আল্লাহ যখন মানুষকে বিপদ থেকে বাঁচিয়ে দেন, তখন অনেক সময় তার অন্তর কোমল হওয়ার কথা—কৃতজ্ঞতায় নত হওয়ার কথা—কিন্তু এই আয়াত আমাদের এমন এক নির্মম সত্য দেখায়: রক্ষা পাওয়ার পরও মানুষ আবার সীমালঙ্ঘনের পথে দৌড়ায়। যেন সে ভুলে যায়, যে হাত তাকে ডুবি থেকে টেনে তুলেছিল, সেই হাতের সামনে তারই অহংকার কত অসহায়। এখানে ‘يَبْغُونَ’ শুধু বাহ্যিক অন্যায় নয়; এতে আছে জুলুম, ঔদ্ধত্য, সত্যকে অস্বীকার করা, এবং আল্লাহর দেওয়া সুযোগকে অবাধ্যতার হাতিয়ার বানিয়ে ফেলা। মানুষের এই স্বভাব কত বিস্ময়কর—বিপদে সে আল্লাহকে ডাকে, আর নিরাপত্তা পেয়ে নিজের নফসকে ডালপালা মেলতে দেয়।

আয়াতটি মানুষের মনে এক গভীর সতর্কতা স্থাপন করে: তোমাদের অনাচার আসলে তোমাদেরই বিরুদ্ধে ফিরে আসছে। দুনিয়ার ভোগ সাময়িক; তার স্বাদ আছে, কিন্তু স্থায়িত্ব নেই। মানুষ যা দখল করে, যা জমায়, যা দিয়ে গর্ব করে—সেসবের কোনো কিছুই তার আত্মাকে বাঁচাতে পারে না, যদি সে নিজের হাতেই নিজের অন্তরকে কলুষিত করে। আল্লাহর এই বাণী কোনো কঠোরতা নয়, বরং রহমতের ভেতর লুকানো সতর্ক ঘণ্টা। তিনি মানুষকে ছেড়ে দেন না; তিনি আগে বাঁচান, তারপর স্মরণ করিয়ে দেন যে অবাধ্যতার শেষ পরিণতি বাইরের কোনো শত্রুর হাতে নয়, নিজের কৃতকর্মের ভেতরেই গাঁথা।

সুরা ইউনুসের বৃহৎ ধারায় তাওহীদ, নবুয়ত, কুরআনের সত্যতা এবং কিয়ামতের জবাবদিহি বারবার সামনে আসে। এই আয়াতও সেই একই আলোর অংশ—মানুষকে বুঝিয়ে দেয় যে শেষ প্রত্যাবর্তন আল্লাহর কাছেই, এবং সেখানে কোনো ছলনা, কোনো আত্মপ্রবঞ্চনা, কোনো দুনিয়াবি আড়াল টিকবে না। মক্কার সমাজে যেমন আল্লাহর নিদর্শন অস্বীকার, ক্ষমতা-অহংকার ও অন্যায় দাপট ছিল, তেমনি সব যুগের মানুষই এই আয়াতের সামনে দাঁড়ায়। কারণ সাগর পেরোনো নাজাত হোক, জীবনের কোনো বিপদ হোক, কিংবা সুযোগ-সুবিধার প্রাচুর্য—প্রত্যেক মোড়েই প্রশ্ন একটিই: বান্দা কি কৃতজ্ঞ হয়েছে, নাকি নাজাতের পরেই আবার সীমালঙ্ঘনে ফিরে গেছে?

রক্ষা যখন মেলে, তখনই মানুষের আসল মুখ দেখা যায়। বিপদে যে হৃদয় কাঁপে, নিরাপত্তা পেলে অনেক সময় সেই হৃদয় আবার কঠিন হয়ে যায়; যেন সে ভুলে যায়—যে আল্লাহ তাকে ডুব থেকে টেনে তুললেন, তিনিই আবার তার অন্তরের ভেতরের বিদ্রোহও জানেন। এই আয়াত আমাদের বলে, মানুষ যখন ‘يَبْغُونَ’—সীমালঙ্ঘন, জুলুম, অহংকার, সত্যের মুখে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া—তখন সে অন্যের ওপর নয়, নিজেরই আত্মার ওপর আঘাত হানে। বাহ্যত সে পৃথিবীতে দাপিয়ে বেড়ায়, কিন্তু বাস্তবে সে নিজের বিরুদ্ধে এমন এক মামলা তৈরি করে, যার সাক্ষী তারই আমল।

দুনিয়ার জীবন এখানে এক ক্ষণস্থায়ী ভোগের নামমাত্র। এর স্বাদ আছে, কিন্তু স্থায়িত্ব নেই; এর আলো আছে, কিন্তু উত্তাপ ফুরিয়ে যায়; এর সম্পদ আছে, কিন্তু সান্ত্বনা নেই। মানুষ যাকে বিজয় মনে করে, তা অনেক সময় কেবল পরীক্ষার রঙিন পর্দা। আল্লাহ মানুষকে অবকাশ দেন, সুযোগ দেন, রক্ষা করেন—কিন্তু এই সুযোগকে যদি কৃতজ্ঞতার বদলে সীমালঙ্ঘনের বাহন বানানো হয়, তবে তা রহমতের অবমাননা হয়ে দাঁড়ায়। তাই এই আয়াতের ভেতর এক অদ্ভুত কম্পন আছে: ভোগ কর, যদি করতে চাও; কিন্তু ভুলে যেয়ো না, এই ভোগের শেষে ফিরে আসতে হবে সেই দরবারে, যেখানে কোনো মুখোশ টিকে না।
‘অতঃপর আমার নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে’—এই বাক্যটি হৃদয়ের ওপর যেন এক অনিবার্য হাতের চাপ। পালানোর জায়গা নেই, অস্বীকারের আশ্রয় নেই, আত্মপ্রবঞ্চনার অবকাশ নেই। আল্লাহ সেখানে শুধু কথা শোনাবেন না, সবকিছুকে প্রকাশ করবেন—যা কিছু তুমি লুকিয়েছিলে, যা কিছু তুমি হালকা ভেবেছিলে, যা কিছু তুমি মানুষের চোখ এড়িয়ে সেরে ফেলেছিলে। এ আয়াত তাই আমাদের তাওহীদের দিকে ফেরায়: রক্ষাকারী একমাত্র আল্লাহ, বিধানদাতা একমাত্র আল্লাহ, এবং শেষ বিচারের মালিকও একমাত্র আল্লাহ। তাঁর রহমত মানুষকে বাঁচায়, আর তাঁর বিচার মানুষকে জাগায়। যারা আজ অনাচারে মত্ত, তারা যেন জেনে রাখে—অন্যায় পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ালেও, শেষ ঠিকানা আল্লাহর কাছেই; আর সেখানেই প্রতিটি কাজের সত্য রূপ উন্মোচিত হবে।

আল্লাহ যখন বান্দাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন, তখন কৃতজ্ঞতার দরজায় প্রথম যে কড়া নাড়ার কথা ছিল, তা অনেক সময়ই নীরব হয়ে যায়; আর তার জায়গায় জেগে ওঠে সীমালঙ্ঘনের তৃষ্ণা। এ এক অদ্ভুত মানবমনের রোগ—যে করুণা তাকে টেনে তুলেছে, সেই করুণার ছায়াতেই সে আবার অন্যায়কে স্বাভাবিক করে ফেলে। আয়াতের এই ঘোষণা আমাদেরকে কেবল ব্যক্তিগত পাপের দিকে নয়, সমাজের গভীর অসুস্থতার দিকেও তাক করায়: যখন মানুষ নাজাতের পরও ন্যায়ের সীমা ভাঙে, তখন শহর-জনপদ, বাজার-রাজনীতি, শক্তি-সম্পদ—সবই ধীরে ধীরে জুলুমের ইন্ধনে জ্বলে ওঠে।

“তোমাদের অনাচার তোমাদেরই উপর”—এই বাক্যটি যেন আসমান থেকে নেমে আসা এক আয়না, যেখানে মানুষ নিজের চেহারা দেখে। দুনিয়ার জীবনের ভোগ সাময়িক; ক্ষমতা আছে, কিন্তু স্থায়িত্ব নেই; স্বাদ আছে, কিন্তু উত্তরাধিকার নেই; গর্ব আছে, কিন্তু নিরাপত্তা নেই। শেষে প্রত্যাবর্তন তো আল্লাহর কাছেই—সেখানে কোনো শব্দ আড়াল হবে না, কোনো ভিড় ঢাকবে না, কোনো অজুহাত টিকবে না। তখন মানুষের কাজই তার পরিচয় হয়ে দাঁড়াবে। এই আয়াত তাই একসাথে ভয়ও জাগায়, আশা-ও জাগায়: ভয়, কারণ সীমালঙ্ঘন অবশেষে নিজের ওপরই ফিরে আসে; আশা, কারণ এখনো সময় আছে ফিরে আসার, নিজের নফসের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর, এবং সেই রবের দিকে মুখ ফেরানোর যিনি সতর্কও করেন, আবার ক্ষমাও করতে ভালোবাসেন।

যে মানুষ বিপদে আল্লাহকে ডাকে, আর রক্ষা পেয়ে আবার সীমালঙ্ঘনের পথে ফিরে যায়—সে আসলে নিজের হৃদয়ের ভেতরেই এক ভয়ংকর প্রতারণা লালন করে। এই আয়াত যেন বলে, তোমার অন্যায় প্রথমে পৃথিবীকে আহত করে না; তা আগে তোমাকেই আহত করে। তোমার অন্তরের সরলতা ভেঙে যায়, তোমার কৃতজ্ঞতা নিঃশেষ হয়ে যায়, তোমার আত্মা এমন এক অন্ধকারে ঢুকে পড়ে যেখানে সত্য আর বাতিলের পার্থক্য ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসে। আল্লাহ কাউকে বাঁচিয়ে দিয়ে তার জুলুমকে বৈধ করেন না; বরং সে বাঁচা নিজেই একটি পরীক্ষা—এই মুক্তির পরে তুমি কাদের দিকে ঝুঁকবে, নত হবে, নাকি আরও অহংকারে ফুলে উঠবে।

দুনিয়ার ভোগ ক্ষণিকের, কিন্তু তার পরে যে হিসাব, তা অবশ্যম্ভাবী। আজ মানুষ ক্ষমতা পায়, জমি পায়, সুযোগ পায়, মুখে হাসি পায়—আর ভাবে, জীবন বুঝি এখানেই শেষ। কিন্তু কুরআন স্মরণ করিয়ে দেয়, শেষ নয়; ফিরে যেতে হবে। ফিরতে হবে সেই রবের দিকে, যিনি গোপন-কথা জানেন, যিনি অন্তরের ভেঙে পড়া, লুকানো জুলুম, প্রকাশ্য অবাধ্যতা—সব কিছুর খবর রাখেন। সেদিন মানুষের অজুহাত ঝরে পড়বে, মুখের পর্দা সরে যাবে, আর অবশিষ্ট থাকবে কেবল কর্ম। তাই এখনই হৃদয় নরম হওয়া উচিত, এখনই নফসকে থামানো উচিত, এখনই তওবার দরজা কড়া নাড়তে থাকা উচিত। কারণ যে হাত আজ সীমালঙ্ঘন করছে, সেই হাতই কাল নিজেরই বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে।