মূসা আলাইহিস সালামের কণ্ঠে এই প্রশ্নটি যেন বজ্রের মতো কঠিন, আবার ন্যায়ের মতো নির্মল। “হে সামেরী, এখন তোমার ব্যাপার কি?”—এটা কেবল জিজ্ঞাসা নয়, এটা এক ভ্রান্ত হৃদয়কে সামনে এনে দাঁড় করানো, যেন সত্যের আলোয় তার মুখোশ খুলে যায়। এই আয়াতে আমরা দেখি, অহি-নির্দেশিত নবী কোনো অস্পষ্টতার কাছে নত হন না; তিনি বিভ্রান্তিকে নাম ধরে ডাকেন, তার জবাবদিহি চান। তাওহীদের কঠিন মসনদে দাঁড়িয়ে মূসার এই প্রশ্ন আমাদের শেখায়, সত্য শুধু অনুভবের বিষয় নয়; সত্যের সামনে মানুষের কাজ, নিয়ত, এবং পথও জবাবদিহির আওতায় আসে।

সূরার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এই কথা আসে বনী ইসরাঈলের সেই ভয়াবহ পরীক্ষার পরে, যখন সামেরী তাদের অন্তরে ফিতনা ছড়িয়ে একটি বাছুর-রূপ মূর্তি নির্মাণ করে উপাসনার বিভ্রম তৈরি করেছিল। এ বিষয়ে কুরআনই মূল ভরসা; নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো অতিরিক্ত কাহিনি বা অলঙ্কার এখানে প্রয়োজন নেই। কুরআনের এই বর্ণনা আমাদের সামনে একটি স্থায়ী সামাজিক-আকীদাগত বাস্তবতা তুলে ধরে: হিদায়াতের কাছাকাছি থেকেও মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে, আর নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো বিভ্রান্তিকে চিহ্নিত করা, মিথ্যার নাম উন্মোচন করা, এবং তাওহীদের দিকে ফিরিয়ে আনা।

এই আয়াত হৃদয়কে থামিয়ে দেয়, কারণ এটি কেবল সামেরীর প্রতি প্রশ্ন নয়; এটি যেন আমাদের প্রতিটি ভাঙা বিশ্বাসকে জিজ্ঞাসা করে—তুমি কোন পথে চলে গেলে, কেন গেলে, কীসের মোহে গেলে? মূসার প্রশ্নে রয়েছে কঠোরতা, কিন্তু তার ভেতরে আছে দাওয়াতের করুণা; তিনি অপমানের জন্য ডাকেন না, বরং সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ডাকেন। যে অন্তর স্মরণ হারায়, সে সহজেই মায়ার পিছু নেয়; আর যে অন্তর তাওহীদ আঁকড়ে ধরে, সে বিভ্রান্তির মধ্যেও আল্লাহর দিকে ফিরবার শক্তি পায়। এই প্রশ্ন আমাদেরও জাগায়—জীবনে যদি কোনো সামেরী-ধরনের ফিতনা ঢুকে পড়ে, তবে তার নাম ধরে তাকে চেনা, তাকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানো, এবং আল্লাহর সত্যের সামনে নিজেকে সমর্পণ করা-ই ঈমানের পথ।

মূসা আলাইহিস সালামের এই প্রশ্নে কোনো কৌতূহল নেই, আছে সত্যের অনড় দৃষ্টি। বিভ্রান্তি যখন ভিড়ের মধ্যে ভিড় করে, তখন নবীর কণ্ঠ তাকে আলাদা করে ডেকে আনে—হে সামেরী, তোমার ব্যাপার কি? এ প্রশ্ন শুধু একজন মানুষের অপরাধ জিজ্ঞাসা নয়; এ প্রশ্ন অন্তরের ভেতর লুকানো সেই রোগকে নাম ধরে ডাকে, যা হিদায়াতের পাশে থেকেও মানুষকে গোমরাহির দিকে টেনে নেয়। কুরআন এখানে আমাদের শেখায়, মিথ্যা যতই শৈল্পিক হোক, তাওহীদের সামনে তার হিসাব দিতে হয়; আর সত্যের সামনে অজুহাত কেবল আরও নগ্ন হয়ে পড়ে।

একজন নবী যখন জিজ্ঞাসা করেন, তখন সেই প্রশ্নে করুণা থাকে, কিন্তু ঢিলেঢালা ছাড় থাকে না। কারণ দাওয়াত মানে কেবল ডাক নয়, জবাবদিহিও; কেবল সান্ত্বনা নয়, ভাঙা আত্মাকে আয়নার সামনে দাঁড় করানোও। সামেরীর ফিতনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষ অনেক সময় আল্লাহকে ভুলে কোনো বস্তু, কোনো কল্পনা, কোনো দল, কোনো আকর্ষণকে কেন্দ্র বানিয়ে ফেলে; আর তখন অন্তর নিজেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে ওঠে। মূসার এই বাক্য আমাদের হৃদয়ে কাঁপন জাগায়: যে সত্যকে তুমি চেনো, তার সামনে একদিন তোমাকেও দাঁড়াতে হবে।
এখানে এক গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা লুকিয়ে আছে—হিদায়াতের পথে শুধু অশ্রু যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সোজাসুজি সত্যকে স্বীকার করার সাহস। আল্লাহর বান্দা যখন ভুল করে, তখন তার মুক্তি লুকায় না; বরং নিজের অবস্থাকে আল্লাহর আলোয় দেখা, এবং সেই আলো থেকে পালিয়ে না বেড়িয়ে ফিরে আসা। এই আয়াত যেন বলে, বিভ্রান্তির পক্ষে যতই শব্দ জমুক, সত্যের একটিই প্রশ্ন যথেষ্ট: এখন তোমার ব্যাপার কি? সেই প্রশ্ন আজও আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে—আমার হৃদয় কি তাওহীদের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, নাকি কোনো নীরব সামেরীর হাতের কারুকাজে বন্দী হয়ে গেছে?

মূসা আলাইহিস সালামের এই প্রশ্নে যেন নরম সুর নেই, তবু তার ভেতরে করুণার শেষ আলোটুকু জ্বলছে। “হে সামেরী, এখন তোমার ব্যাপার কি?”—এ প্রশ্নের মধ্যে আছে জবাবদিহির আহ্বান, আছে ভ্রান্তিকে আড়াল থেকে বের করে আনার দীপ্ত সাহস। সত্য যখন সামনে দাঁড়ায়, তখন মিথ্যা আর ধোঁয়াশার আশ্রয়ে লুকোতে পারে না; তাকে নাম ধরে ডাকতে হয়, তার কাজের হিসাব চাইতে হয়। অহি-নির্দেশিত নবীর দৃষ্টি আমাদের শেখায়, দ্বীনের পথে সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিস হলো বিভ্রান্তিকে স্বাভাবিক মনে করে নেওয়া, আর সবচেয়ে বড় নেয়ামত হলো অন্তরকে এমন এক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো, যেখানে মানুষ নিজের অবস্থান চিনতে বাধ্য হয়।

এই আয়াতের পেছনের বৃহত্তর দৃশ্যে বনী ইসরাঈলের এক কঠিন পরীক্ষার কথা আছে—যেখানে সামেরী ফিতনার বীজ বুনে মানুষের চোখকে মোহিত করেছিল, আর হৃদয়কে তাওহীদের সরল পথ থেকে টেনে নিতে চেয়েছিল। কুরআন এখানে কাউকে কল্পনার রাজ্যে নেয় না; বরং সমাজের সেই পুরোনো ক্ষতটি দেখায়, যেখানে নেতৃত্বহীনতা, স্মৃতিভ্রংশ, এবং প্রবৃত্তির মোহ একসঙ্গে মিলে ঈমানকে দুর্বল করে দেয়। তাই মূসার প্রশ্ন শুধু সামেরীর জন্য নয়; তা প্রতিটি যুগের সেই সব মানুষকে জাগায়, যারা সত্যের কাছাকাছি থেকেও নিজের হাতে বিভ্রমকে লালন করে।

এ আয়াত আমাদের নিজের হৃদয়ের সামনে দাঁড় করায়। আমরা কি এমন কোনো ‘সামেরী’ পুষে রাখিনি—যে আমাদের কাছে সত্যকে সুন্দর নাম দিয়ে ভুল পথে হাঁটায়, আর আল্লাহর স্মরণকে ফিকে করে দেয়? মূসার কণ্ঠে শোনা যায় শাসনের কঠোরতা, কিন্তু তার অন্তরে লুকিয়ে থাকে উম্মতের কল্যাণচিন্তা; কারণ নবী চান মানুষ ফিরে আসুক, ধ্বংসে না যাক। এভাবেই কুরআন আমাদের শেখায়, তাওহীদের আহ্বান কখনো কোমলতার অভাব নয়, আবার জবাবদিহির দাবি কখনো হিদায়াতের করুণা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। যে হৃদয় আজ নিজের হিসাব নিতে শেখে, সে-ই আগামী দিনে আল্লাহর সামনে হালকা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

মূসা আলাইহিস সালামের এই প্রশ্নে এক অদ্ভুত কাঁপন আছে—তিনি কেবল একজন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করছেন না, তিনি যেন বাতিলের মুখোশের সামনে সত্যের শেষ আলোটুকু তুলে ধরছেন। সামেরীকে তিনি ডাকছেন নাম ধরে, কারণ বিভ্রান্তি যখন সমাজে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা আর ধোঁয়াশা হয়ে থাকতে পারে না; তাকে জবাবদিহির মুখে দাঁড়াতেই হয়। অহির পথ এভাবেই সরল: মিথ্যার যত সূক্ষ্ম কারুকাজই থাকুক, সত্য তার আসল চেহারা চিনিয়ে দেয়। তাওহীদ এমন এক নূর, যার সামনে মানুষের বানানো আকর্ষণ, কৌশল, প্রতীক, এবং ভিড়ের উন্মাদনা সবই ক্ষুদ্র হয়ে যায়।

আজকের হৃদয়ও কি সামেরীর মতো কোনো না কোনো ভ্রান্তির দিকে সরে যায় না? কখনো নামের মোহে, কখনো ভিড়ের চাপেতে, কখনো নিজের ভেতরের দুর্বলতায়—মানুষ সত্যকে চিনেও সত্যের পাশে স্থির থাকতে পারে না। এই আয়াত আমাদের শেখায়, আল্লাহর পথে ফিরে আসা মানে শুধু ভুল স্বীকার করা নয়; ভুলের উৎস চিনে নেওয়া, নিজের অন্তরকে প্রশ্নের সামনে বসানো, এবং লাজুক তওবার আগুনে জ্বলে উঠে শুদ্ধ হওয়া। মূসার প্রশ্ন আমাদেরও জাগিয়ে তোলে: আমার ব্যাপার কী, আমি কার পক্ষে দাঁড়িয়েছি, কার ডাকে সাড়া দিয়েছি, কোন প্রতিমাকে হৃদয়ে বসিয়েছি? যে দিন মানুষ এই প্রশ্নের সামনে কেঁপে উঠে, সে দিনই তার অন্তরে ঈমান নতুন করে নিঃশ্বাস নেয়।