মানুষের অন্তর যখন অহংকারে ভরে যায়, তখন ওহীর সবথেকে সোজা কথাটিও তাদের কাছে বিস্ময়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা এক গভীর সত্য উন্মোচন করেছেন: তিনি মানুষের মধ্য থেকেই একজন মানুষকে রাসূল হিসেবে পাঠান, যাতে তিনি মানুষকে সতর্ক করেন—কোনো দুর্বোধ্য দম্ভের ভাষায় নয়, বরং তাদেরই ভাষায়, তাদেরই সমাজের ভেতর দাঁড়িয়ে, তাদেরই হৃদয়ে আঘাত করে। তাওহীদের এই আহ্বান অস্বাভাবিক নয়; বরং এটাই আল্লাহর রহমত, কারণ মানুষের কাছে মানুষই সর্বাধিক সহজবোধ্য হুজ্জত, আর নবুয়ত কোনো দূরবর্তী কল্পনা নয়—এটি আসমান থেকে নেমে আসা বাস্তব পথপ্রদর্শন।
আয়াতটি একই সঙ্গে কিয়ামতের ভয় এবং ঈমানের মিষ্টি সুসংবাদ—এই দুই স্রোতকে একত্রে বহন করে। একদিকে মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে, কারণ অবহেলার শেষ পরিণতি আছে, হিসাব আছে, প্রত্যাবর্তন আছে; অন্যদিকে যারা ঈমান এনেছে, তাদের জন্য ঘোষণা করা হচ্ছে ‘কদামে সিদ্ক’—রবের কাছে সত্য মর্যাদা, দৃঢ় পদ, সম্মানিত অবস্থান। এই শব্দগুলো শুধু পুরস্কারের ভাষা নয়, এগুলো যেন জান্নাতের দিকে এগিয়ে যাওয়া এক অন্তর্গত সান্ত্বনা; যে মুমিন আজ দুনিয়ায় অবজ্ঞিত, তার জন্য আসমানে অপেক্ষা করছে স্থায়ী স্বীকৃতি। আর এটাই কুরআনের রীতি—ভয় দেখায়, আবার আশা জাগায়; ভাঙে, আবার জোড়া লাগে; জাগিয়ে তোলে, আবার আশ্রয় দেয়।
নির্ভরযোগ্যভাবে নির্দিষ্ট কোনো একক শানে নুযূল না থাকলেও, সূরা ইউনুসের এই অংশ মক্কার সেই সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, যেখানে কুরআনের আহ্বানকে অনেকে নবুয়তের সত্য হিসেবে গ্রহণ না করে অবজ্ঞা, বিস্ময় ও বিদ্রূপের ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাদের কাছে আশ্চর্য লাগছিল—একজন মানুষের ওপর ওহী নাজিল হবে কেন? অথচ এখানেই আল্লাহ মানুষের ধারণাকে ভেঙে দিচ্ছেন: প্রেরণার জন্য আসমানি বাণী মানুষের রক্ত-মাংসের মধ্য দিয়েই আসে, যাতে অস্বীকারের কোনো অজুহাত না থাকে। আর অস্বীকারকারীদের ‘এ তো স্পষ্ট জাদু’ বলার মধ্যেই ধ্বনিত হয় তাদের অন্তর্গত অন্ধত্ব; সত্যকে যখন হৃদয় প্রত্যাখ্যান করে, তখন সে সত্যকে ব্যাখ্যা করে মিথ্যার নামে।
মানুষের বিস্ময় এখানে আসলে নতুন কিছু নয়; বিস্ময়টি মানুষের অহংকারের নাম। আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নেমে আসবে—এতে আশ্চর্য কিসের? যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি মানুষকে পথ দেখাতে অক্ষম? যিনি হৃদয়ের গোপন কথা জানেন, তিনি কি হৃদয় স্পর্শ করার জন্য মানুষেরই ভাষায়, মানুষেরই সমাজ থেকে একজনকে নির্বাচন করতে পারবেন না? নবুয়ত তাই আকাশচ্যুত কোনো কল্পকাহিনি নয়; এটি সৃষ্টির গভীর রহস্যের সঙ্গে মিশে থাকা এক করুণা। আল্লাহ যখন বান্দাদের মধ্য থেকেই একজন বান্দাকে পাঠান, তখন তিনি মানুষকে তারই আয়নায় নিজের চেহারা দেখান—যাতে অজুহাতের সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং সত্যের আহ্বান আর দূরের কোনো স্বপ্ন না থেকে জীবন্ত বাস্তব হয়ে ওঠে।
অস্বীকারকারীরা যখন বলে, ‘এ তো স্পষ্ট জাদু’, তখন আসলে তারা কুরআনের আলোকে নয়, নিজেদের অন্ধকারকেই নাম দিয়ে ডাকে। সত্য যখন আত্মসমর্পণ চায়, অহংকার তখন তাকে অপবাদ দিয়ে ঠেকাতে চায়। নবীর দাওয়াতের সামনে এমন প্রতিক্রিয়া নতুন ছিল না, আজও নেই; কারণ বাতিলের সবচেয়ে পুরনো অস্ত্র হলো সত্যকে অবিশ্বাসের ভাষায় আঘাত করা। কিন্তু এই অপবাদ সত্যকে ছোট করে না, শুধু অপবাদদাতার অন্তরকে প্রকাশ করে। সূরা ইউনুসের এই আয়াত আমাদের শেখায়, আল্লাহর রহমত কোনো বিমূর্ত অনুভব নয়—তিনি সতর্ক করেন, আবার সম্মানও দেন; ভয় দেখান, আবার আশা জাগান; মানুষকে জবাবদিহির সামনে দাঁড় করান, আবার ঈমানকে দেন স্থায়ী মর্যাদার প্রতিশ্রুতি। যে হৃদয় এই ডাক শোনে, সে আর আল্লাহর আয়াতকে বিস্ময় বলে না; সে তাকে নিজের মুক্তির দরজা বলে চিনে নেয়।
মানুষের অহংকার কত সূক্ষ্ম, কত ভয়ংকর! আল্লাহ যখন তাদেরই মধ্য থেকে একজন মানুষকে ওহীর আমানত দিলেন, তখন তারা বিস্মিত হলো। যেন তারা বলতে চাইল, মানুষের কাছে মানুষ কীভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসতে পারে? অথচ এই বিস্ময়ের মধ্যেই তাদের অন্তরের রোগ ধরা পড়ে। আল্লাহ তাআলা যাকে চান, তাকেই হেদায়েতের বাহক বানান; তিনি মানুষকে মানুষ দিয়ে ডাকেন, যাতে অজুহাতের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, আর সত্যের ডাক ঘরের দরজার মতো সহজ, জীবনের মতো কাছের হয়ে ওঠে। নবুয়ত কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়; বরং এটাই আল্লাহর রহমত—যে পথ হারিয়েছে, তার কাছে পথের খবর পৌঁছে দেওয়া।
এই আয়াতে একদিকে সতর্কবার্তা, অন্যদিকে সুসংবাদ। মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে—কারণ অবহেলারও হিসাব আছে, অস্বীকারেরও শেষ আছে, মাটির জীবনের পর এক ভয়াবহ প্রত্যাবর্তন আছে। আর ঈমানদারদের জন্য ঘোষণা হচ্ছে, তাদের জন্য রয়েছে ‘সিদ্ক’-এর পদ, সত্য মর্যাদা, রবের কাছে সম্মানের আসন। দুনিয়ার পদমর্যাদা কতই না নড়বড়ে; আজ আছে, কাল নেই। কিন্তু আল্লাহর কাছে যে মর্যাদা, তা সত্যের মতো স্থায়ী, নূরের মতো নির্মল, জান্নাতের মতো প্রশান্ত। ঈমান মানে শুধু বিশ্বাস করা নয়; ঈমান মানে এমন এক পথে দাঁড়িয়ে যাওয়া, যেখানে আল্লাহ নিজেই বান্দার জন্য সত্য প্রতিষ্ঠা করেন।
কিন্তু যারা অহংকারে অন্ধ, তারা নবীর মুখে আল্লাহর বাণীও সহ্য করতে পারে না। তাই তারা বলে, এ তো স্পষ্ট জাদু! সত্য যখন হৃদয়ে ধাক্কা দেয়, আর নফস যখন আত্মসমর্পণ করতে চায় না, তখন মানুষ শব্দকে আক্রমণ করে, সত্যকে অপমান করে, ওহীকে বিকৃত নামে ডাকে। তবু ওহী থামে না; আল্লাহর ডাক থামে না; কিয়ামতের পদধ্বনিও থামে না। এই আয়াত আমাদের নিজের দিকে ফিরিয়ে নেয়: আমি কি সত্যকে বিস্ময় মনে করছি, নাকি আত্মসমর্পণ করছি? আমি কি অস্বীকারকারীদের কণ্ঠে মিশে যাচ্ছি, নাকি ঈমানদারদের সেই সিদ্কের পথে পা রাখছি, যার শেষ গন্তব্য রবের সন্তুষ্টি?
অথচ মানুষের বিস্ময় যতই বড় হোক, আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নেমে আসা কোনো অস্বাভাবিকতা নয়; অস্বাভাবিক হলো সেই হৃদয়, যা নিজেরই মতো এক বান্দার কণ্ঠে সত্য শুনেও কেঁপে ওঠে না। মানুষ তো মানুষকেই চেনে, মানুষের দুঃখ-ক্লান্তি, ভুল, কান্না, ভাঙন—সবই মানুষে মানুষে বোঝে; তাই আল্লাহ যখন মানুষের মধ্য থেকেই একজনকে পাঠান, তখন তাতে রহমতও থাকে, প্রমাণও থাকে, এবং হুজ্জতও থাকে। নবীকে অস্বীকার করা মানে কেবল একজন ব্যক্তিকে অস্বীকার করা নয়; তা হলো আসমানী দয়ার দরজায় তালা লাগাতে চাওয়া, আর নিজের অন্তরের অন্ধকারকে সত্যের আলো ভেবে বুকে লালন করা। তাই যারা বলে, “এ তো প্রকাশ্য যাদু,” তারা আসলে সত্যের জাদুতে নয়, নিজেদের অহংকারের মায়ায় বন্দী হয়ে পড়ে।
আর যারা ঈমান আনে, তাদের জন্য এই আয়াতে আছে এমন এক প্রতিশ্রুতি, যা দুনিয়ার সব প্রশংসার চেয়ে গভীর, সব মর্যাদার চেয়ে স্থায়ী: রবের কাছে তাদের জন্য আছে সত্য পদ, সত্য অবস্থান, সত্য সম্মান। কদামে সিদ্ক—এ এমন কোনো পদ নয়, যা চোখে দেখা যায়; এটি সেই মর্যাদা, যা কিয়ামতের দিন মানুষের সব পরিচয়ের ওপরে উঠে দাঁড়াবে। আজ যে হৃদয় ওহীর সামনে নত হয়, কাল সে হৃদয়ই আল্লাহর রহমতে উঁচু হবে; আজ যে চোখ অশ্রু দিয়ে নিজের ভুল দেখে, কাল সে চোখই নাজাতের আলো দেখবে। সুতরাং এই আয়াত আমাদের সামনে শুধু নবুয়তের সত্যতা রাখে না, আমাদের নিজেদের অবস্থাও উন্মোচন করে: আমরা কি বিস্মিত অস্বীকারকারীদের দলে, নাকি কাঁপতে কাঁপতে তওবা করা মুমিনদের দলে? যদি সত্যিই হৃদয়ে সামান্যও ঈমান থাকে, তবে আজই অহংকার ছেড়ে এই ঘোষণার সামনে নত হওয়া উচিত—আল্লাহর পাঠানো কথাই সত্য, আর তাঁর ডাকে সাড়া দেওয়াই মানুষের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য।