ফেরাউন যখন বলল, “তাহলে অতীত যুগের লোকদের অবস্থা কী?”—তখন তার কণ্ঠে শুধু কৌতূহল ছিল না, ছিল ঔদ্ধত্যের আড়ালে লুকোনো এক ব্যর্থ প্রতিরোধও। সে মূসা (আ.)-এর আহ্বানকে কেবল বর্তমানের একটি সংঘর্ষ হিসেবে দেখতে চাইছিল না; বরং ইতিহাসের দরজায় প্রশ্ন ছুড়ে দিতে চেয়েছিল, যেন অতীতের প্রজন্মদের হিসাব টেনে এনে সত্যের পথকে অস্পষ্ট করা যায়। কিন্তু কুরআনের বিস্ময় এখানেই—মানুষ যখন ইতিহাসকে ভুলে গিয়ে নিজেকে কেন্দ্র বানাতে চায়, তখন ওহি এসে স্মরণ করিয়ে দেয়: আল্লাহর সামনে কোনো যুগই হারিয়ে যায় না, কোনো প্রজন্মই জবাবদিহির বাইরে থাকে না।
এই আয়াতটি সূরা ত্বহার সেই বৃহত্তর প্রবাহের অংশ, যেখানে ফেরাউনের দরবারে মূসা (আ.)-এর দাওয়াত ধীরে ধীরে তাওহীদের দীপ্তি ছড়িয়ে দেয়। ফেরাউন বারবার কথাকে ঘুরিয়ে দিতে চায়, যেন মূল প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া যায়—কে রব, কার কাছে নত হবে হৃদয়, এবং কার বিধানেই মানুষ আশ্রয় পাবে? তাই সে অতীত জাতিদের কথা তোলে। যেন বলতে চায়, তাদেরও তো ছিল জীবন, সভ্যতা, স্মৃতি; তারা কোথায় গেল? এই প্রশ্নের জবাবে কুরআন আমাদের শেখায়, ইতিহাস নিছক ধ্বংসস্তূপ নয়; ইতিহাস আল্লাহর আদালতের নীরব সাক্ষ্য। যে জাতি অহংকারে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছে, তার পতনও সেই সত্যেরই ভাষা।
এখানে কোনো নির্দিষ্ট শানে নুযুলের পৃথক বর্ণনা নয়, বরং মূসা (আ.) ও ফেরাউনের দীর্ঘ কথোপকথনের ভেতরে মানুষ-হৃদয়ের চিরন্তন এক বাস্তবতা উন্মোচিত হয়েছে। ক্ষমতাবান শাসকেরা যেমন বারবার অতীতকে প্রশ্ন করে নিজের বর্তমান অপরাধকে ঢাকতে চায়, তেমনি সাধারণ মানুষের মনও কখনো কখনো জানতে চায়—আগে যারা ছিল তারা কোথায়, কী হলো তাদের? কুরআন সেই প্রশ্নের ভেতরেই জবাবদিহির আলো ফেলে। অতীতের প্রজন্মদের অবস্থা কোনো শূন্য কৌতূহলের বিষয় নয়; তা আমাদের জন্য স্মরণ, শিক্ষা, এবং আত্মসমালোচনার দরজা। যে চোখ ইতিহাসকে আল্লাহর আয়না হিসেবে দেখে, সে বুঝতে শেখে: পৃথিবীতে কেউ চিরকাল থাকে না, তবে প্রতিটি আত্মা তার রবের সামনে পৌঁছবেই।
ফেরাউনের এই প্রশ্নে যেন মানুষের চিরচেনা অস্থিরতা ধরা পড়ে। সে জানতে চায় অতীতদের কথা, কিন্তু সত্যি করে জানতে চায় না; সে ইতিহাসের দরজা খুলছে না, বরং সত্যের দরজায় ধুলা ছিটাতে চাইছে। কারণ যে হৃদয় তাওহীদের সামনে মাথা নত করতে চায় না, সে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নের ভিড়ে আশ্রয় খোঁজে। অথচ ইতিহাস আল্লাহর কাছে নীরব নয়। যাদের নাম মুছে গেছে, যাদের প্রাসাদ ধুলো হয়েছে, যাদের শক্তি ছিল আকাশছোঁয়া—তাদের প্রতিটি অধ্যায়ও রব্বুল আলামিনের জ্ঞানের মধ্যে উজ্জ্বল। মানুষ ভাবে, সময়ই সব ঢেকে দেয়; কিন্তু ওহি বলে, সময় কিছুই ঢাকে না। সময় শুধু পর্দা সরিয়ে দেয়, আর পর্দার ওপারে জবাবদিহির আকাশ জ্বলজ্বল করে।
আর এ কারণেই এই প্রশ্নের জবাব শুধু তথ্য নয়, তাওহীদের এক তীব্র স্মরণ। অতীতের লোকজন কোথায়—এই প্রশ্নের আসল অর্থ হলো, আমার পরিণতিও কোথায় যাবে যদি আমি রবকে ভুলে যাই? যে আল্লাহ অতীতকে ধরে রেখেছেন, তিনিই ভবিষ্যতেরও মালিক। দাওয়াতের পথে চলতে গিয়ে কখনো কখনো মানুষের ঠাট্টা, প্রশ্ন, অপচেষ্টা, ইতিহাসের আড়ালে পালানোর কৌশল—সবকিছুই সামনে আসে। কিন্তু এই আয়াত অন্তরে সান্ত্বনা দেয়: সত্য কখনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়; তা আদমের পর থেকে সব যুগের ওপর দিয়ে বয়ে এসেছে, আর শেষ পর্যন্ত সে-ই টিকে থাকে যাকে আল্লাহ চান। তাই আজকের হৃদয়ও যদি এই প্রশ্নে কেঁপে ওঠে, তবে সেটাই হোক জাগরণের শুরু—অতীতকে দেখে নিজের শেষকে স্মরণ করা, আর স্মরণ থেকে তাওহীদের দিকে ফিরে আসা।
ফেরাউন অতীত যুগের লোকদের কথা তুলল, কিন্তু তার প্রশ্নের ভেতরে ছিল হৃদয়ের জিজ্ঞাসা নয়; ছিল সত্যকে ঘোলাটে করার পুরোনো কৌশল। মানুষ যখন আল্লাহর ডাক শুনে অস্বস্তি বোধ করে, তখন সে শুধু বর্তমানের মুখোমুখি হতে চায় না; ইতিহাসকেও টেনে এনে নিজের পক্ষে সাক্ষী বানাতে চায়। যেন বলে, “আগে যারা ছিল, তারা কোথায় গেল?” অথচ এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আরেকটি বড় সত্য—যে জাতি আল্লাহকে ভুলে যায়, তাদের দেহ থাকে, নাম থাকে, স্মৃতি থাকে; কিন্তু তাদের ভেতরের জ্যোতি নিভে যায়। কুরআন আমাদের শেখায়, ইতিহাস নিছক স্মৃতির ভাণ্ডার নয়; ইতিহাস জবাবদিহির নীরব আদালত।
এই আয়াত অন্তরে এক গভীর কাঁপন জাগায়। আমরা কত সহজে ভাবি, অতীত মানে দূরের কাহিনি, অন্যদের পতন, অন্যদের ভুল; অথচ কুরআনের দৃষ্টিতে অতীতের প্রতিটি প্রজন্ম যেন আমাদেরই সামনে দাঁড়িয়ে আছে—কারা সত্যকে মানল, কারা অহংকারে ডুবে গেল, কারা স্মরণ রাখল, কারা ভুলে গেল। ফেরাউনের এই প্রশ্ন আমাদেরও প্রশ্ন করে: তুমি কি মানুষের সংখ্যায় মুগ্ধ, সভ্যতার চাকচিক্যে বিমোহিত, নাকি আল্লাহর হকের সামনে বিনীত? পৃথিবীর উঠানামা, জাতির উত্থান-পতন, ক্ষমতার জৌলুশ ও ধ্বংস—সবই বান্দাকে শেখায় যে কারও স্থায়ী আশ্রয় নেই। শেষ আশ্রয় একমাত্র সেই রব, যাঁর সামনে সবাইকে ফিরতে হবে।
তাই এই আয়াত শুধু ফেরাউনের মুখের কথা নয়, এটি আমাদের অন্তরের জন্যও আয়না। যে হৃদয় স্মরণে বাঁচে, সে ইতিহাস দেখে ভয়ে কেঁপে ওঠে, আবার রহমতের আশায় ভরসাও পায়; কারণ আল্লাহ যাকে হিদায়াত দেন, তার জন্য অতীতের পতন শিক্ষা হয়ে যায়, শাস্তি নয়। আর যে হৃদয় ঔদ্ধত্যে থাকে, সে যুগের পর যুগ প্রশ্ন করেও সত্য থেকে পালাতে চায়। মূসা (আ.)-এর দাওয়াত আমাদের শেখায়—আহ্বান যখন তাওহীদের, তখন মানুষ, সমাজ, ইতিহাস, প্রজন্ম সবকিছুই আল্লাহর সামনে অর্থবহ হয়ে ওঠে। অতীত জাতিদের পরিণতি দেখে মুমিনের উচিত নিজের নফসকে জবাবদিহির মসনদে বসানো, যাতে সে আজই ফিরে আসে, আজই নরম হয়, আজই বলে: হে আল্লাহ, আমি ভুলে যেতে চাই না; আমি আপনার সামনে জীবিত থাকতে চাই।
কিন্তু এই প্রশ্নের ভেতরেই মানুষের অন্তরের চিরন্তন দুর্বলতা ধরা পড়ে। আমরা যেন বারবার জানতে চাই—যারা আগে গিয়েছিল, তাদের কী হলো? অথচ প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত—তারা যেখানে পৌঁছেছে, আমিও কি সেদিকেই এগোচ্ছি? ফেরাউনের জিজ্ঞাসা ইতিহাসকে টেনে আনে, কিন্তু কুরআন ইতিহাসকে সাক্ষী বানায়। অতীত প্রজন্মের ভিড়ে আল্লাহর নিদর্শন মুছে যায় না; বরং প্রতিটি উত্থান-পতন, প্রতিটি সভ্যতার গর্ব ও ভাঙন, প্রতিটি বাদশাহি ও পতন আমাদের শেখায়—মানুষ যত বড়ই হোক, আল্লাহর সামনে সে কেবল এক মুহূর্তের পথিক।
এ আয়াত আমাদের কানে শুধু ফেরাউনের প্রশ্নই শোনায় না; নিজের ভেতরের সেই প্রশ্নটিকেও জাগিয়ে তোলে, যা আমরা অনেকদিন চাপা দিয়ে রেখেছি: আমার পরিণতি কোথায়? আমার আমল কোথায়? আমার রবের সামনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি কোথায়? যারা আগে চলে গেছে, তাদের কবরও এখন নীরব; কিন্তু তাদের ইতিহাস নীরব নয়। মূসা (আ.)-এর দাওয়াত আমাদের শেখায়, দুনিয়ার কোলাহলে হারিয়ে না গিয়ে হৃদয়কে তাওহীদের দিকে ফিরিয়ে আনতে হয়, কারণ সত্যের পথ একা হলেও নিরাপদ, আর আল্লাহর স্মরণই মানুষের জন্য সবচেয়ে গভীর সান্ত্বনা। যে ব্যক্তি আজ নিজের অহংকার ভেঙে ফেলে, সে-ই বুঝতে পারে—অতীতের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই দুনিয়া আমাকে ভয় দেখাতে নয়, আমাকে জাগাতে এসেছে।