এই আয়াতে এমন এক দৃশ্য ধরা পড়ে, যেখানে মানুষের অন্তর সত্যকে সামনে পেয়েও স্থির থাকে না; বরং কৃত্রিম আশ্রয়ের গায়ে লেগে থাকতে চায়। তারা বলল, মূসা আলাইহিস সালাম ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা এর সাথেই যুক্ত হয়ে বসে থাকব। কথাটি শুনতে যেন অপেক্ষার ভাষা, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে জেদের অন্ধকার। যখন অহির ডাক মানুষকে তাওহীদের দিকে টানে, তখনও কেউ কেউ সাময়িক অনুপস্থিতিকে অজুহাত বানিয়ে ভ্রান্তির পাশে বসে থাকে। এভাবেই প্রকাশ পায়—অন্তর যদি স্মরণহীন হয়ে পড়ে, তবে সে সত্যের দিকে এগোনোর বদলে নিজের তৈরি মূর্তির সামনে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেও প্রস্তুত থাকে।
সূরা ত্বহার এই অংশে মূসা আলাইহিস সালামের ফিরে আসার প্রসঙ্গ মূলত বনী ইসরাঈলের এক বড় পরীক্ষার আবহে এসেছে। এখানে তারা আল্লাহর একত্বের পথে ডাকা সত্ত্বেও ধৈর্য, আনুগত্য ও অন্তরের স্বচ্ছতা হারিয়ে ফেলে। কোনো নির্ভরযোগ্য বিবরণ ছাড়া নির্দিষ্ট ঘটনার খুঁটিনাটি টেনে আনার প্রয়োজন নেই; তবে কুরআনের সামগ্রিক ধারায় স্পষ্ট, এ ছিল এমন এক সামাজিক ও ঈমানি সংকট, যেখানে মানুষ নবীর অনুপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ভুলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। সত্যের দাওয়াত দূরে সরে গেলে হৃদয় কত সহজে পুরনো অভ্যাস, দৃশ্যমান প্রতীক আর ভ্রান্ত নির্ভরতার কাছে ফিরে যায়—এই আয়াত তা গভীরভাবে দেখায়।
আর এখানেই আমাদের জন্য এক নীরব কিন্তু তীব্র সান্ত্বনা আছে। মূসা আলাইহিস সালামের প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষা যেমন একদল মানুষকে ভ্রান্তিতে স্থির করে রেখেছিল, তেমনি আজও প্রতীক্ষার নাম করে মানুষ নিজের ভিতরের সংশয়কে লুকিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু অহি আমাদের শেখায়, সত্য কখনো মানুষের জেদের উপর নির্ভরশীল নয়; সত্যের আলো আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর তা গ্রহণের জন্য চাই স্মরণ, নম্রতা এবং তাওহীদের প্রতি ফিরে আসা। যে অন্তর আল্লাহকে স্মরণ করে, সে অনুপস্থিতির ভয়েও পথ হারায় না; আর যে অন্তর বিস্মৃত হয়, সে উপস্থিত সত্যকেও অস্বীকার করতে পারে।
মূসা আলাইহিস সালাম ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা এর সাথেই লেগে থাকব—এই এক বাক্যের ভেতরে কত বিপজ্জনক আত্মপ্রবঞ্চনা লুকিয়ে থাকে! মানুষের হৃদয় যখন সত্যের ডাক শুনেও থামে না, তখন সে প্রতীক্ষাকেও জেদের ঢাল বানায়। বাহ্যত এটি ধৈর্যের ভাষা, কিন্তু অন্তরে তা হতে পারে সত্য থেকে সরে থাকার এক দীর্ঘ অনড়তা। কুরআন যেন আমাদের সামনে এমন এক আয়না ধরে: মানুষ কখনো কখনো আল্লাহর স্মরণের পথে না গিয়ে, নিজের হাতে গড়া ভ্রান্ত আশ্রয়ের গায়ে ভর দিয়েই নিরাপত্তা খোঁজে। অথচ নিরাপত্তা সেখানে নয়; নিরাপত্তা একমাত্র সেই তাওহীদের ছায়ায়, যেখানে অন্তর আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ে।
এ কারণেই এই আয়াত অন্তরের এক গভীর পরীক্ষার কথা বলে। মানুষ কখনো কখনো সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে না বলে না, কিন্তু তার হৃদয় ভেতরে ভেতরে বলে—এখন নয়, পরে, আরেকটু সময়, আরেকটু প্রতীক্ষা। কিন্তু ঈমানের আসল প্রশ্ন হলো: আমি কীসের অপেক্ষা করছি, আর কীসের পাশে বসে আছি? যদি অপেক্ষা আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার না হয়, তবে সে অপেক্ষা কেবলই শূন্যতার নামান্তর। সূরা ত্বহার আলোয় এই দৃশ্য আমাদের মৃদু নয়, কঠিনভাবে জাগিয়ে তোলে: মূর্তির পাশে বসে থাকা হৃদয়কে মুক্তি দেয় না; মুক্তি দেয় একমাত্র স্মরণ, একমাত্র অহির ডাক, একমাত্র সেই রবের দিকে প্রত্যাবর্তন—যাঁর সামনে সমস্ত প্রতীক্ষা শেষ হয়, আর সমস্ত ভাঙা অন্তর শান্তি খুঁজে পায়।
মূসা আলাইহিস সালামের ফিরে আসা পর্যন্ত তারা যে ভ্রান্ত বস্তুটির সামনে “সদাসর্বদা” বসে থাকার অঙ্গীকার করল, তাতে মানুষের এক গভীর অন্তর্গত রোগ ধরা পড়ে: সত্য সামনে এলে শুধু দেখা নয়, তাকে গ্রহণ করাই সবচেয়ে কঠিন। অপেক্ষা এখানে ধৈর্যের নাম নেয়, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তা জেদের মোহরে পরিণত হয়। মানুষ যখন অহির আলো শোনেও নিজের নির্মিত ভ্রান্ত আশ্রয় ছাড়তে চায় না, তখন তার প্রতীক্ষা আর ইবাদত থাকে না; তা হয়ে ওঠে আত্মাকে ধীরে ধীরে পাথর বানিয়ে দেওয়ার এক নীরব সাধনা।
এই আয়াত আমাদের সমাজকেও আয়না দেখায়। কখনো পরিবারে, কখনো জনতার ভিড়ে, কখনো মত ও অভ্যাসের শক্তিতে মানুষ এমন কিছুকে আঁকড়ে ধরে, যা তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে; অথচ মুখে সে সময়ের অপেক্ষার কথা বলে। কিন্তু কুরআন শেখায়, সত্যের ডাক বিলম্বে আসে না, আমাদের হৃদয়ই অনেক সময় বিলম্বিত হয়। মূসা আলাইহিস সালাম ফিরে আসবেন—এই নিশ্চিত আশার মাঝেও তাদের অবস্থান বলছে, নবীর অনুপস্থিতি বা পরিস্থিতির ঘোলাটে সময় অন্তরকে পরীক্ষা করে; তখনই প্রকাশ পায় কে আল্লাহর দিকে ফেরে, আর কে ভ্রান্তির পাশে স্থির হয়ে বসে থাকে।
এখানেই মুমিনের নিজের হিসাব নেওয়া জরুরি। আমি কি এমন কোনো অভ্যাস, কোনো মানুষ, কোনো ভাসা-ভাসা ধারণার পাশে বসে আছি, যা আমাকে তাওহীদের সতেজতা থেকে দূরে রাখছে? আমি কি সত্যের ডাক শুনে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দিচ্ছি, নাকি মূসা আলাইহিস সালামের ফিরে আসার অজুহাতের মতো কোনো কাল্পনিক ‘পরে’ বানিয়ে নিয়েছি? এই আয়াত ভয় জাগায়, আবার আশা-ও জাগায়—কারণ আল্লাহর বান্দা যতক্ষণ ফিরে আসার ক্ষমতা রাখে, ততক্ষণ তার জন্য দরজা বন্ধ নয়। হৃদয় যদি স্মরণে জেগে ওঠে, তবে ভ্রান্তির সামনে বসে থাকা মানুষটিও একদিন উঠতে পারে; আর সেই ওঠাই হলো আত্মার প্রকৃত প্রত্যাবর্তন, একমাত্র রবের দিকে।
কখনো মানুষের ভেতরের অবস্থা এমন হয় যে, সে সত্যকে অস্বীকার করছে বলেও মনে হয় না; সে শুধু “পরে”র আড়ালে নিজের অবাধ্যতাকে লুকিয়ে রাখে। মূসা আলাইহিস সালাম ফিরে আসবেন—এই অপেক্ষার কথাই তারা বলেছিল; কিন্তু অপেক্ষা যদি তাওহীদের কাছে নত হওয়ার জন্য না হয়, তবে তা হয় জেদের দীর্ঘ ছায়া। আজও মানুষ এমনই করে: আল্লাহর ডাক সামনে, কুরআনের আলো সামনে, তবু অন্তর বলে—আরও একটু পরে, আরও একটু সময়। এই “পরে” কতবার যে হৃদয়ের দরজায় তালা হয়ে বসে! আর তালা-লাগা হৃদয়ই একদিন নিজের হাতে গড়া ভ্রান্ত আশ্রয়কে সান্ত্বনার ঘর মনে করতে শুরু করে।
এই আয়াত আমাদের থামিয়ে দেয়, যেন মাথা নত করে আমরা নিজেদের জিজ্ঞেস করি—আমি কি সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, নাকি আমার অভ্যাসকে ধর্মের পোশাক পরিয়ে অপেক্ষার নাম দিচ্ছি? মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াত ছিল মানুষের অন্তরকে জীবিত করার ডাক; স্মরণের ডাক; সেই রবের দিকে ফেরার ডাক, যিনি আদম আলাইহিস সালামকে সম্মানিত করেছিলেন এবং সকল অন্তরকে তাঁরই দিকে ফিরতে আহ্বান করেন। তাই দেরি না করে আজই ফিরে আসা দরকার—অহংকার থেকে, গাফিলতি থেকে, নিজের বানানো ভরসা থেকে। কারণ সত্যের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় থাকা ইবাদত নয়; নত হওয়াই ইবাদত। আর যে হৃদয় আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তার জন্য তাওহীদ শুধু বিশ্বাসের কথা নয়, বরং সান্ত্বনার সবচেয়ে গভীর আশ্রয়।