সূরা ইউনুসের এই আয়াতটি যেন মানব-হৃদয়ের দরজায় জোরে কড়া নাড়ে। আল্লাহ নবীকে ﷺ নির্দেশ দেন, জিজ্ঞেস করো: আসমান ও যমীন থেকে কে তোমাদের রিযিক দেন? কে তোমাদের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তির মালিক? কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন, আর মৃতকে জীবিতের ভেতর থেকে বের করেন? কে সমগ্র ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করেন? এই প্রশ্নের উত্তর কোনো তর্কের নয়, স্মরণের। কারণ মানুষ অনেক কিছু দাবি করতে পারে, কিন্তু যখন অন্তর সত্যের সামনে আসে, তখন সে জানে—রিযিকের উৎস, জীবন-মৃত্যুর অধিপতি, ব্যবস্থার পরিচালক একমাত্র আল্লাহ।

এই প্রশ্নগুলোর ভেতরেই তাওহীদের এমন এক আলো আছে, যা মানুষের ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে তোলে। আরবের মুশরিক সমাজও গভীরভাবে চিন্তা করলে স্বীকার করত যে স্রষ্টা, রিযিকদাতা, জীবনদানকারী ও নিয়ন্তা আল্লাহই; কিন্তু তাদের বড় বিপর্যয় ছিল এই স্বীকৃতিকে ইবাদতে, ভয়ে, ভরসায়, আনুগত্যে পরিণত না করা। কেবল মুখে ‘আল্লাহ’ বলা যথেষ্ট নয়—আল্লাহ এই আয়াতের শেষে প্রশ্ন রাখেন: তাহলে কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না? অর্থাৎ যে সত্তাকে তোমরা অন্তরে চিনতে পারো, তাঁর সামনে কি তোমাদের হৃদয় নত হবে না?

এখানে কোনো একক নির্দিষ্ট কারণ-নুযূল স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়; তবে সূরার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে এটি মক্কার সেই তীব্র তাওহীদ-ঘোষণার অংশ, যেখানে কুরআন মানুষের জগৎকে টলিয়ে দিয়ে সত্যকে মুখোমুখি দাঁড় করায়। এই আয়াত শুধু পুরোনো এক জাতির কথা বলে না; এটি আজও প্রতিটি অন্তরকে জিজ্ঞেস করে—যে আল্লাহ তোমাকে শ্বাস দিয়েছেন, চোখ দিয়েছেন, রিযিক দিচ্ছেন, জীবন থেকে মৃত্যু আর মৃত্যু থেকে জীবনের বিস্ময় সামনে তুলে ধরছেন, তাঁর প্রতি কি তোমার ভয়, বিনয় ও নির্ভরতা জন্মেছে? এই প্রশ্নের ভেতরেই কিয়ামতের প্রস্তুতি, জাতির পরিণতির শিক্ষা, এবং আল্লাহর রহমতের ডাক একসাথে জেগে ওঠে।

আয়াতটি মানুষের ভেতরের সবচেয়ে গভীর ভ্রম ভেঙে দেয়। আমরা অনেক সময় রিযিককে দেখি বাজারে, চাকরিতে, জমিতে, মানুষের হাতে; কিন্তু আল্লাহ প্রশ্ন করেন আসমান ও যমীন থেকে কে রিযিক দেন? অর্থাৎ কারণের পেছনে যে মূল কারিগর, দৃশ্যের আড়ালে যে অদৃশ্য দাতা, তাঁকে কি তোমার অন্তর চিনতে শিখেছে? কান ও চোখ—যেগুলোকে আমরা নিজেদের ক্ষমতা ভাবি—সেগুলোর মালিকও তো তিনিই। যা দিয়ে তুমি সত্য শোনো, যা দিয়ে তুমি নিদর্শন দেখো, যা দিয়ে তুমি হিদায়াত গ্রহণ করো—সবই তো তাঁর অনুগ্রহ। তাই মানুষ যতই নিজের শক্তি নিয়ে গর্ব করুক, সে আসলে এক ফোঁটা নিয়ন্ত্রণও নিজের হাতে ধরে রাখতে পারে না।

জীবন ও মৃত্যুর এই বিস্ময়কর বিনিময়ও মানুষের অহংকারে কাঁপন ধরায়। কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন, আর কে মৃতকে জীবিতের ভেতর থেকে বের করেন? বীজের নীরব অন্ধকারে জীবন জাগে, মৃত মাটি থেকে সবুজ উঠে আসে, গাফেল হৃদয়ে তাওবা জন্ম নেয়, শুষ্ক আত্মায় ইমানের স্রোত ফিরে আসে—এসবই তাঁর কুদরতের আলামত। মানুষ ভাবে, সে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে; অথচ সে তো নিজের শ্বাসেরও মালিক নয়। জীবনের শুরু যেমন তাঁর হাতে, পরিণতিও তেমনই তাঁর হাতে। তাই মৃত্যুকে ভয় পাওয়া নয়, বরং মৃত্যু-পরবর্তী জবাবকে ভয় করা উচিত; কারণ যিনি জীবন দিয়েছেন, তিনিই হিসাব নেবেন।
শেষ প্রশ্নটি সবচেয়ে ভারী: কে সবকিছুর ব্যবস্থাপনা করেন? এই মহাবিশ্ব কোনো অরক্ষিত বিশৃঙ্খলা নয়, কোনো অন্ধ স্রোতও নয়; প্রতিটি ঘটনাই এক মহান ব্যবস্থাপনার অধীন। মানুষ যখন মুখে ‘আল্লাহ’ বলে, কিন্তু ভয়ে, ভরসায়, আশা-নিরাশায়, আনুগত্যে অন্যকে কেন্দ্র বানায়, তখন তার স্বীকৃতি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই আয়াত তাই শুধু যুক্তির নয়, তাকওয়ার আহ্বানও বটে—তাহলে কি তোমরা ভয় করবে না? অর্থাৎ যিনি রিযিক দেন, দৃষ্টি-শ্রবণ দান করেন, জীবন-মৃত্যু পরিচালনা করেন, সমস্ত কাজের ব্যবস্থাপক, তাঁর প্রতিই কি হৃদয় নত হবে না? তাওহীদ কেবল বিশ্বাসের কথা নয়; তা আত্মার কাঁপন, জীবনের শুদ্ধি, এবং আল্লাহর সামনে বিনয়ী হয়ে বাঁচার নাম।

এই প্রশ্নগুলোর সামনে মানুষ আসলে অজুহাত খুঁজে পায় না, শুধু আত্মসমর্পণের পথ খুঁজে পায়। কারণ রিযিক, শ্রবণ, দৃষ্টি, জীবন আর মৃত্যু—এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো এক মহাশাসনের অংশ, এক অদৃশ্য ব্যবস্থার প্রকাশ, যার নিয়ন্ত্রণ আল্লাহর হাতে। দিনশেষে মানুষ যতই নিজের হাতে জীবনের লাগাম আছে বলে ভাবুক, তার কান কতটা শুনবে, চোখ কতটা দেখবে, ভোরে কী পাবে, রাতে কী হারাবে—এসবের এক কণাও তার অধিকারে নেই। তাই এই আয়াত শুধু তর্ক ভাঙে না, অহংকারও ভেঙে দেয়। অন্তরকে বলে, তুমি যে নিশ্বাস নিচ্ছ, সেটাও দয়ার ভাষা; তুমি যে বেঁচে আছ, সেটাও ধার করা সময়।

আর এখানেই সমাজের রোগ ধরা পড়ে। যখন মানুষ আল্লাহকে স্রষ্টা হিসেবে মানে, কিন্তু তাঁর সামনে জবাবদিহির ভয় জাগে না, তখন তার নৈতিকতা কেবল নামের মধ্যে থাকে, হৃদয়ের গভীরে থাকে না। সে অন্যায় দেখে চুপ থাকে, হারামকে সহজ মনে করে, দুনিয়ার ঝলকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, আর নিজের ভিতরের আদালতে আল্লাহকে সাক্ষী মানে না। অথচ যে সত্তা মৃতের ভেতর থেকে জীবিতকে বের করতে পারেন, যিনি শুকনো মাটি থেকে সবুজকে জাগিয়ে তোলেন, যিনি বান্দার বুকের অন্ধকারেও আলো জ্বালান—তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে কি মানুষ নির্ভীক থাকতে পারে? তাই তো শেষ প্রশ্নটি তীরের মতো বিদ্ধ করে: তারপরেও কি তোমরা ভয় করবে না? এই ভয় শাস্তির ভয়ে কেঁপে ওঠা নয় শুধু, বরং এমন ভয়, যা গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনে, গাফিলতি ভাঙে, আর হৃদয়কে আল্লাহর দিকে ফেরায়।

যে অন্তর আজ এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে, সে-ই বুঝতে শুরু করে—আল্লাহর একত্ব কোনো শুষ্ক মতবাদ নয়; তা জীবনের প্রতিটি শিরায় চলমান সত্য। রিযিকের ওপর নির্ভরশীল দেহ, ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল পৃথিবী, জীবন-মৃত্যুর মধ্যে ঝুলে থাকা মানুষ—সবাই শেষ পর্যন্ত একমাত্র তাঁর মুখাপেক্ষী। তাই এই আয়াত মুমিনকে ভয় দেখিয়ে ছোট করে না; বরং তাকে সত্যের সামনে বড় করে। যেন অন্তর বলে, আমি কারও কাছে নয়, শুধু তাঁর কাছেই ফিরে যাব। আমি যে পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আছি, তা অস্থায়ী; আর যার হাতে আমার শুরু, আমার চলা, আমার শেষ—তাঁরই দিকে আমার প্রত্যাবর্তন।

মানুষ কত সহজে স্বীকার করে, আর কত কঠিনে আত্মসমর্পণ করে। মুখের স্বীকৃতি আর হৃদয়ের নতজানু হওয়া এক জিনিস নয়। এই আয়াতে যেন আল্লাহ মানুষের শেষ আশ্রয়টুকুও কাঁপিয়ে দেন: তোমরা জানো, রিযিক তাঁরই হাতে; কান-চোখ তাঁরই দান; জীবন ও মৃত্যু তাঁরই ইচ্ছার অধীন; সমগ্র জগতের গতি-প্রকৃতি তাঁরই ব্যবস্থাপনায়। তারপরও যদি অন্তর কেবল নিজের হিসাবেই ব্যস্ত থাকে, যদি জীবন আল্লাহর সামনে নয় বরং নফসের আদেশে চলে, তবে সেই জানা কি সত্যিই জানা? এই প্রশ্নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ঈমানের পরীক্ষা—স্বীকৃতি আছে, কিন্তু তাকওয়া আছে কি?
তাই এ আয়াত আমাদের কানে নয়, অন্তরে ধাক্কা দেয়। যিনি আসমান থেকে রিযিক বর্ষণ করেন, যমীনে জীবনের দানা জাগিয়ে তোলেন, অন্ধকারের ভেতর দৃষ্টির আলো রেখে দেন, মৃত হৃদয়কে হিদায়াতের দিকে ফিরিয়ে আনেন, এবং প্রতিটি বিষয়কে তাঁর নির্ধারিত মাপে চালান—তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বান্দার অহংকার কত ক্ষুদ্র, কত নগ্ন। মানুষের ভয়, মানুষের প্রশংসা, দুনিয়ার ক্ষণিক ভরসা—সবকিছুই তখন ম্লান হয়ে যায়, যদি হৃদয় বুঝে ফেলে যে আসল মালিক একমাত্র আল্লাহ। আর তাই প্রশ্নটা রয়ে যায়: তারপরেও কি তুমি ভয় করবে না? তারপরেও কি তুমি ফিরে আসবে না?
যে হৃদয় আজ এই প্রশ্নের সামনে নরম হয়ে যায়, তার জন্য এই আয়াত ধ্বংস নয়—রহমত। কারণ আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করতে প্রশ্ন করেন না; জাগাতে প্রশ্ন করেন। তিনি চান, বান্দা যেন রিযিকের চিন্তায় রিযিকদাতাকে না হারায়, জীবনের কোলাহলে মৃত্যুকে না ভুলে যায়, আর ব্যবস্থার জটিলতায় পরিচালনাকারী রবকে বিস্মৃত না হয়। সুতরাং আজ অন্তর বলুক: হে আল্লাহ, আমি জানি তুমিই যথেষ্ট; আমার ভরসা ভেঙে দাও, কিন্তু আমার ঈমান ভেঙো না। আমাকে এমন তাকওয়া দাও, যা শুধু মুখে নয়, ভয়ে, ভালবাসায়, তওবায়, এবং সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণে তোমার দিকে ফিরিয়ে আনে।