামতের আহ্বানও লুকিয়ে আছে। মানুষ যতই দুনিয়ার শক্তি, বংশ, সম্পদ, প্রতাপ কিংবা ভরসার ভিড়ে হারিয়ে যাক, শেষ প্রশ্নটি এসে একা দাঁড়ায়—তোমাকে কে সৃষ্টি করেছে, আর মৃত্যু শেষে কে আবার দাঁড় করাবে? এখানে কোনো শির্কের জন্য অবকাশ নেই, কোনো সন্দেহের জন্য আশ্রয় নেই। তাই আয়াতটি শুধু বুদ্ধিকে প্রশ্ন করে না, হৃদয়কেও নাড়া দেয়: যে আল্লাহ প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তাঁর কাছে আবার ফিরিয়ে দেওয়া কি অসম্ভব? আর যদি তিনি-ই একমাত্র সত্য ক্ষমতার অধিকারী হন, তবে মানুষ কেন ভ্রান্তির দিকে ফিরে যায়, কেন সত্যকে ছেড়ে অক্ষমতার পেছনে ঘুরপাক খায়? এই প্রশ্নের মধ্যেই তাওহীদের জাগরণ, কিয়ামতের স্মরণ, এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার জরুরি ডাক একসাথে হৃদয়ে বাজতে থাকে।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মানুষের অহংকার যেন নিজেকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। যে সত্তা এক ফোঁটা শূন্যতার বুক চিরে অস্তিত্বের দরজা খুলে দেন, যে সত্তা না-থাকা থেকে থাকা, মৃতপ্রায় থেকে জীবন্ত, ছিন্নভিন্ন থেকে সম্পূর্ণ করে তোলেন—তাঁর সমকক্ষ আর কে হতে পারে? মানুষ যাদের শরীক মনে করে, তারা কি একটিমাত্র প্রাণেরও সূচনা করতে পারে, আবার তা ফিরিয়ে আনতে পারে? এই প্রশ্নে শির্কের সমস্ত সাজসজ্জা ম্লান হয়ে যায়। কারণ সৃষ্টি কেবল একটি কাজ নয়; এটি ক্ষমতার মূল ভাষা। আর পুনরুত্থান তো আরও বড় সাক্ষ্য—যে সত্তা প্রথমবার জীবন দিয়েছেন, দ্বিতীয়বার ফেরাতে তাঁর জন্য কোনো অসাধ্য নেই।
এই প্রশ্নের মধ্যে কেবল তর্ক নেই; আছে আত্মার ডাক, আছে জাগরণের শঙ্কা। যদি আল্লাহই প্রথম সৃষ্টি করেন, তিনিই যদি আবার ফিরিয়ে আনেন, তবে জীবনকে খেলনা ভাবার কোনো অবকাশ থাকে না। প্রতিটি নিঃশ্বাস তখন আমানত হয়ে ওঠে, প্রতিটি কর্ম সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, প্রতিটি মৃত্যু চূড়ান্ত বিস্মৃতির নয় বরং প্রত্যাবর্তনের দ্বার। এই আয়াত হৃদয়কে শেখায়—সত্য তাওহীদ মানে শুধু মুখের স্বীকৃতি নয়, বরং অন্তরের সমস্ত আস্থা, ভয়, আশা আর ভরসাকে একমাত্র আল্লাহর দিকে ফেরানো। যিনি সৃষ্টি করেন, তিনিই মালিক; যিনি পুনরুত্থিত করবেন, তিনিই বিচার করবেন; আর যিনি বিচার করবেন, তাঁর কাছেই একদিন ফিরে যেতে হবে।
এই আয়াত মানুষের আত্মপ্রবঞ্চনার পর্দা টেনে ছিঁড়ে দেয়। যে হৃদয় আল্লাহকে দূরে সরিয়ে নানা কল্পিত ভরসার দিকে ঝুঁকে পড়ে, সে আসলে সৃষ্টির শুরু ও শেষ—দুই প্রান্তকেই ভুলে যায়। মানুষ শক্তিকে দেখে, প্রভাবকে দেখে, ভিড়কে দেখে; কিন্তু জীবন কোথা থেকে এলো, মৃত্যুর পর কে আবার ডাকবে, তার জবাব দিতে গিয়েই সব ভরসা ভেঙে পড়ে। আল্লাহর প্রশ্নটি তাই শুধু মুশরিকদের উদ্দেশে নয়; এটি প্রতিটি অহংকারী আত্মার দরজায় কড়া নাড়া—তুমি যাকে আশ্রয় ভাবছ, সে কি এক কণাও সৃষ্টি করতে পারে, নাকি হারানো প্রাণকে ফিরিয়ে আনতে পারে?
আল্লাহই প্রথম সৃষ্টি করেন, তিনিই আবার পুনরুজ্জীবিত করবেন—এই ঘোষণা কিয়ামতের সত্যকে হৃদয়ের সামনে এনে দাঁড় করায়। মানুষের জীবন কোনো এলোমেলো প্রবাহ নয়; এর শুরু আছে, শেষ আছে, এবং সেই শেষের পরও আছে মহান প্রত্যাবর্তন। আজ যে সমাজ ক্ষমতা, সম্পদ, পরিচয় আর বংশমর্যাদার মোহে বিভক্ত, এই আয়াত তাকে মনে করিয়ে দেয়: শেষ বিচারে কারও হাতে কোনো দাবি থাকবে না, কোনো মিথ্যা অবলম্বন টিকবে না। তখন রাজা ও প্রজা, শক্তিমান ও দুর্বল, গোপন ও প্রকাশ্য—সবাই একসারি হয়ে দাঁড়াবে সেই রবের সামনে, যিনি সৃষ্টি করেছেন এবং পুনরায় সৃষ্টি করবেন।
অতএব, কোথায় ঘুরপাক খাচ্ছ?—এই প্রশ্নে ভয় আছে, আবার রহমতের ডাকও আছে। ভয়, কারণ পথভ্রষ্টতার শেষ পরিণতি বড় কঠিন; আর রহমত, কারণ আল্লাহ এখনো ফিরবার দরজা বন্ধ করেননি। যে ব্যক্তি আজ নিজের ভেতরে সৎভাবে তাকায়, সে বুঝতে পারে—সবচেয়ে জরুরি হিসাবটি মানুষের সঙ্গে নয়, তার নিজের রূহের সঙ্গে। আমি কোথায় যাচ্ছি, কাকে ভরসা করছি, কার সামনে একদিন দাঁড়াতে হবে? এই প্রশ্নগুলোর জবাব যদি অন্তরে জেগে ওঠে, তবে তাওহীদ কেবল বাক্য থাকে না; তা হয়ে ওঠে জীবনযাপনের দিশা, চোখের পানি, লজ্জা, আশা, এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি।
এই প্রশ্নের সামনে মানুষের অহংকার আর টেকে না। যে হৃদয় সত্যকে শুনতে চায়, সে বুঝে যায়—জীবন এমন কোনো দুর্ঘটনা নয়, আর মৃত্যু কোনো চূড়ান্ত হার নয়; বরং সবকিছুই সেই সত্তার হাতে, যিনি প্রথমবার আমাদের না-চাওয়ার মধ্যেও সৃষ্টি করেছেন এবং আবার একদিন আমাদেরই হিসাবের জন্য দাঁড় করাবেন। তখন আর মুখে বলা যাবে না, “আমি জানতাম না।” তখন আর অন্যের কাঁধে নিজের দায় চাপানো যাবে না। তখন মানুষ দেখবে, যার উপর সে ভরসা করেছিল, সে ছিলই অক্ষম; আর যিনি একমাত্র ভরসা হওয়ার উপযুক্ত, তিনি তো সবসময়ই কাছে ছিলেন—তবু আমরা তাঁকে ভুলে ছিলাম।
অতএব, কোথায় ঘুরপাক খাচ্ছ আমরা? কিসের মোহে, কিসের ভয়ে, কিসের সম্মোহনে সত্যকে পাশ কাটিয়ে চলেছি? এই আয়াত যেন মনের দরজায় নীরবে কিন্তু কঠোরভাবে কড়া নাড়ে—ফিরে এসো, কারণ ফিরে আসার ঠিকানা আল্লাহর কাছেই। যিনি সৃষ্টি করেন, তিনিই ক্ষমা করতে পারেন। যিনি পুনরায় জীবিত করবেন, তাঁর কাছেই শেষ আশ্রয়। আজ যদি অন্তর সামান্যও নরম হয়, তবে সেটাই নাজাতের শুরু। শির্কের ছায়া, গাফলতের পর্দা, ভ্রান্ত নির্ভরতার জাল ছিঁড়ে একটিই সত্যকে আঁকড়ে ধরা দরকার: আল্লাহই যথেষ্ট। তাঁর দিকে ফিরলে হৃদয় বাঁচে, আর তাঁর থেকে দূরে গেলে মানুষ নিজেরই ভিতর ডুবে যায়।