মানুষের জীবন অদ্ভুত এক দোলাচল—কখনো কষ্টের আঁধার, কখনো কল্যাণের আলো। কিন্তু এই আয়াত আমাদের চোখের সামনে পর্দা সরিয়ে দেয়: ক্ষতি যদি এসে লাগে, তা দূর করার চূড়ান্ত ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর; আর কল্যাণ যদি তিনি দান করেন, তা ফিরিয়ে নেওয়ার, রদ করার, ঠেকিয়ে দেওয়ার শক্তি কারও নেই। এখানে তাওহীদের এমন এক নীরব বজ্রধ্বনি আছে, যা হৃদয়ের ভিতর জমে থাকা সব ভ্রান্ত ভরসাকে কাঁপিয়ে দেয়। মানুষ কখনো মানুষকে আশ্রয় মনে করে, কখনো সম্পদকে, কখনো নিজের পরিকল্পনাকে; কিন্তু এই আয়াত বলে, সব আশ্রয়ই ভঙ্গুর, সব হাতই সীমাবদ্ধ। অদ্বিতীয় মালিকের ইচ্ছার সামনে কষ্টও থেমে যায়, রহমতও নেমে আসে—এবং উভয়ই তাঁর জ্ঞানে, তাঁর হিকমতে, তাঁর পরিমাপে ঘটে।

এই বাক্যগুলো কোনো শুষ্ক দর্শন নয়, বরং মুমিনের অন্তরকে শুদ্ধ করার এক জীবন্ত পাঠ। কারণ মানুষের প্রকৃত বিপদ কেবল দুঃখ নয়; প্রকৃত বিপদ হলো, দুঃখের সময় আল্লাহকে ভুলে যাওয়া, আর সুখের সময় তাঁকে প্রয়োজন না ভাবা। কুরআনের এই ঘোষণা আমাদের শেখায়—তাকদিরের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং তাকদিরের মধ্যেও রবকে চিনে নেওয়া। কষ্ট এলে তা আল্লাহর পরীক্ষা, কল্যাণ এলে তা আল্লাহর অনুগ্রহ; আর উভয় অবস্থায় বান্দার কাজ একটাই—ফেরেশতাদের ভাষায় নয়, ভাঙা হৃদয়ের ভাষায়ও যদি হয়, তবু রবের দিকে ফিরে যাওয়া। কারণ আল্লাহর ফযল এমন এক নদী, যার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষের ক্ষমতা কেবলই ক্ষুদ্র ঢেউয়ের মতো।

সূরা ইউনুসের সামগ্রিক সুরায় তাওহীদ, নবুয়ত, কিয়ামতের স্মরণ, এবং অবাধ্য জাতিসমূহের পরিণতি বারবার আলোচিত হয়েছে। এই আয়াতও সেই বৃহত্তর সত্যবয়ানের অংশ: যে আল্লাহ আকাশ-জমিনের মালিক, যিনি রাসূলকে সত্য বার্তা দিয়ে পাঠিয়েছেন, যাঁর কাছে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত, তিনিই ক্ষতি দূর করেন এবং কল্যাণ দান করেন। এখানে কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার কঠোর সীমায় কথাটি বাঁধা নেই; বরং এটি সব যুগের মানুষের জন্য আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ঘোষণা। বিশেষত সেই সমাজের জন্যও, যেখানে মানুষ নিজেদের ক্ষমতা, বংশ, উপাস্য বা মধ্যস্থতাকে ভরসা মনে করত—আয়াত তাদের ভেঙে দিয়ে শেখায়, একমাত্র গফুরুর রাহীম রবই আশার শেষ ঠিকানা।

এই আয়াতের গভীরে দাঁড়িয়ে মানুষ বুঝে যায়, সে নিজেই নিজের ভাগ্যের মালিক নয়; সে কেবল এক অপার করুণার মুখাপেক্ষী বান্দা। কষ্ট এলে আমরা কত দরজায় কড়া নাড়ি, কত নামের সামনে ভরসা ভেঙে রাখি; কিন্তু শেষ কথাটি তবু একমাত্র আল্লাহর। তিনি যদি কোনো দুর্ভাগ্যের আঁচ ছুঁয়ে দেন, সেই আঁচ মুছিয়ে দেওয়ার শক্তি কারও নেই। আবার তিনি যদি কল্যাণের একটি ফোঁটাও নাজিল করেন, দুনিয়ার কোনো জোর, কোনো কৌশল, কোনো প্রাচীর তা ফিরিয়ে রাখতে পারে না। এ তো কেবল ক্ষমতার ঘোষণা নয়; এ হলো হৃদয়কে সব মিথ্যা নির্ভরতা থেকে মুক্ত করার এক মহান ডাক।

আর এই মুক্তি মুমিনকে নিষ্ঠুর করে না, বরং নরম করে; তাকে গর্বিত করে না, বরং কৃতজ্ঞ করে। কারণ যে জানে কল্যাণ তার নিজের কৃতিত্বে নয়, সে অহংকারে ফুলে ওঠে না; আর যে জানে ক্ষতি আল্লাহর হাতেই উত্থান-পতনের স্রোতে আসে, সে হতাশার অন্ধকারে হারিয়ে যায় না। এখানে তাকদিরের কঠোরতা আছে, আবার তার চেয়েও গভীর আছে রহমতের আশ্বাস। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ দেন, আর সেই অনুগ্রহ কোনো শুষ্ক আইন নয়—তা ক্ষমাশীল রবের দয়ার ছায়া। তাই এই আয়াতের শেষ প্রান্তে এসে হৃদয় কেঁপে ওঠে: যিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান, তিনিই আবার الغفور الرحيم। তাঁর ক্ষমতা ভয় জাগায়, আর তাঁর ক্ষমাশীলতা আশা জাগায়; মুমিনের জীবন এই দুই স্রোতের মাঝখানে, এক নিঃশর্ত ভরসার পথে হাঁটে।
এই আয়াত মানুষের অন্তরের সবচেয়ে গভীর ভরসাগুলোকে প্রশ্ন করে। আমরা কত সহজে ক্ষতিকে মানুষের হাতে লিখে ফেলি, আর কল্যাণকে নিজের কৌশলের ফল মনে করি; অথচ কুরআন এসে বলে, ক্ষতি দূর করার চাবি ও কল্যাণের দরজা—দুটোই আল্লাহর হাতে। তাই মুমিনের আত্মসমালোচনা এখানেই শুরু হয়: আমি কি বিপদের মুহূর্তে তাঁর কাছে ফিরি, নাকি অন্য সব দরজায় মাথা ঠুকেও শেষে ক্লান্ত হয়ে যাই? আমি কি ভালো সময় পেয়ে অহংকার করি, নাকি অনুগ্রহের সঙ্গে কৃতজ্ঞতাও বহন করি? যে হৃদয় আল্লাহকে কেন্দ্র করে, সে ভাঙে না; সে আহত হয়, কিন্তু বিপর্যস্ত হয় না; সে কষ্ট দেখে, কিন্তু কষ্টের কাছে আত্মসমর্পণ করে না।

সমাজ যখন মানুষকে মাপতে শেখে ক্ষমতা, সম্পদ, পরিচয় আর প্রভাব দিয়ে, তখন এই আয়াত নীরবে সেই ভ্রান্ত মানচিত্র ছিঁড়ে ফেলে। কারণ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাঁর বান্দাদের মধ্যে অনুগ্রহ দান করেন—এ এক অদৃশ্য বণ্টন, যেখানে কারও জোর নেই, কারও হস্তক্ষেপ নেই। এতে গরিবের হৃদয়ে সান্ত্বনা আছে, ধনীর হৃদয়ে সতর্কতা আছে, আর প্রত্যেকের জন্য আছে জবাবদিহির স্মরণ। তুমি যা পেয়েছ, তা দিয়ে তুমি গর্বিত হবে, নাকি কৃতজ্ঞ হবে—এই প্রশ্নের মুখেই মানুষ নিজের প্রকৃত রূপ দেখে। আর শেষে আয়াতটি আমাদের আল্লাহর আরেক নামের দিকে টেনে নেয়: তিনি غفور, তিনি رحيم। অর্থাৎ, বান্দা যদি ফিরে আসে, তবে তাঁর দরজা কঠিন নয়; যদি চোখ ভিজে ওঠে, তবে তাঁর রহমত দূরে নয়। ভয় আর আশা—দুটোকে একসঙ্গে বুকে ধারণ করাই ঈমানের শ্বাস।

এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মানুষ আর নিজের শক্তির গল্প শোনাতে পারে না। যে কষ্ট আমরা এতদিন ধরে বয়ে বেড়াই, যে দুশ্চিন্তাকে বুকে আঁকড়ে ধরি, যে ভয়কে রাতের অন্ধকারে আরও বড় করে তুলি—সেগুলোর সবকিছুর ওপরই শেষ কথা আল্লাহর। আবার যে কল্যাণকে আমরা নিজের বুদ্ধি, নিজের পরিশ্রম, নিজের পরিকল্পনার ফল বলে গর্ব করি, সেটিও আসলে তাঁরই ফযল, তাঁরই দান, তাঁরই রহমত। মুমিনের হৃদয় তখন নত হয়; সে বুঝে যায়, আমি কিছুই ধারণ করে রাখি না, আল্লাহই সব ধারণ করেন। আমি কিছুই প্রতিরোধ করতে পারি না, আল্লাহই সব প্রতিরোধের মালিক।

তাই এই আয়াত কেবল আশ্বাস নয়, এটি জাগরণের ডাক। যদি কষ্ট এসে থাকে, তবে রবের দিকে ফিরে যাও; যদি কল্যাণ এসে থাকে, তবে অহংকারে নয়, কৃতজ্ঞতায় মাথা নত করো। কারণ আল্লাহ গফুর—তিনি ক্ষমা করেন; তিনি রহিম—তিনি দয়া করেন। বান্দা যতবারই দুর্বল হয়ে পড়ে, ততবারই তার জন্য খোলা থাকে ফিরে আসার দরজা, যদি সে সত্যিই ফিরে আসতে চায়। এই সত্যকে হৃদয়ে বসিয়ে দিলে দুঃখও একদিন ইবাদতে বদলে যায়, আর সুখও একদিন পরীক্ষায়। তখন জীবন আর এলোমেলো থাকে না; জীবন হয়ে ওঠে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের এক দীর্ঘ, কাঁপতে-কাঁপতে-চলার সফর।