কখনো কখনো কুরআনের একটি আয়াত যেন ভয় আর আশ্বাস—দুটোকে একসঙ্গে বুকে নিয়ে আসে। এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করছেন, তিনি তাঁর রসূলদের এবং যারা ঈমান এনেছে, তাদের নাজাত দেন; এমন নাজাত, যা কেবল দুনিয়ার একটি বিপদ থেকে বাঁচানো নয়, বরং সত্যের সঙ্গে থাকা বান্দাকে শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের হাত থেকে উদ্ধার করে নিরাপত্তার দিকে টেনে নেয়। আরবিতে যে শব্দটি এসেছে, نُنَجِّي, তাতে আছে ধীরে ধীরে মুক্তি দেওয়ার, নিরাপদে বের করে আনার, অন্ধকার ভেদ করে আলোতে পৌঁছে দেওয়ার এক গভীর তাৎপর্য। যেন আল্লাহ বলছেন, আমার পথের পথিক একা পড়ে যায় না; আমার রসূলের পথ কখনো পরিত্যক্ত হয় না; আমার প্রতি ঈমান যে ধরে, সে শেষ পর্যন্ত রহমতের হাতের বাইরে থাকে না।

সূরা ইউনুসের এই অংশে মূল সুরটি হলো তাওহীদ, নবুয়তের সত্যতা, আর কিয়ামতের সামনে মানবজীবনের চূড়ান্ত পরিণতি। এর আগের আয়াতগুলোতে অবিশ্বাসী জাতিরা সত্যকে অস্বীকার করেছিল, রাসূলদের বিরুদ্ধে তর্ক করেছিল, আর দুনিয়ার শক্তি দিয়ে নিজেদের নিরাপদ ভাবছিল। কিন্তু কুরআন স্মরণ করিয়ে দেয়, জাতির ভিড়, ক্ষমতার উল্লাস, মিথ্যার জোর—কোনোটিই আল্লাহর ফয়সালাকে ঠেকাতে পারে না। যখন সত্যকে অস্বীকারের অন্ধকার ঘনীভূত হয়, তখন আল্লাহ তাঁর রসূল ও মুমিনদের রক্ষা করেন—কখনো দৃশ্যমান বিপদ থেকে, কখনো জাতির চূড়ান্ত পরিণতি থেকে, আর কখনো এমনভাবে যে, ধ্বংস আসে সত্যদ্রোহীদের ওপর, অথচ ঈমানদারদের জন্য খোলা থাকে বাঁচার রাস্তা। ইতিহাসের প্রতিটি জাতি যেন এই আয়াতের নীরব সাক্ষী: আল্লাহর ন্যায়বিচার দেরি করতে পারে, কিন্তু ব্যর্থ হয় না।

আর শেষ বাক্যটি তো হৃদয় কাঁপিয়ে দেয়: كَذَٰلِكَ حَقًّا عَلَيْنَا نُنجِ ٱلْمُؤْمِنِينَ—এমনিভাবে, ঈমানদারদের বাঁচিয়ে নেয়া আমার দায়িত্বও বটে। সৃষ্টির প্রভু যখন নিজের ওপর ‘হক’ বা অটল প্রতিশ্রুতি আরোপ করে কথা বলেন, তখন তা কোনো মানুষের বাধ্যবাধকতা নয়; বরং তাঁর কৃপা, তাঁর ওয়াদা, তাঁর অমোঘ ইনসাফের ঘোষণা। এখানে কোনো বান্দার গর্ব করার জায়গা নেই, আছে শুধু বিনয়; কোনো অহংকারের প্রশ্রয় নেই, আছে নিরাপত্তার আশা। যে ঈমান আনে, সে বুঝতে শেখে: নাজাত কেবল বাহ্যিক সাফল্য নয়, নাজাত হলো আল্লাহর কাছে হেফাজত, সত্যের সঙ্গে স্থির থাকা, আর শেষ বিচারে অপমানিত না হওয়া। তাই এই আয়াত মুমিনের অন্তরে এক আশ্রয়-নদী হয়ে প্রবাহিত হয়—ভয় আসে, কিন্তু নিরাশা আসে না; বিপদ আসে, কিন্তু হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে না; কারণ আল্লাহর নাজাতের প্রতিশ্রুতি সত্য, আর তাঁর রহমত সত্যের পথকে কখনো ফাঁকা করে রাখে না।

কখনো সত্যের পথকে মানুষ একাকিত্বের পথ ভাবে, কখনো মনে করে এই পথে নেই কোনো আশ্রয়, নেই কোনো শেষ হাসি। অথচ এই আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করছেন, তিনি তাঁর রসূলদের এবং যারা ঈমান এনেছে তাদের নাজাত দেন। নাজাত এখানে কেবল পানিতে ডোবা থেকে তোলা নয়, কেবল শত্রুর আঘাত থেকে বাঁচানোও নয়; বরং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো বান্দাকে ভেতর-বাহিরের ধ্বংস, অপমান, বিভ্রান্তি আর চূড়ান্ত পরিণতির ভয়াবহতা থেকে নিরাপদে টেনে আনা। মানুষের চোখে কখনো ঈমানী জীবন দুর্বল দেখায়, কিন্তু আল্লাহর চোখে সেটাই নিরাপত্তার দরজা। যেখানে মানুষ পরাজয় দেখে, সেখানে আল্লাহ দেখেন রক্ষা; যেখানে মানুষ শেষ দেখে, সেখানে আল্লাহ শুরু করেন রহমতের পথ।

রসূলগণের নাজাতের উল্লেখ আসলে নবুয়তের সত্যতাকেই উজ্জ্বল করে। আল্লাহর পক্ষ থেকে যারা পাঠানো, তারা মিথ্যার জালে আটকে পড়ে নিঃশেষ হয়ে যান না; তাদের দাওয়াত, তাদের সত্যনিষ্ঠা, তাদের ত্যাগ অবশেষে আল্লাহরই সুরক্ষায় পূর্ণতা পায়। আর তাদের সঙ্গে মুমিনদের উল্লেখ যেন ঘোষণা করে, সত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকা একটি নিরাপদ নৌকা—ঝড় উঠতে পারে, ঢেউ ভাঙতে পারে, কিন্তু আল্লাহর ওয়াদা ভাঙে না। এই নাজাত কেবল দুনিয়ার ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; কিয়ামতের দিনও তা প্রকাশ পাবে, যখন সমস্ত জোর, সমস্ত অহংকার, সমস্ত মিথ্যা আশ্রয় ভেঙে পড়বে, আর একমাত্র আল্লাহর রহমতই হবে শেষ আশ্রয়।
অতঃপর আয়াতটি এমন এক বাক্যে এসে হৃদয়কে থামিয়ে দেয়: ঈমানদারদের বাঁচিয়ে নেয়া আমার দায়িত্বও বটে। কী অপূর্ব প্রতিশ্রুতি! বান্দা যখন ঈমানকে আঁকড়ে ধরে, আল্লাহ তখন নিজের উপরই নাজাতের দায়িত্ব স্থির করেন—এ কথা মানুষের নয়, রবের কথা। তাই ঈমান মানে শুধু কিছু বিশ্বাসের কথা বলা নয়; ঈমান মানে এমন এক আশ্রয়ে প্রবেশ করা, যেখানে নুহূর নয়, ভরসা; ভয়ের নয়, ওয়াদা; পরাজয়ের নয়, রহমতের নিয়ন্ত্রণ। এই আয়াত আমাদের শেখায়, সত্যের পথে চলা কখনো বৃথা যায় না। যে আল্লাহ রসূলকে রক্ষা করেন, তিনি মুমিনকেও রক্ষা করেন; যে আল্লাহ ইতিহাসের ভাঙনের মধ্যে তাঁর প্রিয়দের নিরাপদ রাখেন, তিনি আজও তাঁর ঈমানদার বান্দাকে অন্ধকারের ভেতর একা ছেড়ে দেন না।

এই আয়াতে যেন আসমান থেকে নেমে আসে এক অটল ঘোষণা: আল্লাহ তাঁর রসূলদের বাঁচিয়ে নেন, আর যারা ঈমান এনেছে তাদেরও বাঁচিয়ে নেন। মানুষ যখন সত্যকে ঘিরে ঘৃণার অন্ধকার রচনা করে, যখন শক্তি, সংখ্যাগরিষ্ঠতা, শাসন, অথবা বিদ্রূপ নিজেকে বিজয়ী ভাবতে শেখায়, তখন কুরআন বলে—শেষ কথা মানুষের নয়, আল্লাহর। নবুয়তের পথ কখনো অনাথ নয়; ঈমানের যাত্রী কখনো পরিত্যক্ত নয়। আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সুরক্ষা আসে, তা শুধু শরীর বাঁচানো নয়; তা হৃদয়কে বিভ্রান্তি থেকে, আত্মাকে ধ্বংস থেকে, এবং বান্দাকে চিরস্থায়ী লাঞ্ছনা থেকে রক্ষা করার রহমত।

আরবির نُنَجِّي শব্দটি মনে করিয়ে দেয়, নাজাত হঠাৎ চমকে আসা এক ঘটনা নয়; এটি আল্লাহর কুদরতের পরিকল্পিত, ধীর, গভীর, নিরাপদ মুক্তি। বান্দা হয়তো অন্ধকারে হাঁটে, ভয় পায়, ক্ষতবিক্ষত হয়, তবু যদি সে সত্যের সঙ্গে থাকে, তার পথের শেষ প্রান্তে আল্লাহর হিফাজত অপেক্ষা করে। এ জন্যই এই আয়াত শুধু রাসূলদের মর্যাদা ঘোষণা করে না, মুমিনের বুকেও সাহস ঢেলে দেয়। ঈমান মানে এই নয় যে বিপদ আসবে না; ঈমান মানে এই যে বিপদের ভিতরেও আল্লাহর ওয়াদা ভেঙে যাবে না।

এখানে নিজের হিসাব নেওয়ার ডাকও আছে। আমি কি সত্যের সঙ্গে আছি, নাকি কেবল নিরাপত্তার সঙ্গে? আমি কি আল্লাহর সন্তুষ্টি চাই, নাকি জনতার তালি? সমাজ যখন অন্যায়কে স্বাভাবিক করে, যখন মিথ্যা আর সত্যের মুখোশ বদলে যায়, তখন এই আয়াত মুমিনকে সোজা দাঁড় করায়: ভয় পেয়ো না, কারণ রক্ষাকারী আল্লাহ; নিরাশ হয়ো না, কারণ নাজাতও তাঁরই দায়িত্ব। যে হৃদয় তাঁর ওপর নির্ভর করে, সে অবশেষে রক্ষা পায়—দুনিয়ার চাপে হয়তো ক্ষতবিক্ষত, কিন্তু আখিরাতের ফয়সালায় অপমানিত নয়; বরং রহমতের দিকে তুলে নেওয়া এক বান্দা, যাকে আল্লাহ নিজ হাতে নিরাপত্তার অদৃশ্য ছায়ায় পৌঁছে দেন।

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলার এক মহিমান্বিত ঘোষণা যেন সমস্ত ভয়ের ভেতরকার শেষ শব্দটি উড়িয়ে দেয়: তিনি তাঁর রসূলদের বাঁচিয়ে নেন, এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরও। দুনিয়ার হিসাব আমাদেরকে শেখায়, শক্তিমানই টিকে থাকে; কিন্তু কুরআন শেখায়, টিকে থাকে সেই-ই, যার সঙ্গে আল্লাহর নুসরত আছে। রাসূলের পথ কখনো ব্যর্থতার পথ নয়, ঈমানের পথ কখনো অপমানের শেষ পরিণতি নয়। সত্যকে যারা ঘিরে ধরে, দুনিয়া তাদের ওপর অন্ধকার নামাতে পারে; কিন্তু আল্লাহর ফয়সালা এলে সেই অন্ধকার ভেদ করে নাজাতের আলোই বেরিয়ে আসে।
আয়াতের এই প্রতিশ্রুতি কেবল অতীতের কোনো জাতির জন্য নয়; এটি কিয়ামত পর্যন্ত জেগে থাকা এক সান্ত্বনা। যখন সত্যের লোকেরা একা হয়ে যায়, যখন মিথ্যার ভিড় নিজের সংখ্যাকে শক্তি ভাবে, যখন হৃদয় শঙ্কায় কাঁপে—তখন এই বাক্যটি মনে পড়া উচিত: ঈমানদারদের বাঁচিয়ে নেওয়া আল্লাহর দায়িত্ব। কী শান্ত, কী গভীর, কী ভয়ভরা আশ্বাস! যে রব তাঁর রাসূলকে রক্ষা করেন, তিনি মুমিনের অশ্রুও দেখেন; যে রব সত্যের বাহকদের বের করে আনেন, তিনি পথহারা অন্তরকেও ডেকে নিতে পারেন।
সুতরাং এই আয়াত আমাদেরকে অহংকারের নয়, আশ্রয়ের দিকে ফেরায়। নিজের শক্তি, পরিচয়, ভিড়, যুক্তি—কোনোটাই শেষ রক্ষাকবচ নয়; আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই রক্ষার শুরু। আজ যদি ঈমান দুর্বল হয়ে থাকে, তাওবা করে তা জাগাও। যদি অন্তর সন্দেহে ঘেরা থাকে, কুরআনের সত্যের সামনে নত হও। কারণ আল্লাহর ওয়াদা খণ্ডিত হয় না, আর তাঁর রহমত এমন সব বান্দার জন্যই অপেক্ষা করে—যারা ভাঙা হৃদয় নিয়ে তাঁর দরজায় দাঁড়ায় এবং বলে, হে রব, আমাদেরও তাঁদের দলে রাখুন যাদের আপনি নাজাত দেন।